জ্বলদর্চি

ড. সৈয়দ শামসুল বারি (অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ, মেদিনীপুর) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২৩০
ড. সৈয়দ শামসুল বারি (অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ, মেদিনীপুর) 

ভাস্করব্রত পতি

১৯১৫ সালে মেদিনীপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সৈয়দ আবদুল বারির মৃত্যু হয় যখন তাঁর বয়স মাত্র চার বছর। এমতবস্থায় তাঁর পরবর্তী জীবনযাপন শুরু হয় মামাবাড়িতে। সেখানে থেকেই তিনি পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হন। মেদিনীপুর জেলার একজন অন্যতম শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং স্বনামধন্য সমাজসেবী হিসেবে নিজেকে পরিশীলিত করেন। 

ড. সৈয়দ শামসুল বারি ছিলেন মেদিনীপুর জেলার অন্যতম একজন শিক্ষাবিদ এবং সমাজসেবী। মেদিনীপুর টাউন স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে মেদিনীপুর কলেজ থেকে ১৯৩৪ সালে গণিত বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন প্রথম শ্রেণীতে। যা ছিল এক সিঁড়ি ভাঙা উত্তরণের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। অনেক লড়াইয়ের ফসল তাঁর এই সাফল্য। 

গণিতে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তাঁকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর তিনি সরকারী বৃত্তি পেয়ে জার্মানীর F.W. Levy এর অধীনে উচ্চতর জ্যামিতিতে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। প্রথমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট কলেজে (১৯৩৮) কিছু সময়ের জন্য অধ্যাপনা শুরু করেন। এরপর চলে আসেন মেদিনীপুর কলেজে। ১৯৪১ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত মেদিনীপুর কলেজে অধ্যাপনা করেন। এখানে ১৯৬৯ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন। 

তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। মেদিনীপুরের উপকন্ঠে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্থাপনে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান উদ্যোগী। মেদিনীপুরের আর একটি বিখ্যাত কলেজ কৈবল্যদায়িনী কলেজ তথা কমার্স কলেজের অন্যতম স্থপতি হিসেবে তাঁর নাম উল্লিখিত হয়। 

ছাত্রদরদী এই মানুষটির অবদান আজও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে সবাই। এ বিষয়ে তাঁর সুখ্যাতি আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। তিনি Debt Settlement Board-এর সদস্য হিসেবে দুঃস্থদের সেবায় আত্মনিয়োগ করে পরবর্তীকালে সমাজকর্মে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। 

প্রাক স্বাধীনতা পর্বে তিনি ছিলেন মুসলিম লীগের মেদিনীপুর জেলার সভাপতি। পরবর্তীতে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দলের সদস্য হয়ে ভারতের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। কংগ্রেসের জেলা সভাপতি পদেও (১৯৩৭-১৯৪১) আসীন ছিলেন। মেদিনীপুর পৌরসভার সদস্য নির্বাচিত হন। জনসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন অধ্যাপনার পাশাপাশি। হয়েছিলেন মেদিনীপুর বিধানসভার বিধায়ক। 

১৯৬২ এর বিধানসভা নির্বাচনে মেদিনীপুর কেন্দ্রে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দলের প্রার্থী ড. সৈয়দ সামশুল বারি পেয়েছিলেন মোট ১৩০৩৪ টি ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআইয়ের কামাখ্যাচরণ ঘোষ পেয়েছিলেন ১২১২৩ টি ভোট। পাঁচ বছর (১৯৬২-১৯৬৭) এখনকার বিধায়ক পদে থেকে এলাকার উন্নয়নে নিয়োজিত ছিলেন। এর আগে এই কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন কংগ্রেসের অঞ্জলি খান। যদিও ১৯৬৭ এর বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই তিনি হেরে যান। এই নির্বাচনে কামাখ্যাচরণ ঘোষ পেয়েছিলেন ২৩৭৮৪ টি ভোট। সৈয়দ শামসুল বারি পেয়েছিলেন ১৫৭০৪ টি ভোট। আজীবন তিনি এলাকার উন্নয়নে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। ১৯৯০ সালে মেদিনীপুরের এই সফল শিক্ষাব্রতী মানুষটির জীবনাবসান ঘটে।
🍂

Post a Comment

0 Comments