মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২২৯
মৃত্যুঞ্জয় মাইতি (স্বাধীনতা সংগ্রামী, সাংবাদিক, লেখক, ভগবানপুর)
ভাস্করব্রত পতি
তখন তাঁর ছাত্রজীবন। ১৯৪২ সাল। সারা ভারত জুড়ে চলছে ভারতছাড়ো আন্দোলন। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গ্রেপ্তার বরণ করলেন। আর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে দেশবিরোধী কার্যকলাপের জন্য এক বছরের কারাবাসের শাস্তি দেয়। তিনি মৃত্যুঞ্জয় মাইতি। একাধারে স্বাধীনতা সংগ্রামী। অন্যদিকে কবি, লেখক এবং প্রোথিতযশা সাংবাদিক।
১৯২১ সালের ১৯ শে মে ভগবানপুরের কুঞ্জপাড়াতে জন্মগ্রহণ করেন মেদিনীপুরের এই স্বল্প পরিচিত মানুষ রতনটি। বাবা গদাধর মাইতি এবং মা ছিলেন সুভদ্রা মাইতি। প্রথমে মুগবেড়িয়া গঙ্গাধর একাডেমি স্কুল, পরে ভগবানপুর হাইস্কুল এবং কাঁথি প্রভাত কুমার কলেজ থেকে পড়াশোনা। স্বাধীনতা সংগ্রামের পীঠস্থান মেদিনীপুর জেলার সন্তান হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের শরিক হবেন না, তা কি হয়? স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ সরকার উৎখাতের লড়াইয়ে সামিল হন কিশোর মৃত্যুঞ্জয়।
অবশেষে ভারত স্বাধীন হল। চারিদিকে নতুন ভারত গঠনের তোড়জোড়। স্বাধীন ভারতের সরকারী অফিসে করণিকের পদে কর্মজীবন শুরু করলেন। এরপর প্রায় সাত বছর মন্ত্রী চারুচন্দ্র মহান্তির আপ্ত সহায়ক পদে যোগ্যতার সাথে কাজ করেন। যিনি ছিলেন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার একজন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা এবং দাঁতনের জনপ্রতিনিধি। স্বাধীন ভারতে তিনি সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং মেদিনীপুর জেলার নানা জনকল্যাণমূলক ও শিক্ষামূলক কাজে জড়িয়ে ছিলেন। ফলে এই কর্মময় ব্যক্তির সাথে মৃত্যুঞ্জয় মাইতি ওতপ্রোতভাবে নিজেকে বেঁধে রেখেছিলেন একজন সফল আপ্তসহায়ক হিসেবে।
তিনি তাঁর কর্মজীবনে এক বছর খাদি ও গ্রামোদ্যোগ বোর্ডে পাবলিসিটি অফিসার পদে দায়িত্ব পালন করেন। এর সাথে প্রবেশ করেন সাংবাদিকতার জগতে। তৎকালীন বিখ্যাত 'যুগান্তর' পত্রিকায় দীর্ঘ ২৮ বছর যুক্ত ছিলেন সাংবাদিক হিসেবে। এখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন পত্রিকার চিফ সাব এডিটর পদে থাকা অবস্থায়। এর আগে প্রমথনাথ পালের 'প্রভাত' পত্রিকায় সহ সম্পাদক পদে নিযুক্ত ছিলেন কিছুসময়।
সাহিত্য ও সঙ্গীতের প্রতি কৈশোরকাল থেকেই প্রবল অনুরাগ। মৃত্যুঞ্জয় মাইতির লেখা কিছু কাব্য হল আবাদ, গ্রাম নদী বন, দূরের বন্ধু এবং শেষ অপরাহ্ণ। এই 'শেষ অপরাহ্ন' কাব্যকে ইংরেজীতে Last Afternoon নামে অনুবাদ করেছেন অনুবাদক কৌশিক রায়।
তাঁর লেখা উপন্যাসগুলি হল নূতন জনপদ, নদী মাটি মানুষ, নিঃসঙ্গ নায়ক, যখন বৃষ্টি নামল, শেষ প্রহরের ঘণ্টা, রূপনারায়ণ, বীজধান, মুক্তির দিন এবং মাটির রং লাল। জনপ্রিয় 'বীজধান' উপন্যাসকে ইংরেজীতে Earth and the Seeds নামে অনুবাদ করেছেন অনুবাদক কৌশিক রায়। এছাড়াও তাঁর কলমের নির্যাসে প্রকাশিত হয়েছে বহু গল্প, কবিতা এবং প্রবন্ধ। পশ্চিমবঙ্গের নানা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেসব। তাঁর লেখা ডাকবাংলো, প্রসন্ন সকাল, শেষ ট্রেন, জন্মভূমি, ভারততীর্থ, সমুদ্রের কাছে, ঈশ্বরের আলো, শেষ ট্রেন, জন্মভূমি, ভারততীর্থ, পোষ্ট মাস্টার (পুস্কিনের ছায়ায়), দীনের হতে দীন (লা মিজারেবল অনুসরণে), করুণাদি প্রভৃতি বেতার নাটকগুলিতে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছেন তিনি। ২০১৩ এর ২৫ শে নভেম্বর মৃত্যু হয় মেদিনীপুরের এই মহান কর্মযোগীর।
🍂
0 Comments