দূর দেশের লোকগল্প— ৩০৫
চার কালা-র গল্প
নেপাল (এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
এক ছিল শহর। সেই শহরে থাকত এক বুড়ি আর এক বুড়ো। মজার ব্যাপার হলো, দুজনেই ছিল কালা — কানে একদম শুনত না। একটা মেয়ে ছিল বুড়োবুড়ির। সেও ছিল কালা। মজার ব্যাপ্র হলো, সেই মেয়ের বিয়ে হলো যার সাথে, সেও ছিল কালা! মানে, এক বাড়িতে চার- চারজন কালা।
বুড়োবুড়ির একটা খেত ছিল রাস্তার ধারে। একদিন মেয়ের জামাই গেল ধান খেতে লাঙল চালাতে। দুটো বলদ দিয়ে হাল টানছে। সেসময়ই রাস্তা দিয়ে এক লোক যাচ্ছিল। পথ হারিয়ে ফেলেছে লোকটা।
পাশেই একজন চাষিকে দেখতে পেয়ে, সে জিজ্ঞেস করল, "ভাই, এই রাস্তাটা কোন দিকে গেছে?"
জামাই তো কানে শোনে না। সে ভাবল, লোকটা তার বলদ নিয়ে জিজ্ঞেস করছে। সে বলদ দেখিয়ে বলল, "এই বলদটা আমি গ্রাম থেকে কিনেছি। আর ওই বলদটা আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া।"
পথিক বলল, "আরে ভাই, তোমার বলদের খবর আমার দরকার নেই! আমাকে রাস্তাটা বলো।"
জামাই আবার বলল, "বললাম তো, এটা আমার নিজের বলদ!"
পথিক রেগে বলল, "তোমার বলদ নিয়ে আমি কী করব? রাস্তা বলো।
এবার জামাই ভাবল, লোকটা ঝগড়া করছে। সে রেগে গিয়ে বলল, "আর একবার বলদ নিয়ে কথা বলে দেখো!" — বলেই হাতের লাঠি দিয়ে পথিককে দু-চার ঘা দিয়ে দিল। পথিক বেচারা আর কী করে। মার খেয়ে পালাল সেখান থেকে।
কিছুক্ষণ পর জামাইয়ের বউ মাঠে এসেছে ভাত নিয়ে। জামাই খেতে খেতে বলল, "জানো, একটু আগে একটা লোক এসে আমার বলদ নিয়ে ঝগড়া করছিল।"
বউও তো কানে শোনে না। সে ভাবল, জামাই বলছে, ভাত আনতে দেরি হয়েছে কেন।
বউ বলল, "আমি কী করব? কাঠ কুড়োলাম, জল আনলাম, শাক তুললাম, রান্না করলাম — তাই তো দেরি হলো!"
এই নিয়ে দুজনের ঝগড়া হয়ে গেল। রেগেমেগে বাড়ি চলে গেল বউটা। বাড়ি গিয়ে সে তার মায়ের কাছে গেল। মা তখন দাওয়ায় বসে মাদুর বুনছিল। মেয়ে বলল, "মা, তোমার জামাই আমার সাথে ঝগড়া করেছে। বলেছে, ভাত আনতে দেরি করেছি।"
মা-ও কানে শোনে না। সে ভাবল মেয়ে তার মাদুর বোনা ভালো হয়নি বলছে। বেদম রেগে মা বলল, "তুই তোর বাপকে বিয়ে কর! সে ভালো মাদুর বুনে দেবে। আমার মাদুর ভালো হলো না খারাপ হলো, তাতে তোর কী?"
মা-মেয়ের ঝগড়া লেগে গেল। বুড়ি রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। বুড়ো তখন মিষ্টি আলুর ক্ষেত পাহারা দিচ্ছিল, যাতে চোর আলু তুলে না নেয়। খুঁজতে খুঁজতে বুড়ি সেখানে গিয়ে হাজির। বুড়ি বলল, "আজ মেয়ে মাঠে ভাত নিয়ে গিয়েছিল। ফিরে এসে আমার মাদুর বোনা ভালো হয়নি বলে ঝগড়া করল। আমিও তাকে খুব বকেছি।"
বুড়ো তো বদ্ধ কালা। সে ভাবল, বুড়ি তার আলু চুরি করে নিয়ে গিয়ে খেয়েছে। বুড়ো রেগে বলল, "ওরে দুষ্টু বুড়ি! আমি খেত পাহারা দিচ্ছি। আর তুই কিনা তিন-তিনটে আলু রান্না করে খেয়ে ফেললি?"
বলেই, দুম দুম করে বুড়ির পিঠে দিয়েছে কয়েক ঘা বসিয়ে। যন্ত্রণায় ককাতে ককাতে বুড়ি কোনও রকমে সরে পড়ল সেখান থেকে।
ভ্রি দুঃখ হোল বুড়োর মনে। সে ভাবল, "নিজের বউ-ই যদি আলু খেয়ে ফেলে, তাহলে আর খেত পাহারা দিয়ে, হবেটা কী? চুলোয় যাক সব।"
এই ভেবে,খেতের বেড়া উপড়ে, গরু-ছাগলের ঢোকার রাস্তা করে দিল। তোরাই সব খা এবার থেকে।
তার পর? তার পর আর কী? এমন সংসারে থেকে আর কী হবে? রাগ করে, গ্রাম ছেড়ে যে দিকে দু’চোখ যায়, চলে গেল বুড়ো মানুষটা।
0 Comments