জ্বলদর্চি

বিশ্ব থ্রম্বোসিস দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে


বিশ্ব থ্রম্বোসিস দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

 আজ ১৩ই অক্টোবর, বিশ্ব থ্রম্বোসিস দিবস। আমাদের মানব জীবনে এই দিবসটির গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, আসুন এই সম্পর্কে  বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
সচেতনতা, প্রতিরোধ ও সুস্থ জীবনের অঙ্গীকারে
প্রতি বছর ১৩ই অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব থ্রম্বোসিস দিবস, রক্ত জমাট বাঁধার কারণে সৃষ্ট বিপজ্জনক শারীরিক সমস্যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, রোগের লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। আধুনিক জীবনযাত্রায় থ্রম্বোসিস একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা, অথচ সঠিক সচেতনতা, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে এর অনেক জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য রক্তকে তরল অবস্থায় থাকা প্রয়োজন। কোথাও আঘাত লাগলে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য রক্ত জমাট বাধা একটি স্বাভাবিক ও জরুরি প্রক্রিয়া, কিন্তু কোনো আঘাত ছাড়াই যখন রক্তনালির ভিতরে অস্বাভাবিকভাবে রক্ত জমাট বাঁধে এবং রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তখন তাকে থ্রম্বোসিস বলা হয়। রক্ত জমাট বা ক্লট যদি শিরায় তৈরি হয়, তাকে ভেনাস থ্রম্বোসিস এবং ধমনিতে তৈরি হলে তাকে আর্টেরিয়াল থ্রম্বোসিস বলা হয়। পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধাকে বলা হয় ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস (DVT)। এই জমাট রক্তের কোনো অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে ফুসফুসে পৌঁছে গেলে পালমোনারি এম্বোলিজম (PE) হতে পারে, যা প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধলে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়ে হার্ট অ্যাটাক এবং মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হলে ইস্কেমিক স্ট্রোক হতে পারে। থ্রম্বোসিসের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, অনেক সময় এর প্রাথমিক লক্ষণ স্পষ্ট হয় না, ফলে, আক্রান্ত ব্যক্তি সমস্যাটিকে সাধারণ ব্যথা, পেশিতে টান বা ক্লান্তি বলে উপেক্ষা করতে পারেন, কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
🍂

দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকা, বড় অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী থাকা, হাসপাতালে ভর্তি থাকা, ক্যানসার, গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী সময়, কিছু হরমোনজাত ওষুধের ব্যবহার, স্থূলতা, ধূমপান এবং আগে থ্রম্বোসিস হওয়ার ইতিহাস, এসব কারণে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে, সঙ্গে ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, যেকোনো বয়সের মানুষেরই থ্রম্বোসিস হতে পারে। ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিসের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি পায়ে বা হাতে ফোলা, ব্যথা, স্পর্শে উষ্ণতা এবং ত্বকের রং পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে, তবে, সবার ক্ষেত্রে একই লক্ষণ থাকে না। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, শ্বাস নেওয়ার সময় ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা পালমোনারি এম্বোলিজমের লক্ষণ হতে পারে। আবার মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, হাত-পায়ে হঠাৎ দুর্বলতা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির সমস্যা স্ট্রোকের সংকেত হতে পারে। তীব্র বুকব্যথাও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের জরুরি লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ খেয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। থ্রম্বোসিস প্রতিরোধে দৈনন্দিন জীবনে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রথমত, দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকা এড়িয়ে চলতে হবে। অফিসে কাজ করার সময়, পড়াশোনার ফাঁকে বা দীর্ঘ যাত্রাপথে সুযোগমতো উঠে হাঁটাচলা করতে হবে এবং পায়ের পেশি সচল রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং উপযুক্ত ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করা দরকার। ধূমপান বর্জন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অস্ত্রোপচার, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা দীর্ঘ সময় চলাফেরা করতে না পারার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত জমাট প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসক বিশেষ ধরনের কম্প্রেশন স্টকিংস বা রক্ত জমাট প্রতিরোধী ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন, তবে চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি পর্যাপ্ত জল পান করা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে, কিন্তু শুধু জল পান করলেই থ্রম্বোসিস প্রতিরোধ করা যায় না। ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব থ্রম্বোসিস দিবস কেবল একটি বিশেষ দিন নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার এবং অন্যদের সচেতন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে থ্রম্বোসিসের কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিরোধ সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দিতে হবে।
বিশেষ করে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করেন এমন মানুষ, বয়স্ক ব্যক্তি, অস্ত্রোপচারের রোগী এবং অন্যান্য ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের এ বিষয়ে সচেতন করা জরুরি, একই সঙ্গে ভুল ধারণা দূর করতে হবে। থ্রম্বোসিস মানেই মৃত্যু নয়, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রেই গুরুতর জটিলতা এড়াতে সাহায্য করে।
রক্ত আমাদের জীবনের প্রতীক, আর রক্তের স্বাভাবিক প্রবাহ সুস্থ থাকার অন্যতম শর্ত। সেই প্রবাহে অস্বাভাবিক বাধা সৃষ্টি হলে তার পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত গুরুতর, তাই বিশ্ব থ্রম্বোসিস দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, রোগ সম্পর্কে জানব, সতর্কসংকেত চিনব, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করব এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নেব। সচেতনতাই প্রতিরোধের প্রথম ধাপ, আর সময়মতো চিকিৎসাই জীবন বাঁচানোর অন্যতম চাবিকাঠি। আসুন, ১৩ই অক্টোবর বিশ্ব থ্রম্বোসিস দিবসে আমরা নিজেদের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে সচেতন করে তুলি এবং থ্রম্বোসিসমুক্ত, সুস্থ ও নিরাপদ জীবনের পথে এগিয়ে যাই।

Post a Comment

0 Comments