জাপানের লোকগল্প (দুই ব্যাঙের দেশ ভ্রমণ)/ চিন্ময় দাশ

দূর দেশের লোকগল্প -- জাপান 

চিন্ময় দাশ 

দুই ব্যাঙের দেশ ভ্রমণ 

একবার জাপানে জমায়েত হয়েছিল ব্যাঙেদের। সত্যি বলতে কি, সে এক মহাজমায়েত। ব্যাঙ রাজার বিয়ে। মহাভোজের আয়োজন হয়েছিল রাজবাড়ির মাঠে। রাজ্যের যত ব্যাঙ হাজারে হাজারে এসে জমায়েত হয়েছিল সেখানে। গ্রাম-শহর, মাঠ-ঘাট, পাহাড়-জঙ্গল, নদী-নালা ঝেঁটিয়ে এসেছিল সবাই। রাজের বিয়ের ভোজ বলে কথা! এমন দাঁও জীবনে বড় একটা আসে না।
 কয়েক দিন ধরে চলেছিল ভোজের আসর। কত পুরাণো জনেদের সাথে দেখা হয়েছিল, নতুন নতুন জনের সাথে আলাপ হয়েছিল ব্যাঙেদের। সেসময় বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল দুটি বাচ্চা ব্যাঙের। পাশাপাশি ডেরা পড়েছিল তাদের দুই পরিবারের। তাতেই তাদের আলাপ-পরিচয়। তা থেকেই বন্ধুত্ব। ভোজের আসর যখন ভাঙল, যে যার ডেরায় ফিরে যাওয়ার পালা। তখন কী কান্না কী কান্না দুই বন্ধুর! থামানোই যায় না। পরে আবার কখনও দেখা হবে তোদের-- এইসব বলে, তাদের বাবা-মায়েরা ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দুজনকে।
  তারপর কত দিন কেটে গেছে। দুজনের আর দেখা হয়নি। হবে কী করে? দুজনের আস্তানা যে দুই এলাকায়। মাঝে দুস্তর ফারাক। একজন থাকে সমুদ্র ঘেঁষা ওসাকা শহর লাগোয়া একটা জলাভূমিতে। অন্যজনের ডেরা কিয়োটো শহরের গা বেয়ে চলা একটা ছোট্ট নদীর পাড়ে। আর এইজন্যই দেখা তো দূরের কথা, কেউ কারও ডাকও শুনতে পায় না কখনও।
  মজার ব্যাপার হলো, একবার দুজনেরই একসাথে মনে হোল-- এখন তো বড় হয়েছি। নিজেই বেরিয়ে, একবার বন্ধুর সাথে দেখা করে আসি। ওদের শহরটাও দেখা হয়ে যাবে সেই সাথে। একসাথে দুজনেরই মনে সাধ জাগল, একই সময়ে।
তখন বসন্তকাল। দুই ব্যাঙ বেরুল দেশভ্রমণে। কিয়োটোর ব্যাঙ চলল ওসাকা। ওসাকার ব্যাঙ কিয়োটো। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে দুজনেই মর্মে মর্মে বুঝতে পারল, দেশ ভ্রমণ  মোটেই সোজা কাজ নয়। বিশেষ করে তাদের মত ব্যাঙেদের পক্ষে। একসাথে বেশ কিছুটা দূরত্ব লাফ দিতে পারে বটে, কিন্তু বেশিক্ষণ তো আর লাফানো যায় না। বুক ধড়ফড় করতে থাকে। যাইহোক, বেরিয়েছে যখন যেতেই হবে। যত কষ্টই হোক, ফিরে তো আর যাওয়া যায় না। এগোতেই হবে সামনে।
  মোটামুটি মাঝামাঝি রাস্তায় পৌঁছল যখন, দুজনেই দেখল, সামনে উঁচু এক পাহাড়। এগোতে গেলে, পার হতেই হবে পাহাড়টাকে। কী আর করা যায়? বন্ধুর সাথে দেখা হবে। তাছাড়া, তাদের দেশটাও দেখা হবে, কম কথা নয় সেটা। দুজনেই উঠতে লাগল দু'দিক থেকে। অনেক মেহনত করে, যখন পাহাড়ের মাথায় পৌঁছল, কেউ জানত না, এমন একটা বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে দুজনের জন্য।
  দু'দিক থেকে উঠেছে দুজনে। একসাথে ওঠা শুরু করেছিল। একসাথেই চূড়ায় উঠেছে দু'জনে। কী অবাক কান্ড,  দুজনেই দেখল, ঠিক সেই সময়ে 
উল্টো দিক থেকে তার বন্ধুও উঠে এসেছে পাহাড়ের মাথায়। স্বপ্ন বা কল্পনা নয়, একেবারে সশরীরে বন্ধুই দাঁড়িয়ে আছে সামনে। 
  একটু সময় লাগল বিস্ময়ের ঘর কাটাতে। করোও মুখেই কথা জোগাল না। কিন্তু সে একটু সময় মাত্র। তারপর শুরু হল কথা। সে যেন আর শেষ হতেই চায় না। সেই কবে তাদের দেখা। কত দিন কেটে গিয়েছে তরপর। কিন্তু কেউ কাউকে ভুলে যায় নি। কেউ মুছে যায়নি কারও মন থেকে। সেই কবে থেকে দুজনেই ভাবছে, এখন তো বড় হয়েছি। এবার একবার যেতেই হবে বন্ধুর সাথে দেখা করতে। যেতেই হবে, সে যতদূরের পথই হোক না কেন। 
-- শুধু কি তোমার সাথে দেখা হবে? কিয়োটো-র ব্যাঙ বলল-- তোমার দেশটাও দেখা হয়ে যাবে সেই সাথে। এই ভাবনাটাও আমাকে ঘর ছেড়ে বেরুতে তাগাদা দিত।  
  ওসাকা তো আমি দেখিনি কখনো।
ওসাকা-র ব্যাঙ বলল-- আরে, কী আশ্চর্য়! আমিও তো এটা ভেবেই বের হয়েছি। তোমার সাথে দেখা হবে, সাথেসাথে কিয়োটো ভ্রমণটাও হয়ে যাবে। অন্তত কুয়োর ব্যাঙ-এর দুর্নামটা তো ঘুচবে আমাদের।
একই ভাবনা নিয়ে বেরিয়েছে দুজনে, একথা জেনে, দুজনেই ভারী খুশি। নানান কথা আলোচনা চলতে লাগল দুই বন্ধুর। অনেকটা সময় কাটল পুরণো দিনের আলোচনায়। একসময় কিয়োটো-র ব্যাঙ বলল-- আচ্ছা বন্ধু, তোমাদের ওসাকা শহরটা দেখতে কেমন? দূরত্বই বা কতটা? আমার কিয়োটো-র চেয়ে আরও সুন্দর? 
  ওসাকা-র ব্যাঙ বলল-- আমারও তো সেটা জানবার কৌতূহল হচ্ছে? কিয়োটো শহর কি ওসাকার চেয়ে সুন্দর? আরও কত দূর হবে এখন থেকে?
হঠাৎই কিয়োটো-র ব্যাঙের মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সে বলল-- অতো উঁচু পাহাড়ের মাথায় উঠেছি দুজনে। অন্যের মুখে শুনে, জানতে হবে কেন? নিজের চোখেই তো দেখে নিতে পারি শহর দুটোকে। চোখে দেখেই তো পথটাও মেপে নিতে পারি নিজেরা। এখান থেকে কত দূর দূর পর্যন্ত দেখা যায় সহজে।
  ওসাকা-র ব্যাঙ আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল এ কথা শুনে-- আরে ভাই, দারুণ কথা বলেছো তো! এই সাধারণ বুদ্ধিটা আমার মাথায় এলো না কেন? যাই হোক, নিজের চোখেই দেখে নিই এসো। এই বলে দুই ব্যাঙ পিছনের দুই পায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দুজনেই তাদের সামনের দুটি পা তুলে দিল মুখোমুখি দাঁড়ানো বন্ধুর কাঁধে। দুজনে সেঁটে আছে দুজনের শরীরের সাথে। দেখাচ্ছে যেন একেবারে আমের আঁটির দুটি খোলের মত।
  মজা হল, ব্যাঙ তো জানে না, খাড়া উঁচু হয়ে দাঁড়ালেও, সামনের কিছুই আর দেখতে পাচ্ছে না তারা। কেননা, তাদের দুজনেরই চোখ তখন চলে গেছে নিজেদের পেছন দিকে। যে পথ দিয়ে এসেছিল তারা, দেখছে সেই পথটাকে। অনেক দূরে যে শহরটা দেখা যাচ্ছে, সেটা আসলে তার নিজেরই শহর। তার বন্ধুর শহর নয়।  
  ব্যাঙ দুটো জানতেই পারল না, দুজনের নাক দুটোই কেবল উঁচু হয়ে আছে তাদের গন্তব্য শহর দুটোর দিকে। যে শহর দুটো দেখবে বলে, আনন্দে বিভোর হয়ে ছিল তারা। কিন্তু তাদের চোখ দেখছে পিছনে ফেলে আসা নিজেদেরই শহর দুটোকে। 
কেমন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল দুজনেই। নতুন তো কিছুই নাই। একই রকম পথঘাট। হুবহু একই রকম শহর। থপ থপ করে পাগুলো নামিয়ে নিল দুজনেই। 
  এক বন্ধু বলল-- আর এগিয়ে লাভ নাই, ভাই। তোমার শহর তো দেখলাম একেবারে আমাদেরটার মতোই। নতুন কিছুই দেখলাম না। পথটাও সেই একঘেয়ে, কষ্টকর।
  অন্যজন বলল-- ঠিকই বলেছ, বন্ধু। পথ বলো, শহর বলো, সবই দেখছি এক। তা হলে, কী এমন স্বর্গ দর্শন হবে আবার অতখানি পথ উজিয়ে গিয়ে? আমাদের দুজনের দেখা তো হয়েই গেল। 
-- সেই ভালো। পরে আবার কখনও একবার আসা যাবে। এখন ঘরেই ফেরা যাক।
এই বলে, পরস্পরকে বিদায় জানাল দুজনে। পিছন ফিরে, নিজের নিজের আস্তানার পথে রওনা হয়ে গেল দুই বন্ধু। 
  আবার কখনো তাদের দুই বন্ধুর দেখা হয়েছিল কি না, আমাদের জানা নাই। তবে, ব্যাঙেরা আজও ভালো করেই জানে-- কিয়োটো আর ওসাকা শহর দুটোর মধ্যে পার্থক্য বা নতুনত্ব বলে কিছুই নাই। একেবারে মটরদানার দুটো খোলের মতোই। এই কারণেই ব্যাঙেরা ঘর ছেড়ে তেমন বের হতে চায় না সহজে।

আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি