প্রবাসীবেলা/ত্র্যম্বক ভট্টাচার্য্য

প্রবাসীবেলা
ত্র্যম্বক ভট্টাচার্য্য

২ মে, রবিবার, শ্রীরামপুর (দুপুর ১:২৭ মিনিট)
 
এবার বেশ কিছুদিন দেরি হলো। বাড়ি আসার কথা বলছি আর কি। কর্মসূত্রে আমি থাকি রাশিয়ার দুবনায়। কিন্তু পৈতৃক ভিটে হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে। আর দেরি করে বাড়ি আসার কারণ অনুমান করার জন্য কোনো পুরস্কার নেই। পৃথিবী জুড়ে অতিমারী জনিত অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, আর আশংকা। 
 
এসব পেরিয়ে ২০২১ যখন এলো, ইতি-উতি দেখে ভয়ে ভয়ে বিমানযাত্রার পরিকল্পনা করলাম। এরপরই  শুরু হলো প্রবল ঠান্ডা। রাশিয়ার বিখ্যাত শীত। শীতকাল অনেক দিনই এসে গেছে, কিন্তু সে সময়ে যে পরিমাণ তুষারপাত হলো, তা নাকি স্মরণাতীত কালে দেখা যায়নি। তৎসহ ঠান্ডা। তাপমাত্রা মাইনাস তিরিশ ছোঁয় ছোঁয়।
  সূর্যের করুণাহীন মেঘাচ্ছন্ন বিষণ্ণ দিন।  
 
  বাড়ির বাইরে যখন বেরোতাম, মনে হতো যেন ছাদে শুকোতে দেওয়া সমস্ত জামাকাপড় বোঝাই করে চলেছি। কারণ আমার বহুদর্শী বন্ধু একবার বলেছিলেন যে 'layering is important', আর আমার একবার ঠাণ্ডা লাগিয়ে রাশিয়ান হাসপাতাল ঘোরার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে।
 
  সপ্তাহান্ত চলছে। বাড়িতে বন্দি। কারণ প্রবল তুষারঝড়। কিন্তু ঠান্ডা সেই লাগলোই। শরীর-মন-পাকস্থলী সকল মাননীয় ব্যক্তিবর্গ প্রবল গোঁসা করে বসে রইলেন। যাওয়া গেলো সরকারি আরোগ্য নিকেতনে। 
 
  সেখানে ছিলেন ডাক্তার দিদিমা চেরনিয়েভস্কায়া ও তাঁর  এক সহকারিণী। আমি আবার রাশিয়ান এ তুর্গেনিভ। একবার দোকানে 'ডিম চাই' বলতে গিয়ে বলেছিলাম 'মুন্ডু চাই' । অনেক কষ্টে নিজের মুন্ডু বাঁচিয়ে সেদিন ফিরেছিলাম ।  আমার সেই অপরূপ রাশিয়ান জ্ঞান সম্বল করে কোনোক্রমে ডাক্তার এর কথা বুঝে, ডাক্তার কে বুঝিয়ে সেদিন উদ্ধার পেলাম। এই কসরত এর কারণেই বোধ হয়, শরীরও একটু সুস্থ বোধ হতে লাগলো। কিন্তু সে বললে শোনে কে। ফুসফুস পরীক্ষা হলো বিনাপয়সায়। এমনকী covid পর্যন্ত। তবে সমস্তই সন্তোষজনক।  
 
  দিনদুয়েকে আরও চাঙ্গা হয়ে উঠলাম। এরপরই শুরু হোলো বাড়িতে চিকিৎসকদের আনাগোনা। একদিন কাজে ব্যস্ত। বেজে উঠলো আমার পাঁচতলার ফ্ল্যাট এর 'দোমাফোন'। এই ফোন এর সঙ্গে একটি বোতাম আছে, যেটা টিপলে আমাদের এপার্টমেন্ট এর একতলার স্বয়ংক্রিয় দরজা খুলে যায়। দেখি এক সরকারি চিকিৎসক দাড়িয়ে। কেমন আছি খবর নিতে এসেছেন। তিনি তো আমায় টিপেটুপে দেখে খুশি হয়ে চলে গেলেন, কিন্তু সাধারণত এনারা বুকিং ছাড়া আসেননা। তাই আসার কারণ বোধগম্যতার বাইরে। কে আসতে  বলেছিলেন, তাও অজানা। 
 
  পরেরদিন মূত্র এবং নিষ্ঠীবন পরীক্ষার সমন নিয়ে এলেন আরোগ্য নিকেতন এর প্রতিহারিণী। আর দিয়ে গেলেন এক অদ্ভুত দিগদর্শন। যেখানে অ্যাম্বুলেন্স দাড়িয়ে থাকে, সেখানেই পরীক্ষাগার। তিনি চলে যাবার পর খেয়াল হলো যে, কোথায় অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়ায় তা আমার অজানা, আর অ্যাম্বুলেন্স চিরকাল দাড়িয়ে থাকবে তার ও কোনো নিশ্চয়তা নেই। অ্যাম্বুলেন্স তো আর উদ্ভিদ নয়। মনে পড়ে গেলো বাঙালনামা বর্ণিত সেই অবিস্মরণীয় পথনির্দেশ। তপনবাবুর ভাষাতেই বলি। 
 
  'কয়েক বছর পর কলকাতার রাস্তায় ব্যানার্জীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। খুব উৎসাহের সঙ্গে নেমন্তন্ন করে বাড়ির ঠিকানা দিলেন। বললাম, "একটু পথ বাতলাবেন ?" উত্তর, "কোনো অসুবিধে হবেনা। যে বাড়িটার সামনে একটা ষাঁড় বসে আছে দেখবেন, সেইটে।" "ষাঁড়টা আপনাদের?" "না"। "ওখানে ল্যাম্পপোস্ট এ বাঁধা থাকে?" "না, কিন্তু আপনি চিন্তা করবেন না।  রোজ ই আসে।" যথা সময়ে ব্যানার্জীর বাড়ির রাস্তায় ঢুকলাম। সেখানে কোনো ষাঁড় নেই। কিন্তু ব্যানার্জী পায়চারি করছেন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম। স্মিতমুখে ব্যানার্জী ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন, "ষাঁড়টা আজ আসেনি। " কিন্তু ব্যানার্জী এসেছেন। অতএব আমার কোনো অসুবিধে হল না।'
 
  ষাঁড়ের মতোই অ্যাম্বুলেন্সও ছিলোনা। 'ব্যানার্জী' ও উধাও। বহু কষ্ট করে একজন কে অনুরোধ করলাম, আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা' গোছের আর কী। অনেক কষ্টে এই প্রভাতী বিপত্তি এড়ানো গেলো। 
 
  ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছি। আবার বাজলো বাঁশি। ব্যাকুলা রাধার মতো ছুটে গেলাম, ফোন তোলো, কথা বলো, মুখোশ পরো, দরজা খোলো। আবার সেই হাস্যবদনা। জানতে এসেছেন পরীক্ষা করিয়ে এসেছি কিনা। এবম্বিধ ঘটনা বার বার ঘটায়, পরেরদিন থেকে চা-বিস্কুট নিয়ে তৈরী থাকতাম। এমনকি পরেরদিন ডাক্তার না আসায় বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগতে লাগলো। যাই হোক, আবার একদিন সমন এলো আরও কিছু পরীক্ষার। ডাক্তারি হাতের লেখা, তাও আবার রাশিয়ান এ। একবার তো রাত দুপুরে মাইনাস পনেরো ডিগ্রীতে বেরোতে হয়েছিল নমুনা সংগ্রহের শিশি কিনতে। হাতের লেখা বুঝতে ভুল করেছিলাম বলে। তারপর থেকে আমি বেশি বেশি শিশি কিনে রাখি, 'কী জানি সে আসবে কবে, যদি আমায় পড়ে তাহার মনে', আর যদি হাতের লেখা বুঝতে না পারি।  
 
  অনেক বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে বাড়ি এসেছিলাম গত ১৯ মার্চ। ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এলো। এখনো আশা-আশংকার দোলাচলে। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

  1. মুজতবা আলী সাহেবের 'দেশে বিদেশে'-র ছোঁওয়া লাগলো প্রাণে। চালিয়ে যাও হে, থেমো না। তথাগত ঠিক বলেছে, এবার সেই হাসপাতাল কাহিনীটা লিখে ফেলো। জমবে ভালো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া