লক্ষ্মণ প্রধান ( প্রত্ন সংগ্রাহক পান বিড়ির দোকানদার, তমলুক )/ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১২

লক্ষ্মণ প্রধান (প্রত্ন সংগ্রাহক পান বিড়ির দোকানদার, তমলুক)

ভাস্করব্রত পতি


পেটে তাঁর পুথিগত বিদ্যা নেই। তথাকথিত 'পণ্ডিত'দের দলেও তিনি পড়েননা। প্রথামাফিক শিক্ষা হয়ে উঠেনি তাঁর। 'টু কিলাস' পর্যন্ত পড়া সেই লক্ষ্মণ প্রধান পাননি প্রচারের ঢক্কানিনাদ। অথচ এই মানুষটিই মানবজাতির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল তুলে এনেছেন কাদামাটির বুক থেকে। খুঁজে পেয়েছেন তিন হাজার বছরের হাড়ের তৈরি হারপুণ। যা মেদিনীপুরকে আলোকিত করেছে ইতিহাসের পথ ধরে। আর লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন "মেদিনীপুরের মানুষ রতন"।

তাম্রলিপ্ত পৌর এলাকার ১ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। শহরের বুকে একটা পান দোকানের মালিক ৮০ ছুঁইছুঁই এই নিরহঙ্কার প্রত্মতাত্ত্বিকের। সেই ১৯৬২ থেকে শুরু দোকান। নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা! এরকম 'আপাত নিরক্ষর' পান দোকানীর ভাবনা অবশ্য আলাদা। তাই পান বিড়ি বেচার ফাঁকেই তিনি সংগ্রহ করেন পুরাতাত্ত্বিক উপাদান। না, সেসব তিনি পকেটে ভরে 'নিজের' মনে করে নিয়ে চলে যাননি। ব্যক্তিগত সংগ্রহেও রেখে দেননি। বা চড়া দামে চোরাই বাজারে বেচেও দেননি। তুলে দিয়েছেন মিউজিয়াম গড়ার কাজে।

এই সব প্রত্ন উপাদানের গুরুত্ব তিনি বোঝেন। জানেন এগুলির মহার্ঘতা। তবুও দারিদ্রতার নাগপাশে আবদ্ধ লক্ষ্মণের কোনোদিন তা বেচে দেওয়ার বাসনা জন্মায়নি। এই সম্পদ জনগণের। এই সম্পদ ভারতের। তাই তিনি এইসব প্রাচীন সামগ্রীগুলি নিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছেন সংরক্ষণশালা। তাঁরই অবদানে আজ প্রাণ পেয়েছে 'তমলুক আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়াম'।

আবাসবাড়ি ইরিগেশান ডাক বাংলো এলাকা থেকে প্রথম পেয়েছিলেন হাতে তৈরি পোড়ামাটির পাত্র। সেই শুরু। সেটি ছিল তমলুক মিউজিয়ামের ১২ তম সংগ্রহ। এরপর অসংখ্য উপাদান সংগ্রহ করেছেন তমলুক সংলগ্ন এলাকা থেকে। রূপনারায়ণের পাড় বরাবর দিনের পর দিন হেঁটে হেঁটে খুঁজেছেন ‘খোলামকুচি'। সেই আপাত তুচ্ছ খোলামকুচি অবশ্য লক্ষ্মণ প্রধানের হাত ধরে জানিয়ে দিয়েছে তমলুকের প্রাচীনত্ব। এক অজানা ইতিহাসকে আলোয় তুলে ধরতে পেরেছেন এই পান বিড়ির দোকানের মালিকই।

প্রত্নানুসন্ধানে মূল অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন পরেশ দাশগুপ্ত। তাঁরই অনুপ্রেরণায় তিনি হয়ে উঠেছেন অন্য ধরনের মানুষ। ১৯৭৩ থেকে শুরু তাঁর সংগ্রহ অভিযান। পেটে টান পড়ে। ট্যাঁকে টাকা নেই। সংসারে অনটন। বউ বাচ্চা নিয়ে সংসার। তাঁদের জঠরানল মেটানোর পাশাপাশি নিজের 'জঠরানল' নিবারিত করতে দোকান ছেড়ে ছুটে বেড়ান রূপনারায়ণের পাড় বরাবর। এজন্য অবশ্য জোটেনি কারও অনুকম্পা। জোটেনি স্নেহবর্ষণ। জোটেনি সম্মান, পুরস্কার বা অর্থ। ১৯৭৫ এর ১৭ ডিসেম্বর যখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় তমলুক মিউজিয়ামের উদ্বোধন করেছিলেন, সেদিনেই কেবল মানপত্র দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছিল লক্ষ্মণ প্রধানকে।

তিনিই সংগ্রহ করেছিলেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের নিদর্শন। যেগুলির সাথে রোমান এবং হরপ্পা সভ্যতায় প্রাপ্ত সামগ্রীর মিল রয়েছে। তিনি পেয়েছেন তামার তৈরি আংটাবিহীন হাড়ের হারপুণ, বড়শি, শিলমোহর ইত্যাদি। ১৯৭৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তা দেখে এই সামগ্রীর সাথে অন্তত ৩ থেকে ৫ হাজার বছর আগেকার মিশরের হিরাকন পলিশের সভ্যতার মিল খুঁজে পেয়েছিল।

যে যুগান্তকারী জিনিস তিনি আলোয় এনেছিলেন তার বিনিময়ে কিছুই জোটেনি তাঁর। লক্ষ্মণ প্রধানকে 'ব্যবহার' করে বহু 'প্রত্নপ্রেমী' মানুষ পেয়েছেন খ্যাতি। পেয়েছেন সম্মান। অথচ তাঁর জোটেনি কিছুই। ব্রাত্য থেকেছেন সব মানুষের কাছ থেকে। মেলেনি ভালোবাসা। মেলেনি যোগ্য সম্মান। মেলেনি অভিনন্দন।

অথচ তিনিই খুঁজে পেয়েছেন পাথরের মাল্যদানা, লাল কালো রঙের মৃৎপাত্র, অস্থি নির্মিত শলাকা, নিওলিথিক যুগের কুঠার, শুঙ্গ ও কুষাণ যুগের কাষ্ট কয়েন, টেরাকোটার হাতি, রেডওয়ার, ব্ল্যাক ওয়ার, কুঠার, হাড়ের হারপুণ, ব্রোঞ্জের নারীমূর্তি এমনই কত কি! তাঁর সংগৃহীত চিত্রিত মৃৎপাত্রটির সাথে পাণ্ডুরাজার ঢিবি থেকে পাওয়া মৃৎপাত্রের সাথে যথেষ্ট মিল রয়েছে। বয়সের বিচারে তা ৩০০০ বছরের বেশি প্রাচীন।

বয়স তাঁর কাজকে থাবা বসাতে পারেনি। এ বয়সেও চালিয়ে যাচ্ছেন অন্তহীন খোঁজ। তাঁর সন্ধানী দৃষ্টির নজর থেকে রেহাই নেই কাদামাটির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা প্রাগৈতিহাসিক সামগ্রীর। তাঁর কথায়, 'এগুলো মোটেও মৃত বস্তু নয়। এরা কথা বলে। সেই কথা বলা সামগ্রীগুলি পেয়েও লোভ সামনে অকাতরে দান করেছেন মিউজিয়াম গড়ে তোলার জন্য। তাই তো তিনি অকপটে বলতে পারেন, ঘরে যদি আমি জিনিসগুলো রাখতাম তবে আজ তমলুক মিউজিয়াম গড়ে উঠতো না।" তাই তো বাহাত্তুরে এই বুড়োটা এ বয়সেও হরির বাজার থেকে পাওয়া পাল সেন যুগের গরুঢ় মূর্তি পেয়ে দান করেছেন সংগ্রহশালাকে। আসলে নির্লোভ, প্রচারবিমুখ এই মানুষটাকে ভালোবেসে ফেলেছে হাজার বছরের পুরানো প্রত্নসামগ্রীগুলি। তারা আর অন্ধকারে চাপা থাকতে চায় না। আলোয় ফিরতে চায়। লক্ষ্মণ প্রধানেরই হাত ধরে তাঁদের ঘরে ফেরার অদম্য ইচ্ছা। সেই ইচ্ছা পুরণের তীব্র বাসনায় নিয়োজিত লক্ষ্মণ প্রধান।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি