দূরদেশের লোকগল্প—দক্ষিণ আমেরিকা (চিলি)/চোখ দুটো খোলা রেখো /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প—দক্ষিণ আমেরিকা (চিলি)
চোখ দুটো খোলা রেখো

চিন্ময় দাশ
 
একটা ছেলেকে নিয়ে এই গল্পটা। 
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের গায়ে একটা দেশ-- চিলি। আশ্চর্য গড়ন দেশটার। বুড়ো মানুষের হাতের লাঠির মত দেখতে একেবারে। তো, সেই দেশেই বাস ছেলেটার। 
ছেলেটার নাম—আতুরো। খুব গরীব এক বাবার ছেলে সে। গরীব হলে কী হবে, ভারি ভালো মানুষ ছিল তার বাবা। আর ছিল বেশ উদার মনের।
ছেলেকে শিখিয়েছিল মানুষটা, জীবনকে ভালো বাসতে হয়। কত না বিস্ময় লুকিয়ে আছে সারা দুনিয়া জুড়ে। চোখ দুটো খোলা রাখলে, সেসব দেখা যায় নিজের চোখে। 
বাবা যখন মারা গেল, আতুরো তখন মাত্র দশ বছরেরটি। ঘরে তো নাই-ই, এত বড় দুনিয়াতেও কেউ কোথাও নাই তার। থাকবার মধ্যে ছিল ক্ষুধার্ত একটা পেট—এই যা! 
সেই ছোট বয়সেই এক চাষির ঘরে কাজে লেগে গিয়েছিল আতুরো। সাধ্যমত পরিশ্রম করে ছেলেটা। সারা দিন কাজ করে, আর গুন গুন করে গান গায় নিজের মনে। 
আরও কয়েকজন কাজের লোক ছিল চাষির ঘরে। তাদের ভিতর জর্জ নামে একজনও ছিল। যেমন কুঁড়ের বাদশা, তেমনি হিংসুক। অন্যের নামে নালিশ করতে জুড়ি নাই তার।
আতুরো কাজ করে মন দিয়ে। নিজের মনে গান গাইতে থাকে কাজের মধ্যেই। অন্যদের সাথে গল্প করতে থাকে। পরামর্শ দেয় সবাইকে—অনেক বিস্ময় লুকিয়ে আছে এই দুনিয়ায়। দেখতে চাও তো, চোখ দুটো খোলা রেখো সব সময়। 
জর্জেরও কানে যায় সব কথা। অন্যেরা মন দিয়ে শোনে। কিন্তু হিংসায় গা রি-রি করে ওঠে তার। জর্জ এটাও দেখেছে, মালিক একটু বেশি ভালোবাসে ছেলেটাকে। হাল্কা কাজ দেয়। খাবারের বেলাতেও, বাড়তি কিছু জোটে ছেলেটার। 
একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার বাছাধনকে। এই ভেবে, মনে মনে একটা ফন্দি আঁটল জর্জ। 
পরদিন সকাল। সবাই কাজে বেরিয়ে গেছে। জর্জ করল কী, চুপিসারে গিয়ে, মালিকের তিন বালতি দুধ ছাগলের খোঁয়াড়ে ঢেলে দিল।
খামারবাড়িতে এসে, মালিক তো রেগে কাঁই। চেঁচাতে লাগল—কে করেছে এই কাজ? কে করেছে?
কারও মুখে কথা নাই। জর্জ মাথা নীচু করে আছে। চোখ দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গিয়েছে তার। একটু উশখুশ ভাব। 
মালিক যত ধমক দেয়, তার মুখে যেন রা-টি নাই। মাথা নাড়তে থাকে কেবল। 
মালিক রেগেমেগ বলল—না বললে, কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেব তোকে। 
--তা দিতে পারো। জর্জ বলল—কিন্তু বাচ্চাটাকে ছাড়িয়ো না। একটা ভুল না হয় করেই ফেলেছে। ঐটুকু ছেলে, ছাড়িয়ে দিলে, যাবে কোথায়? 
মালিকের বুঝতে কিছু বাকি রইল না। নিশ্চয়ই আতুরোর কাজ! আতুরোকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিল তখনই।
কোন অভিযোগই করল না আতুরো। খামারবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। 
আজ কোনও চাষির খেতে, তো কাল কোনও খনিতে। কাল কোন গেরস্তবাড়িতে, তো পরদিন কোন গুদামঘরে। যখন যা জোটে, সেই কাজে লেগে থাকে সে। এভাবেই কত কাল কেটে গেল ছেলেটার। দেখতে দেখতে যুবকটি হয়ে উঠল সে।
একবার একটা কয়লা খনিতে কাজ করছে আতুরো। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। রাতে শুয়ে পড়েছে। শোয়ামাত্রই ঘুম। একদিন ঘুমের ভিতর আশ্চর্য একটা স্বপ্ন দেখল ছেলেটা। 
এক বুড়ি বসে আছে একটা আগুনের পাশে। বুড়ি আতুরোকে বলল— দুঃখের দিন শেষ তোমার। বেরিয়ে পড়ো এই কয়লা খাদান থেকে। 
বুড়ি বলল—কাল পথে একজনের সাথে দেখা হবে তোমার। সাহায্য চাইবে তোমার কাছে। যত অদ্ভূত সাহায্যের কথাই বলুক। হাত বাড়িয়ে দিও। 
সকাল হতেই, বুড়ির কথাগুলো মনে পড়ে গেল তার। খনি ছেড়ে, পথে নামল আতুরো। 
কত দূর গিয়েছে, হঠাতই পেছনে কারও পায়ের শব্দ শুনতে পেল যেন। পেছন ফিরে দেখে, একজন যুবক ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে হাজির—ভারি সমস্যায় পড়েছি। একটু উপকার করবে আমার?
আতুরো বলল—বলো, শুনি। কী উপকার? সমস্যাটা কী তোমার? 
--বাচ্চা হবে আমার বউয়ের। যুবকটি বলল—জানোই তো, প্রথম বাচ্চার জন্মের সময়, একজন ধর্মপিতা লাগে। তুমি হবে ধর্মপিতা? 
সত্যিই অদ্ভূত সাহায্য! জীবনে এই প্রথম বার শুনল এমনটা। সাথে সাথে স্বপ্নে দেখা বুড়ির কথা মনে পড়ে গেল আতুরোর। যত অদ্ভূতই হোক, অরাজি হওয়া যাবে না। 

এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল সে। যুবকটির সাথে তার বাড়ির পথে রওণা হয়ে গেল আতুরো। 
ফুটফুটে একটা মেয়ে জন্মালো সেই বাড়িতে। এক মাথা কোঁকড়ানো চুল। মুখখানা তো নয়, যেন পূর্ণিমার চাঁদ! ধর্মপিতা ঘোষণা করা হোল আতুরোকে। 
যুবকের তো আনন্দ ধরে না যেন। রাতে শুয়ে ঘুম আসছে না তার চোখে। আতুরোর সাথে গল্প জুড়ে দিল সে—জানো, বন্ধু! গতকাল রাতে ভারি অদ্ভূত একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি। তুমি যদি শোন, তো বলি। 
--কেন শুনবো না? বলো তুমি। 
যুবকটি শুরু করল—স্বপ্ন দেখলাম, আমাকে আতাকামা মরুভূমিতে যেতে হয়েছে। আর, সে যাওয়া মানে কী! একেবারে ভিতর পর্যন্ত। সেখানে একটা উলের গোলা দেখতে পেলাম। আমার চোখে পড়ামাত্রই সেই গোলা গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে লাগল। তখন আমিও চললাম গোলাটার পেছন পেছন। গোলা গড়াচ্ছে, আমি চলেছি। আমি চলেছি, গোলা গড়াচ্ছে। 
কতক্ষণ চলে, শেষমেষ গোলাটা থামল এক দৈত্যের সামনে পৌঁছে। সেই দৈত্য কী বলল জানো? সে নাকি আমাকে অনেক সোনাদানা দেবে! সারা জীবন যত ধন-দৌলত, টাকা-কড়ি চেয়েছি মনে মনে, সবই দিয়ে দিতে পারে দৈত্যটা। 
কথা থামিয়ে হেসে উঠল যুবকটি। বলল-- তুমিই বলো, দৈত্য বলে কিছু আবার আছে না কি কোথাও?  ওসব কি আর সত্যি হয় কখনও? যত্তোসব আজগুবি স্বপ্ন!
মন দিয়ে শুনল আতুরো। কিন্তু হাসল না একটুও। উলটে বলল—তুমি কিন্তু যেতে পারতে, বন্ধু। সত্যি বলতে কী, যাওয়া উচিত ছিল তোমার। চোখ আর মন বড় করে খুলে রাখতে হয় আমাদের। কেন বলো তো? এই বিশাল দুনিয়ায় কোথায় কত বিস্ময়, কত যাদু যে লুকিয়ে আছে, তার গোণা-গুণতি নাই। সেসবের কতটুকুই বা জানি আমরা!
--তার মানে? দৈত্য বা এইসব মাথা খারাপ করে দেওয়া স্বপ্ন বিশ্বাস করো তুমি? 
যুবকটির কথাগুলো শুনল বটে, কোন জবাব দিল না আতুরো। সারা রাত দিগন্ত ছড়ানো আতাকামা মরুভূমি, আর গড়িয়ে গড়িয়ে চলা একটা উলের গোলা ঘুরপাক খেতে থাকল তার মাথায়। 
সকাল হলে, দেখা গেল, বিছানা ফাঁকা। চিহ্নটুকুও কোথাও নাই আতুরোর। আলো ফুটবার আগেই চলে গেছে সেই আগন্তুক। 
সত্যি সত্যি আতাকামার উদ্দেশ্যেই রওণা দিয়েছে আতুরো। মরুভূমির একেবারে মাঝামাঝি পৌঁছলো যখন, সামনে দেখে একটা উলের গোলা। চোখে পড়ামাত্রই গড়াতে লাগল গোলাটা। পিছু পিছু এগিয়ে চলল আতুরো। 

চলতে চলতে গোলাটা থেমে গেল যেখানে, সামনে দেখে, বিশাল বপুর এক দৈত্য। ভয়ে বুক হিম হয়ে যায়, এতই বড় দৈত্যটা। কটমট করে চেয়ে আছে আতুরোর দিকে। 
ভয় পেলে, কোন কাজ হয় না—ভালোই জানে আতুরো। সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে, প্রথমে দৈত্যটাকে অভিবাদন জানাল। তারপ্‌ দৈত্য কিছু বলবার আগেই, আতুরো বলল—অনেক না কি সোনাদানা আছে তোমা,? সেগুলো দিতেও নাকি চাও অভাবীদের? 
কোন কথা বলল না দৈত্যটা। গটগট করে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। একটা গুহার মধ্যে নিয়ে গেল আতুরোকে।
ভেতরে ঢুকে, চোখ ঝলসে গেল আতুরোর। থরে থরে সাজানো সোনার বাট। তাকে চমকে দিয়ে, দৈত্য বলল— অনেক দিন আগলে বসে আছি আমি। এখন এ সবই তোমার। নিয়ে যাও। সব নিয়ে যাও। 
কয়েক দিন সেখানেই থেকে গেল ছেলেটা। হাতে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়, এমন একটা গাড়ি বানালো যত্ন করে। তারপর? তার নতুন ধর্ম-মেয়ের ঘরে ফিরে এলো, গাড়ি ভর্তি সোনা-দানা নিয়ে।
সেই যুবক আর তার বউ তো বিশ্বাসই করতে পারছে না নিজেদের চোখ জোড়াকে। কথা ফুটছে না মুখে। আতুরো  বলল—এ সবই এখন তোমাদের। আমার ধর্ম-মেয়ের জন্য সামান্য উপহার!
মেয়েটার বাবা-মা তো কিছুতেই ছাড়বে না আতুরোকে। তাদের প্রস্তাব, আলাদা বাড়ি বানিয়ে দেব তোমার। বিয়ে-থা করো। এখানেই থেকে যাও আমাদের বন্ধু হয়ে। 
রাজি হবার মানুষ আতুরো নয়। সে বলল—কত বড় দুনিয়া পড়ে আছে সামনে। কতটুকুই বা দেখেছি আমি? এখানেই থেমে গেলে, চলে কখনও?
কী আর করে? নিজের জন্য আদ্ধেক নিয়ে, বাকি সোনা আতুরোর গাড়িতেই রেখে দিল যুবকটি। 
সেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল আতুরো। কত বিস্ময় লুকিয়ে আছে এই পৃথিবীতে। সেসব দেখা দরকার। 
যেখানেই পৌঁছায়, স্থানীয় লোকেদের সাথে মিশে যায়। কিছু সোনা-দানা বিলিয়ে দেয় অভাবি গরীব মানুষদের। সবাইকে বলে—যত দিন বাঁচো, চোখ আর মন খোলা রেখো, বন্ধুরা! এই পৃথিবী অনেক বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে তার আঁচলের ভিতর। সেসবই দেখে নিতে হবে আমাদের।
দিন কয় থাকে সেখানে। তারপর? তার পর আবার চলতে থাকে ছেলেটা, সামনের দিকে।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি