পথরেখা গেছে মিশে - পর্ব ৩ /নাম মাহাত্ম্য /মিলি ঘোষ

পথরেখা গেছে মিশে - পর্ব ৩

নাম মাহাত্ম্য

মিলি ঘোষ
 
অপরাজিতার বাবা আশা করেছিলেন তাঁর অন্য মনোযোগী সন্তানদের মতো কনিষ্ঠা কন্যাটিও হয়তো মনোযোগীই হবে। কিন্তু বাবার সে'গুড়ে সাক্ষাৎ বালি হয়ে এলো অপা। পড়াশুনায় তার মন নেই। বাবা পড়া বুঝিয়ে আর পড়া ধরতেন না। অপাও সেই সুযোগটা একেবারে লুফে নিত। যে বিষয় ভালো লাগত, তা নিয়ে নাড়াচাড়া করত। আর যা লাগত না, তা ছুঁয়েও দেখত না। অঙ্ক, বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ ছিল। ইংরেজি, বাংলাও মন্দ নয়, তবে অপার মনে হতো তা বাবার পড়ানোর গুণেই। কিন্তু ইতিহাস, ভূগোল দেখলেই অপার গায় জ্বর আসত। এরফলে সব মিলিয়ে যে রেজাল্ট হতো, তা পাতে দেবার মতো নয়। 

বলতে গেলে খেলা সর্বস্ব জীবন ছিল অপার। খেলত তো বাকিরাও, তবে পড়া বাদ দিয়ে নয়। আর অপা ? বইয়ের পাতায় মাঠের ছবি দেখত। স্কুলে গিয়ে খেলা, টিফিনের সময় খেলা, ইন্টার স্কুল খো খো প্রতিযোগিতার জন্য আলাদা করে প্র্যাকটিস, বাড়ি ফিরে আবার খেলা। এবার সন্ধ্যেবেলা বই নিয়ে বসে চোখ যে ঢুলবে, সে বলা বাহুল্য।

অ্যানুয়াল পরীক্ষার পর থেকে রেজাল্ট বেরোনোর আগে পর্যন্ত খেলা চলতই। দিনকাল তেমন ছিল না, যে বাড়ি বসে বাবা-মা'দের চিন্তা করতে হবে। কোথায় খেলতে গেল, কোথায় খেলতে গেল বলে কপাল চাপড়াতে দেখা যায়নি কাউকে। ছোটবেলায় মাঠ তবু পেয়েছে অপা। তবে অনেক সময়ই তা ছেলেদের দখলে থাকত। মেয়েরা তখন ব্রাত্য। ব্রাত্য হলেও খেলা দেখার আমেজটা বজায় ছিল। ফুটবল, ক্রিকেট যে টুর্নামেন্ট হোক, নারী পুরুষ নির্বিশেষে আট থেকে আশি ভিড় করে দেখত। এরপর মাঠে  বাড়ি গজাতে শুরু করল। তখন রাস্তাই খেলার মাঠ।  দেওয়ালে পিঠ ঘষে যেত, তবু খেলা বন্ধ হতো না। সন্ধ্যে হলে একরাশ মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হতো। বর্ষাকালে বাধা কিছুটা পড়ত। তবে, যখন তখন বাজ পড়ার হিড়িক তো ছিল না, তাই বৃষ্টিকে সব সময় গ্রাহ্য করা হতো না। 

আর ছিল অপার সুর-তালের প্রতি অদম্য আকর্ষণ। ফরিয়াপুকুর লেনে 'সরস্বতী বালিকা বিদ্যালয়' নামে মেয়েদের যে স্কুলটা আছে, সেখানে শনি ও রবিবারে নাচ, গান, গিটারের ক্লাস হতো। কথাকলির গুরু গোবিন্দন কুট্টি, মণিপুরির শ্রীমতি ইভা সিং এর কাছে অপা নাচ শিখতে যেত। শিল্প জগতের মহান মহিয়সীদের সামনে কখনও নিজেকে ছোটো মনে হতো না অপার। কোনও সময় মনে হয়নি তার,"আমি কাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি!" কারণ, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। আর দু'জনেই পরিষ্কার বাংলায় কথা বলতেন।

এমনিতে কুট্টি স্যার ছিলেন খুব সহজ ও মজার মানুষ। কিন্তু নাচ শেখানোর সময় দয়া দাক্ষিণ্য করতেন না বিশেষ। হাঁটু না ভাঙলে একটা স্কেল দিয়ে দুই পায়ের মধ্যে ডাইনে বাঁয়ে হাত চালাতেন। হাঁটু ভাঙতে বাধ্য। অসাধারণ বোঝাতেন। বলতেন, দেওয়ালে একটা টিকটিকি থাকলে সেটা দেখাতে গিয়ে আমাদের চোখও থাকবে টিকটিকির দিকে, আঙ্গুলও থাকবে টিকটিকির দিকে। টিকটিকির অবস্থান বোঝাতে চোখ কখনও আঙুলের দিকে যাবে না। নাচ শেখানো হয়ে গেলেই আবার অন্য মানুষ। তখন কত মজা, কত গল্প করতেন অপাদের সাথে। 

আর ইভাদি ছিলেন নরম স্বভাবের মানুষ। ইভাদি সবার বাড়ির খবর নিতেন। মা বাবা কেমন আছেন খোঁজ নিতেন। তবে ইভাদির থেকে অপা এমন কিছু পেয়েছে, যা অপার সারা জীবনের প্রাপ্তির তালিকায় একেবারে বেমানান। পরীক্ষার সময় ইভাদি অপাকে যা নম্বর দিতেন, তা অন্যদের তুলনায় একটু বেশির দিকেই। অপা নিজেও এক এক সময় ভাবত, সত্যিই সে এই নম্বর পাবার উপযুক্ত কি না। না কি অতি স্নেহের বশে ইভাদি ওই নম্বরটা দিতেন। কারণ যাই হোক, নম্বর পেতে কার না ভালো লাগে।

কুট্টি স্যার যখন জীবনের শেষ খেয়া পাড়ি দিলেন, অপার মেয়ে তখন স্কুলে পড়ে। কেরালার মানুষ হয়েও কোলকাতা ছিল তাঁর প্রাণ। বলতেন, " আমার দ্বিতীয় বাড়ি কোলকাতা।" জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত কোলকাতাতেই কাটালেন। নিজের দেহ দান করে গেলেন, 'মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল অথরিটি'কে, চিকিৎসার স্বার্থে। কেউ জানল না। বহু খবরের ভিড়ে, কাগজে ছোট্ট করে খবরটা বেরিয়েছিল। "প্রয়াত নৃত্যগুরু গোবিন্দন কুট্টি।"
আসলে নাচও যে একটা আর্ট, তার জন্যও যে শিক্ষা, পরিশ্রম, পড়াশুনা প্রয়োজন তা মানতে নারাজ বহু লোক।  

স্কুল জীবনে অপার সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ কিছু ছিল কি না, অপা নিজেও জানে না। বংলা পরীক্ষায় পেন মুখে নিয়েই পুরো সময়টা প্রায় কেটে যেত। ভাব সম্প্রসারণ লিখতে গিয়ে অপার অন্তরে বাহিরে কোথাও কোনও ভাবের আদান প্রদান ঘটত না। তবু কিছু কবিতা, গল্প এমনভাবে মনে দাগ কাটত, যার থেকে বেরোনো মুশকিল হতো। অপা ভাবত, এর থেকে প্রশ্ন এলে ফাটিয়ে লিখব। আসত না। একটাও আসত না। যেসব গদ্য, পদ্য অপার কাছে রসকষহীন  মনে হতো, প্রশ্নকর্তার কাছে সেগুলোই ছিল রসের বিপুল ভান্ডার সম। অথবা উল্টোটা। কোনওরকমে বানিয়ে বানিয়ে যা লিখত অপা, তাতে হাস্যকর নম্বর ছাড়া কিছুই আসত না। পরে অপা ভেবে দেখেছে, সে এত লিখত, এত লিখত যে, বাংলার শিক্ষিকা তার খাতায় নম্বর দেবার জায়গা পেতেন না। একই ঘটনা ঘটত ইতিহাস, ভূগোলেও। 

তবে অনুরাগ ছিল ঘুরপথে। পড়ার বইয়ের তলায় গল্পের বইকে আশ্রয় দিতে অপা ছিল সিদ্ধহস্ত। বড়োদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই গল্পের বই মাঝেমাঝে মুখ বার করত। এই লুকোচুরি খেলা অপার নিত্য সঙ্গী হয়ে উঠল। 
জন্ম থেকেই অপা দেখেছে বাড়িতে দেশ পত্রিকা আসে। ওদের তখন 'আগে কেবা প্রাণ, করিবেক দান' অবস্থা। 'দেশ'-র দখল নেবার জন্য ভাই বোনেরা সব প্রস্তুত। যে ধারাবাহিক উপন্যাসটি চলছে, সেটি আগে পড়ে নিয়েই হাত বদল। 'দেশ' এ'হাত থেকে ও'হাত, ও'হাত থেকে সে'হাত ঘুরতেই থাকত। বাকি সব পরে পড়া হতো।

বছরের শেষে একটা অসাধারণ মার্কশিট নিয়ে অপা দুরুদুরু বক্ষে বাড়িতে ঢুকত। অপার মা সেটাকে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে লকারে রেখে দিত। তখন নতুন বই, নতুন ক্লাস। মনে চিতোর রানার পণ। আর কোনোদিকে তাকাব না। ভালো রেজাল্ট কাকে বলে দেখিয়ে দেবো। দু'দিন। ঠিক গুণে গুণে দু'দিন। তারপর আবার যেই কে সেই। সেই মাঠ... ঘুঙুরের ঝমঝম... বাঁশির সুর .... অপা ভেসে যেত তার নিজের মতো করে। 

 সমস্যা দেখা দিত পুজোর সময়। কারণ, পুজো মানেই মা'র হাতে বানানো জামা, ঝুলটা একটু বড়ো, যাতে আরো দু'বছর পরতে পারে অপা। আর ছিল খবরের কাগজে জুতোর ছবি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা। তবু চোখ যেত অপার, দোকানে সাজানো দামি ফ্রকগুলোর দিকেই। ওগুলো কারা পরবে জানত অপা। চিনত তাদের। ওমুকের এটা আছে, আমার নেই। তমুকেরটা দামি, আমারটা সস্তা। এ'সব তো ছিলই। তার মধ্যে জামার বড়ো ঝুল নিয়ে মনের মধ্যে ছিল প্রবল আপত্তি, কিন্তু বলার উপায় ছিল না। কখনও যদি কোনও কেনা জামা ভুল পথে বাড়িতে ঢুকে পড়ত, সবাই মিলে বলত, "জামাটা কী সুন্দর না! জামাটা কী সুন্দর না!" তেতো ওষুধ গেলার মতো করে ঘাড় কাত করত অপা। বড়ো হয়ে অপা বুঝেছে অতবার করে সুন্দর বলার অন্তরনিহিত কারণটা কী। 

 বন্ধুদের ঝলমলে পোশাকের মাঝে নিজেকে কেমন যেন বেমানান লাগত অপার। দু'একজন যে মায়ের বানানো জামাটার দিকে তাকিয়ে দেখত না, তা নয়। যদিও মুখে কিছু বলত না। তবে সে দৃষ্টির অর্থ অপা ধরতে পারত না।
 তবু কোনও বন্ধুর বাড়িতে গেলে, তার মা যখন জানতে চাইতেন, "জামাটা কোথা থেকে করিয়েছ ?"
অপা বলত, "মা বানিয়ে দিয়েছে। মেশিনে।"
বন্ধুর মায়ের তখন পলক পড়ত না। 
তারপর চোখ বড়ো বড়ো করে বলতেন, "মা বানিয়ে দিয়েছেন ? নিজে ?"
হাসিমুখে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলত অপা। 
বন্ধুর মায়ের চোখের মুগ্ধতা দেখে ভেতরে ভেতরে তখন অপাই জিতে যেত। 
নিজের নামের সার্থকতা নিজেই উপলব্ধি করত অপরাজিতা।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
 

Comments

  1. সুন্দর বিন্যাস। ভালো লাগছে 😊

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি