পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

পতনমনের ছবি

শতাব্দী দাশ




- ছবি তুলে দিবি? 

-চল্।  দাঁড়া।

-না, এখন নয়। একটা বাচ্চাকে জড়িয়ে চুমু খাব।  তখন।

-চুমু! 

-হ্যাঁ, তাতে কী? 

-না মানে, করোনার সময়…

-ধুর, এখন অনেকটা কম। ঠিক আছে। শুধু জড়িয়ে ধরব। 

-তাতে কী হবে?

-একটা মেসেজ যাবে না? একটা ক্লাস-ডিসক্রিমিনেশন বিরোধী মেসেজ। 

-জড়িয়ে টড়িয়ে ধরার আগে কথা বলে নিস্। গ্রামের লোক কীসে ক্ষেপে যায়, তার ঠিক নেই।

-ক্ষেপবে কেন? আরে! র‍্যাশন নিয়ে এলাম, কাপড় চোপড়… একটা ছবি তুললে ক্ষেপে যাবে?

কোথাও খটকা লাগে। কোথায়, তা বুঝতে পারি না বলে অস্বস্তি থেকে যায়। ছুটোছুটি করে বন্যা বাচ্চা পাকড়েছে এর মধ্যে। বন্যা বন্যার মতো আগলভাঙা। আমার মধ্যে একটা নিষ্প্রভ কুনোভাব আছে, টের পাই। একটা জড়তা। দেখি বেশি, বলি কম। যা বলি, তাও যেন প্রত্যয়ের উচ্চারণ নয়। অনেক সংশয়। বন্যা উল্টো পুরোপুরি৷ সব বোঝে, সব জানে। নির্ভুল। তার চেয়ে বড় কথা, নির্ভুলতা বিষয়ে নিশ্চিত। যা ভাবে, তাই করে৷ যা করে, তার জন্য যুক্তি মজুত হরওয়ক্ত। কোন্ থিয়োরিকে কোথায় বসিয়ে যে কী প্রমাণ করে দেবে! মুগ্ধবিস্ময়ে দেখি। কিন্তু খটকা থেকে যায়। স্নেহহীন চুম্বন লালাময় ঘিনঘিনে মনে হয়। যদিও এমনটা কোনো ম্যানিফেস্টোতে লেখা নেই৷ কী যেন একটা মনে করতে চাই। অস্বস্তির উৎস হাতড়াই। 

ঝাঁ করে স্মৃতির তাকের এক কোণায় চার ব্যাটারি টর্চের আলো পড়ে। আঙুরপিসির ফেসবুক অ্যালবাম। ইয়েস। ওটাই কারণ। আঙুরপিসির ভালো নাম মধুমিতা। প্রতিবেশী পিসি। নার্সিং করত। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে প্রণয় হওয়ার পর মাইতি থেকে চ্যাটার্জি হল। দুবছরের মধ্যে হাজরা লেন থেকে ভায়া বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড ঠিকানা বদল হল কানাডায়। সেসময় প্রতি অভিজাত পাড়াতে একজন করে এনআরআই থাকত না। আর আমাদের বাইলেনে তো…

আমার শৈশব কৈশোর জুড়ে হতশ্রী দীনতা। শিশুমঙ্গলের উল্টো দিকে গোপন একফালি দেশ।   একটা করে ভাড়াঘর সবার, আর সামনে ঢালা উঠোন। বড় হয়ে জেনেছিলাম, ওকে বস্তি বলে। আরও বড় হয়ে জানলাম, বস্তিতে থাকার কথা ইস্কুলে চেপে যেতে হয়। ছুটির পর শিশুমঙ্গল পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে এসে হালকা পরে কেটে পড়তাম। যেমন হয় ছুটকো-ছাটকা সারভাইভাল স্ট্র‍্যাটেজি…

বারো ঘর এক উঠোনের একপাশে একটাই চানঘর। একটাই কলতলা। তাছাড়া একটা পায়খানা, ইউরিনালও একটা। ব্যক্তিগত টয়লেট জেনেছিলাম রাজীবদের বাড়িতে  প্রথমবার।

অবশ্য আমরা গড়িয়ার ফ্ল্যাটে উঠে গেছি এখন। বাপের আজীবনের সঞ্চয় গেছে এমন এক ঠিকানা খরিদ করতে, যা অভিজাত না হলেও, বস্তি নয়। অথচ দুই বাই এক বাই দুই হাজরা লেন-কে চোরাকুঠুরিতে যতই চালান করে দিই, সে ফিরে ফিরে আসে। যেমন এল, যখন বহুদিন পরে আঙুরপিসিকে দেখলাম ফেসবুকে। আজকাল সকলেই সকলকে অন্দরমহলে ঢুঁ মারতে দেয়। অন্তত যেটুকু প্রদর্শনযোগ্য, সেইটুকুতে ঢুঁ বড় কাঙ্ক্ষিত। মধুমিতা চ্যাটার্জির ঘর-বাড়ি দেখি৷ মাছি পিছলানো আসবাব, মানুষ পিছলানো মেঝে। কৃতি সন্তান-সন্ততি। কখনও চিনতাম পিসিকে, একথা ভেবে আরাম হয়। প্রতিফলিত গরিমা।

ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর আগে ছবি থেকে ছবিতে পিছোই। আঙুরপিসির কাঁচাপাকা বয়কাট সময় পিছোলে লম্বা কালো কেশদাম হয়ে যায়৷ একটা ছবিতে আটকাই। ছবিটা মূল ছবি থেকে স্ক্যান করা। এ তো হাজরা লেন! দুটো তিনটে বাচ্চার মাঝে আঙুরপিসি। সিঁথিতে সিঁদুর। কানাডায় সেটল করার পর ওই একবারই ফিরেছিল বাপের বাড়ি৷ দামি চকোলেট পেয়েছিলাম। ছবির বাচ্চাগুলোর মধ্যে একজন আমি। ক্যাপশন- 'অ্যামিডস্ট লেস ফরচুনেট চিলড্রেন অফ ইন্ডিয়া।' মিথ্যাচার নেই। সবকটি অক্ষর সত্যি৷ আমরা কবে যেন আঙুরপিসির 'সোশাল ওয়ার্ক' হয়ে গিয়েছিলাম। রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়নি আর।
 
বন্যারা বলে, দারিদ্র‍্য লজ্জার নয়। দারিদ্র‍্যই শক্তি৷ যার শিকল ছাড়া কিছু হারানোর ভয় নেই...ইত্যাদি। ওদের মতো আমার শৈশবে থরে থরে মহত্তর প্রগতির উপকরণ ছিল না বলে আঙুরপিসির ছবির ক্যাপশন আমাকে যখন তখন তাড়া করে। আমরা রুশ শিশু সাহিত্য পড়ে বড় হইনি। রবীন্দ্রসংগীত বা গণসঙ্গীত না, আমাদের পাড়াতে জুম্মা চুম্মা বা শীতলাগান হত। সকাল বিকেল জল ধরার লাইন, ঝগড়াঝাঁটি। বড় রাস্তার পর অনেক গলি-ঘুঁজি পেরিয়ে আমাদের বাড়ি পৌঁছতে হত। গলিগুলো লুকিয়ে ছিল ভদ্রবিত্ত ঝোলা বারান্দাওয়ালা বাড়িদের পিছনে৷ সে কারণেই হয়ত, নব্বইয়ের দশকে, সর্বহারার সরকারের উত্তুঙ্গ সময়েও আমাদের ওরা খুঁজে পায়নি। আশেপাশে কারখানা ছিল না, তাই ট্রেড ইউনিয়ানিস্টদেরও নজরে পড়িনি। আবার বড় রাস্তা থেকে দূরত্বের কারণে বস্তি ভেঙে হাইরাইজ বা উড়ালপুল হল না৷ অতএব উচ্ছেদ বিরোধীরাও পাত্তা দিল না। পাড়াটা শহরের বুকে আমারই মতো নিশ্চুপ ঘাপটি মেরে আছে একশো বছর। অপ্রত্যয়ী। ভাষাহীন। 

ওই বাচ্চাগুলো, ওদের কি ভাষা আছে? একটা নয়, দুটো-তিনটে বাচ্চা। ওদের শ্যামলা মায়েরা দাঁড়িয়েছিল লাইনে একটু আগে। মলিন একটা সারি। ছিন্ন শাড়ি সব, তবু ঊর্ধ্বাংশ আবৃত তাদেরই শুধু। ন-দশ বছরের মেয়েরাও ইজের পরে ঘুরছে। ছেলেগুলো হাফপ্যান্ট। পাঁচের নিচে শিশুরা ন্যাংটো মূলত। কারও কারও কোমরে ঘুনসি, শরীরে সুতো বলতে ওটুকুই। নোনা হাওয়া ওদের আদুল গায়ে আদর দিয়ে যাচ্ছে। অথচ সেদিন হাওয়া ছিল নির্মম, সমুদ্র বেপরোয়া নির্দয় ছিল, যেদিন মেটে বাঁধ ভেঙ্গে গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে গেল। 

মায়েরা অর্ধগোল করে হাঁমুখ শুনছে। হাত-পা নেড়ে বোঝাচ্ছে বন্যা। ওদের আপত্তি নেই বোঝা যাচ্ছে। সপ্রশ্রয় মাথা নাড়ছে। এসবে অভ্যস্ত মনে হয়। দুর্যোগের পরের মাসগুলোতে শুধু আমরাই তো এলাম না। কত গাড়ি, বাস এসেছে কলকাতা থেকে। মুড়ি, ছাতু, চাল, ডাল, ওআরএস দিয়ে ছবি তুলে নিয়ে গেছে। ফোটোশ্যুট কবে থেকে যেন আবশ্যক হয়ে গেছে ত্রাণে। যেন দলিল। সত্যতার প্রমাণপত্র। যেন ছবি ছাড়া কেউ বিশ্বাস যাবে না। বন্যা বলছিল, 'ত্রাণ নয়। বল্ অধিকার। আমাদের আছে, ওদের নেই। আসলে সবারই থাকার কথা ছিল। তাই আমরা দিচ্ছি।' আমি লজ্জা পেয়েছিলাম। ঠিকই তো। এজন্যই কথা বলি কম। কত কী ভুলভাল বলে ফেলি! বন্যা বা বন্যারা জানে। ভুল ধরে ফেলে চটপট। অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে শব্দহীন বশ্যতা প্রত্যাশা করার সম্পর্ক ঠিক কেমন? সে নিয়ে ওরা কখনও শেখায়নি কিছু। তবে বন্যা একদা কনসেন্ট শিখিয়েছিল। আদরে আপত্তির অধিকার ইত্যাদি। সেই যেদিন হাত জড়িয়ে কেঁদেছিল আমার। বলেছিল রানিবাঁধে গিয়ে প্রবালদা ওকে জোর করেছিল। ক্যাম্পেইনে গিয়ে পাশাপাশি শোয় সবাই শতরঞ্জি পাতা মেঝেতে৷ অন্ধকারে বন্যা চেঁচিয়ে উঠতে যেতেই প্রবালদা মুখ চেপে ধরেছিল।  বলেছিল, 'করতে দে, প্লিজ।' প্লিজটা অনুরোধ না আদেশ বুঝতে না পেরে বন্যা চুপ করে গিয়েছিল। আমাকে বলেছিল সকালে। আমি জানতাম, বন্যা প্রবালদাকে পছন্দই করে। কিন্তু অসম্মতির ঘনিষ্ঠতার ঘেন্নায় ওর মুখ ভেঙেচুরে যাচ্ছিল। পার্টির কাছে লিখিত অভিযোগ জানানোর প্রস্তাব ওঠার কিছুদিন পর প্রবালদা অবশ্য প্রোপোজ করল বন্যাকে। বন্যা অভিযোগ জমা দেয়নি শেষতক। খুচরো ব্যক্তিগত ঝামেলা ভুলে আমরা আবার শ্রেণিসংগ্রামে মন দিয়েছিলাম। 

একটা বোল্ডারের উপর বসে আছে বন্যা। ছেলেমেয়েগুলো ত্রিভঙ্গ দাঁড়িয়ে ওকে ঘিরে। বন্যা ইশারা করছে। শট রেডি। আমি লেন্স ঠিক করি। বন্যা ধমকে বলল, 'মোবাইলে।' ক্যামেরা থেকে ছবি যাবে কম্পিউটারে, সেখানে থেকে মেইলে বা পেনড্রাইভে, সেখানে থেকে বন্যার কম্পিউটারে — অত ধৈর্য নেই। চটজলদি শেয়ার চাই। লাইভ টাইমে প্রায়। বন্যা ভীষণ ঘটমান। মোবাইল ঘেঁটে ক্যামেরা অন করি। এলোমেলো হাওয়ায় বন্যার চুল উড়ে যাচ্ছে। ও যেকোনো ব্যাকগ্রাউন্ডে সুন্দর। এখনও, কেমন মালিন্যর মধ্যে উজ্জ্বল ফুটে আছে! 

ওদিকে কিছু একটা গোল বেধেছে। অসীমদার সামনে একটা বারমুডা পরা লোক ভুঁড়ি বের করে তড়পাচ্ছে। লোকটা ঘুরঘুর করছিল অনেকক্ষণ। তড়িঘড়ি সারতে বলছিল৷ অসীমদা পাত্তা দিচ্ছিল না। অসীমদার একটা এনজিও আছে এ অঞ্চলে। ঝড়ের পর থেকে ওদের কাছে মাল আসছে উপচে। লোকাল এনজিও বা নেতা না ধরে হুট করে সাহায্যের হাত বাড়ানো যায় না। তাছাড়া কে কী পেল না পেল, কেউ রিপিট পাচ্ছে কিনা, ওদের কাছে হিসাব থাকে। প্রবালদা বলেছিল, বটতলার মোড়ে দুটো বাইক থাকবে অসীমদাদের। বাইকদুটো আমাদের গাড়িকে পথ দেখিয়ে গাঁয়ে নিয়ে যাবে। পুরো সময়টা হেল্প করে দেবে। অসীমদা লোক মন্দ নয়। শুধু সঙ্গে যে শাগরেদ মেয়েটা এসেছে, সে চোখ মটকে দিতেই, তার জন্য মশারি চাইল একটা, মাল নামানোর সময়। মেয়েটার নাম মিতা। সে পছন্দমতো রঙ বেছে নিল।  

ছবিটা তুলে অসীমদার দিকে এগোই। অসীমদা চিরঞ্জিত টাইপ ভাও নিচ্ছে। 

-খুচরো ক্যাডারের মুখ লাগি না৷ যা গে তোর নেতাকে বল৷ অসীম মণ্ডল। নামটা বলিস। এমএলএ-র বাড়ি যাওয়া আসা আছে আমার। 

লোকটা মিইয়ে গেছে। সিচুয়েশন আন্ডার কন্ট্রোল৷ মিতা এখন ভ্রু কুঁচকে বন্যাকে দেখছে। ওর চোখে কিছু আছে... রাতুল গোছগাছ করে নিয়েছে। বিড়ি ফুঁকে রেডি জয়ন্তদাও স্টিয়ারিং ধরল। মিতা আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। বন্যাকে দেখিয়ে বলল,

-গার্লফ্রেন্ড?

হেসে 'না' বলি। মিতা আরও ঘন হয়ে আসে৷

-থ্যাংকু বলতে এলাম। মশারির কালারটা ভালো। মভ আমার খুব প্রিয়। মভ ল্যাভেন্ডার ম্যাজেন্টা ভায়োলেট পার্পল...আপনি আলাদা করতে পারেন? 

আমি ওর চোখ দেখছিলাম। অনেক রকম চোখ দেখেছি আমি। ছোট না বড়, আয়ত না নরুনচেরা, সেসব দেখি না, মাইরি। পিউপিল, আইরিস, অক্ষিপল্লবের টান — তাও না। পাগলাটে শোনাবে...চোখের মধ্যে আমি রাস্তা দেখি। ভিতরে ঢোকার রাস্তা। এসব কথা কাউকে বলি না৷ উদ্ভট, সাক্ষ্যপ্রমাণহীন, অযৌক্তিক কথা বলা মানা আমাদের রাজনৈতিক চত্বরে। বলবই বা কী? নিজেও কি ঠিক জানি, কী দেখি আর কেমন ভাবে, চোখে?
মিতার চোখে কিছু ছিল, যাতে ওকে ভরসাযোগ্য লাগে না। আবার বন্যা, ওর চোখ বদলায়। চঞ্চলতা  যখন, তখন তা খাঁটি। মাঝে মাঝে হিসেবও থাকে। ছবি, ফেসবুক, প্রচার, লাইক। বিপ্লবের গরিমা কিসে কত আউন্স বাড়বে, সেসব যে বোঝে — চোখ তা বলে দিচ্ছিল, যখন ও বোল্ডারে বসেছিল। 

মিতাকে এড়িয়ে এগিয়ে যাই গাড়ির দিকে। বন্যা ফোন কানে গাড়িতে উঠল। প্রবালদার ফোন নির্ঘাত। আমাদের সবচেয়ে ঝকঝকে নেতা। ওর মতো যদি হতে পারতাম! ওর দিকে বন্যা আজকাল মুগ্ধচোখে চায়। চোখের রাস্তা বেয়ে সৎ নিবেদন দেখতে পাই। মাসিকে নিয়ে কিছু বলছে বন্যা। বন্যার মাসি হাইফাই। অসীম মণ্ডলের মতো ছোটখাটো এনজিও নয় ওঁর। নাম প্রায়শ বেরোয় কাগজে৷ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। উপযুক্ত শিক্ষা, বিকাশ আর বিনোদনের ব্যবস্থা করেন তাদের। মৃত্যুর পরে সন্তানের হিল্লে হবে ভেবে বড়লোক বাপ-মায়েরা একটা বড় অ্যামাউন্ট ওঁর অর্গানাইজেশনের নামে লিখে দেয়। মাসি সমস্যায় পড়েছেন মনে হয়। প্রবালদা আশ্বাস দিচ্ছে, দেখে নেবে।

রাতুল সমুদ্রে যেতে চাইছে। বেলাভূমি পাঁচ-ছ কিলোমিটার বৈ নয়। কাঁচা রাস্তায় গাড়ি আস্তে চলছে। মিনিট দশের মধ্যে হাওয়ায় সমুদ্র সমুদ্র গন্ধ। হুড়মুড় নামছে বন্যা, রাতুল। রাতুলকে বন্যা বলছে, 'একটা ছবি তুলে দে প্লিজ!' এগুলো আজ ফেসবুকে যাবে না। বেমানান লাগবে দুর্গতি আর দুর্গতর পাশে। সময়-সুযোগ বুঝে প্রোফাইল পিক হবে টুক্ করে। সমুদ্রের পাশে কীভাবে দাঁড়ায় মানুষ? ক্ষুদ্রতায় সঙ্কোচ লাগে না?

ছোটবেলায় বাবা-মার সংগে সমুদ্রে গিয়েছিলাম। একটা ঘরে আমরা তিনজন। অ্যাটাচড বাথ। ওখানে কেউ জানে না, আমরা বস্তিতে থাকি। ওখানে ধরা পড়ার ভয় ছিল না। সমুদ্র দেখে অথচ ভুলে গেলাম এসব ছোট ছোট লজ্জা। সমুদ্রের সামনে আমি আর পার্সোনাল টয়লেটওয়ালা রাজীব দুজনেই বড় ক্ষুদ্র। মজার ব্যাপার। বাবা-মাকে আজকাল প্রাচীন আর এঁদো মনে হয়। অথচ ওদের ছোঁওয়া সহজ হওয়ার কথা ছিল, রাজনীতির পথ বেয়ে৷ বরং হাজরার দুশো স্কোয়ারফিট আমাদের জড়িয়েমড়িয়ে থাকতে বাধ্য করত। 

ফেরার পথে বন্যা কাচ তুলতে চাইল৷ এসি চলল৷ কুলকুল হাওয়া বেরোচ্ছে। সামনে জয়ন্তদার পাশে বন্যা। আমি আর রাতুল পিছনে। অভ্যেসবশে ফেসবুক খুলি। স্ক্রলিং-এ দৃশ্য এত দ্রুত বদলায় যে কোনোকিছুই ছাপ ফেলে না। সল্টলেকে বস্তি উচ্ছেদের প্রতিবাদ করছেন প্রবাল মিত্র। সংগে ছবি। 'বস্তির মানুষের পাশে, গতবছর বিশ্বকর্মা পুজোর দিন।' টেস্টিমোনিয়াল অ্যাটাচড হেয়ারউইদ।
নিউজ ক্লিপে মানুষের হাহাকার শুনি। চারঘণ্টার নোটিসে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ভর্তুকি দু-চারটে ত্রিপল আপাতত। বোল্ডারের উপর শিশু-পরিবৃতা বন্যাও আসে। পাশে এঁকেবেঁকে 'অধিকার'-বিলির লাইন। ক্যাপশনে সকালের কথাগুলো: 'ত্রাণ নয়, মানুষের অধিকার'। ওদিকে শেয়ারে শেয়ারে ভাইরাল সন্তানহারা মা। মুর্শিদাবাদে কম্বল না পেয়ে শীতে মারা গেছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। মাসির হোম না? লোকাল ছেলেরা হল্লা করছে হোমের সামনে। প্রবালদার ফোনে হয়ত হটে যাবে তারা। নাহলে মেরে হটানো হবে। হাহাকার থেকে হাহাকারে সার্ফ করি।

বন্ধ গাড়ির ঘেরাটোপে আমার ক্লস্ট্রোফোবিক লাগে। গ্রুপে মেসেজ আসে টুং শব্দে। কাল সল্টলেকে উচ্ছেদ-বিরোধী ডেমনস্ট্রেশন। স্লোগান তৈরির দায়িত্ব আমার। আর একটা চিঠি করে লোকাল থানায় জমা দিতে হবে। মিডিয়ায় খবর দেবে রাতুল। বন্যা কলেজ ইউনিয়নগুলোর সংগে যোগাযোগ করবে। সবাই যেন নিজের নিজের পোস্টার নিয়ে আসে। গ্রুপে মুষ্টিবদ্ধ হাতের ইমোজি পড়তে থাকে টুপটুপ। সলিডারিটি এক ক্লিক দূরত্বে আজকাল। অস্বস্তিটা যাচ্ছে না মাথা থেকে। তাকে এড়াতে সামান্য এলিয়ে চোখ বন্ধ করি। হাজরা লেনের বারো ঘর এক উঠোন। ঢেউ এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ঢেউ মাথা তোলার সময় বুলডোজারের দাঁত হয়ে যায়। বন্যার গলা শুনতে পাই, 'ছবি, ছবি প্লিজ…' আমি উঁচু থেকে ক্যামেরা তাক করি। একটা উচ্চাকাশীয় জানালা থেকে শট নিচ্ছি৷ যেমন জানালার পাশে নেতাদের বসে থাকতে দেখি। হাই অ্যাঙ্গেল শটে সবকিছু ড্রামাটিক দেখায়, বিশেষত মানুষ। ড্রামাটিক দারিদ্র‍্য আর ড্রামাটিক দুর্গতি দেখি। আমি ভরহীনতা টের পাই। লিফটে নামার সময়ের যে ভরহীনতা। যেকোনো পতনে যে ভরহীনতা। আমি আঁকড়ে ধরতে চাই ডালপালা। উচ্চাকাশীয় জানালা থেকে আমি সটান দুই বাই এক বাই দুই হজরা লেনে পড়ি। সে আমাকে না আমি তাকে — কে যে কাকে বাঁচাতে চাইছে, গুলিয়ে যায়।  
 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. পতন আর আপওয়ার্ড মোবিলিটির বৈপরীত্যটা ভালো ধরা পড়েছে। এরকম গল্প একমাত্র এ্যাক্টিভিস্ট নান্দনিকতার ওপর ভালো দখল ছাড়া লেখা সম্ভব নয়। লেখা ও মাঠের সক্রিয়তা ভালো মিলেছে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন