ঘুমিয়ে গেছে গানে পাখি
(অষ্টাদশ পর্ব)
চিত্রা ভট্টাচার্য্য
ভাষা–সাহিত্য ও সংস্কৃতি একটি দেশের পরিচয়, সভ্যতার মানচিত্র, দেশের গৌরবের ঐতিহ্যের পতাকা বহন করে দেশকে দশের সভায় আলোকিত করে।
ভাষা ও সাহিত্যের বুননের মধ্যে থাকে দেশপ্রেম মানবধর্ম ও প্রেমের বিকাশ গৌরবের উজ্জল ইতিহাস। বঙ্গজীবনে উৎসবের নানা ধারায় লেখক কবি শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে দেখা দেয়। বঙ্গ সাহিত্যের আকাশ অজস্র নক্ষত্র রাজির সারিতে ভরা থাকলে ও কাব্যে সাহিত্যে সুরে সংগীতে স্বর্ণোজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বিরাজ করছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ' তাঁরই পাশে পরবর্তীকালে পেয়েছি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল কে যিনি বহু যুগ আগেই অভিষেকের সিংহাসন জুড়ে আলোকিত এক কবির আধারে ঔপন্যাসিক ,প্রাবন্ধিক গল্পলেখক দেশপ্রেমিক বিপ্লবী হয়েও অসাধারণ এক সংগীত শিল্পী। সুরের সৃষ্টিতে কথায় সঙ্গীতে স্বপ্নময় করে রেখেছেন তাঁর তারায় খচিত নির্মল আকাশ।
🍂
এই অনন্য ব্যক্তিত্বে নজরুল শিক্ষিত বাঙালির চিন্তা জগতে ,মানস জগতে স্থায়ী প্রভাব ফেলে স্বীয় গুণে বরণীয় হয়ে উঠেছেন। আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে ‘বুলবুল’নামে পরিচিত হয়ে কবি নজরুল বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে রইলেন। তিনি একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় সংযোজন করলেন অসাম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের কবি। ধর্ম ও সমাজে যেখানেই শোষণের বাড়াবাড়ি দেখেছেন তার লেখনী সেখানেই প্রতিবাদে মুখর ,রণতূর্য বাজিয়ে জনগণের সুপ্ত চেতনাকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন । সুন্দরের মাধুরী মিশিয়ে বিবেকের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। বিদ্রোহী কবিতা দিয়ে তিনি যেন সেই সময়ে বাঙালি মুসলমানের জীবনে এক রেনেসাঁসের বাতাবরণ তৈরি করেছিলেন।"
নজরুল-প্রতিভা সর্বাধিক সার্থকতা লাভ করেছে সংগীত রচনার মাধ্যমে। বাংলা সংগীতের ঐতিহ্য অনুসরণ করেই নজরুল গান রচনা করেছেন। তাই তাঁর গান হয়ে উঠেছে বাণী ও সুরে ঐশ্বর্যমণ্ডিত। নজরুলের গানের সহজ, সরল ও স্বতঃস্ফূর্ত গুণ, ছন্দের বিচিত্রতা, মিলের সৌন্দর্য এবং অলংকার প্রয়োগের কুশলতা তাঁর গানগুলোকে করে তুলেছে হৃদয়গ্রাহী। তাঁর গানের বাণী ও সুর চমকিত তীক্ষ্ণধার, অতলস্পর্শী চিত্তহারী রূপ এবং হৃদয় মুগ্ধ করা ঔজ্জ্বল্য বহু গুণে সমৃদ্ধ। সঙ্গীতে রাগ রাগিনীর সৃষ্টিতে কথায় ছন্দের ব্যবহারে তিনি এক সুদক্ষ কারিগর।
কী মাত্রাবৃত্ত, কী স্বরবৃত্ত ছন্দ তাল অপূর্ব মোহনীয় রূপে ধরা পড়েছে তাঁর গানে।
শৈশবকালে লেটোর দলের সঙ্গে মিশে সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ ও সহজাত আকর্ষণ স্রষ্টার প্রাণে যেমন শিহরণ জাগিয়েছিল তেমনি শ্রোতার কর্নকুহরে প্রবেশ করে মর্মে গভীর দোলা দিয়েছিল। তিনি স্বয়ং সেই শিশুকাল থেকে গান রচনা করতেন এবং সে গানে নিজেই সুরারোপ করতেন। যৌবনে গ্রামোফোন কোম্পানিতে চাকরি করেছেন, বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। এই দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য তাঁকে প্রচুর গান লিখতে হয়েছে, রচনা করতে হয়েছে বহু সংগীতালেখ্য।
কবির "নজরুল গীতিকা" নামক গ্রন্থে দেখাযায় কবি নিজেই নিজের গানের শ্রেণিবিন্যাস করে গেছেন। সেখানে মোট ১১টি শিরোনাম পাওয়া যায়। যেমন ,ভক্তিমূলক গান, প্রণয়গীতি, প্রকৃতি বন্দনা, দেশাত্মবোধক গান, রাগপ্রধান গান, হাসির গান, ব্যাঙ্গাত্মক গান, সমবেত সঙ্গীত, রণ সঙ্গীত এবং, বিদেশীসুরাশ্রিত গান। নজরুল সঙ্গীতের বিষয় ও সুরগত বৈচিত্র্য বর্ণনা করতে গিয়ে নজরুল-বিশেষজ্ঞ আবদুল আজীজ আল্-আমান লিখেছেন---,''গীতিকার, সুরকার ও গায়ক-সংগীতের এই তিন ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিভার অনন্য স্বাক্ষর রেখে গেছেন। সংগীতে নজরুল প্রতিভার স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর সৃষ্টিশীল ভাবাবেগের সুরমূর্তি প্রকাশিত হয়েছে সংগীতে। তাঁর প্রাণশক্তির উচ্ছলতার অভিব্যক্তি রূপায়িত হয়েছে সংগীত রচনায়। নজরুলের মধ্যে কাব্য-প্রতিভা ও গীতি-প্রতিভার এক অভূতপূর্ব মিলন ঘটেছে। "
'নজরুলের সংগীত প্রতিভার প্রথমদিকে কাব্য-সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি অনুকূল পরিবেশে বিস্তার ঘটেছে দেশবন্দনা, উদ্দীপনামূলক, জাগরণী গান, গণসংগীত, হিন্দু-মুসলিমের মিলন প্রত্যাশী অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিমূলক গানে। এরপর বাংলা গজল রচনা ও পরিবেশনের সময়ে এসে নজরুলকে পাওয়া গেল সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে, ভিন্নভাবে। এখানে তিনি ছিলেন ঝর্ণা ধারার মতো বেগবান, তবে সংহত। গজলের সহজ-সরল বাণী ও সুরে মাতোয়ারা হয়েছে সমকালে সর্বস্তরের মানুষ। সংগীতপিপাসু শ্রোতার আন্তরিক সমীহ, ভালোলাগার এই পর্বে নজরুল অনাস্বাদিত আনন্দের স্বাদ পেয়েছেন।
''গানগুলি সব এক গোত্রের নয়, বিভিন্ন শ্রেণীর। তিনি একাধারে রচনা করেছেন গজল গান, কাব্য সংগীত বা প্রেমগীতি, ঋতু-সংগীত, খেয়াল, রাগপ্রধান, হাসির গান, কোরাস গান, দেশাত্মবোধক গান, গণসংগীত–শ্রমিক-কৃষকের গান, ধীবরের গান, ছাদপেটার গান, তরুণ বা ছাত্রদলের গান, মার্চ-সংগীত বা কুচকাওয়াজের গান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান, নারী জাগরণের গান, মুসলিম জাতির জাগরণের গান, শ্যামাসংগীত, কীর্তন, বৈষ্ণবপদাবলী, অন্যান্য ভক্তিগীতি, ইসলামী সংগীত, শিশু সংগীত, নৃত্য-সংগীত, লোকগীতি – ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, সাম্পানের গান, ঝুমুর, সাঁওতালি, লাউনী, কাজরী, বাউল, মুর্শেদী এবং আরও নানা বর্ণের গান। বিভিন্ন বিদেশী সুরের আদলে রচিত গানের সংখ্যা অজস্র । এ ছাড়া লুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় রাগ-রাগিণীকে অবলম্বন করে 'হারামণি' পর্যায়ের গান এবং নতুন সৃষ্ট রাগ-রাগিণীর উপর ভিত্তি করে লেখা 'নবরাগ' পর্যায়ের গানগুলি নজরুলের সাংগীতিক প্রতিভার অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় বহন করে। ''
কবি নজরুল ইসলাম রচিত ও সুরারোপিত গান, যা মূলত বিপ্লবী, আধ্যাত্মিক, দার্শনিক এবং রোমান্টিক বিষয়বস্তুতে সমৃদ্ধ। লোক ও ধ্রুপদী সুরের মিশ্রণ, এবং বিভিন্ন রীতির (যেমন পল্লীগীতি, বাউল, গজল) ব্যবহার নজরুলের গানে এক স্বতন্ত্র বিপ্লবী রূপ ও চেতনা এনেছে। তাঁর গানের কথা ও সুরে তারুণ্যের অফুরন্ত প্রাণশক্তি ও বিপ্লবের বার্তা লুকিয়ে আছে, যা সব শ্রেণির মানুষের সুপ্ত চেতনায় আঘাত করে জাগরণ সৃষ্টি করেছিল ঝিমিয়ে পরা যুবশক্তিতে । ''
নজরুল গবেষক দের মতে ''সঙ্গীতের প্রতি কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবাল্য অনুরাগ। তিনি তাঁর সৃষ্টিশীল সঙ্গীত জীবনে প্রায় তিন সহস্রাধিক গান রচনা ও সুর সংযোজনা করেছেন। সম্ভবত: গান রচনার সময় কবি মনের মধ্যে সুরটি রচনা করে একটি সুরের কাঠামো তৈরি করে নিতেন। গীতি গ্রন্থগুলোতে অন্তর্ভুক্ত গানের শীর্ষদেশে প্রায় সকল গানেরই সুর ও তাল নির্দেশ পাওয়া যায়। তবে শিল্পীকে গান শেখাতে গিয়ে শিল্পীর কণ্ঠনৈপুণ্য অনুযায়ী কখনো কখনো সুর ও তালের পরিবর্তন করেছেন। এছাড়া রেকর্ডে ধারণের সীমাবদ্ধতার কারণেও গীতিগ্রন্থে প্রকাশিত অনেক গানের বাণী সংযোজন, বিয়োজন কিংবা পরিমার্জন প্রয়োজন অনুযায়ী করেছেন।''
বিশেষ ভাবে রবীন্দ্র-অনুরাগী কবি নজরুল নিজের স্বাতন্ত্র্যতা বজায় রেখে আপন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সঙ্গীতস্রষ্টা নজরূল তাঁর সৃষ্ট, ভাব-ভাষা-তাল-লয়ে একাত্ম হয়ে সুরের মায়াজালে আচ্ছন্ন হয়ে নিরন্তর সঙ্গীতের কত রূপ কত ধারা সৃষ্টি করে চলেছেন । তিনি স্বাতন্ত্র্যতা বজায় রেখে আপন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দ্বারা প্রভাবিত কবি মূলত খেয়াল ও ঠুমরি গানের প্রতি কাজী নজরুলের ছিল গভীর অনুরাগ । একাধিক রাগের ছায়ায় সৃষ্ট হয়েছে তাঁর গান, এইসব গানের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে উত্তর ভারতের খেয়াল, ঠুমরি, টপ্পা, গজল, কাওয়ালী, লাউনি প্রভৃতি এমনকি লোকগীতির ধারাও। তাঁর রাগাশ্রয়ী গানগুলি ও মিশ্র রাগের গানগুলি বিশ্লেষণ করলে যে বৈশিষ্ট্যগুলি প্রধানত দেখা যায় তা হলো— (১) প্রচলিত রাগাশ্রয়ী গান (২) মিশ্র রাগের গান (৩) প্রচলিত রাগের পুনরুদ্ধার (৪) নবরাগ সৃজন (৫) লক্ষণ গীতের বাংলা রূপায়ন (৬) বিভিন্ন প্রদেশের এবং দুই বাংলার আঞ্চলিক লোকগীতির সুর সঞ্চয়ন (৭) বাংলা গানে বিদেশি সুরের প্রয়োগ ও রূপান্তর। এছাড়াও হিন্দি খেয়াল গানের সুরের প্রয়োগ করে বাংলা গানে নতুনত্বের আবির্ভাব ঘটিয়ে ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের ভাঙাগান-এ যেমন দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ নিজের রচিত গানে হিন্দি খেয়াল গানের সুরের প্রয়োগ করেছেন, অনুরূপভাবে নজরুলও তাঁর অনেক গানে হিন্দি খেয়াল ও ঠুমরি সুর ব্যবহার করে তাঁর রূপান্তর ঘটিয়েছেন।
নজরুল প্রথম জীবনে নানা ধরনের গান ও তাঁর বিচিত্র সুর-লহরী আয়ত্ত করেছিলেন। তাঁর সঙ্গীতে পরবর্তীকালে তিনি যথাযথভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুশীলন করে, তাঁর রীতি-নীতি, পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন এবং সঙ্গীত সমাজের গুণীজনদের নিকট সমাদৃত হয়েছিলেন।
আগ্রা ঘরানার বিখ্যাত ওস্তাদ বাদল খাঁ সাহেব ছিলেন সমকালীন উস্তাদদের মধ্যে অগ্রণী। খাঁ সাহেবের সুযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ও উস্তাদ জমিরুউদ্দিন খাঁ। এঁদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন স্বয়ং নজরুল। এছাড়া এই ঘরানার উস্তাদ দবির খাঁ সাহেব, মঞ্জুসাহেব, মস্তানা গামা প্রভৃতি বিশিষ্ট গুনীজনের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন কবি। তবে গুরু হিসাবে জমিরুদ্দিন খাঁ সাহেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর প্রমাণ-স্বরূপ দেখা যায় কবি তাঁর ‘বনগীতি’ সঙ্গীতগ্রন্থটি তাঁর প্রিয় উস্তাদ জমিরুদ্দিন খাঁ সাহেবকেই উৎসর্গ করেছিলেন। কবির সঙ্গীত জীবনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই, কবি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন আগ্রা ঘরানার উস্তাদদের কাছে।
এই ঘরানার মহান শিল্পী ছিলেন উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ। যৌবনে উস্তাদ ছিলেন বরোদার সভা-গায়ক। তিনি অনেক খেয়াল ও ঠুমরির বন্দিশ রচনা করেছিলেন এবং সেই বন্দিশে নিজেই সুরারোপ করেছিলেন বিভিন্ন রাগে। তাঁর ছদ্মনাম ছিল ‘প্রেমপিয়া’। তাঁর রচিত গানে তিনি এই ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। তাঁর অনেক বন্দিশে দেখা যায় উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সনাতনী হয়েও তাঁর নিজের পরিবেশিত খেয়াল ও ঠুমরিতে সামান্য বদল করতে দ্বিধা করেননি, তাকে তাই বলা হত ‘নিও-ক্লাসিস্ট’। তাঁর সময়েই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন।
উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের প্রিয় শিষ্য ছিলেন বিদূষী দীপালি নাগ (তালুকদার)। ইনি আগ্রা ঘরানার শিল্পী ছিলেন। দীপালি কাজী নজরুলের সান্নিধ্যে এসেছিলেন ১৯৩৮ সালে।
নজরুল সঙ্গীতের বিপুল ভাণ্ডারটি সমৃদ্ধি লাভ করেছিল কবির রচিত সুর ও বাণীতে; আবার তাঁর রচিত গানে সেই সময়ের বিভিন্ন শিল্পীর সূরারোপের মাধ্যমে। যে সকল সঙ্গীত শিল্পী তাঁর গানে সুরারোপ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিদূষী দীপালি নাগ।
কবি নজরুল তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে লেখা লেখির জন্য খুব সীমিত সময় মাত্র ২৩টি বছর পেয়েছিলেন। তাঁর রচনা কালে রচিত সংগীতের আলোচনা প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে পড়ে তাঁর দেশাত্মবোধক গানগুলো যা পর্যালোচনা করলে কবির গভীর দেশপ্রেম আজও মনে শিহরণ জাগায়।
আব্দুল আজিজ-আল-আমানের ‘নজরুল গীতি – অখণ্ড’ ষষ্ঠ সংস্করনে নজরুলের রচনায় মোট ১১৫টি দেশাত্মবোধক গান পাওয়া গিয়েছে । ডঃ করুণাময় গোস্বামী'র মতে এর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দেশাত্মবোধক গান হল।
১/ দেশ বন্দনা মূলক গান
২/ পরাধীনতার বিরুধ্যে সংগ্রামী গান
৩/ শোষণের বিরুধ্যে সোচ্চার গান
৪/ নারী জাগরণ মূলক গান
৫/ মুসলিম জাগরণী - উদ্দীপনা মূলক গান
৬/ দেশাত্মবোধক গান
৭/ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার গান
১/ ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি ২/ জাগ নারী জাগ বহ্নি শিখা ৩/ এই শিকল পরা ছল ৪/ হে পার্থসারথী
৫/ আমি পূরব দেশের পুরনারীএ গানটি সম্পর্কে এক কথায় বলা যায়- তৎকালীন ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীদের জন্য একটি উদ্দীপনামূলক গান।
আরেকটি শিকল ভাঙার গান-- কারাগারের লৌহকপাট এবং রক্ত-জমাটকরা ভয়ঙ্কর আসন ভেঙে ফেলার জন্য, ঈশানরূপী (মহাদেবের অষ্ট মূর্তির একটি) তরুণদের আহবান করা হয়েছে। কবি কামনা করছেন, বিদ্রোহী তরুণদের হাতে ধ্বনিত হোক মহাদেবের প্রলয়ঙ্করী শিঙা, পূর্বদেকের (প্রাচী-র) আলোক-প্রতিবন্ধী প্রাচীর ভেদ করে উত্তোলিত হোক ধ্বংসের পতাকা। এই ধ্বংসের ভিতর দিয়ে জেগে উঠবে স্বাধীনতার নতুন পতাকা, স্বাধীনতার নতুন সূর্য আলো ছড়াবে জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
কবি তরুণদেরকল্পনা করেছেন পাগলা ভোলা মহেশ্বর রূপে। প্রচণ্ড ধ্বংসের দোলায় সব কারাগারকে আন্দোলিত করুক আর হ্যাঁচকা টানে সেগুলোকে ধ্বংস করুক। হায়দরী হাঁক হেঁকে, যুদ্ধের দুন্দুভি বাজিয়ে মৃত্যুর আলয়কে ধ্বংস করে, সে মৃত্যু মুক্তজীবনের আকাঙ্ক্ষাকে উজ্জীবিত করুক। কবি তরুণদের ডেকে বলছেন, বিধ্বংসী কালবৈশাখীর মতো আন্দোলন সমাসন্ন, এখন বসে বসে কাল কাটানোর অবসর নেই। এখন অটল কারাগারের ভিত্তিকে নড়িয়ে দিতে হবে। কবি কামনা করছেন, যত কারাগার আছে, পদাঘাতে তার সবগুলোর তালা খুলে যাক, আগুনের লেলিহান শিখায় ধ্বংস হয়ে যাক সকল বন্দীকারাগার, সমূলে উৎপাটিত হোক পরাধীনতার জগদ্দল পাথর।এই গানের ভিতর দিয়ে নজরুল তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের আহ্বান করেছিলেন। তিনি বিপ্লবীদের মনে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন পরাধীনতার বন্দী দশা থেকে মুক্ত হওয়ার বার্তা।
বাংলা দেশাত্মবোধক গানের ধারায় অসামান্য অবদানের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণীয় হয়ে আছেন। ভাষায়, সুর ও ছন্দে নজরুল তাঁর দেশাত্মবোধক গীতিমালাকে এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন যে তা শুধু সমকালের প্রয়োজন মেটায়নি বরং ভবিষ্যতের সংগ্রামেও অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল বা অতুলপ্রসাদের স্বদেশ সংগীতের মত নজরুলের দেশাত্মবোধক গানও বাঙালির চিরকালীন স্বদেশসংগীতে পরিণত হয়েছে। ক্রমশ:
গ্রন্থ: ভাঙার গান
প্রথম সংস্করণ। শ্রাবণ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ (আগষ্ট।)
তথ্য সূত্র--- ১))কাজী নজরুল ইসলাম ও বাংলা সাহিত্য। আজিবুল হক। লেখা প্রকাশনী, কলকাতা।
.২)নজরুল সঙ্গীত /ড : করুণা ময় গোস্বামী
৩) কাজী নজরুল /প্রাণতোষ ভট্টাচার্য। ন্যাশনাল বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড।
৪). কাজী নজরুল ইসলাম/বসুধা চক্রবর্তী। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইন্ডিয়া।
৫). নজরুল জীবনী /অরুণকুমার বসু। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। জানুয়ারি ২০০০।
৬). নজরুল-জীবনী/ রফিকুল ইসলাম। নজরুল ইন্সটিটউট, ঢাকা।
0 Comments