বরফ ঘর
পুলককান্তি কর
টানা দুদিন বেশ দুর্যোগ চলছে এখানে। এমন বরফ পড়ছে, বাইরের রাস্তায় বেশ পুরু হয়ে জমে আছে তা। একটু আগে রিমা ফোন করেছিল। ওর একটা সেমিনার আছে তিনদিন পরে। সেটা কমপ্লিট করেই আসবে সে। ফ্লাইটের টিকিট কেটে রেখেছে। ইউ.এস.এ তে একটা পোষ্টডক প্রোগ্রামে গেছে সে। ছোট মেয়ে রাইমা লন্ডনে থাকে, চাকরী সূত্রে। গতকালই সে জানিয়েছে- না এলে যদি হয়, তবে বেকার সে আসবে না। কোম্পানি ছুটি দিতে চায় না। এক্ষেত্রে যদিও ছুটি ম্যানেজ হয়ে যেত, তবে মিছিমিছি এসে লাভ কী। তেমন কিছু রিচুয়ালস তো হচ্ছে না। মনীষা কিছু বলেন নি, শুনে নিয়েছেন শুধু। রাইমা সম্ভবত মৌনতাকে সম্পত্তি ভেবে নিয়েছে। জামাইও কী একটা কাজে বাইরে সুতরাং কাউকে কিছু বলার নেই।
মনীষার অনেকক্ষণ মাথাটা ধরে আছে। আসলে দুপুরে খাওয়ার পরে একটু শুয়েছিলেন। স্বপ্নের মধ্যে ছেঁড়া ছেঁড়া অসংলগ্ন অনেককিছুই দেখছিলেন, বোধ হয় তখন থেকেই ধরেছে। উঠে একটু কফি বানালে হয়, কিন্তু কোথাকার এক আলস্য যেন চেপে ধরেছে তাঁকে। কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না। এমন ঠান্ডা হয়ে আছে চারপাশে যে বিছানার নিচে নামার কথা ভাবলেই কাঁপুনি দিচ্ছে। তবু উঠতেই হবে। জীবন তো আর থেমে থাকবে না। অন্যান্য দিন এই সময় রেহান আসতো, এই দুর্যোগে সে আর আসবে না। ও এলে হয়তো সময়টা কেটে যেত, কিন্তু কী আর করা। মনীষা ভাবলেন কফিটা বসিয়ে একটা কল করবেন। রেহান এর বাবা-মা বছর খানেক হল এখানে এসেছে। ওরা সাউথ ইন্ডিয়ার লোক, চাকরী সূত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে হয়। প্রবীর বরং এসব ব্যাপারে ভীষণ কুঁড়ে ছিলেন। বিয়ের আগে থেকে যে কোম্পানিতে ছিলেন সেখানেই কাটিয়ে দিয়েছেন আজীবন।
মনীষার মনে পড়ে, তখন বয়স একুশ বাইশ। বিয়ের সম্বন্ধ এল- ছেলে জার্মানিতে থাকে কোবার্গে। পুরোনো আমলের শহর- আল্পস পর্বতমালার কাছাকাছি। তখন তো আর গুগল ছিল না, অ্যাটলাস খুলে খুলে দেখা। পাশে রেগনীজ নদী, ব্যামবার্গ শহর। একটু দূরে ট্যারিন জিয়ান ফরেস্ট। মনীষা বিয়ের পর এসে অনেকবার গেছেন ওখানে। প্রবীর যদিও বেড়ানোর ব্যাপারে ভীষণ অলস ছিলেন, ছুটির দিনে ঘর ছেড়ে বেরোতেই চাইতেন না। মনীষা বরং পীড়াপীড়ি করে এদিক ওদিক নিয়ে যেতেন। এরকম শীতের দিনে যদিও প্রবীরকে দিয়ে কোনও কাজ করানো যেত না। সারাক্ষণ ফায়ার প্লেসে কাঠ গুঁজে আগুন পোয়াতেন আর বারবার চা কফির জন্য তদ্বির করতেন। মর্গের ওই বরফশীতল অন্ধকারে এখন একা একা কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন কে জানে?
পরশুদিন সন্ধের সময় ওঁরা দুজন গাড়ীটা নিয়ে ব্যাগবার্গ গিয়েছিলেন একটা চার্চে। কিছু কেনাকাটা সেরে সন্ধেবেলায় ফেরার সময় প্রবীর বলেছিলেন, শরীরটা তেমন জুতে নেই। নিয়ম করে ক'দিন আগেই সমস্ত টেষ্ট করানো হয়েছে; হার্ট-ফাট নর্মাল ছিল। বয়স জনিত সমস্যা যেটুকু থাকে, ততটুকুই। একটুখানি প্রষ্টেটের সমস্যা ছিল। সুগার, প্রেসার- সবই নর্মাল। বাড়ী ফিরে ডাক্তার দেখিয়েছেন মনীষা। অথচ লোকটা রাতে শুয়ে আর উঠলেন না। মেয়েরা কেউ কাছে নেই। মনীষা একা হাতে সব করেছেন। এখানে ক্রিমেশনের ব্যবস্থা ইন্ডিয়ার মতো নয়। কয়েকটা জায়গায় চুল্লীর বন্দোবস্ত আছে, কিন্তু সেগুলি দিনরাত খোলা থাকে না। একটা নির্দিষ্ট সময় দাহ কাজ হয়। ওরা সিরিয়াল অনুযায়ী ডেট দেয়। প্রবীরের ডেট আছে আরও পাঁচদিন পরে। রিমা এসে যাবে তার মধ্যে। প্রবীরের যদিও ইচ্ছে ছিল মৃত্যু হলে দেশে গিয়ে দাহ করানোর- কিন্তু মনীষার পক্ষে সেটা পূরণ করা সম্ভব ছিল না। শুধু অর্থবল থাকলেই হয় না, লোকবল লাগে। ইন্ডিয়া থেকেও প্রবীরের ভাইপোরা কেউ আসতে পারবে না জানিয়ে দিয়েছে। এখানে তো পুরোহিত পাওয়া যায় না। মনীষা ভেবে রেখেছেন দিন সাতেক বাদে চার্চে গিয়ে একটু প্রার্থনা করে আসবেন।
🍂
কফি খেয়ে চুপ করে ফায়ার প্লেসের সামনে এসে বসলেন মনীষা। ম্যাথিউ ফোন করেছে। ও প্রবীরের জুনিয়র ছিল অফিসে। অনেকদিনের চেনা শোনা- প্রায় আত্মীয়ের মতোই।
- কী করছো মনীষা?
- এই তো, বসে আছি।
- ভাবছিলাম তোমার বাড়ী যাবো, এত বরফ পড়েছে- আর যাওয়া হলো না।
- কী আর করবে! প্রকৃতির উপরে তো আর জোর চলে না।
- তুমি কি খুব বোর ফিল করছো?
- এ তো অভ্যেস করতে হবে ম্যাথিউ। এতদিন বকবক করতাম, ঈশ্বর বোধ হয় তার কোটা পূর্ণ করে দিয়েছেন।
- আমি গেলে কি তোমার ভালো লাগবে?
- তুমি সবসময় চার্মিং ডার্লিং, কিন্তু এই বরফের মধ্যে এসো না। কাল পরশু ওয়েদার ভালো হবে লিখেছে- তখন এসো।
- ঠিক আছে, দরজাটা খোলো।
- কেন?
- আরে খোলোই না।
মনীষা উঠে দরজা খুলে দেখলেন সামনে ম্যাথিউ। সারা গায়ে কুচি কুচি বরফ। রেনকোটটা খুলতে খুলতে ম্যাথিউ বললো, কখন থেকে ডোরবেল বাজাচ্ছি!
- ওমা, বাজে নি তো!
- খারাপ হয়ে গেছে বোধহয়। তুমি চিন্তা ক'রো না, আমি দেখছি।
- তুমি একটু কফি খাবে?
- আমি করছি মনীষা। তোমাকে দেখে খুব ক্লান্ত লাগছে।
একটুক্ষণ বাদে কফি বানিয়ে ম্যাথিউস বললো, ‘মেয়ে জামাইরা আসবে নাকি?’
- রিমা আসবে তো বলেছে, না আঁচালে বিশ্বাস নেই। ছোট মেয়ের জামাই আসবে না।
- তোমরা ভারতীয়রা বিদেশে থেকে থেকে বেশ বিদেশী হয়ে গেছ মনীষা!
মনীষা চুপ করে রইল। ম্যাথিউ আবার বললো, টানা দুদিন তুমি প্রবীরের চিন্তায় রয়েছো, চল আজ আমরা অন্য কিছু নিয়ে গল্প বলি।
- দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে যার সাথে রয়েছি, তাকে বাদ দিয়ে আর কোন গল্প আছে ম্যাথিউ? ওকে বাদ দেওয়ার মতো কিছু তো চোখে পড়ে না।
- তুমি তো এখনও বেশ সুন্দরী, যখন ইয়াং ছিলে নিশ্চই ডাকসাইটে ছিলে, তোমার তখনকার প্রেমের গল্প বলো।
মনীষা চুপ করে রইলেন। ম্যাথিউ আবার বলল, ‘দয়া করে এমনটা বলো না যে তোমার প্রেমিক ছিল না। ইন্ডিয়ার লোকেরা এই ব্যাপারে বড় কনজারভেটিভ।’
মনীষা নিজের ভেতর তাকলেন। যতদূর চোখ যায় শুধু প্রবীরের স্মৃতি। অনেক আড়ালে অল্প উঁকি ঝুঁকি দিয়ে যাচ্ছে দু-চারটে মুখ। সজনে ডাঙার পুকুর, স্কুল বাড়ী, মন্দির, তালগাছ। তারও আড়ালে ভীষণ আবচ্ছা ঝাপসা হয়ে আসা একটা লাজুক মুখ উঁকি দিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে। ম্যাথিউ একদৃষ্টিতে মনীষার মুখের বদল দেখতে লাগলো। বলল, ‘কী হলো? মনের মধ্যে তো অনেক কথাই আসছে, বলে ফেল।’
- থাক ম্যাথিউ। সারাটা জীবন আমি প্রবীরের কথা আর তার ভালো মন্দ নিয়েই চিন্তা করেছি। আজ তার চলে যাবার পর অন্য কিছুর দিকে মন দেওয়া ঠিক লাগছে না।
- দ্যাখো মনীষা, আমি যতদূর তোমাকে চিনি, তুমি প্রবীরের প্রতি বিশ্বস্ত রয়েছ। আর যদি পুরোনো কিছু স্মৃতি মনেও আনো, তাতে দোষ কিছু হবে না। আর তাছাড়া তুমি বরাবরই জানো- আই এম অলওয়েজ অ্যাট ইওর সার্ভিস। তুমি আমাকে কোনওদিনই পাত্তা দাওনি, কিন্তু আমি তোমার পিছু ছাড়ি নি আজ এত গুলো বছর। ফলে এটা আমার দাবি বলতে পারো, আমি তোমার অতীত কিছুটা হলেও জানতে চাই।
- মেয়েদের জীবন এক একটা উপন্যাস ম্যাথিউ- কতটুকুই বা তার জানবে?
- হোক না উপন্যাস। তার একটা অধ্যায় জানাই বা কম কী?
- তুমি ওয়েস্ট বেঙ্গলের দার্জিলিং এর নাম শুনেছ?
- ইয়েস! আমি আর হেনরি একবার ইন্ডিয়া এক্সপ্লোর করার প্ল্যান করেছিলাম, নেহাৎ তোমাকে ছেড়ে এতদিন থাকতে হবে বলে ক্যানসেল করেছিলাম। আমাদের লিস্ট এ দার্জিলিং এর নাম ছিল।
মনীষা এবার বেশ উঁচু স্বরেই হাসলেন। বললেন, 'তুমি পারোও বটে ম্যাথিউ! এই বয়সে এখনও তুমি এমন চমৎকার ফ্লার্ট করতে পারো- ভাবলেও অবাক লাগে। তোমার এই স্বভাব নিয়ে আমি আর প্রবীর খুব হাসাহাসি করতাম।
- নো, নো। নো প্রবীর টুডে। উই উইল অনলি ডিসকাস অ্যাবাউট সাম আদার কমপিটিটরস অফ মাইন হুম ইউ হ্যাড প্রিসাইজড ইন ইয়োর ডিপ ওসান। ডোন্ট বাইপাস মাই কোয়েশ্চেন।
- আমি যখন গ্রাজুয়েশন করছি, তখন আমরা একবার দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার বাবা বেস্ট অফবিট জায়গায় যেতে পছন্দ করতেন। বাবার একজন অফিস কলিগের বাড়ী ছিল দার্জিলিংয় এর কাছাকাছি কোনও এক গ্রামে। গ্রামটার নাম ঠিক মনে নেই এখন। সেখানে একটা পাহাড়ী রাস্তার পাশে কাঠের একটা বেঞ্চ ছিল। ভারী চমৎকার একটা দৃশ্যকল্প। একদিন সন্ধ্যায় ওখানে হাঁটতে গিয়ে দেখি, একটি রোগা মতো ছেলে আমারই বয়সী, গালে দাড়ি, অদ্ভুত দুটো জ্বলজ্বলে চোখ- বসে সিগারেট খাচ্ছে। আমি রোজ হাঁটতে হাঁটতে ওই বেঞ্চটায় বসে খানিকক্ষণ জিরোতাম, সেদিন অচেনা লোকের পাশে বসতে ঠিক মন চাইলো না।
- সেই ছেলেটি বুঝি সেটা বুঝতে পারলো?
- না। সে এক মনের ধোঁয়ার রিঙ বানাতে লাগলো। এমন ভাব করলে যেন সে দেখেই নি। কিন্তু আমার ভারী কৌতূহল হল। এমন শহুরে হাবভাব সেই ছেলের- এখানকার স্থানীয়দের মতো চেহারা না।
- বাবা। তোমারও এত কৌতুহল হয় পুরুষ দেখে? হাসল ম্যাথিউ। মনীষাকে যেন একথা ছুঁলই না। তিনি একভাবে বলতে থাকলেন, 'জানো ম্যাথিউ, ছেলেটার সেই চোখ- তার দৃষ্টি- এত তীব্র ছিল, না না, ঠিক তীব্র না- কেমন যেন হিপনোটাইজিং…
- ইস, আমার যদি তেমন একটা চোখ হত!
- ঠিক। তাহলে তুমি বোধ হয় আমাকে পটাতে পারতে।
- যা হোক, দুর্ভাগ্য! তুমি বল।
- জানো, আমি নিজে থেকেই ওর পাশে গিয়ে বসলাম। ও খানিকক্ষণ এপাশ ওপাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘সিনেমা করবেন?’
- মানে?
- মানে আমি একটা সিনেমা বানাবো ভাবছি, ওর যে নায়িকার চরিত্র ভেবেছিলাম- ওটা অবিকল যেন আপনি। তাই আপনাকেই রোলটা অফার করলাম। করবেন?
- করবেন মানেটা কি? জীবনে কখনও অভিনয় করিনি, নায়িকা হওয়া কি মুখের কথা?
- আপনি যদি ফিল্মের হিস্ট্রি পড়তেন, তবে দেখতেন- বহু অভিনেতা অভিনেত্রীরই প্রথাগত কোনও অভিনয় শিক্ষা ছিল না। এমনকি বহুজনই সিনেমায় নামার আগে কখনও কোনও স্টেজেই ওঠেননি। যেমন ধরুন আমি। আমি নিজেই কি আগে কখনও ফিল্ম বানিয়েছি, না কি শিখেছি? ওটা ইনস্টিংক্ট। আপনি চাইলে পারবেন।
- আপনি জীবনে ফিল্ম বানান নি তো আপনাকে প্রোডিউস করবে কে। শুনেছি তো সেখানে অনেক টাকার খেলা।
- ওই জন্যই তো সব অ্যামেচার খুঁজছি যাদের পারিশ্রমিক দিতে হবে না।
- তা হলেও তো শুটিং এর একটা খরচ আছে!
- দেখি, তার জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু না হলে একটা কিডনি বেচে দেব। শুনেছি অনেক টাকা পাওয়া যায় ওতে।
- কী আবোল তাবোল ভাবছেন! এমনটা কিন্তু সিরিয়াসলি করবেন না কখনও।
জানো ম্যাথিউ, আমার গলার উৎকণ্ঠায় আমি নিজেই যেন খানিকটা চমকে উঠলাম। ছেলেটি বলল 'ওটা লাস্ট অপশন। অন্যভাবে চেষ্টা করে দেখব।'
- না না, ওটা কোনও অপশনই হতে পারে না। আপনি প্রমিস করুন।
- আপনার সাথে চেনা শোনাই হল না, আপনি প্রমিস আদায় করে নিচ্ছেন? এবং সবচেয়ে বড় কথা, শুরুতেই বাধা।
- আমি মনীষা।
- কী করেন?
- কলকাতায় বাসন্তী দেবী কলেজে বি.এস.সি করছি। আপনি?
- আমি যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে বি. ই. কমপ্লিট করলাম এই বছর। চাকরীর চেষ্টা চলছে আপাতত।
- হঠাৎ ফিল্মের লাইন ধরতে চাইছেন কেন?
- শখ।
- আপনার নামটা বললেন না তো?
- শিলাই।
- মানে।
- এটা একটা নদীর নাম। মেদিনীপুরের দিকে ট্রেনে গেছেন কখনও? ওখানে একটা স্টেশনের নামও এই নামে।
- না যাইনি কখনও।
- তা আমার প্রস্তাবটায় কি আপনি রাজী? বিনা পারিশ্রমিকের কিন্তু! ফিল্ম চললে একটা লভ্যাংশ পাবেন।
- ও আমি পারবো না।
- সে দায়িত্ব আমার। আপনি নিজে রাজী থাকলে বলুন।
তারপর শিলাই যেন কোন জগতে হারিয়ে গেল। 'জানেন মনীষা অদ্ভুত একটা বিষয় নিয়ে এই ফিল্মের গল্পটা ভেবেছি। একটা ছেলে যে সবে কিশোর বয়স পার করে এসেছে, তার সাথে পাড়াতুতো এক দিদির সম্পর্ক নিয়ে এগোবে গল্পটা- আপনি তো নিশ্চই রবি ঠাকুরের ফটিকচাঁদ পড়েছেন- সেই অসহায়তা- ক্রমশ নিজেকে খুঁজে পাওয়া চেষ্টা, ভালবাসা খোঁজার কাঙালপনা, দিদি সম্পর্কের মেয়েটির প্রশয়- তার প্রতি ভালোবাসার অধিকার- পাগলামি- এই সবকিছু নিয়েই ফিল্মটা। শেষটা একটু স্যাড এন্ডিং- ভাবছি এখনও জায়গাটা নিয়ে। আমার ধারণা এই দিদি রোলটায় আপনি বেষ্ট সিলেকশান হবেন।
'জানো ম্যাথিউ - এই গল্পটা যেন আমারও। আমার বোনের সাথে একটা ছেলে পড়তো, তার নামটা ছিল জনা। সেই ছেলেটি অদ্ভুতভাবে আমার খুব ন্যাওটা ছিল। যখন ও সেভেন এইট এ পড়তো তখন সব সময় আমার পেছনে ঘুরঘুর করতো। যখন একটু বড় হল, বুঝতে পারলাম আমার প্রেমে পড়েছে। নানান আব্দার, অধিকার বোধ শুরু হল তার। ছেলেটি ক্লাস টেন স্ট্যান্ডার্ডে খুব খারাপ রেজাল্ট করলো -
- তুমি কোনওভাবে ওকে বোঝাবার চেষ্টা করনি?
- কিছু কিছু কথা আছে, সেসব বুঝলেও না বোঝার ভান করতে হয় ম্যাথিউ। আমি ওকে পড়তে বলতাম, ভালো রেজাল্ট করার কথা বললাম, কিন্তু বেশি প্রশ্রয় দিতাম না।
- ছেলেটি এখন কী করে?
- জানিনা। যোগাযোগ নেই বহু বছর। জার্মানিতে আসার পর কয়েকবছর পর্যন্ত টুকটাক খবর পাওয়া যেত, যতদিন বাবা-মা বেঁচে ছিলেন।
- কী করে সে?
- নষ্ট হয়ে গেছে। টুকটাক দোকান টোকান চালাতো তখন। অথচ ছোটবেলায় বোনেদের ক্লাসে ফার্স্ট হ'ত সে।
- যাইহোক, শিলাই এর গল্প বলো। তুমি রাজী হলে?
- পাগল। বাবাকে বলার সাহসই হয়নি কখনও।
- তবে কি শিলাই এর চ্যাপ্টার শেষ হয়ে গেল?
- না। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিল না। আমাদের হোষ্টেলের ফোন নম্বর দিলাম, সেও দিল। মাঝে মাঝে আমার সাথে দেখা করতে আসতো।
- তখন তাহলে তোমার ডেট করছ?
একে আদৌ কি ডেটিং বলা যায়? মাসে হয়ত দু-তিনবার আসতো, এসে তার ফিল্ম নিয়েই কথা বেশীর ভাগ।
কাজ কতটা এগুলো, স্পনসর এর সমস্যা, বাড়ীতে চাকরিতে জয়েন করার জন্য পীড়াপীড়ি- এইসব।
- সে কোনওদিন প্রেমের প্রস্তাব দেয়নি বা তুমি?
- না। এর কয়েক মাসের মধ্যেই আমার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয়ে গেল; আর এদিকে প্রবীরের সাথে বিয়ের সম্বন্ধ এসে গেল।
- তুমি ওকে তোমার বিয়ের কথাটা বলেছিলে?
- হ্যাঁ।
- ও কিছু বলল না?
- কী আর বলবে! কনগ্র্যাটস জানালো।
- এ আবার কেমন প্রেমের গল্প? এর মধ্যে তো কিছুই নেই! এর থেকে তোমার আমার প্রেমের গল্পটাই ভালো।
মনীষা মিষ্টি করে হাসলেন, বললেন ‘সে তো একশোবার। তুমি যেভাবে নানান সময়ে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছ, ক'জন করে তা?’
- কিন্তু মনীষা, ভদ্রলোকের ফিল্মটার কী হল? ওটা কি উনি বানাতে পেরেছিলেন?
- না বোধ হয়। বানালে জানতে পারতাম।
- তোমার সঙ্গে উনার যোগাযোগ আছে?
- আমার তরফ থেকে নেই। তবে উনি বছরে একবার আমার জন্মদিনে কিছু একটা লিখে পাঠান- বেশির ভাগই কবিতা। তবে মাঝে মধ্যে দু-একটা টুকরো কথা, যা কবিতার মতোই; ব্যক্তিগত কথাবার্তা কিছুই থাকে না তাতে।
- ভদ্রলোক এখন কী করেন? কোথায় থাকেন?
- এই জার্মানিতেই থাকে। চিঠির ঠিকানায় দেখলাম ‘ব্যামবার্গ’। শুনেছি আমার বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে জার্মানীতে চাকরী নিয়ে চলে আসে সে। কয়েক বছর চাকরী করে এখন নিজেরই এখানে কিছু একটা কনসালটেন্সী ফার্ম করেছে।
- ভদ্রলোক বিয়ে-থা করেছেন?
- নাঃ।
- মনীষা, তোমার কি মনে হয় এসব কিছু তোমার জন্য?
- দ্যাখ ম্যাথিউ, আমাদের আলাপের প্রথম দিনগুলোয়, ওর ব্যবহার বা কথাবার্তা থেকে কোনওভাবেই বোঝা যেত না যে তার আমার প্রতি- ওর ফিল্মের নায়িকা বানানোর ছাড়া- অন্য কোনও ইন্টারেস্ট আছে। বরং আমার মধ্যে ওর প্রতি একটা ভালোলাগা ছিল। কিন্তু বিয়ের পর ওর এখানে চলে আসায় মনে মনে বেশ বিরক্তই হয়েছিলাম- ভেবেছিলাম এ আবার কী পাগলামি! নিশ্চই আমার সংসারে এর একটা প্রভাব পড়বে, যখন তখন দেখা করতে চাইবে। কিন্তু যতদিন যেতে লাগলো, আমার মনে ওর প্রতি শ্রদ্ধা বাড়তে শুরু করলো। আমার মনে হয় এ এক অপূর্ব প্রেম…
- কিন্তু মনীষা, তুমি বোধহয় ভদ্রলোকের প্রতি একটু নিষ্ঠুরতাই দেখিয়েছ। যখন বুঝলে সবকিছু, তখন কি ওঁর সাথে একবার দেখা করা তোমার উচিত ছিল না? না কি করেছো?
- না। ম্যাথিউ, আমাদের ভারতের নারীরা সাধারণত এরকমই। বিয়ে হয়ে গেলে স্বামীর সংসারকেই তারা স্বর্গ মনে করে। সেখানে অন্য কোনও ছায়া মনে আনতেও তারা ভয় পায়। আমি সারা জীবনই তাই শিলাই এর কথা মনেও আনতে চাইনি, পাছে এসব কথা প্রশ্রয় পেয়ে ডালপালা মেলতে শুরু করে।
- তোমরা এত বছর এখানে আছো। তোমাদের ইন্ডিয়ানদের বা বেঙ্গলীদের তো একটা অ্যাসোসিয়েশন আছে। তাদের বার্ষিক সম্মেলনও হয়- সেখানে কখনও দেখাশোনা হয়নি?
- না। ও কোনওদিন ওই সব সম্মেলনে আসেনি।
- তাহলে ও তোমার সব খবর রাখে কীভাবে? তুমি বা ওর সম্বন্ধে জানো কোথা থেকে?
- সেটা আমারও অবাক লাগে। মনে হয় আমাদের কিছু কমন ফ্রেন্ড থেকে খবরটা চালাচালি হয়।
- ভদ্রলোক সত্যি ইন্টারেস্টিং। আমার মনে হয় আমার দশটা জন্মেও আমি তোমার প্রতি এতটা আনুগত্য দেখাতে পারবো না। স্যরি মনীষা। তুমি আমাকে কেন পাত্তা দাও না, আমি বেশ বুঝতে পারি। যার এমন প্রেমিক থাকে, তার কি আর অন্য কারুকে প্রয়োজন পড়ে? স্যরি এগেইন।
মনীষা স্মিত হেসে ম্যাথিউর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন 'পাগল কোথাকার। দাঁড়াও তোমায় আর একটা জিনিস দেখাই।’
খানিকক্ষণ বাদে একটা খাম এনে দিলেন ম্যাথিউর সামনে। ম্যাথিউ বলল, 'এটা কি? লেখা বুঝি না তো!'
মনীষা বললেন, ‘আজই ডাকে পেলাম চিঠিটা। শিলাই এটা নিয়মভঙ্গ করেই লিখেছে- একই বছরের দ্বিতীয় চিঠি! প্রবীরের মৃত্যুসংবাদ জেনে একটি কবিতা পাঠিয়েছে। অনুবাদ করে বলছি, শুনবে?’
- বলো।
- চারপাশে এত শীতল, বড় ভয় করে আমার
বড় ভয় করে এই হিমেল হাওয়া
যা ছুঁচের মতো বিঁধে যাচ্ছে আমার প্রতিটি রোমকূপে
বরফপোকা একটু একটু করে কুরে খাচ্ছে
আমার মাংস আমার অস্তিত্ব
কেউ কি এসে আমায় একটু ওম দেবে?
কেউ কি এসে উষ্ণ আলিঙ্গনে
আস্তে আস্তে জাগিয়ে দেবে আমার শীতল শরীর?
তুমি ভয় পেয়ো না,
তোমার মৃত্যু হলে
আমি কিন্তু আগে থেকে এসে
সাজিয়ে রাখবো বাসর রাত
এই অন্ধগহ্বরে তোমার মনেও হবে না
এই অন্ধকার কতটা গহীন, কতটা শীতল,
যখন তোমার প্রিয়জনেরা তোমায় এই পর্যন্ত রেখে
ফিরে যাবে যে যার বাসায়
সেদিন তীব্র আলিঙ্গনে তোমায় বুঝিয়ে দেব
কত তৃষ্ণা বেঁচে থাকে অনন্ত তৃষ্ণায়
খানিকক্ষণ চুপচাপ হয়ে থাকল চারপাশ। বাইরে এখনও বরফ পড়ছে। ম্যাথিউ বলল, ‘এটা কি প্রবীরের ভার্সান নাকি সলিলকি?’
1 Comments
খুব সুন্দর হয়েছে গল্পটা।
ReplyDelete