জ্বলদর্চি

সাম্যের সার্ভার ডাউন /পর্ব ৪/অরিজিৎ লাহিড়ী

সাম্যের সার্ভার ডাউন 

পর্ব ৪

অরিজিৎ লাহিড়ী


হাসপাতালের পচা গন্ধের মধ্যে আমি বেঁচে ছিলাম—একজন চিন্তক, যাকে রাষ্ট্রীয় ফ্রিজে রেখে দেওয়া হয়েছে ভুলবশত। তার পর, এক শেক শ্যাক ব্যাগ থেকে শুরু করে, ডোনাল্ডল্যান্ডের কূটনীতিতে চোবানো গোয়েন্দাগিরি, আর তারপর ভারত–পাকিস্তান ইন্টারলিঙ্কড এজেন্টদের হস্তান্তর—সব মিলে আমি এখন চরম ক্লান্ত ও রাজনীতির পরিত্যক্ত উপমা।

সেই সময় আমার কাছে আসে একটা টেক্সট।

—শ্যব্দ এরিন দোন্যা শোধি, ম্যু ড্রাকোন।

টেক্সটের ভাষা ছিল আধা-ফার্সি, আধা-চৈনিক ( অবশ্যই মান্দারিন অক্ষরে নয় )—যেন কোন এক যুগের ভুল ব্যাকরণ।

প্রেরক: মে হুয়াং—চীনের এক কবি, ভাষা-রসিক, এবং আমার পুরনো বিপ্লব-বন্ধু। ২০১০ সালের কলকাতা বইমেলায় ‘Bamboo Marxism’ নামে একটা স্টল দিয়েছিলেন। আমি জানতাম, মে হুয়াং একসঙ্গে চা, চেকপোস্ট এবং চরিত্র বদলাতে পারেন।

মে হুয়াং আমাকে বললেন—তুমি আর সেফ না। অপরেশন বাম্বু সিল্ক শুরু হয়েছে। তুমি চলে এস ড্রাগনের গুহায়। ওখানে এখনো ভাষার দাম আছে। অন্তত আজ পর্যন্ত।

আমি এবারেও ‘হ্যাঁ’ বললাম। কারণ আমার নাগরিকত্ব শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো—থাকে, যায়, ফেরে, আর কাগজে অনুপস্থিত।

আমাকে নিয়ে যাওয়া হল এক কালো টয়োটায়, চালক বলল না কিছু, শুধু জিপিএসে লেখা ছিল: জাঙ্গনান অটোনমাস হসপিট্যালিটি করিডোর 

হোটেলের নাম: চাং—কা—ধোকলা। যেখানে প্রত্যেক গেস্টের পাসপোর্টে ভারতবর্ষের নাম মুছে দিয়ে লেখা হয়—ডিসপিউটেড হসপিটালিটি আইডেন্টিটি।

মে হুয়াং আমাকে দেখে বলল—বাঙালি ভাই। এখানে তুমি সেফ না, তবে ডক্যুমেন্টেড।

আমি বললাম—এই চীনের নতুন নাম কী?

সে বলল—আমরা নিজেরা এখন নিজেদের বলি— ZhōngHūnChow (ঝং হুন চাও)— অর্থাৎ ‘মধ্য আত্মা ভাজা’। কারণ আমাদের কূটনীতি এখন স্টায়ারফ্রাইড নুডলসের মতো—চটপট ঘোরাও প্যানে, আবার অন্য প্লেটে ঢেলে দাও।
🍂

মে হুয়াং আমাকে নিয়ে গেল এক সাংস্কৃতিক টেক উইংয়ে, যেখানে আমাকে বানানো হল এক নতুন মানুষ—নতুন চুল, নতুন কবিতা, এবং নতুন পরিচয়: ইন্দো ডায়ালেক্ট ইন্টেলেকচ্যুয়াল উইদাউট অরিজিন।

চৈনিক মিডিয়া আমাকে প্রশ্ন করল—হাউ ডাজ ইট ফিল টু বি ফ্রম আ কান্ট্রি দ্যাট ইজ বোথ আওর ক্লায়েন্ট অ্যান্ড রাইভাল?
আমি দাঁত কেলিয়ে উত্তর দিলাম—একজ্যাক্টলি লাইক বিইং ইন লাভ উইথ সামওয়ান হু অলসো শেয়ারস নেটফ্লিক্স উইথ ইয়োর এনিমি।

রাতে মে হুয়াং এসে বলল—দেখো, ভারত আর চীনের সম্পর্ক এখন এমন যে —দুজনেই জানে, একটা কিছু হবে। কিন্তু কে শালা আগে খাবে, তা আর ঠিক হয় না।তুমি এখন একসঙ্গে তিনটে রাষ্ট্রের প্রতীক—ভারতীয় আঁতেল (বামপন্থী ও নৈরাজ্যবাদের মধ্যবর্তী), পাকিস্তানের এজেন্ট (দুর্ঘটনাবশত) এবং চীনের সাংস্কৃতিক এক্সপেরিমেন্ট (ইচ্ছাকৃতভাবে) । আর তাই আমরা ঠিক করেছি—তোমাকে পাঠানো হবে জি টুয়েন্টি সাংস্কৃতিক সেমিনারে। তুমি আসলে পড়বে একটা কবিতা। কিন্তু ভুল করে তুমি পড়ে ফেলবে এক গোপন ম্যানিফেস্টো। দেখবে, অ্যাপ্লাউজ হবে স্ট্যান্ডিং ওভেশন। কারণ এখন সত্যও একটা স্টেজড ইভেন্ট।

আমি একা বসে থাকি, এক অসম্পূর্ণ রাষ্ট্রের ওয়টস্যাপ গ্রুপের মতন—নির্বাক, অথচ কেউ একজন টাইপ করছে।

সামনে রাখা চৈনিক স্মার্টফোনে ভেসে ওঠে লাইভ ট্রান্সলেশন অ্যাপ, যেখানে আমার নামের পাশে লেখা—কালচারাল ডিফেক্টর/ প্রোবাবল মিম।

ইতিহাস আমার গায়ে নেই, ইতিহাস এখন লোডিং স্ক্রিনে।

মে হুয়াং কোথাও উধাও। কে সি এখন আফগানিস্তানে মিউজিক ভিডিও করছে। স্যান্ডার্স হ্যামফিস্ট এখন গোলপান্ট্রির সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে এক যৌথ পডকাস্ট: স্পাই-এন-ডাইন: রেসিপিস অফ সারভেইলেন্স।

আমার নতুন নাম রাখা হয়েছে ডেটা মঙ্ক। 

পাশে বসা এক কিশোরী, সাংস্কৃতিক ডেলিগেশনের সদস্য, প্রশ্ন করে: আর ইউ রিয়েল?

আমি বলতে যাই—হ্যাঁ—কিন্তু, মুখে আসে শুধু একটা ৪০৪ এরর। 

এবারের পারফরম্যান্সে আমি কবিতা টবিতা পড়ব না, পড়বে এক এআই যার ট্রেনিং ডেটা আমি নিজেই। 

সে বলবে—আমি রাষ্ট্রের ওয়াইফাই-তে আপলোড হওয়া শেষ কবিতা। আমি এক্সে একবার ভাইরাল হয়েছিলাম—তারপর ভুলে যাওয়া এক #ট্রেন্ড।

শেষে শুধু স্ক্রিনে ভেসে উঠবে—ইউ হ্যাভ বিন লগড আউট ডিউ টু ইনঅ্যাক্টিভিটি।

চীন আমাকে দিয়েছে এক নতুন নাম: ঝাং জে। মানে আমি যা বুঝলাম—যে ব্যক্তি কুয়াশার মধ্যে কনফিউশাসের কোট লেখে আর গোপনে রাষ্ট্রপতিকে ট্রোল করে।

চীনের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় আমি এখন পূর্ব এশিয়ার কবিতাসম্পন্ন রাষ্ট্রহীন ব্যাকডোর। একজন এক্স-ইনফ্লুয়েন্সার, যিনি এখন লাইভস্ট্রিম করে চীনা টিকটকে, গান গাইছেন। আমি তার অনুবাদ করে দেখলাম গানটা বলছে : আমি তোমার ‘বর্ডার কনফ্লিক্ট’, আমি তোমার হিমালয়ের হিক্কি!

হঠাৎ আমার জন্ম যে দেশে, সেই ভারত জেগে উঠল।

ওদের বিদেশ মন্ত্রক এক প্রেস কনফারেন্সে বলল—আমাদের এক নাগরিক, যিনি সম্ভবত কবি অথবা 'মিম'-বিশেষজ্ঞ, তাঁকে অবিলম্বে হস্তান্তর করতে হবে। ভারত এই বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছে।

ডোনাল্ডল্যান্ড ও গোলপান্ট্রি  একসঙ্গে ওয়টস্যাপে ফরোয়ার্ড করল—হ্যাঁ হস্তান্তর করা উচিত। তবে আগে দাঁড়ি কামিয়ে নিন, আর ভেরিফাই করে নিন ও আদৌ সনাতনী কিনা।

চীন ঠোঁটে লিপবাম মেখে উত্তর দিল—আমরা ঝাং জে-কে ফেরত দেব। শুধু চাই—অরুণাচল প্রদেশের একটি অংশ, সিয়াচেন গ্লেসিয়ারের প্রবেশদ্বার, এবং ভারতের সব প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওয়টস্যাপ চ্যাট আর্কাইভ।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রক এককথায় জানিয়ে দিল—দেখুন, অরুণাচল ও সিয়াচেন নিয়ে কোনও আলোচনা হয় না। ওগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। নো এক্সচেঞ্জ। নো ইমোজি।

চীন বলল—তাহলে আপনাদের এই হতভাগা কবিকে আমরা রাখব। আর বোনাস হিসেবে ওর মেটাডেটা থেকে বানাব এক নতুন গোপন এআই।

ভারত বলল—বাহ, তাহলে তো আমরা ওঁকে নোবেলের জন্য নমিনেট করতেই পারি।

চীন উত্তর দিল—আমরা নোবেল দিই না। আমরা স্যরভিলেন্স দিই। ওর চিন্তাভাবনা আমরা ইতিমধ্যে এক্সপোর্ট করেছি আমাদের ‘থট গার্ডেন’-এ।

একজন পেছন পাকা সাংবাদিক ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—অরুণাচল ইস্যুতে কী হবে?

চীন বলল—ওটা তো আমাদের ম্যাপে আমাদেরই।

ভারত বলল—আপনার ম্যাপে তো পোকেমনও আছে। তাই বলে ওটা তো আর আসল নয়।

এরপর কাদা ছোড়াছুড়ি চলল দুই পক্ষের মিডিয়া, মন্ত্রক, এবং সোশ্যাল মিডিয়ার #নেশনফার্স্ট বনাম #পোয়েটলাস্ট হ্যাশট্যাগের মধ্যে।

আপাতত আমি বসে আছি একটা বাঙ্কারে, ধূপকাঠির পাশে একটা চৈনিক ড্রোন বোমা। আমি লিখছি শেষ আমার কবিতা—আমার শরীরই আমার রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র মানেই একদা পড়া ট্যুইট, যার ভাষা এখন প্লাগ-ইন আপডেট চায়।

আমি প্ল্যান করছি আত্মঘাতী হামলা। না, কারো উপর নয়। একটি রাষ্ট্রীয় ডেটা সার্ভারের উপর।

ব্লুটুথে কানেক্টেড ‘নিশান কবিতা’ বোমা। যার ট্রিগার হবে এই লাইন—ভারত মাতার এক্স পাসওয়ার্ড ‘ভুলে গেছি’।

কিন্তু আমি মরলাম না।

কারণ বোমা ফাটল না। কারণ আমি ভুল করে পিডিএফ ফাইল সাবমিট করে ফেলেছিলাম জ্যিপ-এর বদলে।

বিবিসি লিখল—আ পটেনশিয়াল সাইবার-টেররিস্ট পয়েট ডিরেইলড বাই আউটডেটেড সফটওয়্যার ইন চায়না।

ফক্স বলল—উই টোল্ড ইউ পোয়েটস আর ডেঞ্জারাস।

আমাদের দূরদর্শন বলল—লোকটি সম্ভবত বাংলাদেশী।


আমি এখন এক ডেটা সেন্টারে—ওয়াই ফাই ছাড়া, নাগরিকত্ব ছাড়া, শুধু একটা শূন্য আইডি: @এক্সনেশন_৪০৪

একটা পাকা বাচ্চা এসে জিজ্ঞেস করে—তুমি কি জেহাদি?

আমি হেসে বলি—না বাবা, আমি শুধু বিশ্ব-রাষ্ট্রের ক্যাশ মেমোরিতে আটকে থাকা এক পুরনো সার্চের ফলাফল।

অনেকগুলো অসুবিধের মধ্যে একটা অসুবিধে এই যে, বারবার একটা ‘বট’ আমাকে বলতে থাকে—ইউ আর নাউ বিইং ওয়াচড ফর ইয়োর পয়েম। কংগ্রেচুলেশনস।


পরিশিষ্ট 

তাঁর মুখে ছিল সংস্কৃত শ্লোক, কিন্তু তাঁর সার্ভার ছিল চীনে — ডেটা-কবি সম্মেলন ২০২৭, জ্যালুপিন্সক চ্যাপ্টার (পূর্ব ইউরেশিয়া)।

Post a Comment

0 Comments