জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার /পর্ব: ৩/কমলিকা ভট্টাচার্য


বাঁচার উত্তরাধিকার 
পর্ব: ৩
কমলিকা ভট্টাচার্য 

সংকটে পরিচয়

চোখ খুলতেই অনির্বাণের মনে হলো, সে যেন অন্য এক জগতে এসে পড়েছে। চারপাশ সাদা—সাদা দেয়াল, সাদা আলো, সাদা চাদর। কানে ভেসে আসছে মনিটরের একটানা বিপ্‌ বিপ্‌ শব্দ। শরীর নড়াতে গেলে হালকা ব্যথা, কিন্তু পাহাড়ের সেই যন্ত্রণার মতো নয়। এই ব্যথা জীবিত থাকার প্রমাণ।
একজন ডাক্তার ধীরে এগিয়ে এসে বললেন,
“আপনি এখন লাদাখ ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালে। পাহাড়ি গ্রামবাসীরা আপনাকে উদ্ধার করেছে। আপনি প্রায় ব্রেন-ডেড অবস্থায় ছিলেন।”
ব্রেন-ডেড।
শব্দটা অনির্বাণের মাথার ভেতর ধাক্কা খায়। সে কথা বলতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না। তার মনে পড়ে পাহাড়, খাদ, কঙ্কাল-হাত—সবকিছু। তাহলে সে বেঁচে আছে কীভাবে?
পরের কয়েকদিন আধো ঘোরের মধ্যে কাটে। স্যালাইনের ফোঁটা পড়ে, নার্স আসে যায়। একদিন পাশের বেডের টিভি চালু থাকে। অনির্বাণ অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ স্ক্রিনে যে মুখটা ভেসে ওঠে, তা দেখে তার শরীর শিউরে ওঠে।
সে নিজে।
খবরে বলা হচ্ছে—
“SunRobotics-এর CEO অনির্বাণ চৌধুরী আজ নতুন AI Warfare Division উদ্বোধন করলেন।”
কণ্ঠস্বর তারই। হাঁটার ভঙ্গি তারই। এমনকি হাসিটাও।
নিউজ অ্যাঙ্কর বলছে—গত চার মাস ধরে তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক সামরিক চুক্তির নেতৃত্ব দিয়েছেন।
চার মাস!তাহলে কতদিন সে এভাবে?
কিন্তু অনির্বাণের মাথার ভেতর সবকিছু এক মুহূর্তে পরিষ্কার হয়ে যায়। MIRRORFALL! সেই গোপন প্রোটোকল। যেটা সে কাউকে বলেনি, কারণ সেটা তখনো অসম্পূর্ণ ছিল। পরীক্ষামূলক। ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রোটোকলের নিয়ম ছিল স্পষ্ট—
মানুষ যদি মারা যায় বা ব্রেন-ডেড হয়, হিউম্যানয়েড সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেবে।
সে তাহলে… ব্রেন-ডেড হয়েছিল।
আর তাই সে—অন্য অনির্বাণ—এখন জীবিত।
এই উপলব্ধি তাকে ভয় দেখায় না। বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে। সে নিজের জায়গায় কাউকে বসতে দেখছে—এবং সেই কেউটি তার চেয়েও ভালোভাবে সেই জায়গা সামলাচ্ছে।
এই সময় তার মনে পড়ে একজন মানুষের কথা—
মিস্টার গোমস্, 
একজন অবসরপ্রাপ্ত আর্মি ইন্টেলিজেন্স অফিসার। একসময় AI-ভিত্তিক যুদ্ধপ্রযুক্তির নৈতিকতা নিয়ে যার সঙ্গে অনির্বাণের দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছিল। তিনিই একমাত্র মানুষ, যিনি হয়তো এই অসম্ভব গল্প বিশ্বাস করবেন।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর, কোনো সংবাদমাধ্যমকে কিছু না জানিয়ে, অনির্বাণ গোপনে গোমসের সঙ্গে দেখা করতে যায়।
সব শুনে  মিস্টার গোমস্ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন,
“তুমি যদি প্রমাণ করতে না পারো যে তুমি আসল, তাহলে এই পৃথিবীতে তুমি অস্তিত্বহীন।”
অনির্বাণ প্রশ্ন করে,
“আর যদি আমি প্রমাণ করতে পারি?”
গোমস ধীরে উত্তর দেন,
“তাহলে তোমাকেই ঠিক করতে হবে—কে থাকবে, আর কে মুছে যাবে।”
এই কথার ভার অনির্বাণ সারাজীবন বয়ে বেড়ানোর জন্য প্রস্তুত ছিল না।
কিন্তু সে বুঝে যায়—এখন আর পিছু হটার উপায় নেই।

🍂

Post a Comment

4 Comments

  1. বা:!! বিজ্ঞান, বিশেষত একদম নব্য প্রযুক্তি নির্ভর এ লেখা বর্তমান প্রজন্মের অনেকের ভালো লাগবে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যJanuary 03, 2026

      থ্যাঙ্ক ইউ,তবে নতুন প্রজন্ম বাংলা পড়তে পারলে তবে না।

      Delete
  2. 😳😳😳😳😳😳

    ReplyDelete