দর্শনের আলোকে
দ্বিতীয় পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
(দার্শনিক আলোচনায় জ্ঞান)
সব আলোচনার মূলে রয়েছে জ্ঞান। জ্ঞান ছাড়া সব আলোচনাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দার্শনিকগণ জ্ঞানের আলোচনায় নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানের উৎস, বৈধতার সূত্র, তার প্রকারভেদ ও প্রায়োগিক ক্ষেত্র সম্পর্কে দার্শনিক জ্ঞান প্রদান করেছেন।
ভারতীয় দর্শনের জ্ঞান- চর্চা অনেকাংশে বেদের উপর নির্ভরশীল। বেদকে অপৌরুষেয় বলে স্বীকার করা হয়। ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা,করণাপাটবাদি দোষরোহিত শাশ্বত সত্তা বেদের স্রষ্টা। যুগ যুগ ধরে সত্য দ্রষ্টা তপস্যাকৃত শ্বাশ্বত জ্ঞানের ভাণ্ডার হল বেদ। কিছু দর্শন অবশ্য বেদ নির্ভর নয় তাদের আলোচনা স্বতন্ত্র দার্শনিক চেতনায় বিবৃত (চার্বাক, বৌদ্ধ, জৈন)। এইসব দর্শনে অতীন্দ্রিয় জগত অপেক্ষা দৃশ্যমান জগতের মানুষের জীবন সমস্যা ও তার সমাধানের পথ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
🍂
চার্বাক দর্শন পুরোপুরি জড়বাদী দর্শন, যেখানে বিচার বিমুক্ত ব্যক্তিগত সুখলাভ মূল বিবেচ্য বিষয়। মনুষ্য চেতনা তো পুরোপুরি ভাবে কখনোই জড়নির্ভর হতে পারে না- বিবেকের প্রত্যাদেশ মনুষ্য অন্তরে সদা জাগরিত হয়তো হয় না, তবে সর্বদা সর্বৈব তা সুপ্তও থাকে না। তাই চার্বাক মত আপাতঃ সুখী বচন হলেও বিবেকসম্পন্ন মনুষ্য বিচারের মানদন্ডে উচ্চ আসন লাভ করতে পারেনি।
বেদ নির্ভর ব্রাহ্মণ্য সমাজ যখন বৈদিক ব্যাখ্যাকে তার উৎস মূল থেকে বিচ্যুত করে নিজ স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োগ করল, তখন মানব সমাজে মানবতাই অবহেলিত হতে শুরু করল। ব্রাহ্মণ্য সৃষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যা যখন মানুষের জন্য না হয়ে ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষায় অপব্যাখ্যাত হতে শুরু হল, তখনই ওই নিমজ্জিত প্রায় মানব ধর্মকাতরতাকে যুক্তি ও মুক্তির নতুন আলোক দেখাতে জন্ম নিলো দুই দর্শন- বৌদ্ধ দর্শন ও জৈন দর্শন।
পাশ্চাত্য দর্শনে জ্ঞানের উৎসরূপে অপৌরুষেয় কোন গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। তবে কোথাও বুদ্ধি, কোথাও অভিজ্ঞতা, কোথাও বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা উভয়ের গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী জ্ঞানের উৎস ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে।
এইবার আসা যাক্ মূল উপজীব্য কথায়। বিভিন্ন আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে জ্ঞানলাভের জন্য মানব সত্তা সর্বদা উন্মুখ। এটি তার সহজাত প্রবৃত্তিও বটে। পাশবিক জীবন ও মানবিক জীবনের একখানা বড় প্রভেদ হল এই জ্ঞান-তৃষ্ণায়। পশুরা তাদের জৈবিক প্রয়োজন পূরণেই পরিতৃপ্ত। কিন্তু মানুষ এমন জীব যে শুধু জৈবিক প্রবৃত্তি সাধনেই শান্তি লাভ করে না, তারপরেও তার অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা কোন উচ্চতর উদ্দেশ্য সাধনে উৎসুক থাকে। মানব সত্তা জানতে চায় এই জগত সম্পর্কে, তার অস্তিত্ব সম্পর্কে তথা নিজ সম্পর্কে। পরিবর্তনশীল জগতের অন্তরালে কোন অপরিবর্তনীয় শাশ্বত সত্তা আছে কিনা সে সম্পর্কে মানব সত্তা জানতে আগ্রহী হয়।
জ্ঞানের পরিসর বৃহৎ। মানুষ অভিজ্ঞতায় যে জ্ঞান পায় বৌদ্ধিক বিচারের কষ্টিপাথরে তা পরখ করে নিতে চায়। তবে যদিও বিচার প্রক্রিয়া যতটা শুনতে সহজ মানবমন তার থেকে অনেক বেশি জটিলতার পাহাড় লঙ্ঘন করে তারপর তার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এই বিচার প্রক্রিয়ায় জন্মসূত্র হতে প্রাপ্ত পরিবার ও সমাজের শিক্ষা সংস্কার অনেকটাই প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু আসল সমস্যার সূত্রপাত হয় যখন সে তার চেনা জগৎ থেকে বৃহত্তর তথা অন্য অপরিচিত শিক্ষা সংস্কার সমৃদ্ধ জগতে পদার্পণ করে।
একটু ব্যাখ্যা করে বিস্তৃতভাবে এইভাবে বলা যায় - মানুষ যে পরিবারে সদ্যোজাত হিসেবে নথিভুক্ত হয় সেখান থেকে তার তিলে তিলে শিক্ষা লাভ শুরু হয়। সর্বপ্রথম তার শিক্ষা শুরু হয় জৈবিক প্রয়োজন সাধনে। যেমন- খিদে পেলে খাওয়া, ঘুম পেলে ঘুমোনো কষ্ট পেলে কান্না বা আনন্দ পেলে হাসি ইত্যাদি ইত্যাদি। ধীরে ধীরে যখন সে বড় হয় তার তখন পরিবারের বিভিন্ন জনের কাছ থেকে জীবনের বৃহত্তর ক্ষেত্রে পদার্পণের জন্য শিক্ষালাভ শুরু হয়। জীবনের প্রাত্যহিক বিভিন্ন কর্মের মধ্য দিয়ে তার শিক্ষা চলে। তারপর সেই শিক্ষা ধীরে ধীরে যত সময় এগিয়ে চলে ততই মননের দিকে অগ্রসর হয়। সে বিচার বিবেচনা করে সংসারের ক্ষেত্রে ছোটখাটো ব্যাপারে বা নিজে ব্যাপারে মতামত প্রকাশ শুরু করে। সামাজিক ক্ষেত্র তো পরিবারের থেকে বৃহত্তর ক্ষেত্র। সেই ক্ষেত্রে সে সহজে হুটহাট মত প্রকাশ করার স্পর্ধা পায় না। সেই সাবলীলতা অর্জন করতে তার সময় লাগে। পরে জীবনের অগ্রগতির তালে তাল রেখে যখন সে সমাজের মানুষজনের সাথে মেশে তখন তার জ্ঞানের পরিচয় সমৃদ্ধ হয় ও সমতালে চলে তার পুস্তকলব্ধ জ্ঞান আহরণও। এভাবে ধীরে ধীরে মানব সত্ত্বা তার জ্ঞানের অগ্রগতি এগিয়ে নিয়ে চলে।
ক্রমে সে বুঝতে পারে পৃথিবীতে দৃষ্টিগ্রাহ্য জাগতিক বিষয়ে মোটামুটি একতা লক্ষ্য করা গেলেও, নৈতিক ক্ষেত্রে বা আধিবিদ্যকক্ষেত্রে সমমত পাওয়া যায় না।
মানবচিত্ত বড়ই চঞ্চল। জ্ঞান চলমান প্রক্রিয়া। জ্ঞান থেমে নেই। দিনক্রমে জ্ঞানের ভান্ডার নব নব রূপে সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে।
ব্যক্তি মন যান্ত্রিক হয়ে পরানুকরণ করে সন্তুষ্ট হয় না। সে চায় অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিভূমে নবরূপে তার চেতনা স্থান লাভ করুক।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতপার্থক্য থাকলেও দার্শনিক মন পর্যবেক্ষণ করে স্বীয় বুদ্ধির স্পষ্ট আলোকে সঠিক বলে বিবেচিত হলে তা গ্রহণ করে। অথবা যদি বিবেকের স্পষ্ট সম্মতি পায় বা তার চেতনায় যদি তার পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত রূপ উচিত বলে মনে হয়, তখন দার্শনিক মন তা পর্যালোচনা করে সেই বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এটাই হল দার্শনিক মনন- যা মুক্ত ও বিচারযুক্ত চিন্তার পটভূমি রচনা করতে সহায়তা করে।।
0 Comments