দূর দেশের লোকগল্প— ২৭১
(ইতালি, ইউরোপ)
শুঁয়োপোকার সাপ্তাহিক খাদ্যতালিকা
চিন্ময় দাশ
[ শুঁয়োপোকা তো আমরা সবাই দেখেছি। আমরা এ-ও দেখেছি, দিনকয়েক বাদে উধাও হয়ে যায় পোকাগুলো। ছোট্ট গোল-গোল ডিমের মতো বাসা বানিয়ে তার ভিতর সেঁধিয়ে যায়।
তারপর? তার পর হপ্তা দুই বাদে, সুন্দর ঝলমলে প্রজাপতিটি হয়ে, বাইরে বেরিয়ে আসে। রঙ-বেরঙে আঁকা সুন্দর চারখানা ডানা মেলে দেয় বাতাসে!
কিন্তু হাতে গোণা সামান্য ক’টা দিনের জীবনে, কী কী খায় পোকাগুলো-- সে খবর কি রাখি আমরা কেউ?
সেই খাদ্যতালিকার খতিয়ান রইল এখানে। ]
এক রবিবারের সকাল। গাছের পাতায় ছোট্ট একটা ডিম দেখা গেল। একেবারে সর্ষেদানার মতন ছোট্টটি। চোখে পড়ে কি পড়ে না, এমন ছোট্ট।সূয্যিমামার উদয় হোল। রোদের তাত লেগে, এক্কেবারে এইটুকুন একটা পোকা বেরিয়ে এল ভেতর থেকে। লম্বাটে গড়ন। খুদেখুদে অনেকগুলো পা।
বেরিয়েই এদিক ওদিক কিছু খুঁজে বেড়াতে লাগল পোকাটা। খুঁজবে না কেন? রাজ্যের খিদে যে তার পেটে।
গাছে গাছে নানান জাতের ফল। চোখে পড়ে গেল পোকাটার। আর দেরি নয়। শুরু হোল তার খাওয়া। খাচ্ছে তো খাচ্ছেই। থামবার নামটিও নাই।
সূয্যিমামা বাড়ি চললেন একসময়। আলো মুছে গেল আকাশ থেকে। অগত্যা খাওয়া থামাতে হোল তাকে।
রাত কাটতে, এল সোমবার। সেদিন ভারি আনন্দ পোকাটার। আলো ফুটতেই একটা আপেল চোখে পড়ে গেছে তার। সারাদিন ধরে আপেল খেল কুট-কুট করে।
পরদিন মঙ্গলবার। সেদিন পর পর দুটো নাসপাতি খেল। কিন্তু দুটো নাসপাতি খেতেই, পুরো দিনটা কেটে গেল। এদিকে পেট তার তখনও ভরেনি। কিন্তু করবার কী আছে? আলো নিভে গেল যে!
বড় কিছু খেতে সময় চলে যায়। দুটোর বেশি খাওয়া যায় না।
বুধবারে তিনটে পামফল খেল।
স্ট্রবেরি পেয়ে গেল বিষ্যুদবারে। গুণে গুণে চারটে ফল খেল সেদিন। কিন্তু এমন জ্বালা, পেট ভরবার আগেই দিন শেষ!
পাঁচ-পাঁচটা কমলালেবু খেল শুক্রবার। কিন্তু তাতেও পেট ভরল না পোকাটার। সারারাত ধরে চিন্তাভাবনা করল। মনে হোল, এইসব ফল খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে। পেট ভরেনা এতে।
শনিবার। খাদ্যতালিকায় বিরাট রদবদল এলো সেদিন। আর বনে-বাদাড়ে নয়। সেদিন একটা গির্জাঘরে গিয়ে ঢুকে পড়েছে। দেদার খাবার-দাবার হেঁসেলে।
খাওয়া শুরু হোল একটা চকোলেট দিয়ে। তার পর? তার পর কেক, একটা আইসিক্রীম, এক টুকরো চীজ, একটা পিজ্জা, মশলা দেওয়া সসেজ এক টুকরো—খেয়ে যাচ্ছে তো খেয়েই যাচ্ছে। থামবার নামটিও নাই। ভারি মজা। আরও খাবার সামনে। এবার একটু আচার খেয়ে নিল। তাতে হোল কী, খাওয়ার ইচ্ছেটা বেড়ে গেল আরও।
এবার শুরু হোল ললিপপ দিয়ে। সেটা সেরে, চেরি পী। তারপর নিল সসেজ। তারপর একটা কাপকেক।
কেক খাওয়া সেরে, একফালি তরমুজ ধরেছে, অমনি বলা নেই কওয়া নেই, ঝুপ করে আলো নিভে গেল। কী আর করা যায়। খাওয়া থামাতে হল বাধ্য হয়ে।
সেদিন ছিল শনিবার। রাতেই শুরু হল ঝামেলা। অতো খাবার কি কারও পেটে সয় কখনও? সারা রাত পেটের বেদনায় এপাশ ওপাশ ছটপট করতে লাগল বেচারা।
নিজে সমঝে গেছে, একেবারে বেয়াক্কেলে কাজ হয়ে গেছে। সময় মতো থেমে যাওয়া দরকার ছিল।
পরদিন। সকাল হয়েছে। আলোয় ঝলমল করছে চরাচর। পোকাটা ঠিক করে নিয়েছে, উল্টো-পালটা খাবার আর একদম নয়। সেদিন আবার রবিবার। খুদে খুদে দুটো শুঁড় উঁচিয়ে, এদিক ওদিক কিছু খুঁজতে লাগল পোকাটা।
পেয়েও গেল এক সময়। পায়ে পায়ে এগিয়ে, একটা পেয়ারাগাছে গিয়ে হাজির।
আহা, কী নরম পাতা সব। যেমন সবুজ, তেমনি নধর। অন্য কিছুই মুখে তোলা যাবে নয়া। আজ থেকে শুধু পাতাই। বড্ড ভোগান্তি গেছে কাল রাতে। মন স্থির করে নিল, পাতা ছাড়া, কিছুই পেটে দেওয়া যাবে না।
পাতা খেয়ে, বেশ আরাম বোধ হচ্ছে তার। মনেও বেশ শান্তি। পেটের ঝামেলাটাও নাই আর। পেটের দিকে তাকাতে গিয়ে অবাক হয়ে গেছে জীবটা। তার সেই ছোট্ট এইটুকুন চেহারাটা গেল কোথায়? খেয়েখেয়ে এখন বেশ বড়সড় চেহারা হয়ে গেছে। বেশ নাদুস-নুদুসটি। নিজের চেহারা দেখেই, চনমনে ভাবটা উধাও হয়ে গেল মাথা থেকে। বেশ একটা আয়েশি ভাব এখন। পোকাটা ভাবল, অনেক ছোটাদৌড়া হয়ে গেছে। একটু বিশ্রাম দর কার। জিরিয়েনিতেহবেএকটু।
কাজ শুরু করে দিল সাথে সাথে। মুখের লালা বের করে, নিজের শরীরের চারদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একটা গুটি বানিয়ে ফেলেছে। নিশিন্তে গা এলিয়ে শুয়ে রইল গুটিটার ভেতর।
তারপর? তার পর দিনের পর দিন যায়। এক হপ্তা গেল।
গেল আরও একটা হপ্তা। অনেক হয়েছে। এবার বাইরে বেরোন দরকার। গুটিতে ছোট্ট একটা ফুটো করে, বাইরে বেরিয়ে এল সে।
বেরোল বটে, কিন্তু এখন আর আগের সেই পোকার নাদুস নুদুস বড়সড় চেহারা নাই। ছোট্ট একটু শরীর। তাতে কোনও রকমে টিকে আছে তিন জোড়া মাত্র পা। আর আছে, দু’জোড়া রঙীন ডানা।
এই ডানার জন্য, সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর পতঙ্গ হয়ে উঠল সে। দুনিয়ার সবাই মুগ্ধ তার ডানার রঙের বাহারে!
এখন সেই নধর লম্বা শুঁয়োপোকা আর নাই সে। সে এখন হয়ে উঠেছে প্রজাপতি।
0 Comments