জ্বলদর্চি

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি /২৯ পর্ব/চিত্রা ভট্টাচার্য্য


ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি    
২৯ পর্ব

চিত্রা ভট্টাচার্য্য

সুরের সাধক নজরুল      

গানেরসুরে আত্মমগ্ন  সুররসিক নজরুলের  ঐকান্তিক বিশ্বাস ছিল , ' গান তার আত্মার উপলব্ধি’।  সে কথা বারবার তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন। গান রচনার ক্ষেত্রেই নজরুলের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। বাংলা  গানের ভুবনকে তার বাণী সৌকর্যে আর সুরবৈচিত্র্যে করেছিলেন বিশাল সমৃদ্ধময়। নজরুল তাঁর সৃষ্টি সাহিত্য ও সংগীতের মধ্যে তুলনা করে  নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ' গানেই তিনি শ্রেষ্ঠ। ' তাঁর এই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ স্বরূপ বাংলা সঙ্গীতের সুরের আকাশ ধ্বনিত হয়েছে তিন হাজারের বেশি অপরূপ গানের সুরের মূর্ছনায়। তাঁর জীবনের অঞ্জলি সঙ্গীতে সুরের লহরী তে অসীমে বিরাজিত। তাই তিনি আবহমান কাল ধরে সঙ্গীতে -সুরের আকাশে নজরুল গীতির অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র রূপে আলোকিত। 

কবি নজরুল আত্ম সমীক্ষা ছলে একদা বলেছিলেন,
'‘বেণুকা’ ও ‘দোলানচাঁপা’ দুটি রাগিণীই আমার সৃষ্টি। আধুনিক(মর্ডাণ)গানের সুরের মধ্যে আমি যে অভাবটি সবচেয়ে বেশী অনুভব করি তা’হচ্ছে ‘সিমিট্টি’ বা ইউনিফর্মিটির অভাব।কোন রাগ বা রাগিণীর সঙ্গে অন্য রাগ বা রাগিণীর মিশ্রণ ঘটাতে হলে সংগীতশাস্ত্রে যে সূক্ষ্ম জ্ঞান বা রসবোধের প্রয়োজন তার অভাব আজকালকার অধিকাংশ গানের সুরের মধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং ঠিক এই কারণেই আমার নতুন রাগ-রাগিণী উদ্ধারের প্রচেষ্টা। রাগ-রাগিণী যদি তার “গ্রহ” ও “ন্যাস” এবং বাদী, বিবাদী ও সংবাদী, মেনে নিয়ে সেই রাস্তায় চলে তাহলে তাতে কখনও সুরের সামঞ্জস্যের অভাব বোধ হবে না”।- ('কাজী নজরুল ইসলাম '')

নতুন রাগ সৃষ্টি বা লুপ্তপ্রায় রাগ-রাগিণীর পুনরুদ্ধার ছাড়াও বাংলা সঙ্গীতে নজরুল যেভাবে গজল, দাদরা,টপ্পা, খেয়াল, ভাঙ্গা-খেয়াল, ঠুমরী প্রভৃতি গানের ব্যাপক প্রচলণ ঘটিয়েছেন তা এক বিস্ময়কর সৃষ্টি ।

  অধিকাংশ গান লেখা সাময়িক আবেগের তাড়নায় তাই হয়ত অনেক সময়ে সুসামন্জস্য পূর্ণ শব্দের চয়নের প্রতি তাঁর খেয়াল রাখতেন না। তিনি সুর সংযোজন করতেন সমগ্র গানের বিষয় বস্তু অনুযায়ী। তাই গানের মধ্যে কোনো একটি শব্দ বেমানান থাকলেও সুর সংযোজনে বাঁধা পড়ত না। এ বিষয়ে নজরুল নিজেই বলেছিলেন “আপনারা আমার কবিতা সম্পর্কে যা ইচ্ছা হয় বলুন কিন্তু গান সম্পর্কে নয়। গান আমার আত্মার উপলব্ধি। ”গানের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মানানসই সুরের ব্যবহারে তার গীতিকবিতাগুলি একটি অন্য মাত্রা পেত।    ( অ-খণ্ড নজরুলগীতি- /  নজরুল সঙ্গীত:পটভূমি ও পরিচয়)।
🍂

 
 সংগীত রচনার ক্ষেত্রে ঝর্ণা ধারার মত অবারিত কথার প্রবাহ বয়ে যেত তাঁর লেখনীতে।নজরুল আর গান একে অপরের পরিপূরক। অলৌকিক প্রতিভার অধিকারী কবি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে নানান ধারার গানের পর গান রচনা করে সংগীতে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মাত্রা সংযোজন করতে পেরেছিলেন। বিচিত্র ধারার গান রচনা তার অপরিসীম মেধা ও প্রতিভার পরিব্যাপ্তির কথাই প্রমাণ করে। 

কখনো তিনি পথ চলতে শোনা অচেনা সুরকে আত্মস্থ করে সেই সুরের ওপর বাণী সংযোজন করেছেন, আবার কখনও বাণী রচনা করে তাকে সুরে বন্দি করেছেন। সুরের সাথে বাণীর মিলন ঘটিয়ে গানের মালা গাঁথায় নজরুল এক এবং অদ্বিতীয়। গান রচনার ক্ষেত্রেই নজরুলের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। তার গান বাণী সৌকর্যে আর সুরবৈচিত্র্যে বাংলা গানের ভুবনকে করেছিলেন সমৃদ্ধ। সাহিত্য ও সংগীতের মধ্যে তুলনা করে নজরুল নিজেই স্বীকার করেছেন যে, গানেই তিনি শ্রেষ্ঠ। 
 
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ছাড়া যে কোনো প্রাদেশিক সঙ্গীতেই সাহিত্য বা গীতিকবিতার একটি বিশেষ ভূমিকা থাকে।প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক ভাষা এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে তার বিশেষ যোগসূত্র আছে এবং যা আঞ্চলিক সঙ্গীতের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভারতের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় বাংলায় সংগীতের ধারায় নবনব রূপে সঙ্গীতের সৃষ্টি ও প্রকাশ সর্বাপেক্ষা বেশি। এত পরিমান গান এবং সুরের খেলা বুঝি আর এ দেশের কোনো প্রান্তে এভাবে দেখা যায়না। কাব্য সঙ্গীত থেকে লোকগীতি সর্বত্রই নিত্য নতুন কবি এবং সুরকারের অবির্ভাব  নিরন্তর ঘটলে ও গীতিকার সুরকার শিল্পী কবি নজরুলের গান তাদের মধ্যে আজো অন্যতম স্থান অধিকার করে আছে।

 উচ্চাঙ্গ সংগীতের সঙ্গে আধুনিকতার রস মিশ্রণ করে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করে সংগীতকে নতুন রূপে-রসে-গন্ধে-মাধুর্যে ভরে তুলে আধুনিকতার পথে পরিচালিত করেছিলেন । 

নজরুলকে বলা হয় আধুনিক সংগীতের অন্যতম পথপ্রদর্শক। সুরের সাধক তথা 'সুরের রাজা নজরুল কে একদিকে কবি অপরদিকে সুরকার –দুইয়ের সমন্বয়ে আমরা পরিপূরক নজরুলকে পাই। ' কারণ আধুনিক গানের বাণী ও সুরের কারুকার্য তার সংগীতকে বাঙ্ময় করে তুলেছে। ঐশ্বরিক কোন সূত্র ধরেই তার সৃষ্টিশীল আবেগের উৎসমুল থেকে স্বকীয় সুরের ধারায় গান আপনার হয়ে জগতে সমানহারে বিস্তার লাভ করে আছে। কবি গানের জগতে নিমজ্জিত ছিলেন একনিষ্ঠের সাধনার সঙ্গমে, তার প্রাণের আকুলতা ছিল বাঙলা গানকে উচ্চতরের আসনে নিয়োগের জন্যে, তিনি বৈচিত্র্য ও  সুরের মধ্যে গানের বাণীকে নিয়ে তাকে অপরূপ মহিমায় প্রকাশ করেছেন।

গান ও সুরকে বৈচিত্র্যময় করে তোলাই ছিল নজরুলের বিশেষত্ব ও প্রধান উদ্দেশ্য । তার শ্রেষ্ঠত্ব বিভিন্ন রাগ-রাগিণীকে ভেঙে, তাতে অন্য সুরের সংমিশ্রণ করে নতুন সুর সৃষ্টিতে এবং তার রচিত গানে সেই সকল সুর অনায়াসে প্রয়োগ করে। তাছাড়া, বিভিন্ন বিদেশী রাগের সুরেও কবি গান লিখেছেন। বাংলা সঙ্গীতের আসর ধীরেধীরে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো শ্রুতিমধুর দরবারি কানাড়া, মালকোষ, হিন্দোল প্রভৃতি রাগে যেন সুরের খেয়ায় তরী ভাসিয়ে বীনাপানির বরপুত্র  একমনে রচনা করে চলেছেন অসংখ্য গান। স্বীয় সুরারোপিত গানের স্বরলিপি রচনা করে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করতেন আগামী প্রজন্মের আগ্রহী শিক্ষার্থীর জন্য। এমনকি, নিজের রচিত কবিতায়ও পছন্দমত  সুরের সংযোজনা করে সাবলীল ভাবেই গানের জগৎ কে সুদূরেপ্রসারিত ও বিস্তৃত করেছেন।

তিনি শুধু প্রচলিত রাগ ব্যবহার করেননি, বরং নিজে প্রায় ১৮-১৯টি নতুন রাগ তৈরি করেছেন এবং অনেক হারিয়ে যাওয়া রাগ রাগিনীর পুনরুদ্ধার করে তাতে নতুন জীবন  প্রদান করেছেন , যা তাঁর গানের বিশাল বৈচিত্র্য ও গভীরতা সৃষ্টি করেছে। যেখানে তিনি রাগ মিশ্রণ (মেলবন্ধন) ঘটিয়ে নতুন ধারার গান তৈরি করেছেন এবং বাংলা সংগীতে রাগ-রাগিণীকে সমৃদ্ধ করেছেন। 

   তিনি রচনা করলেন যেমন—বেণুকা’ ‘দোলানচাঁপা’'র মত 'মানস', 'ধারাবারি', 'অঞ্জলি', 'রূপমঞ্জরী', 'রূপালি', 'শাওন', 'শাওয়ালি', 'সন্ধ্যা', 'ফাল্গুন', 'শহিদ', 'সোহাগী', 'বারোয়ান', 'চন্দ্রী', 'দোদুল', 'সুরঞ্জনা',  'শ্যামল'শ্যামলী' ইত্যাদি। হারিয়ে যাওয়া রাগ পুনরুদ্ধার:করে বহু অপ্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় রাগ-রাগিণীকে তাঁর গানের মাধ্যমে ফিরিয়ে এনেছিলেন , যেমন—'পটমঞ্জরী', 'ধবল', 'কঙ্কন', 'বারোয়া', 'ভৈরবী' ইত্যাদি, যা বাংলা সংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।   

বাংলার সঙ্গীতের  প্রচলিত রাগের সঙ্গে অন্য রাগের মিশ্রণে নিজস্ব ঢঙে একের পর এক গানের জন্ম স্মরণীয়, অনির্বচনীয় হয়ে রইলো কবির 'সৃষ্টি সুখের উল্লাসে'।  এই রাগ মিশ্রণ বা মেলবন্ধনে তাঁর সংগীতে এনেছে গভীরতা ও অপরূপ মাধুর্যতা। নজরুল  খেয়াল, টপ্পা , দাদরা, কীর্তন, গজল, ভজন, পল্লীগীতি, লোকগীতি, দেশের গান, ও শ্যামাসংগীত—এমন কোনো ধারা নেই যেখানে তিনি রাগ-রাগিণীর ব্যবহার করেননি। 

'তাঁর সৃষ্ট শাওন রাগে যেমন  দেখা যায়
  'শাওন' রাগের ওপর ভিত্তি করে লেখা 'আজ নিশীথে অভিসার তোমার পথে'; গানটি।   
নজরুলের এই অসামান্য সৃষ্টিশীলতা রাগ ও রাগিনীর মেলবন্ধন ঘটিয়ে সংগীতের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করাই বাংলা সংগীতে অমরত্ব দান করেছে। তিনি রাগ ও রাগের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সংগীতের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।

তাঁর রাগ অরুণ ভৈরব  ১৯৩৯ সালে রচিত উদাসী ভৈরব নাটিকায় ব্যবহৃত হয়েছিল।এই নাটিকায় দেখা যায়  শিবের ধ্যানভঙ্গের প্রেক্ষাপটে ‘জাগো অরুণ ভৈরব জাগো হে, শিবধ্যানী’ গানটি পরিবেশিত হয়। এই গানটি শিবের ধ্যানভঙ্গের প্রাথমিক পর্যায়ে সতী দ্বারা গীত, যেখানে শিবকে ‘অরুণ-ভৈরব’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। 

এই রাগ টি কাজী নজরুলের  সৃষ্টি একটি স্বতন্ত্র রাগ, যা তাঁর সঙ্গীতচর্চার এক অনন্য উদাহরণ। এবং সঙ্গীত প্রেমীদের আজো অনুপ্রাণিত করে।  যেখানে পার্বতীর শিবের ধ্যানভঙ্গের প্রেক্ষাপটে গানেগানে পরিবেশিত হয়।‘   এই গানটি শিবের ধ্যানভঙ্গের প্রাথমিক পর্যায়ে সতী দ্বারা গীত, যেখানে শিবকে ‘অরুণ-ভৈরব’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।  শিবের তেজস্বিতা ও সূর্যের মতো দীপ্তিকে নির্দেশ করে এই নামকরণে।  এই রাগের সুরের গতি বজ্রগতির মতো, যা ধ্রুপদের গম্ভীরতা ও প্রশান্তির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। রাগটির স্নিগ্ধতা ও গভীরতা শ্রোতাকে ধ্যানমগ্নতার অভিজ্ঞতা প্রদান করে। নজরুল তাঁর সঙ্গীতচর্চায় নতুন রাগ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা সঙ্গীতে নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। তিনি ‘অরুণ-ভৈরব’, ‘আশা-ভৈরবী’, ‘রুদ্র-ভৈরব’, ‘যোগিনী’, ‘শিবানী-ভৈরবী’ ও ‘উদাসী-ভৈরব’ সহ ছয়টি নতুন রাগ সৃষ্টি করেছিলেন।

“এস শঙ্কর ক্রোধাগ্নি, হে প্রলয়ঙ্কর রুদ্রভৈরব সৃষ্টি সংহর।”
অনেক ধ্রুপদ, খেয়াল এবং উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এই রাগের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
 “নাট্যশাস্ত্র” এবং “সংগীত রত্নাকর” এর মতো প্রাচীন গ্রন্থে রাগ রুদ্র ভৈরবের উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে।
বলা হয়, এই রাগটি আদিতে শুধুমাত্র যজ্ঞ এবং শক্তির উপাসনায় ব্যবহৃত হত। 
কিন্তু কথিত আছে. প্রাচীনকালে বহিশত্রুর আক্রমণ  থেকে দেশ কে  সুরক্ষিত  রাখবার উদ্দেশ্য যখন যুদ্ধের আয়োজন শুরু হত তখন সৈন্যদের মধ্যে সাহস ও শক্তি সঞ্চার করার জন্য এই গান গাওয়া হত।রাগ রুদ্র ভৈরব তার শক্তি, গভীরতা এবং ভয়ংকর আবহের কারণে আজও সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এটি শুধুমাত্র একটি রাগ নয়, বরং শক্তির উৎস এবং আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক।আধুনিক সঙ্গীত পরিচালকরা অনেক সময় এই রাগের স্বর ব্যবহার করে শক্তিশালী আবহ সঙ্গীত তৈরি করেন দেখা যায়। 

রাগ-আশা ভৈরবী :
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি বিখ্যাত প্রভাতকালীন রাগ  '- আশা ভৈরবী। 'এটি ভৈরব ঠাটের অন্তর্ভুক্ত এবং এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর কোমল স্বর, যা সঙ্গীতে এক গভীর, মিষ্টি এবং ভাবময় আবহ তৈরি করে। এই রাগ সাধারণত ভক্তিমূলক, ধ্যানমূলক এবং আত্মমগ্ন সঙ্গীতের জন্য উপযুক্ত।
রাগ-আশা ভৈরবী মূলত ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি এবং ভজনের মতো বিভিন্ন ধরণের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয়। এটি সেতার, সরোদ, বাঁশি, এবং সরস্বতী বীণার মতো তারবাহিত বাদ্যযন্ত্রেও সমানভাবে জনপ্রিয়। পন্ডিত রবিশঙ্করের সেতারে পরিবেশিত ‘রাগ আশা ভৈরব’। উস্তাদ বিলায়েত খাঁ এবং অনুষ্কা শঙ্করের পরিবেশনায় এই রাগ বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ হয়ে মানব মনে চিরন্তন প্রভাব ফেলেছে। 

 পন্ডিত রবিশঙ্করের সেতারে সুরে ধ্বনিত হয়ে পরিবেশিত ‘রাগ আশা ভৈরব’ সংগীত প্রেমী থেকে সাধারণ শ্রোতার ও মন জয় করেছিল।
ভজন: ‘মেরা মন লাগা শ্যামরঙ্গী’
ঠুমরি: ‘পিয়া বিন নাহি আয় চ্যাঁন’
রাগ-আশা ভৈরবী শুধুমাত্র সঙ্গীতের একটি রাগ নয়, এটি একটি অনুভূতি, এক আত্মবিশ্লেষণ এবং ভক্তির গভীরতায় নিমগ্ন হওয়ার এক সঙ্গীতীয় পথ। এটি ভারতীয় সঙ্গীতের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য যা আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের সাথে সুর মেলাতে সাহায্য করে।

রাগ-শিবানী-ভৈরবী :
সুরের সাধক  নজরুলের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অনন্য সৃষ্টি, রাগ শিবানী ভৈরবী।  এই  অপূর্ব  হৃদয়স্পর্শী  রাগটি ভৈরব ঠাটের অন্তর্গত এবং এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো গভীর ভক্তি। প্রাচীনকাল থেকে হিন্দু ধর্মে দেবী পার্বতীকে ‘শিবানী’ বলা হয়, যিনি দেবাদিদেব মহাদেবের সঙ্গিনী। তাই, এই রাগের মধ্যে মহাদেব ও শিবানীর ভক্তির মিশ্রণ প্রতিফলিত হয়েছে ।রাগটি মূলত ভক্তিমূলক গান ও ধ্যানের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং প্রভাতের সময় পরিবেশন করা হয়, যখন প্রকৃতি শান্ত ও পবিত্র থাকে।এই শিব ও শিবানীর অনন্ত প্রেম ঐশ্বরিক শক্তির অনুভূতিতে নিয়ে যায়। প্রাচীন ভারতীয় মন্দিরে এই রাগের মাধ্যমে দেব-দেবীর প্রতি ভক্তির নিবেদন করা হতো।শিবানী ভৈরবীর সুরের গঠন গভীর ও মৃদু। একটি কোমল অথচ গম্ভীর আবহ সৃষ্টি করে, যা ভোরবেলার পরিবেশের সাথে মিলে যায়। রাগ শিবানী ভৈরবী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অনন্য সৃষ্টি, যা শ্রোতাদের আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক অনুভূতিতে নিয়ে যায়। এর প্রতিটি স্বরে যেন এক মহাশক্তির স্পর্শ লুকিয়ে আছে।  

 বহু প্রথিতযশা শিল্পী এবং পন্ডিত রবি শঙ্কর, উস্তাদ বিলায়েত খান ও এই রাগ শিবানী ভৈরবী রাগে তাঁদের পরিবেশনায় শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন।  
এই রাগে পরিবেশিত কিছু জনপ্রিয় গান হল:
‘ভগবান শিব জাগো জাগো’
‘শিবানী শিবানী মা জাগো’।।          
ক্রমশঃ

Post a Comment

0 Comments