বিশ্ব ক্যান্সার দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। ক্যান্সার এমন একটি রোগ, যা শুনলেই মানুষ ভয় পায়। সেই ক্যান্সার কি,বা কি রকম রোগ, এর থেকে সেরে ওঠা সম্ভব কিনা, আসুন, এই সব কিছুই আজকের লেখার মধ্যে জেনে নিই।
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ ও জটিল রোগ হলো, ক্যান্সার। প্রতি বছর লক্ষ, লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন হারান। ক্যান্সার শুধু একটি শারীরিক রোগ নয়, এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর গভীর মানসিক ও আর্থিক প্রভাব ফেলে। এই মারাত্মক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধ ও চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ৪ঠা ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যান্সার দিবস পালন করা হয়।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবসের সূচনা হয় ২০০০ সালে, প্যারিসে অনুষ্ঠিত World Summit Against Cancer for the New Millennium সম্মেলনের মাধ্যমে। এই দিবসটি Union for International Cancer Control (UICC)-এর উদ্যোগে পালিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো,ক্যান্সার সম্পর্কে মানুষের ভয়, ভুল ধারণা ও অজ্ঞতা দূর করা এবং প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সার সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা।
ক্যান্সার হলো, এমন একটি রোগ যেখানে শরীরের কোষগুলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং আশপাশের সুস্থ কোষ ও টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাধারণত শরীরের কোষ নির্দিষ্ট নিয়মে জন্মায় ও ধ্বংস হয়, কিন্তু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে টিউমার সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় তা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে মেটাস্টাসিস বলা হয়।
ক্যান্সার বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,ফুসফুস ক্যান্সার,স্তন ক্যান্সার,
মুখগহ্বর ক্যান্সার,জরায়ু ক্যান্সার,রক্ত ক্যান্সার (লিউকেমিয়া),ত্বক ক্যান্সার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ফুসফুস ও স্তন ক্যান্সার বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী।
ক্যান্সারের নির্দিষ্ট একটি কারণ নেই, তবে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যেমন,ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য সেবন।অতিরিক্ত মদ্যপান,
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস,
স্থূলতা ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব,
বায়ু ও পরিবেশ দূষণ,
ভাইরাস সংক্রমণ (যেমন HPV, Hepatitis B ও C)
বংশগত কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৩০–৪০% ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য, যদি জীবনযাত্রায় সচেতনতা আনা যায়।
ক্যান্সারের লক্ষণ রোগভেদে ভিন্ন হলেও কিছু সাধারণ উপসর্গ দেখতে পাওয়া যায়, তা হলো,অকারণে ওজন কমে যাওয়া,দীর্ঘদিনের কাশি বা গলা ব্যথা,শরীরের কোনো অংশে অস্বাভাবিক গাঁট,দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত যা ভালো হয় না,অতিরিক্ত ক্লান্তি,
রক্তক্ষরণ বা অস্বাভাবিক স্রাব।এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব, বিশেষ করে যদি প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা যায়।
এই দিনটি মানুষকে সচেতন করে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করে,
ক্যান্সার আক্রান্তদের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তোলে,
গবেষণা ও চিকিৎসা উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরে।
প্রতিবছর বিশ্ব ক্যান্সার দিবস একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রতিপাদ্যগুলো মূলত “Close the Care Gap”, অর্থাৎ চিকিৎসা ব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়,উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্যান্সার চিকিৎসায় যে ফারাক রয়েছে, তা কমানো জরুরি।
🍂
ক্যান্সার প্রতিরোধে করণীয় কিছু ব্যবস্থা হলো,ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, যেমন,ধূমপান,তামাক বর্জন,
নিয়মিত শরীরচর্চা,
স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ,অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ,নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা,টিকা গ্রহণ (HPV ও Hepatitis)।এই অভ্যাসগুলো শুধু ক্যান্সার নয়, অন্যান্য জীবনঘাতী রোগ থেকেও সুরক্ষা দেয়।
সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
ক্যান্সার মোকাবিলায় শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। সরকারকে
সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে,
সরকারি হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে,সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে,গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে,একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে ক্যান্সার আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াতে হবে, মানসিক সমর্থন দিতে হবে।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়,এটি একটি মানবিক আহ্বান। ক্যান্সার সম্পর্কে ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সহমর্মিতা। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত হলে এবং জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে ক্যান্সারকে পরাজিত করা সম্ভব। আসুন, বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করি,নিজে সচেতন হব, অন্যকেও সচেতন করব এবং একটি ক্যান্সারমুক্ত সমাজ গঠনের পথে এগিয়ে যাব।
0 Comments