জ্বলদর্চি

দর্শনের আলোকে/ষষ্ঠ পর্ব /স্বাতী ভৌমিক

দর্শনের আলোকে
ষষ্ঠ পর্ব
 স্বাতী ভৌমিক 

              
  ( দর্শনের আলোকে অর্থ )

 "অর্থ" কথার সাধারণ মানে হোলো- সম্পদ, যা এই জগত সংসারে জীবন নির্বাহের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপকরণ। অর্থ না হলে এই পৃথিবীতে জীবন নির্বাহ করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে পড়ে। ভরণপোষণের জন্য যা কিছু দরকার তার জন্য অর্থ প্রয়োজন হয়- এই কথাগুলো মোটামুটি সবারই জানা।

 কিন্তু দর্শনের আঙিনায় একে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ অর্থ উপার্জনের সাথে ওতঃপ্রোতভাবে নৈতিকতার একটি প্রসঙ্গ এসে পড়ে। আর নীতি নৈতিকতা সম্পর্কিত আলোচনা তো দার্শনিক আলোচনার সাথে সম্পৃক্ত।

 ব্যক্তি স্বার্থ প্রণোদিত হয়ে কর্ম করতে করতে অনেক সময় বিবেক বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে ফেলে। এই পার্থিব জগতে জড় কামনার বস্তু সংগ্রহ করতে গেলে অর্থ প্রয়োজনীয়। তবে বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু উপকরণ দরকার, তার জন্য অর্থ সংগ্রহকে মান্যতা দেওয়া যায়। কিন্তু ব্যক্তি যখন অর্থ পিপাসু হয়ে অর্থ সংগ্রহে লিপ্ত হয়, তখনই ব্যক্তির অর্থ সংগ্রহের উপায় ও মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
🍂

 ব্যক্তির জীবন স্বতঃমূল্যবান। জীবনে অনেক উন্নততর কর্ম করার ক্ষমতা ব্যক্তির থাকে। অর্থ সংগ্রহ হওয়া দরকার সৎপথে - স্বচ্ছতার সাথে। অসৎপথে সংগৃহীত অর্থ ব্যক্তির ভোগে যা না লাগে, তার থেকে বেশি খরচ হয় প্রায়শ্চিত্তে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যক্তি মনে লালসাকে বাড়িয়ে দেয়। মানুষ ধীরে ধীরে ওই অর্থকে জীবনের সার ভাবতে শুরু করে। ফলে মানব জীবনের উচ্চতর কর্মগুলি অবহেলিত হয়। ব্যক্তি ধীরে ধীরে অর্থ সংগ্রহের যন্ত্রসম হয়ে পড়ে।

 অর্থকে সঠিক কাজে প্রয়োগ করাটাও একটা উচিত কর্ম। সঠিক কাজে প্রয়োগ না করলে পরিণতিতে তা শান্তি বিঘ্নিত করে। অর্থকে শুধুমাত্র প্রয়োজনাতিরিক্ত ভোগের কাজে না লাগিয়ে তা ধর্মসম্মত কাজে লাগানো উচিত। ধর্মসম্মত কর্ম মানে গরীব- দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষদের অন্ন -বস্ত্র- বাসস্থানের সুযোগ করে দেওয়া, দশ জনের মঙ্গল হবে সেরকম কোন ক্ষেত্রে দান করা ইত্যাদি।এ তো গেল অন্যজনের ক্ষেত্রে উদার চিত্ততার কথা। নিজের ক্ষেত্রেও সেই অর্থকে ভালো কাজে লাগানো যেতে পারে। যেমন বই ক্রয় করা, ভ্রমণে গিয়ে নিজের মানসিক প্রশান্তিকে অনুভব করা ইত্যাদি।

 মানুষ তার কাঙ্খিত বিষয়কে উপার্জন করে তা সংরক্ষিত করতে চায়। প্রয়োজনাতিরিক্ত সংরক্ষণের চিন্তা ব্যক্তি মানুষের মনে অর্থময় বিব্রত মানসিকতা সৃষ্টি করে। ফলে সে উচ্চতর চিন্তা করার বা আত্মোপলব্ধির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অর্থরূপ অনর্থের পেছনে তার মূল্যবান আয়ুষ্কাল নষ্ট করে। পার্থিব কড়ি সংগ্রহের ব্যস্ততায়, তার অপার্থিব জগতে সুষ্ঠুভাবে পাড়ি দেওয়ার মতো ন্যূনতম কড়িটুকুও অনেক সময় সে জোগাড় করতে পারে না। 

 প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অর্থ দান পুণ্য কর্ম হলেও এ কথা মনে রাখা উচিত, এ ব্যাপারেও ব্যক্তিকে সচেতন হতে হবে-যাতে তার দান করা অর্থ কোন কুকর্মে ব্যয়িত না হয়। এ ব্যাপারে ব্যক্তির সচেতনতা কাম্য। কারণ আধ্যাত্মিক তত্ত্ব অনুসারে, দান করা অর্থ কোন কুকর্মে বা অনৈতিক কোন কাজে ব্যবহৃত হলে তার দায়ভার কিছু অংশে দাতার উপরেও এসে পড়ে। 

 পরিশেষে বলা যায়, অর্থ জীবনধারণের উপকরণ মাত্র.... জীবনের পরিভাষা নয় বা ব্যক্তির বিচারের মানদন্ড নয়। তাই অর্থ সংগ্রহে জীবনের মূল উদ্দেশ্য যেন বিঘ্নিত না হয়, তা লক্ষণীয়। সৎ পথে অর্জিত অর্থে সৎভাবে জীবন যাপন করে, মানবজীবনকে সার্থক করে তোলাই হল উচিত কর্ম। অন্যথায় ওই অর্থই জীবনে অনর্থের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।।

ক্রমশঃ......

Post a Comment

0 Comments