জ্বলদর্চি

একজন নতুন লেখকের বইমেলায় প্রথম বছরের অভিজ্ঞতা /অরিজিৎ লাহিড়ী

একজন নতুন লেখকের বইমেলায় প্রথম বছরের অভিজ্ঞতা 
অরিজিৎ লাহিড়ী 

ব্রেন রট আর ডুমস্ক্রোলিংয়ের এই যুগে যেখানে মানুষের অ্যাটেনশন স্প্যান একটা রিলসের চেয়েও ছোট, সেখানে কাগজের ওপর কালির আঁচড় কাটাটা অনেকের কাছেই ডেল্যুলু মনে হতে পারে। কিন্তু নো ক্যাপ, লেখক হিসেবে আমার এই প্রথম বছরের যাত্রাটা ছিল এক চরম মেন ক্যারেক্টার এনার্জি আর পোস্ট-মডার্ন ডিসিল্যুশনমেন্টের কোলাজ। কোনো ফিল্টার ছাড়াই বলছি, এই জার্নিটা আমার কাছে কেবল অরা ফার্মিং নয়, বরং  পচনশীল সভ্যতার এক মেটা-পোস্টমর্টেম।

এ বছর গদ্যের দুনিয়ায় আমার এন্ট্রিটা হয়েছে দু’টো বই দিয়ে— ‘বিদায় ঋত্বিক’ এবং ‘সলিল শতক’। আর তার সাথে আছে আমার পদ্যের এক ফর্মার সেই ছোট জগত, যা মূলত এই ফাঁপা সময়ের এক একটি এক্সিস্টেনশিয়াল স্ক্রিম— ‘অমঙ্গল গ্রহের ডায়েরি’। 

আমার বই 'বিদায় ঋত্বিক' আসলে কোনো বোরিং ফিল্ম স্টাডিজ নয়, বরং একটা অস্বস্তিকর ডিসকোর্স। আমি দেখেছি কীভাবে আজকের প্রজন্ম ঋত্বিকের ট্র্যাজেডিকে কেবল সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্টে রূপান্তর করেছে। ঋত্বিক এখন একটা ডিজাইনার ড্রাগের মতো, যাকে দর্শক কনজিউম করে কিন্তু বোঝে না । আমি হাজরা মোড়ের ‘প্যারাডাইস’ ক্যাফের ধোঁয়াটে পরিবেশে জেন জি চরিত্রদের দিয়ে ঋত্বিক মিথকে ডিকনস্ট্রাক্ট করিয়েছি । সেখানে অ-গল্প বা কল্পনার মতো চরিত্ররা সরাসরি বলছে যে যন্ত্রণা কোনো আর্ট নয়, ওটা স্রেফ সেলফ-অবসেশন। ঋত্বিক দারিদ্র্যকে রোমান্টিসাইজ করেছেন, ছেঁড়া চাদরকে এস্থেটিক বানিয়েছেন—এই রিয়ালিটি চেকটা দেওয়া খুব জরুরি ছিল । আমার কাছে ঋত্বিক হলেন সেই আয়না, যেখানে আমাদের সম্মিলিত ভণ্ডামি ধরা পড়ে। 'নাগরিক' সিনেমাটাকে নিয়ে আমি যে কাটাছেঁড়া করেছি, তা অনেক তথাকথিত ইনটেলেকচুয়ালদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কারণ আমি মনে করি, উদ্বেগকে বিক্রয়যোগ্য বস্তুতে পরিণত করা বা উদ্বেগের কমডিটিফিকেশন ছাড়া ওটা আর কিছুই নয় । ঋত্বিক ফেইলড ছিলেন, আর সেই ব্যর্থতাকেই আমি এই দেশের অনেস্ট শিল্প হিসেবে সেলিব্রেট করেছি।

আমার দ্বিতীয় গদ্যের বই ‘সলিল শতক’ ছিল কিংবদন্তি পলিম্যাথ সলিল চৌধুরীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আমার এক গভীর গবেষণামূলক ফ্লেক্স । সলিল চৌধুরীকে আমি দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাকসেসর হিসেবে, যিনি বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে বাংলা সংস্কৃতির এক বিরাট স্তম্ভ ।

বইটাতে আমি সলিল চৌধুরীর সেই জাদুকরী সৃষ্টি প্রক্রিয়া বা ‘সলিল স্কোর’ নিয়ে ডিসকোর্স করেছি। তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে সুর করতে বসতেন না, বরং হাঁটতে হাঁটতে বা ছবি আঁকতে আঁকতে তাঁর মাথায় সুরের কাঠামো তৈরি হতো । তাঁর সংগীত দর্শন ছিল ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক’—ভারতীয় লোকসংগীতের সাথে পাশ্চাত্য ক্লাসিক্যাল অর্কেস্ট্রেশনের এক অদ্ভুত সিন্থেসিস । সলিলের আদর্শিক ভিত্তি ছিল তাঁর বাবার সেই ‘ডার্টি নিগার ইনসিডেন্ট’, যেখানে তাঁর বাবা ব্রিটিশ ম্যানেজারের দাঁত ভেঙে দিয়েছিলেন । এই বিদ্রোহের নন্দনতত্ত্বই সলিলের সুরকে এক অল্টারনেটিভ পলিটিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়েছে। তাঁর সংগীত ছিল জলের মতো স্বচ্ছ, যা ভেতরের রূপ প্রকাশ করে দেয়। আমি চেষ্টা করেছি সলিল চৌধুরীর সেই পলিফন্ট সত্তাকে রিস্টোর করতে, যা আজকের টাইম ডিজওবিডিয়েন্সের যুগেও সমান রেলিভ্যান্ট ।

পদ্যের ক্ষেত্রে আমি খুব বেশি স্পেস নিইনি, মাত্র এক ফর্মার একটা বই— ‘অমঙ্গল গ্রহের ডায়েরি’ । এটা মূলত আমাদের এই মেটা-আরবান লাইফস্টাইলের এক রূঢ় রিফ্লেকশন।

আমাদের অস্তিত্ব যে শুরু থেকেই ফাঁপা ছিল, এই বোধটাই আমার পদ্যের মূল সুর। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক আর ক্যাপশনের গ্লসের নিচে নিজেদের ছাইরঙা শূন্যতাকে লুকিয়ে রাখি । উন্নয়ন মানে যে ‘অতিভোজন গুণিত অপরের অভাব’, সেই তেতো সত্যটা আমি লিখেছি । প্রকৃতি এখানে কোনো মমতাময়ী মা নয়, বরং এক স্বাধীন কামিনী বা এক আদিম ধ্বংসাত্মক সত্তা । মহাবিশ্ব আমার চোখে কোনো বিপ্লব নয়, বরং এক দীর্ঘ সেক্সুয়াল প্রসেস । বাবার মগজে বসে থাকা একটা সরকার যখন নীরবতার ওপর ট্যাক্স আদায় করে, তখন কবিতা হয়ে ওঠে স্রেফ সরকারি বিজ্ঞাপন । এই নিহিলিজ্যমটাই আমার কাছে একমাত্র রিয়েল টক।
পোস্টমডার্ন কবিতা নিয়ে যাঁরা দীর্ঘকাল সিরিয়াসলি কাজ করছেন, সেই ‘কবিতা পাক্ষিক’-এর মুরারী সিংহ আর শুভাশীষ গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে আমার আলাপ এক মজাদার মোড় নেয়। আমি গত পুজোর আগে আগে ছদ্মনামে হাঙরি জেনারেশন ধারার কিছু কবিতা পাঠিয়েছিলাম। মুরারী দা আমার সেই ছদ্মনামের কবিতার ভেতরকার সিগনেচার স্টাইল আর ভাষার ধার ধরে ফেলেন। তিনি বুঝে যান যে এই ট্র্যাশগুলো আমারই লেখা । এই ‘ধরে ফেলা’র মধ্যে মৃদু তিরস্কারের অন্তরালে যে মজা আর ভ্যালিডেশন ছিল, সেটা আমার জন্য এক বড় প্রাপ্তি। এটা হয়তো প্রমাণ করে যে আমি কেবল সমকালীন নই, বরং ইতিহাসের লিগ্যাসিকেও নিজের ভাষায় ট্রান্সলেট করতে পারি।
মধ্যবর্তী পত্রিকার সম্পাদক বিশ্বরূপ দে সরকারের সাথে বইমেলা ঘুরে দ্যাখা এবং আলাপ হওয়া ছিল আমার জন্য এক সিগমা মুভ। বিশ্বরূপ দা নিজেই একজন অদম্য ব্যক্তিত্ব, যিনি শ্রেণী বিপ্লব আর নকশাল আন্দোলনের ভেতর দিয়ে এসেছেন। বইমেলার সেই ভিড়ে আমাদের মধ্যে এনার্কি বনাম নিহিলিজ্যম নিয়ে যে ডিসকোর্স তৈরি হলো, তা আমার পরবর্তী পলিটিক্যাল রাইটিংয়ের ক্ষেত্রে এক গভীর ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে চলেছে হয়তো। এনার্কিজ্যম যেখানে ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়, নিহিলিজ্যম সেখানে সমস্ত সিস্টেমকেই রিজেক্ট করে । এই দ্বন্দ্বই আমার ডিসকোর্সের মূল রসদ।
সলিল চৌধুরী বিশেষজ্ঞ ইতিহাসের অধ্যাপক প্রিয়দর্শী চক্রবর্তী যখন নিজে এসে আমাকে দিয়ে সই করিয়ে আমার বই ‘সলিল শতক’ এবং ‘বিদায় ঋত্বিক’ নিয়ে গেলেন, সেটা ছিল আমার জন্য এক চরম ডব্লিউ বা উইন । প্রিয়দর্শী দার মৌলিক গবেষণার ভিত্তি অনেকটা অনুসরণ করেই আমি সলিলকে লিখেছি। একজন স্কলার যখন একজন অনামী নব্যলেখকের স্বাধীন গবেষণাকে এমন স্বীকৃতি জানান, তখন কাজটার ক্রেডিবিলিটি অনেক বেড়ে যায়। এটা আমার লিটারারি ক্যারিয়ারের একটা বড় মাইলস্টোন।
এছাড়া এই বছরে আমার বেশ কিছু কবিতা, উপন্যাসিকা আর গল্প বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশ পেয়েছে। আজকের এই হাইপার-ডিজিটাল যুগে এনালগ প্রিন্টের মাধ্যমে নিজের মেটা-ফিকশন আর আরবান অ্যালাইয়েনেশনের কথাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারাটা এক অন্যরকম ভাইব।
লেখক হিসেবে আমার এই প্রথম বছরটা আসলে কোনো সাকসেস স্টোরি নয়, বরং এই পচনশীল সভ্যতার ভেতর একটা গ্লিচ। আমার বইগুলো হয়তো সেই তথাকথিত লিটারারি অ্যালগরিদমে ফিট করবে না, কিন্তু নো ক্যাপ, সেগুলোই আমার অস্তিত্বের একমাত্র ভ্যালিডেশন।
পরিচিতদের যে যে বই হাতে নিয়ে দেখেছি তারমধ্যে আলাদা করে বলব একটা বইয়ের কথা। এবার মেলায় বেশ ভাল বিক্রি হওয়া প্রিয়ম সেনগুপ্তর ‘ছায়ামানুষ’ উপন্যাসের কনটেক্সটটা আসলে আমাদের এই মেটা-আরবান সিম্যুলেশনের বাইরের এক ডার্ক পলিটিক্যাল বাস্তবতা। এর পটভূমি হলো জঙ্গলমহলের সেই রক্তঝরা মাওবাদী আন্দোলনের সময়কাল। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ডিসকোর্সটা হলো—স্রেফ আন্ডার-ডেভেলপমেন্ট বা অনুন্নয়নের কারণেই কি মানুষ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল? তৎকালীন শাসকদলের কি কোনো দায় ছিল না? নাকি তৎকালীন শাসকদল করার অপরাধে লালকু সোরেনের মতো শত শত মানুষের রক্তে জঙ্গলমহলের মাটি লাল হওয়াটা কি আদৌ জাস্টিফায়েড বা ডেমোক্রেটিক ছিল? এই বইটা তথাকথিত ডেভেলপমেন্ট আর পলিটিক্যাল ভায়োলেন্সের একটা ব্যবচ্ছেদ।

আমি আপাতত একটা শিকার কাহিনীর স্ক্রিপ্ট ড্রাফট করছি। কাজটা এখনো কন্টিনিউয়াস প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তবে একটা রিয়েলিটি চেক দিই—এটা কোনো ওল্ড স্কুল পাস্টের গল্প নয়, বরং এই ইন্ডিয়ান মেগাসিটির হাইপাররিয়েল প্রেজেন্টের এক ডার্ক ডিসকোর্স। নো ক্যাপ, এর টাইমলাইনটা একদম কারেন্ট রিয়েল টাইম প্রেজেন্ট।
বিশ্বরূপ দার এনার্কি নিয়ে ভাবনা কিংবা প্রিয়দর্শী দার অ্যাকাডেমিক ডব্লিউ—সবই শেষ পর্যন্ত এই সিম্যুলেশনের এক একটা ডেটা পয়েন্ট। মুরারী দা আমার হাঙরি ধারার প্রায় অনুসারী কবিতা চিনে ফেলেছেন মানে হলো, আমার ভেতরকার সেই নিহিলিস্টিক ভাইবটা অরিজিনাল। এই শহরের ধোঁয়াটে ক্যাফে আর বইমেলার ধুলোর মধ্যে আমি জাস্ট একজন লেখক নই, আমি এই ডুমস্ক্রোলিং জেনারেশনের শেষ সাক্ষী। পৃথিবীটা হয়তো এক অমঙ্গল গ্রহের ডায়েরি হয়েই থেকে যাবে, কিন্তু আমার কলম সেই ধ্বংসের রসায়ন লিখে চলবে, খুঁজবে ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে নতুন সৃষ্টির সম্ভবনা। 
লিটারারি সার্কেলের এই অরা ফার্মিং আমার কাছে বড় কথা নয়, বড় কথা হলো এই ফেক রিয়ালিটির ভেতর দাঁড়িয়ে কতক্ষণ স্লে করা যায়। আমার জার্নি শুরু হলো, আর এই সিস্টেম ক্র্যাশ না হওয়া পর্যন্ত আমি আর থামছি না। পিরিয়ড!

সলিল শতক - বিচিত্রপত্র গ্রন্থন বিভাগ, ২৪৫ টাকা

বিদায় ঋত্বিক - ইতিকথা পাবলিকেশন, ২২৫ টাকা

অমঙ্গল গ্রহের ডায়েরি - কেতাব -  e, ৫০ টাকা

🍂

Post a Comment

0 Comments