জ্বলদর্চি

দুটি কবিতা/রাখহরি

দুটি কবিতা

রাখহরি

সাদা পায়রার পাঠশালা
        
সন্ধ্যার চায়ে কুড়মুড়ে খবর—
কাগজে কাগজে আগুন ভাজা,
ঘরের ভিতর তর্কের উত্তাপে
এই হাড়কাঁপা শীতে
হিটার অপ্রয়োজনীয়।

স্ক্রিনে ভাসে ড্রোন,
ফাইটার জেটের ডানায়
শান্তির স্টিকার—
নাম তার সাদা পায়রা।

ওড়াও, ওড়াও—
একটু আকাশে তুললেই নাকি
বিভীষণ আসবে নিজে হাতে
দেশ তুলে দেবে!
শোকেসে সাজবে মেডেল
মাথায় বসবে মুকুট,
আর সেই মুকুটের উপর পা তুলে
দাঁড়িয়ে বানানো হবে স্ট্যাচু
গ্যালন গ্যালন তেল—
ইতিহাসের গাড়ির তেল।

এইভাবে নিশ্চিন্ত থাকে
দেশের মাথারা তাদের মাথা
দশের মাথা নয়—
ওগুলো কেবল সংখ্যা,
হোমওয়ার্ক না করা খাতা।

দুনিয়া আজ এক বাধ্য ক্লাসরুম,
ডেস্কে বসে দেশগুলো,
যে প্রশ্ন করে
সে অবাধ্য ছাত্র।
স্যারের এক ধমক—
নিষেধাজ্ঞা, ট্যারিফ,বোমা, নীরবতা।
“চুপ করে বসো,
প্রজেক্টরে তাকাও।”
প্রজেক্টরে দেখানো হয়
সবুজ দ্বীপের স্বপ্ন—
বলা হয়,
“তোমরা দিলে আমি হব রাজা।”
কারা তোমরা?
যাদের ঘর নেই,
যাদের নাম নেই,
যাদের শুধু হাত তোলার অধিকার।
আকাশ জুড়ে আবার
সাদা পায়রা—
ডানায় বারুদ,
ঠোঁটে নৈতিকতার ভাষণ।
শান্তি আজ ইউনিফর্ম পরে,
আর যুদ্ধ
ভদ্র ভাষায় কথা বলে।
এই পাঠশালায়
ঘণ্টা বাজে না
দেওয়া হয়,
শুধু ইতিহাস পড়ানো হয়
উল্টো করে।
আর আমরা—
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে
ভাবি,
আগামী ক্লাস
কার ?

🍂

আরাবল্লী

পৃথিবীর কপালে লেখা
সবচেয়ে পুরোনো ভাঁজ—
আরাবল্লী।
যখন হিমালয়ও ছিল স্বপ্নে,
তখন সে দাঁড়িয়ে ছিল
ধুলো, জল আর বীজের প্রহরায়।
এটা পাহাড় ভাঙা নয়—
এটা হত্যা।
পরিকল্পিত, অনুমোদিত,
ফাইলে সই করা একেকটা আঘাত।
আজ তার বুক চিরে
খননের দাঁত,
পাথরের লোভে কেটে নেওয়া
হাজার বছরের নীরবতা।
ডিনামাইটের শব্দে ভেঙে যায়
একটা পাহাড় নয়—
একটা সময়।
আরাবল্লীর বুক চিরে
লোহার দাঁত ঢুকে যায়,
পাথর নয়—
তুলে নিয়ে যায় জল, ছায়া, ভবিষ্যৎ।
ডিনামাইটের শব্দে
ধসে পড়ে শুধু শিলা নয়,
ধসে পড়ে
নদীর স্মৃতি,
বৃষ্টির ভাষা,
মরুভূমির শেষ বাঁধ।

যে পাহাড়
বৃষ্টি ধরে রাখত,
নদীর পথ শেখাত,
মরুভূমিকে থামিয়ে বলত—
“এখান পর্যন্তই”
আজ সে নিজেই
ধুলো হয়ে উড়ছে শহরের ফুসফুসে।
আরাবল্লী জানে,
সব ক্ষত রক্তে বোঝা যায় না—
কিছু ক্ষত
ভূগর্ভস্থ জলে নামে,
কিছু ক্ষত
আগামী প্রজন্মের
পিপাসায়।
তোমরা বলো—উন্নয়ন।
কিন্তু উন্নয়ন কি
মাটির শ্বাসরোধ করে আসে?
উন্নয়ন কি
শহরের এসি ঠান্ডা রাখতে
গ্রামের কণ্ঠ শুকিয়ে দেয়?
এই খনন মানে
শুধু পাথর চুরি নয়—
এটা জল চুরি,
এটা আগামী প্রজন্মের
অধিকার চুরি।
আমরা উন্নয়নের নামে
তার শরীর মাপছি স্কয়ারে,
ভুলে যাচ্ছি—
পাহাড়েরও প্রাণ আছে,
তারও ক্লান্তি,
তারও শেষ নিঃশ্বাস।
একদিন যখন
বালির মধ্যে দাঁড়িয়ে
শহর খুঁজে পাবেনা ছায়া,
সেদিন হয়তো মনে পড়বে—
একটা পাহাড় ছিল,
যাকে আমরা বাঁচাইনি।

Post a Comment

0 Comments