জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/কমলিকা ভট্টাচার্য/চতুর্থ খণ্ড/পর্ব ৫: মাতৃত্বের সিদ্ধান্ত

বাঁচার উত্তরাধিকার
কমলিকা ভট্টাচার্য
চতুর্থ খণ্ড
পর্ব ৫: মাতৃত্বের সিদ্ধান্ত

ভোরের আলো ধীরে ধীরে জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভিতর ঢুকছিল। সেই আলোতে হাসপাতালের বিশেষ গবেষণা ইউনিটটা আরও নিস্তব্ধ, আরও সংযত মনে হচ্ছিল। বাইরে নিরাপত্তা কড়া—প্রতিটি দরজায় নজরদারি, প্রতিটি করিডোরে সতর্কতা। আর ভিতরে নিঃশব্দে কাজ করছে কয়েকজন ডাক্তার আর বিজ্ঞানী—যেন তারা জানে, আজকের প্রতিটি মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ।
টেবিলের উপর একটা বিশেষ সুরক্ষিত কন্টেইনার রাখা। তার ভিতরে সেই embryo। যে ছোট্ট জীবনের জন্য এত যুদ্ধ, এত বিপদ, এত ত্যাগ। একটা অদৃশ্য ভবিষ্যৎ যেন এই ছোট্ট সুরক্ষিত বাক্সটার মধ্যে নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে।
অনির্বাণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে একসঙ্গে আনন্দ আর উদ্বেগ। মাঝে মাঝে সে কন্টেইনারটার দিকে তাকাচ্ছিল, আবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল—যেন নিজের অনুভূতিকে সামলাতে পারছে না। তার ভিতরে একসঙ্গে দুইটা লড়াই—একটা বাবা হওয়ার আনন্দ, আর একটা প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়।
ঠিক তখন দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন ডক্টর সেন। তার চোখে অভিজ্ঞতার ভার, মুখে গম্ভীরতা। তিনি embryo-টা স্ক্যান করে অনেকক্ষণ নীরবে রিপোর্ট দেখলেন। স্ক্রিনে ভেসে উঠছিল বিভিন্ন তথ্য—সবকিছু যেন নিখুঁত।
তারপর ধীরে বললেন—
“Embryo সম্পূর্ণ সুস্থ।”
অনির্বাণের বুকের ভিতর যেন জমে থাকা একটা ভার একটু হালকা হল। তার চোখে এক ঝলক স্বস্তি ফুটে উঠল।🍂
কিন্তু ডক্টর সেনের মুখে এখনও চিন্তার ছাপ। তার ভ্রু কুঁচকে আছে, যেন কোনো অজানা হিসেব এখনও মেলেনি।
ইরা সেটা লক্ষ্য করল। সে ধীরে জিজ্ঞেস করল—
“কিছু সমস্যা আছে?”
ডক্টর সেন ধীরে বললেন—
“সমস্যা embryo-তে নয়।”
তিনি একটু থামলেন, যেন পরের কথাটা বলার আগে নিজেকে প্রস্তুত করছেন।
“সমস্যা নাতাশার শরীর।”
ঘরের ভিতর নীরবতা নেমে এল।
অনির্বাণ ধীরে বলল—
“মানে?”
ডক্টর সেন বললেন—
“তার শরীর আগের আঘাত আর দীর্ঘদিনের কোমা থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। এই অবস্থায় যদি embryo তার শরীরে বসানো হয়… তাহলে তার জীবনের ঝুঁকি থাকতে পারে।”
কথাটা বলেই তিনি চুপ করে গেলেন। যেন এই কথার পর আর কিছু বলার নেই।
এই নীরবতার মধ্যেই হঠাৎ দরজা খুলে নাতাশা ভিতরে এল। সে ধীরে ধীরে হাঁটছিল, শরীরে এখনও দুর্বলতা আছে, কিন্তু চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা—যেন সে নিজের সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে ফেলেছে।
“আমি সব শুনেছি।”
অনির্বাণ তৎক্ষণাৎ বলল—
“তোমাকে কেউ ডাকেনি এখানে আসতে।”
নাতাশা শান্ত গলায় বলল—
“এটা আমার সন্তানের ব্যাপার। আমি থাকব না কেন?”
তার কণ্ঠে কোনো রাগ নেই, শুধু অধিকার আর দৃঢ়তা।
ডক্টর সেন ধীরে বললেন—
“আমি আবার বলছি, ঝুঁকি খুব বড়।”
নাতাশা এক মুহূর্তও না ভেবে সরাসরি বলল—
“আমি রাজি।”
অনির্বাণ যেন বিস্ফোরিত হল।
“তুমি পাগল হয়েছ?”
তার কণ্ঠে আতঙ্ক, রাগ নয়—হারানোর ভয়।
“আমি তোমাকে আবার হারাতে পারব না।”
নাতাশা ধীরে তার দিকে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত কোমলতা—যেন সে সব বুঝছে, তবু নিজের পথ থেকে সরে আসবে না।
“তুমি আমাকে একবার হারিয়েছ,” সে বলল।
“এবার আমি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেব।”
এই কথাটা ঘরের ভিতরের বাতাস টাকে আরো ভারী করল।
ইরা নীরবে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
নাতাশা আবার বলল—
“এই সন্তান শুধু একটা জীবন নয়। এটা আমাদের ভবিষ্যৎ।”
তার চোখে তখন জল, কিন্তু সেই জলের ভিতরেও ছিল অদ্ভুত শক্তি।
“আমি যদি ভয়ে পিছিয়ে যাই… তাহলে এই লড়াইয়ের কোনো মানে থাকবে না।”
অনির্বাণ কিছু বলতে পারছিল না। তার ভিতরের সব যুক্তি যেন এই একটুকরো আবেগের সামনে থেমে গেছে।
শেষে সে ধীরে বলল—
“আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
নাতাশা তার হাত ধরল। তার স্পর্শে এক অদ্ভুত আশ্বাস।
“তাহলে আমাকে বিশ্বাস করো।”
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল ইরা। তার ভিতরে অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠছিল। নাতাশার চোখে যে মাতৃত্বের আলো সে দেখছে… সেটা তার ভিতরেও কোথাও যেন নাড়া দিচ্ছে।
সে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এল।
করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল ঋদ্ধিমান। সে যেন আগেই বুঝতে পেরেছিল ইরা আসবে।
ইরা চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল—
“তুমি কখনও ভেবেছ… মা হওয়া কেমন?”
ঋদ্ধিমান একটু অবাক হল। তার দৃষ্টিতে প্রশ্ন, কিন্তু কণ্ঠে শান্তি।
“আমি তো মানুষ নই,” সে বলল।
ইরা হালকা হেসে বলল—
“কিন্তু অনুভূতি বোঝো তো?”
ঋদ্ধিমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার ভেতরে যেন শব্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা।
তারপর ধীরে বলল—
“তুমি কি মা হতে চাও?”
ইরা জানালার বাইরে তাকাল। ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ছে।
“আমি জানি না,” সে বলল।
“কিন্তু নাতাশাকে দেখে মনে হচ্ছে… একটা অদ্ভুত শক্তি আছে এই অনুভূতির ভিতরে।”
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল—
“মাতৃত্ব শুধু জন্ম দেওয়ার মধ্যে নেই।”
ইরা তার দিকে তাকাল।
ঋদ্ধিমান বলল—
“তুমি কি মা যশোদার গল্প জানো?”
ইরা মাথা নাড়ল।
ঋদ্ধিমান বলল—
“কৃষ্ণ তার গর্ভের সন্তান ছিল না। তবু পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর মাতৃত্বের উদাহরণ যদি কেউ হয়… তিনি মা যশোদা।”
সে একটু থামল।
“কারণ তিনি জন্ম দেননি… কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করেছেন।”
এই কথাগুলো যেন করিডোরের নীরবতার মধ্যে ধীরে ধীরে বসে গেল।
ইরা চুপ করে রইল। তার চোখে অদ্ভুত একটা আলো জ্বলল—নতুন একটা উপলব্ধি, নতুন একটা অনুভূতির শুরু।
“মানে… মা হওয়ার জন্য সবসময় নিজের সন্তান দরকার হয় না?”
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল—
“মা হওয়ার জন্য দরকার ভালোবাসা।”
করিডোরে আবার নীরবতা নেমে এল। কিন্তু সেই নীরবতা আর আগের মতো নয়—এটা যেন নতুন ভাবনার, নতুন সম্ভাবনার।
ঘরের ভিতরে তখন ডাক্তাররা প্রস্তুতি নিচ্ছে। আলো আরও উজ্জ্বল হয়েছে, যন্ত্রগুলো একে একে চালু হচ্ছে। একটা নতুন জীবনের শুরু করার জন্য সবকিছু তৈরি হচ্ছে।
অনির্বাণ নাতাশার পাশে দাঁড়িয়ে, তার হাত শক্ত করে ধরে আছে। নাতাশার চোখ বন্ধ, কিন্তু মুখে শান্তি—যেন সে নিজের সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ স্থির।
কিন্তু কেউ জানে না সামনে কি অপেক্ষা করছে।
কারণ কখনও কখনও—
জীবনকে পৃথিবীতে আনার জন্যও যুদ্ধ করতে হয়।

Post a Comment

0 Comments