জ্বলদর্চি

যাত্রামঙ্গল/পুলককান্তি কর


যাত্রামঙ্গল

পুলককান্তি কর


হঠাৎ করে স্বপ্নটা ভাঙতেই বড় স্বস্তি বোধ করল নিখিলেশ। এত রকম ভ্যারাইটির বিষয় কেমন দমবন্ধ একটা পটভূমিকায় সারাক্ষণ চোখের সামনে ঘুরছিল, ভাবতেও ইচ্ছে করছে না এখন। অথচ শুরুটা বেশ ছিল। ইলামবাজারে তাদের বাড়ীর সামনের উঠোন, সেই উঠোনে পিঙ্কির হামগুড়ি দেওয়া – এই অবধি ঠিক ছিল। মুশকিলটা শুরু হল যখন এক ফাঁকে একটা শুঁয়োপোকা ওর গায়ে উঠলো আর অমনি ওর কিশোরী বেলার মুখ বলে উঠলো, ‘মারিস না দাদাভাই, শুঁয়োপোকা থেকে কিন্তু প্রজাপতি হয়।’ 

ঘুম ভাঙলেই একবার বাথরুমে না ঘুরে এলে শান্তি হয় না নিখিলেশের। মলি বেশ নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। অবশ্য নাক ডাকা যাকে বলে ঠিক তেমনটা নয়, বেশ একটা ফোঁসফোঁসানি আওয়াজ। এক ঝলক সেদিকে তাকিয়ে মুখটা ফিরিয়ে নিল নিখিলেশ। আজ শোওয়ার আগেও পিঙ্কির বিষয় নিয়ে মলির সাথে বেশ উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে তার। হাজারবার নিখিলেশ বারণ করেছে সব বিষয়ে মলির বিজ্ঞের মতামত না দেওয়াই ভালো, তবে ধর্মমতে পত্নী যখন, সমস্ত বিষয়ে সঠিক বুদ্ধি দেওয়াটাকে নিজের নৈতিক দায় মনে করে মলি। 

পিঙ্কির যখন জন্ম হয় নিখিলেশ তখন হায়ার সেকেন্ডারী পড়ে। দীর্ঘ ষোল বছরের ব্যবধান ভাই বোনের। প্রথমদিকে লজ্জায় মা কোনওরকম ওকে খাবার বেড়ে দিয়েই মুখ লুকোতেন। বাবা প্রথমে গম্ভীর, পরে লাজুক আবার গম্ভীর হতে হতে সময়ের নিয়মে আবার স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে গেলেন। সদ্য শেখা জীবন শৈলীর জ্ঞান থেকে রহস্য উড়ে গিয়ে বন্ধুদের হাসাহাসির মাঝে পড়ে নিখিলেশ বুঝতে পেরেছিল তার জীবনে সত্যি সত্যি কেউ যদি শত্রু থাকে সেটা ওই ফর্সা নাদুস নুদুস ছিঁচকাঁদুনে মেয়েটা, আর যারা তাকে খালকেটে ঘরে নিয়ে এসেছে – সেই নির্লজ্জ বাপ মা। ওর সমগ্র মনোজগতে শুধু ছিছিক্কার। হায়ার সেকেন্ডারীর রেজাল্ট খারাপ হল, জয়েন্টে মন দিতে পারলো না। এতদিন মনে মনে পুষে রাখা ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন অধরা থেকে গেল কেবলমাত্র নির্বোধ দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ছেলেমানুষীর জন্য। এখনও নিখিলেশ পিঙ্কির কথা তুললে মলি প্রায় দিনই বাবা-মায়ের আনন্দের ফসল বলে ওকে আহত করে। অথচ বড় হওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আধো আধো গলায় দাদাভাই ডাকটা কখন যে ওর হৃদয় জুড়ে বসে গেছে, নিখিলেশ টেরই পায় নি। সে যখন বি.এস.সি পড়তে কলকাতায় চলে এল, তখন পিঙ্কির বয়স এক বছর কয়েক মাস। সবে কলকলিয়ে কথা বলতে শিখেছে তখন। ছুটি ছাটায় যখন বাড়ী যেতে বাধ্য হত, তার খেলনা বাটি, পুতুল খেলায় মায়া মাখিয়ে কখন যে পিঙ্কি ওকে ওর দলে টেনে নিয়েছিল, বোঝা যায়নি কখনও।🍂

    বোতল থেকে অল্প একটু জল খেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো নিখিলেশ। মোবাইলটা জ্বেলে দেখল, রাত প্রায় তিনটে বাজে। আকাশে একফালি চাঁদের পাশে শুকতারাটা জ্বলজ্বল করছে। দূরে একটা শিরীষ গাছের চারপাশটা যেন কোনও এক নিশাচর দৈত্যের মতো আকাশটাকে গিলতে চাইছে। নিখিলেশ জানে, আজ ওর ঘুম আসা বড় শক্ত। সন্ধেবেলায় পিঙ্কির বরের সাথে অনেক কথা কাটাকাটি হল। ফোনে এসব না হলেই ভালো হত। এই নিয়ে পিঙ্কির সাথে আবার কোনও অশান্তি না করে রাস্কেলটা। 

পিঙ্কির বিয়ের আগেই বাবা চোখ বুঝেছিলেন। সুতরাং ভালো একটা বিয়ে দেওয়ার দায় তারই ছিল। কিন্তু পিঙ্কি নিজেই ছেলে পছন্দ করল। পাড়ারই ছেলে। নিখিলেশ সারা জীবন কোনওদিনই প্রতীমকে মন থেকে মেনে নিতে পারে নি। ওর থেকে বছর আটেকের ছোট ছিল ও। ওদের গ্রুপের প্রত্যেক কটা ছিল মহা বদ এবং বিচ্ছু প্রকৃতির। পিঙ্কি যে কী করে ওই বিটকেলটার খপ্পরে পড়লো, কে জানে। পিঙ্কি যে এই সম্পর্কে নিখিলেশের অনিচ্ছা টের পায়নি তা নয়, তবে কিনা এক ছাদের নীচে কয়েক রাত কাটানোর আগে পর্যন্ত দেহ মনের টান এত তীব্র থাকে যে অনেক খালি চোখে দেখার জিনিসও ঝাপসা হয়ে যায়। পিঙ্কি যখন অমিলটা টের পেল, ততদিনে ওর আর ফিরে আসার অবসর নেই। হয়তো নিজের পছন্দের বিয়ে বলেই অনেক কিছু সে নিখিলেশের থেকে চেপে যায়। দুটো ছেলে মেয়ে হয়ে যাওয়ার পরও যে গাছ মাটিতে শেকড় পুঁততে পারে না, তার পক্ষে ওখানে টিকে থাকা শক্ত। 

আজ সন্ধেতে ফোনটা অবশ্য প্রতীমই করেছিল। উঁচু গলায় যথেষ্ট অভদ্র ভাষায় প্রথম কথাই এরকম ছিল, ‘নিখিলদা, বোনকে প্রাণে বাঁচাতে চাইলে ইমিডিয়েট এসে নিয়ে যাও, কবে মাথায় খুন চেপে যাবে, মেরে ফেলবো কিন্তু।’ 

যথেষ্ট মাথা ঠান্ডা রেখে নিখিলেশ বলেছিল, ‘কেন, কী হয়েছে, কী নিয়ে অশান্তি করছো তোমরা?’ 

– ‘নাও নিজের বোনের থেকেই শুনে নাও ওর ছেনালপনা’ বলেই দুম করে ফোনটা ধরিয়ে দিল পিঙ্কির কানে। 

বুকটা হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল নিখিলেশের। তার এত আদরের বোন, নিশ্চই অশান্তিতে কাঁদছিল এতক্ষণ। কিন্তু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘দাদাভাই, কেমন আছ? 

– আমি তো ভালো আছি বোনু, তোর কী হল? কী নিয়ে আবার অশান্তি? 

– তুমি ছাড়ো তো দাদাভাই। আমি ঠিকই আছি। 

নিখিলেশ পরিষ্কার ফোনে প্রতীমের চেঁচামেচির আওয়াজ পাচ্ছিল, বলল, ‘তোর ফোন কি স্পিকারে দেওয়া আছে? 

– না। 

– তোর গায়ে কি হাত তুলেছে প্রতীম? তুই হুঁ, না, করে বল, আমি তাতেই বুঝে নেব। 

– তুমি চিন্তা করো না দাদাভাই। ও সব কিছু না। জানোই তো ওর একটুতে উগ্রচণ্ডা রাগ। 

– আমি কালই যাবো তোর বাড়ী। তুই চলে আয়, থাকতে হবে না ওখানে। 

– না দাদাভাই। কলকাতা থেকে এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে উজিয়ে আসতে হবে না। এই তো আর কদিন পরেই ভাইফোঁটা, তখন যাবো। সামনা সামনি কথা হবে। 

পিঙ্কি ফোনটা কেটে দিল। কিন্তু নিখিলেশ নিশ্চিত, তার আগেই দুম করে একটা আওয়াজ হল, ওর একফোঁটা বিশ্বাস হয় না প্রতীমকে। ও পিঙ্কির ফোনে রিঙ করলো, পিঙ্কি তুললো না। 

মলি বলল, ‘কী হল? নতুন কী সমস্যা?’ 

– প্রতীমটা একটা জানোয়ার। আমাকে ফোন করে হুমকি দিচ্ছে পিঙ্কিকে নাকি মেরে ফেলবে। 

– তোমার বোনেরই তো দোষ। লটঘট করার সময় মনে ছিল না? 

– লটঘট করলেই বুঝি মারার এক্তিয়ার হয়ে যায়? তুমিও তো লটঘট করেই বিয়ে করছো। 

– আহা। তুমি যেন গায়ে হাত তোলো না! 

– ভেবেচিন্তে কথা বল মলি। আমি তোমার গায়ে হাত তুলি? 

– তুমি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দাওনি? 

– সব সময় কোন মান্ধাতার আমলে ঘটে যাওয়া একটা কথা নিয়ে কেন টানাটানি কর মলি? তুমি নিজেও জানো ওটা ঠিক সে অর্থে ধাক্কা দেওয়া ছিল না। 

– কোন অর্থে ধাক্কা দিয়েছ, সেটা কি ধাক্কার গায়ে লেখা থাকে? দিয়েছ, সেটাই বড় কথা। আজ প্রতীম কী অর্থে ধাক্কা দিয়েছে, সেটা কি তুমি এত দূরে থেকে বুঝতে পারবে? 

– আমি কালকেই ইলামবাজার যাবো। 

– বাড়াবাড়ি করো না লিখিল। সব ঘরেই অশান্তি হয়। দুটো বাসন পাশাপাশি থাকলে ঠোকাঠুকি লাগে। তাতে সবসময় বাইরের লোককে মাথা গলাতে নেই। 

– বিষয়টা সিরিয়াস মলি। এ তো আজকের বিষয় নয়। অন্তত চার পাঁচ বছর ধরে চলছে। আজ প্রতীমের সাহস এত বেড়ে গেছে যে সে সরাসরি আমাকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে। মানুষের মিনিয়াম চক্ষু লজ্জাটা চলে গেলে ওটা ভয়ংকর হয়ে যায়। ও পরিষ্কার বুঝতে পারছে পিঙ্কি একা। ওর পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। 

– সব বিষয়ে মাথা গলিও না নিখিল। দাম্পত্য সমস্যা। দেখবে আজ রাতে বিছানায় উঠলেই মিটে যাবে। 

কথাটা হয়তো সত্য, কিন্তু পিঙ্কির জন্য কথাটা ভাবতেই গা টা শিউরে উঠল নিখিলেশের। এইরকম একটা অসভ্য জানোয়ার ওই রকম একটা ফুলের মতো মেয়েকে নিজের ইচ্ছে মতো ব্যবহার করবে ভাবতেই রি রি করে উঠলো তার গা-টা। অসংখ্য বাংলা হিন্দি সিনেমা সিরিয়ালে বোনদের উপর এরকম অত্যাচারে তাদের ভাইদের নায়ক হয়ে ওঠার অবাস্তব কল্পনায় নিজের অসহায়তা স্পষ্ট হয়ে উঠলো হঠাৎ। মলি বললো, ‘আর তাছাড়া নিজের দিকটাও তো ভাবো। তোমার বোন যদি দুটো বাচ্চা নিয়ে হঠাৎ চলে আসে, এই ফ্ল্যাটে কোথায় থাকতে দেবে? দু কামরার ফ্ল্যাট। ছেলে বড় হলে ওর তো একটা ঘর লাগবে। অকারণ খাল কেটে কুমির এনো না।’ 

– ঠিক আছে। সেরকম হলে ওকে আলাদা একটা ফ্ল্যাট কিনে দেব না হয়। 

– কোত্থেকে দেবে শুনি? বলি সারাজীবন কম দায়িত্ব কর্তব্য তো পালন করনি! বাপ তো জন্ম দিয়েই খালাস। এত লাখ খরচ করে বিয়ে দেওয়া, বছরে বছরে তত্ত্ব-তালাস, ভাগ্নে-ভাগ্নির অন্নপ্রাশন – কোনটা করোনি তুমি? কুবেরের বংশে তো আর জন্ম নয় তোমার! চুপ করে বসে থাকো ঘরে, কোথাও যাবার দরকার নেই। 

পূব আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। নিখিলেশের মনে পড়ে পিঙ্কির বিয়ের দিন ও ওদের বাড়ীর ছাদে চুপ করে দাঁড়িয়ে ভোরের আকাশ দেখছিল। ও টের পায়নি পিঙ্কি কখন উঠে এসে ওর পাশে দাঁড়িয়েছিল। ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠেছিল সে ‘জানি দাদাভাই, এ বিয়েতে তোমার মত ছিল না। আমার কেবলি যেন মনে হচ্ছে তোমাকে কষ্ট দিয়ে যে বিয়ে, তার সুখ আমার সইবে না।’ 

– দূর পাগলি। আমি কি কষ্টের বিনিময় চাইছি? আমার মতে হোক বা অমতে, তুই সুখী হলেই আমি সুখী। 

– আমার বড় ভয় করছে দাদাভাই। 

– বোকা মেয়ে। তোর মত রূপবতী গুণবতী মেয়ের কিসে অভাব? কেউ তোর দোষ ত্রুটি খুঁজে পাবে না বোনু। আর যাই হোক, তোর দাদাভাই তো তোর মাথার ওপর সারাজীবন থাকবে। 

বড় একটা দীর্ঘশ্বাস বের হল নিখিলেশের। ইলামবাজার অনেক দূরের পথ; যেতে হলে এক্ষুনি বেরোনো দরকার। কিন্তু মলির সাথে যেসব আলোচনা হল এই নিয়ে, তারপর আর যাওয়ার প্রবৃত্তিই এল না ভেতর থেকে। ইচ্ছে হলো পিঙ্কিকে একটা ফোন করার, কিন্তু এত সকালে করার সাহস হল না। কীভাবে, কোন অবস্থায় আছে মেয়েটা কে জানে। 

আলমারীটা গোছাতে গিয়ে পুরোনো অ্যালবামে এসে থমকে গেল নিখিলেশ। এই ছবিগুলো ওর ছোটবেলার স্মৃতি জড়ানো, সুতরাং মলির  নাগালে এগুলো থাকে না। ছবিগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে। যতই বিরক্তি পুষে রাখুক বাবা মার জন্য সারাজীবন, আজ এসে বোঝে তাদের অসহায়তাটুকু। সারাজীবন এত সাবধানতার মাঝখানে কোনও এক দিনের সামান্য অসতর্কতা তো তাদেরও কম বিড়ম্বিত করেনি। সর্বোপরি তাদের হাতে আজকের মতো এতরকম জন্ম নিরোধক বিষয়বস্তুর নাগালও ছিল না। ওর মনে পড়ে, ও যখন মাস্টার্স করছে, ওর বাড়ীর সবাই মিলে দীঘা বেড়াতে গিয়েছিল। বাবার যা চাকরী ছিল, জীবনে ওরা বড় রকমের বিলাস-ব্যসন কোনওদিনই তেমন করে উঠতে পারেনি। নিখিলেশের মনে আছে বাবা মার সাথে ওর বেড়াতে যাওয়া সাকুল্যে তিনবার। দুবার পুরীতে, একবার পিঙ্কি হওয়ার পর দীঘাতে। নিখিলেশের বিন্দুমাত্র যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু সাত বছরের পিঙ্কির আবদার এমনই ছিল, সে অমত করতে পারেনি। দীঘার সমুদ্রে পিঙ্কির হাত ধরে হাঁটা, ওর ভয় চকিত চাউনি, ‘দাদাভাই পায়ের তলা দিয়ে বালি সরে গেল যে!’ – বলতে গিয়ে ওর কোলে লাফিয়ে ওঠা – কতটুকু আর ফটোর ফ্রেমে থাকে? বীচে ঘুরে বেড়ানো ফটোগ্রাফারকে দিয়ে একটা কি দুটো গ্রুপ ফটো তুলতেই যা খরচ, সাধারণ চাকুরীজীবিদের তাতেই বাহুল্য নজরে পড়ে। আজ বড় মনে পড়ছে পিঙ্কির কথা। আজকাল বড় একটা কথা হয় না ওর সাথে। নিখিলেশ ফোন করতেই পারে, কিন্তু ওর সব সময় মনে হয় পিঙ্কি ওর সাথে কথা বলার সময় একটা মুখোশ পরে নেয়, যাতে কোনও ভাবে কোনও লুকোনো দীর্ঘশ্বাস ওর বের না হয়ে আসে। আজ কী ভেবে ফোনটা লাগালো পিঙ্কিকে। এই দুপুরবেলা হয়তো একা পাওয়া যাবে ওকে। ‘কী রে বোনু, কী খবর? 

– খবর ভালো দাদা ভাই। তুমি কেমন আছো? 

– আছি একপ্রকার। জানিস তো, এখন আমাদের ওই দীঘা যাওয়ার ফটোগুলো দেখছিলাম। কতটুকু ছিলি তুই। 

– হ্যাঁ, সে একদিন ছিল! 

– তোর মনে আছে সেসব? 

– মনে আছে, পায়ের তলা থেকে বালি সরে যাচ্ছিল ভাটায় – আমি ভয় পেয়ে তোমার কোলে লাফিয়ে উঠেছিলাম। 

– এটা কি তোর মনে আছে সত্যি সত্যি? 

– তুমি প্রায় বলতে তো! বোধহয় ওই বাক্যগুলোই দৃশ্য হয়ে আমার মাথায় গেঁথে আছে। 

– একবার তোতে আমাতে দীঘা ঘুরে এলে হয়। যাবি বোনু? 

– তা কী করে সম্ভব দাদাভাই? তোমারও তো পরিবার আছে, আমারও। 

– এক কাজ করলে হয় না? তোর বউদি তো পূজোর সময় শানুকে নিয়ে বাপের বাড়ী যায়। তোকে যদি সে সময় কলকাতায় নিয়ে আসি? একদিন টুক করে তার মাঝে ঘুরে আসবো গাড়ী করে! 

– থাক দাদা ভাই। অশান্তি হতে পারে। তার চেয়ে ওই ছেলেবেলার স্মৃতিটুকু ভালো। 

– এবার কটা দিন এসে থাকবি বোনু? পূজোতেই চলে আয়, একেবারে ভাইফোঁটা কাটিয়ে যাবি। 

– থাক দাদাভাই, তোমাদের জামাই-এর অসুবিধে হবে। এতদিনের জন্য কী ব্যবস্থা করে যাবো, বল? 

– বোনু, তুই ভালো আছিস তো? 

– হ্যাঁ দাদাভাই। তুমি অকারণ কেন চিন্তা করো আমায় নিয়ে? 

– বড় অসহায় লাগে বোনু। আমি তোর মাথার উপরে বটগাছ হতে পারলাম না রে! 

– কি যে বলো দাদাভাই! বটগাছ হবে কেন, তুমি তো আমার আকাশ। তোমার কথা ভেবেই তো মুক্তির স্বাদ পাই। তুমি হাঁটাচলা করছো তো ঠিকমতো? 

– হ্যাঁ? 

– ঠিকঠাক সব কিছু মেনে চলো। নইলে সুগার টুগার বেড়ে যাবে। আমাকে নিয়ে বেশী চিন্তা করো না। 

ফোনটা রেখে মনটা বড় বিষণ্ণ হয়ে গেল নিখিলেশের। ও দিকের ঘরে বোধ হয় মলি দিবানিদ্রা ছেড়ে বাথরুমে গেল। শানু বসে বসে মনে হয় মোবাইলে ভিডিও গেম খেলছে। আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারী গোছানোয় মন দিল সে।

   পিঙ্কির ছেলে মেয়ে দুটোকেও যদি মিশন টিশনে ভর্ত্তি করে দেওয়া যেত, ওরা মানুষ হত। ওই পরিবেশে থেকে কী পড়াশুনা শিখবে কে জানে! 

    বাড়ি ফিরেই ধপাস করে একটা চেয়ারে এসে বসে পড়ল নিখিলেশ। মলি বলল, ‘এভাবে বসলে কেন? শ্মশান ফেরৎ স্নান টান করে নাও।’ নিখিলেশ কিছু উত্তর করলো না দেখে মলি আবার বলল, ‘কী বলল প্রতীম? কথা টথা বলল কিছু?’ 

– অসভ্য ইতর একটা। জানোয়ারটা বলে কিনা, ‘কতদিন আগেই তোমাকে নিয়ে চলে যেতে বলেছিলাম নিখিলদা, নিয়ে গেলে না। অন্তত প্রাণে বেঁচে থাকতো।’ কথাগুলো যেন এখনও কানে ঝিম ঝিম করে বাজছে নিখিলেশের। রাগে গরগর করতে করতে বললো, ‘তাই বলে তুই খুন করবি?’ 

– বাজে কথা বোলো না নিখিলদা। পিঙ্কি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টও তুমি দেখেছ। অকারণ অন্যের ঘাড়ে দোষ ফেলো না। 

– সেদিন বিকেলেও আমার সাথে কথা বলেছে পিঙ্কি। কোনও অবসাদ তো কই আমার কানে ধরা পড়েনি? আর তাছাড়া এতগুলো বছর তুই কি ওকে স্বস্তি দিয়েছিস? 

– স্বস্তি নিজেকে খুঁজে নিতে হয় নিখিলদা! ও তো আমাকেও অশান্তি দিত, তাই বলে কি আমি আত্মহত্যা করতে গেছি? 

– পিঙ্কি তোকে অশান্তি দিত? লজ্জা করে না বলতে? এতখানি শান্ত সুশীল মেয়ে সারা জীবন তোর খিদমদ খাটতে খাটতে কাটিয়ে দিল, ওর নামে এসব বলতে মুখে আটকায় না? 

– ফালতু বাজে কথা বলে দেব, তুমি ফোটো এবার নিখিলদা। মুখ খারাপ করিও না। এখনও দাদা বলে সম্মান করছি, এরপর সেটাও থাকবে না। 

– ঠিক আছে। দেশেও আইন আদালত আছে। দরকার পড়লে আমি সুপ্রিমকোর্ট অব্দি যাবো। দেখি তুই কী করে বাঁচিস। 

– আরে যাও যাও! যা খুশি করো গে। 

সম্বিৎ ফিরলো মলির কথায়। ‘তুমি কি থানায় এফ.আই.আর করেছ? 

– হ্যাঁ। 

– ভালই করেছ। যাও স্নান করো। আমি চা বসাচ্ছি। 

– মেয়েটাকে একবারে খুন করে দিল? এত খারাপ ছিল আমার বোন? এত চাপা শান্ত স্বভাবের মেয়ে – সারাক্ষণ তো সংসারের সবকিছু কাঁধে করে রাখতো!

– কত ভালো মেয়ের প্রতিদিন এভাবে মৃত্যু হচ্ছে, কে তার হিসাব রাখছে? ছাড়ো, যা হবার হয়ে গেছে। 

– ছাড়বো মানে? আমি এর শেষ দিকে ছাড়বো। দরকার হলে সুপ্রীমকোর্ট অবদি যাবো। ওকে যদি জেলের ঘানি না টানতে পারি… 

– থাক নিখিল, বেশী বড় বড় প্রতিজ্ঞা করতে যেও না। এইসব মানুষ পয়সা ছড়িয়ে সব কিনে নেবে। দেখবে, পুলিশ স্ট্রং কোনও কেসই দেবে না। 

– ভালো উকিল দেব। 

– মিছিমিছি ইমোশনাল হয়ো না নিখিল। উকিলরাও আজকাল বিক্রি হয়। তুমি তোমার কর্ত্তব্য করেছ, এবার ভুলে যাও সবকিছু। 

– তুমি কি মানুষ, মলি? এখানেও আমাকে বাধা দিচ্ছ? 

– এতে অমানুষের কী দেখলে? তোমার আবেগ বুঝে লাফাচ্ছি না বলে আমি অমানুষ হয়ে গেলাম? গুগলটা খুলে দেখতো রোজ এরকম কত খুন, কত আত্মহত্যা হচ্ছে সারা দেশে? ছাড়ো, তুমি পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাটাই স্টাডি করে দেখ না! 

– তাতে কী হবে? 

– দেখবে তোমার ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এরকম আকছার হচ্ছে। কেউ কি প্রকৃত বিচার পাচ্ছে? 

– তাই বলে চেষ্টা করবো না? 

– চেষ্টা তো করেছ। এফ.আই.আর করে দিয়েছ। এবার সিস্টেমকে বুঝতে দাও। 

– সিস্টেম কি নিজে থেকে বোঝে? ওকে চালাতে হয়। 

– বিষয়টা বোঝ নিখিল। তুমি থাকো কলকাতায়। আড়াইশো তিনশো কিলোমিটার দূরে রেগুলার তুমি জজ কোর্ট অ্যাটেম্পট করতে পারবে? হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট তো দুর অস্ত! 

– তুমি সব বিষয়ে নাক গলিও না মলি। আমার মেজাজ ঠিক নেই। দুটো বাজে কথা বলে দেব। 

– মন ভালো নেই, ভালো কথা; সেটা স্বাভাবিকও। তাতে সত্যটা বদলে যায় না। ইমোশনাল হয়ে কোনও বড় সিদ্ধান্ত নিতে নেই। এটা আমার কথা নয়, বড় মানুষরাই বলেন। সুতরাং ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো, তুমি নিজেই বুঝে যাবে অহেতুক উকিলের পিছনে লাখ লাখ ওড়ালে তোমার বোন ফিরে আসবে না, তার বরও জেলে ঢুকবে না!

 – এটা তোমার নিজের মেয়ে হলে কী করতে মলি?

– এই এক তোমার বাঙ্গালী সেন্টিমেন্ট শুরু হল। কিছু হলেই ‘তোমার মা বোন হলে কী হত’ মার্কা কথা – এসব আমি একদম বরদাস্ত করতে পারি না। আমার মেয়ে নেই যখন, মিছিমিছি ওরকম কষ্ট কল্পনা করবো কেন? 

– মানুষ নিজের ঘরে চোর ঢুকলেই প্রতিবেশীর বিবেক নিয়ে প্রশ্ন তোলে মলি। তখন দেখতে তুমিই থানা পুলিশ নিয়ে ঘর মাথায় তুলতে। 

– আমার মনে হয় না। আমার নিজস্ব কিছু প্রিন্সিপাল আছে নিখিল। অকারণ আবেগে আমি ভাসি না। 

– তুমি না ভাসতে পারো। আমি বিরজা উকিলের সাথে কথা বলেছি ফোনে। ওকে বলেছি ওর সিনিয়রের সাথে কথা বলতে। ও ভালো ক্রিমিন্যাল ল ইয়ার। 

– ওর ফিস কত? 

– পার অ্যাপিয়ারেন্স চল্লিশ হাজার। 

– এসব কেস ক’বছর চলে জানো? 

– আট দশ বছর মিনিমাম। 

– কত টাকা খরচ হবে হিসেব করেছ? 

– যায় যাবে। 

ঠিক আছে, তোমার টাকা তুমি খরচা করলে করতে পারো। এ বছরটা গেলেই সামনের বছর কিন্তু শানুর পেছনে লাগাতার টাকা ঢালতে হবে। মেডিক্যাল এমনি এমনি হয় না। কোচিং সেন্টারে ভর্ত্তি খরচাই আড়াই লাখ। 

চুপ করে গেল নিখিলেশ। কথাগুলো সত্যি। ওর টাকাও অফুরন্ত নয়। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের ব্যথা হঠাৎ করে চিড়িক মারলো বুকে। মলি উঠে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, বরং উকিলের টাকায় যে খরচা হত, তার একটা পার্সেন্টেজ পিঙ্কির ছেলে মেয়েদের নামে ব্যাঙ্কে ফিক্সড করে দাও। ছেলেটা বড় হয়ে লেখাপড়ার জন্য যদি কিছু সাহায্য চায়, ওটা দিতে পারবে। মেয়েটার বিয়ের জন্যও তো মামার বাড়ী থেকে কিছু দিতে হয়। 

হঠাৎ সামনের ফ্ল্যাটের রমা এসে বলল, ‘আন্টি তুমি ঠাকুর বরণ করতে যাবে না? মাম রেডি হয়ে আছে, তাড়াতাড়ি এস।’ 

মলি ওকে মিষ্টি করে বলল, ‘মামকে বলো চলে যেতে, আন্টির একটু দেরী হবে।’ 

নিখিলেশের মনে পড়লো, পাড়ার পুজোয় মা যখন বিজয়ার আগে মিষ্টি আর পান নিয়ে ঠাকুর বরণ করতে যেত, পিঙ্কি আবদার করতো, ‘মা আমাকে নিয়ে চলো, আমিও বরণ করবো।’ মা বলতো, ‘এটা এয়ো স্ত্রী’র কাজ মা। তোমার বিয়ে হোক, তখন করবে।’ 

বিয়ের পর পিঙ্কি আদৌ কোনওদিন ঠাকুর বরণ করতে পেরেছিল কিনা নিখিলেশের জানা হয় নি। দুর্গার মতো টলটলে মুখটায় সিঁদুর মেখে আরেকটা দুর্গার যাত্রামঙ্গল তৈরী করতো কিনা কে জানে? সারা জীবন নিজের সমস্ত রিপুকে হয়তো জয় করতে পেরেছিল সে, কিন্তু বাইরের রিপুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলো না শেষ পর্যন্ত। ক্যাম্পাসের বাইরের প্যান্ডেল থেকে ঘনঘন উলু ধ্বনি আসতে লাগলো, মলি বলল, ‘বাথরুমে গীজার ছেড়ে দিয়েছি, একটু গরম জল চালিয়ে নিও। আমি চা রেখে বেরিয়ে যাচ্ছি।’

Post a Comment

0 Comments