কূটনীতির আঙিনায় মমতার আলো
সুষমা স্বরাজকে মনে পড়ে...
কমলিকা ভট্টাচার্য
আমার প্রিয় জ্বলদর্চি পত্রিকা আর আমার প্রিয় বন্ধু দোলনচাঁপা তিওয়ারি দে-র মাধ্যমে নানা বিষয় জানতে পেরে আমার ভীষণ ভালো লাগে। আজ জানতে পারলাম, আজ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নারীদের দিবস। কূটনীতি সম্পর্কে আমি বিশেষ কিছু বুঝি না। রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভূ-রাজনীতি—এসব আমার চর্চার বিষয় নয়। কিন্তু "কূটনীতি" শব্দটা শুনতেই আমার চোখের সামনে এক মানুষের মুখ ভেসে উঠল—সুষমা স্বরাজ।
তিনি কোন রাজনৈতিক দলের ছিলেন, কোন মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন, সেসব নিয়ে আমি কখনও বিশেষ ভাবিনি। কারণ আমার কাছে তিনি প্রথমেই একজন অসাধারণ শ্রদ্ধার মানুষ। এমন একজন মানুষ, যিনি বিদেশমন্ত্রী হয়েও বহুবার একজন মমতাময়ী মায়ের মতো আচরণ করেছিলেন।
বিদেশমন্ত্রীর দপ্তরে বসে প্রতিদিন অসংখ্য ফাইলের ভিড়ের মধ্যে কাজ করতেন তিনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই ফাইলগুলোর মধ্যে তিনি কাগজ দেখতেন না, দেখতেন মানুষ। হয়তো পৃথিবীর কোনো প্রান্তে একজন ভারতীয় শ্রমিক আটকে আছেন, কোথাও কোনো ছাত্র পাসপোর্ট হারিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে, কোথাও কোনো পরিবার প্রিয়জনের জন্য উদ্বেগে কাঁদছে—সেই সব খবর যেন কোনো অদৃশ্য পথ দিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছে যেত।
তিনি বলতেন," আমি দেখছি ,কি করা যায়।"
এই সহজ বাক্যের মধ্যেই মানুষ ভরসা খুঁজে পেত।
২০১৫ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে হাজার হাজার ভারতীয় যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে আটকে পড়েছিলেন। চারদিকে গোলাগুলি, বোমাবর্ষণ, মৃত্যুভয়। অনেক পরিবার ভারতে বসে দিনরাত উৎকণ্ঠায় কাটাচ্ছিল। সেই সময় শুরু হয় ঐতিহাসিক উদ্ধার অভিযান অপারেশন রাহাত। দিনরাত পরিশ্রম করে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। শুধু ভারতীয়ই নয়, বহু বিদেশি নাগরিকও সেই অভিযানের মাধ্যমে নিরাপদ আশ্রয় পান। দেশে ফিরে আসা বহু মানুষ বলেছিলেন, তাঁরা শুধু একটি সরকারি অভিযান দেখেননি, অনুভব করেছিলেন কেউ তাঁদের জন্য সত্যিই উদ্বিগ্ন ছিলেন।
🍂
আবার একদিন জার্মানির একটি শরণার্থী শিবিরে আটকে পড়েছিলেন গুরপ্রীত নামে এক ভারতীয় মহিলা এবং তাঁর ছোট্ট মেয়ে। বিদেশের মাটিতে অসহায় অবস্থায় তাঁদের দিন কাটছিল। সাহায্যের আবেদন পৌঁছাল সুষমা স্বরাজের কাছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতীয় দূতাবাস সক্রিয় হয়ে উঠল। মা ও মেয়েকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হলো এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলো। সেই ঘটনায় আমি একজন মন্ত্রীকে দেখি না; দেখি এমন একজন মানুষকে, যিনি দূরে কোথাও বিপদে পড়া একটি শিশুর কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।
আরেকটি ঘটনা আমাকে আজও নাড়া দেয়। গীতা—একজন বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ভারতীয় তরুণী। ছোটবেলায় ভুলবশত সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। বছরের পর বছর তিনি সেখানে থেকে গিয়েছিলেন নিজের পরিচয় ছাড়াই। খবরটি যখন সুষমা স্বরাজের কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি তাঁকে কেবল আরেকটি সরকারি মামলার মতো দেখেননি। তিনি বলেছিলেন, "গীতা আমাদের মেয়ে।" সেই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন মমতার সমস্ত উষ্ণতা ছিল। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর গীতা দেশে ফিরেছিলেন। তাঁকে স্বাগত জানানো হয়েছিল পরিবারের সদস্যের মতো।
এমন ঘটনা আরও অসংখ্য। গভীর রাতে টুইটারে কেউ সাহায্য চাইছে—বিদেশে পাসপোর্ট হারিয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি, বা বাড়ি ফিরতে পারছে না। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সাড়া দিতেন তিনি। অনেক সময় মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখেছে, বিদেশমন্ত্রী নিজে তাঁদের বার্তার উত্তর দিয়েছেন। সরকারি ক্ষমতার সঙ্গে এতখানি মানবিকতা খুব কম মানুষই দেখাতে পেরেছেন।
হয়তো এই কারণেই সুষমা স্বরাজকে মনে পড়লে আমার রাজনৈতিক পরিচয় মনে পড়ে না। মনে পড়ে এক মায়ের মুখ। এমন একজন মানুষের কথা মনে পড়ে, যিনি বুঝেছিলেন রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার ক্ষমতায় নয়, তার সহমর্মিতাতেও। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অচেনা মানুষের কান্না, উদ্বেগ, অসহায়তা যেন তাঁর নিজের পরিবারের মানুষের দুঃখ হয়ে উঠত।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় হয়তো একে কূটনীতি বলা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষায় এর নাম মমতা।
তাই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নারীদের দিবসে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সুষমা স্বরাজকে।
আমি জানি ইতিহাস তাঁকে একজন দক্ষ কূটনীতিক হিসেবে মনে রাখবে,কিন্তু আমার মত সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় একবারে অন্যরকম,তিনি গভীর মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর কাজ আমাদের শিখিয়েছে—কখনও কখনও একটি দেশের বিদেশমন্ত্রীও হাজার মাইল দূরে থাকা অচেনা মানুষের কাছে মায়ের মতো হয়ে উঠতে পারেন।
আর হয়তো সেই কারণেই, কূটনীতির কথা উঠলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে না কোনো কূটনৈতিক বৈঠকের ছবি, ভেসে ওঠে এক স্নেহময়ী মুখ,যিনি প্রমাণ করে ছিলেন কূটনীতি, পদমর্যাদা কখনো মানবিকতার থেকে বড় নয়,
0 Comments