জ্বলদর্চি

মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা/ পঞ্চম পর্ব /স্বাতী ভৌমিক

মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা 
 পঞ্চম পর্ব 

 স্বাতী ভৌমিক 

 এই পর্বে "যোগ" সম্পর্কে কিছু কথা ব্যক্ত করতে চলেছি।

 জীবনে প্রথম যখন "যোগ" শব্দটি শুনেছিলাম, তখন খুব সম্ভবত যতদূর মনে পড়ে "যোগ" বলতে Plus তথা অংকের যোগফল নির্ণয় করা অর্থে জেনেছিলাম। "যোগ" বলতে যোগদান অর্থটিও জেনেছিলাম। তারপর যখন "দর্শন" বিষয়টি আমার পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভূক্ত হলো, তখন মহর্ষি পতঞ্জলির "যোগদর্শন" সম্পর্কে অবহিত হলাম। যেখানে যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি এই আটটি যোগের অঙ্গ সম্পর্কেও আলোচনা হয়েছে।

 প্রাথমিকভাবে এই জানাটা নেহাৎই পরীক্ষা বৈতরণী পার হবার একটা উপাদান হিসেবেই মুখস্ত করেছিলাম, পরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে যখন বিস্তৃত আকারে পড়েছিলাম তখন ভারতীয় দর্শনের এই শাখাটি পড়তেও ভালো লেগেছিল এবং এই দর্শনের আলোচনার বিষয়গুলির বাস্তব উপযোগিতা কিছুটা উপলব্ধিও করেছিলাম।

 তারপর মাঝখানে বেশ দীর্ঘ সময় এই বিষয় সম্পর্কে আলোচনা- জ্ঞানলাভ বা জ্ঞানান্বেষণ বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ব্যস্ততায়, বলা যায় এক অর্থে ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল।
🍂
 পরে যখন বিষয়টির সাথে পুনঃসংযোগ হয়, তা তখন এক নতুন রূপে আমার সামনে উপস্থিত হয়। বিভিন্ন ব্যাপার অনুধাবন করে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞান আরো কিছুটা সমৃদ্ধ হয়। এই বিস্তৃত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় সম্পূর্ণরূপে বোঝা আমার মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে খুব একটা সহজ বিষয় বলে মনে হয় না। তবে যেটুকু জেনেছি-বুঝেছি, তারই কিছু মর্মকথা এই পর্বে লিখতে চলেছি।

 "যোগ" কথার অর্থ হল "সংযোগ"। জাগতিক বিষয়ের সাথে বিষয়ীর সংযোগ এবং তৎসংযোগপ্রাপ্ত বিভিন্ন শিক্ষা- তা তো স্বাভাবিক- পরিবর্তনশীল এবং সহজসাধ্য। এই সংযোগ সুখ-দুঃখ এবং চঞ্চলতার কারণ। কিন্তু আধ্যাত্মিক সংযোগ যা সাধনালব্ধ, সহজলভ্য জিনিস নয়।এর জন্য প্রয়োজন গভীর মনঃসংযোগ এবং মানসিক প্রস্তুতি। মনের স্বভাবগত কাজই হল বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গমন করা। এর ফলে মানবচিত্ত সদাচঞ্চল, অস্থির থাকে। মহৎ জিনিসের জন্য কিছু মহৎ অভ্যাস ও গুণাগুণ অর্জন করার প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রয়োজন। যোগাভ্যাসের মাধ্যমে চিত্তবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত হয়, মনে স্থিরতা তথা শান্তি আসে। ব্যক্তিমন দ্রষ্টারূপে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

 বিষয় চাঞ্চল্যে সবচেয়ে যে বিষয়টি অবহেলিত হয় তা হল- ব্যক্তির নিজস্ব সত্তা সম্পর্কে সচেতনতাবোধ। "যোগ" সেই নিজসত্তার সাথে সংযোগস্থাপনে সহায়তা করে। মনের তিনটি স্তর রয়েছে- চেতন, অবচেতন ও অচেতন। আমরা- সাধারণ মানুষজনদের মন চেতন তথা সাক্ষাৎলব্ধ বিষয় সম্পর্কেই বেশি Active থাকে কিন্তু চেতন স্তরের থেকেও অনেক বেশি পরিসরযুক্ত মনোরাজ্য হল মনের অবচেতন স্তর।মনের এই স্তরের প্রভাব আমাদের জীবনে অপরিসীম। যা আপাতদৃষ্টিতে স্বীয় সম্পর্কে অজানা মনে হয়, তার উত্তর থাকে অবচেতন স্তরে। কিন্তু এই উত্তর পাওয়ার জন্য দরকার গভীর আত্মপর্যবেক্ষণ। সেক্ষেত্রেও যোগাভ্যাসের গুরুত্ব অবশ্য স্বীকার্য।

 এই যোগাভ্যাস আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তো বটেই- শিক্ষাজগতে তথা শিক্ষাক্ষেত্রেও এর প্রয়োগের  গুরুত্ব অপরিসীম। ছাত্রছাত্রীরা তথা শিক্ষার্থীরা আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে অল্পবিস্তর অবহিত হলে বা অভ্যাস করলে শারীরিক ও মানসিক দীর্ঘ সুস্থতা লাভ করবে, একাগ্রতা বৃদ্ধি পাবে, স্মৃতিশক্তি ভালো হবে কারণ একাগ্রতা থাকলে যে কোন বিষয়ে আয়ত্ত করতে বা শিখতে অনেক কম সময় লাগে।

প্রাণায়াম, ধ্যানাদি অভ্যাসের দ্বারা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আবেগজনিত প্রক্ষোভগুলো নিয়ন্ত্রিত হলে কামক্রোধাদি রিপুগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে। ফলে ব্যক্তির আচার-আচরণ ধীশক্তিসম্পন্ন হয়। নিজের সম্পর্কে সচেতন হলে ব্যক্তির চেতনাও অনেক উন্নত হয়।

 এছাড়াও নিয়মিত যোগাভ্যাস- আত্মঅনুশীলন- এসবের বৃহত্তর ক্ষেত্রে অনেক আধ্যাত্মিক সুফল আছে। পূর্ণসত্তার উপলব্ধি- যা মুনি ঋষিদের তপস্যাকৃত ফল, তাতে এই যোগাভ্যাস-ধ্যান এসবের ভূমিকা রয়েছে।

 বর্তমানে "আন্তর্জাতিক যোগ দিবস" পালন বা তৎসম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মপ্রণালীর আয়োজন- ভারতবর্ষের প্রাচীন ঐতিহ্যকে যেমন সম্মান প্রদান করছে, তেমনি জাতির আধ্যাত্মিক চেতনার সুবিস্তার তথা মানসিক সমৃদ্ধির পথকেও এটি ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে দেখা যায়, শারীরিক-মানসিক- চেতনার সমৃদ্ধির জন্য প্রাণায়াম-ধ্যান ইত্যাদি যোগের বিভিন্ন অঙ্গগুলোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে- যা অত্যন্ত মঙ্গলকারক ব্যাপার।।

 ক্রমশ

Post a Comment

0 Comments