জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -২১৩


ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -২১৩
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে
চিত্র গ্রাহক: গৌতম সেন

সম্পাদকীয় 

ছোট্ট বন্ধুরা, 
কেমন আছো সবাই? রথযাত্রা কেমন দেখলে? মেলায় গিয়েছিলে তো? রথের মেলার মজাটাই আলাদা, তাই না? জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা সনাতন ধর্মের অনেক প্রাচীন একটা উৎসব সেটা জানো তো? আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই উৎসব হয়। জগন্নাথ দেব আর তার দাদা বলভদ্র আর তাদের ছোট বোন সুভদ্রা এই তিনজন মিলে কাঠের রথে করে তাদের মাসির বাড়ি গুন্ডিচা মন্দিরে যায়। এরপর ন'দিন পরে উল্টো রথের দিন জগন্নাথ দেব ভাই বোন দের সাথে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। ওদের তিনজনের কিন্তু আলাদা আলাদা রথ। জগন্নাথ দেবের রথের নাম নন্দীঘোষ, এর চাকার সংখ্যা ১৬ টি। বলভদ্র দেবের রথের নাম তালধ্বজ এবং  রথের চাকার সংখ্যা ১৪ টি । আর ছোট বোন সুভদ্রার রথের নাম  দেবদলন এবং রথের চাকার সংখ্যা ১২ টি। রথের মেলাতে আমি এখনো যখন যাই অবশ্যই পাঁপড় ভাজা খাব ই খাব। তোমরা সবাই রথের মেলাতে কে কি কেনো আর খাও অবশ্যই আমাকে জানিও। ভালো থেকো সবাই। অনেক ভালবাসা নিও। ইতি তোমাদের স্বাগতা দি

গ্রীষ্মের ঘ্রাণ   
কিশোর নাগ 

লাফালাফি দৌড়ঝাঁপ 
যতই বাড়ুক তাপ 
কিসের ভয় 
এই তো আম পাড়ার 
       স ম য় 

পুকুরে হাঁস 
জ্যৈষ্ঠের নীল আকাশ 
উড়ছে কালো মেঘ
কী দুরন্ত তার বেগ 

নীলচে লেজওয়ালা 
মৌটুসী 
বেশ হাসিখুশি 
সাদা গলা মাছরাঙা 
গ্রীষ্মের ঘ্রাণ আঁকা
সমজিতা জানা, ক্লাস - iii, Medinipur DAV School .

একটি সত্যি  ভূতের গল্প   
               
বিমল গুড়িয়া

সেদিন ছিল শনিবার। জুন মাসের মাঝামাঝি একটি সময়। তারিখ মনে নেই। থাকার কথাও নয়, কারণ সেটা বিগত শতাব্দীর ঘটনা— ১৯৮৮ সাল। 
    শালবনী ব্লক প্রাইমারি হেল্থ সেন্টারে সকালের আউটডোর ডিউটি সেরে, দুপুরান্তে খাওয়া দাওয়া করে যখন বাস ধরলাম তখন সাড়ে ৩টে। 
   খড়গপুর থেকে তারকেশ্বর গামী বাস। আমি আরামবাগে নামব।  একটি বন্দর গামী বাস ধরে আরো আধ- ঘন্টা,  গৌরহাটি -ডোঙ্গলের মোড়ে নামব। সেখান থেকে রিক্সায় চেপে দেড় কিলোমিটার পিচ রাস্তা ধরে ডোঙ্গলবাঁধে পৌঁছাবো। তারপর পায়ে হেঁটে দ্বারকেশ্বর নদী পার হয়ে আরো এক কিলো মিটার মোরামের বাঁধা রাস্তা ধরে গিয়ে আমাদের গ্রাম, বসন্তবাটী।
    কামারপুকুরে যখন বাস পৌঁছুল, তখনই আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। গাঢ় অন্ধকার নেমে এল সন্ধ্যার আগেই। আরাম বাগে যখন বাস থেকে নামলাম তখন মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। তারমধ্যেই বন্দর গামী বাসে উঠলাম।   
   গৌরহাটি, ডোঙ্গলমোড়ে যখন নামলাম, ঘনান্ধকার। সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। জনমানব নেই। স্টপেজে বাসশেডে একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পোকা মাকড়ের কামড় খাচ্ছি। আর গরুভেজা ভিজছি। 
   বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঘন্টা দুয়েক পরে বৃষ্টি একটু কমল। ডোঙ্গলের বাঁধ পর্যন্ত যে পিচ রাস্তা, তার উপর শুয়ে গেছে সরকারের বন সৃজন প্রকল্পের ইউক্যালিপটাস গাছ।
     তখন হয়ত রাত্রি ১০টা পার হয়ে গেছে।  পিচ রাস্তা ধরে হাঁটার চেষ্টা করছিলাম,  কিন্তু এগোবার জো নেই। প্রথমত, ঘনান্ধকার, কিছু দেখা যায় না। তবুও মুহুর্মুহু বিদ্যুতের ঝলকানিতে যতটুকু যাওয়া যায়। যেতে তো হবেই। তারপর রাস্তায় শুয়ে থাকা গাছের ডাল পালা। বাধা পাচ্ছিলাম প্রতি পদক্ষেপে।
এমতাবস্থায় চকিতেই ভুলুর কথা মনে এলো। গ্রামে থাকতে, কতবার কোথাও গিয়ে রাতে হয়ত একা একা ফিরছি।অন্ধকারে গা ছম্ ছম্.. করছে। ভয় পাচ্ছি। তখন 'ভুলু' কে জোরে জোরে ডাকতাম। সে যেখানেই  থাকুক, কয়েক মিনিটের মধ্যে দৌড়ে আমার কাছে হাজির হতো।আমাকে সঙ্গ দিয়ে বাড়ি নিয়ে আসত। তারপর তার বাহাদুরি দাবি করে মায়ের কাছে আদর খেত। মাটিতে গড়াগড়ি খেত।
 বলা হয়নি — ভুলু আমাদের সকলের প্রিয় সারমেয়। 
আমি যখন ক্লাস থ্রি তে পড়ি। ১৯৬৬ সাল। তখন একটি সাদা ধপ-ধপে কুকুর ছানা, শুধু মেরুন রঙের লটকা বড় বড় দুটো কান, চোখের ভ্রু দুটিও মেরুন, পিঠে একটি  উপবৃত্তাকার মেরুন ছোপ, লেজটিও মেরুন এবং বিলিতি কুকুরদের মতো,যেন একটি ফুলের স্তবক, সে আমার পিছে পিছে আমাদের প্রাইমারি স্কুল থেকে আমাদের বাড়ি এসেছিল।
    কয়েক মাসের মধ্যে সকলের আদর যত্নে সে অনেক বড় সড় চেহারার মস্ত একটি সারমেয় হয়ে উঠল। তাঁকে চেন দিয়ে বেঁধে রাখা যেত না, সে মুহূর্তের মধ্যে চেন ছিঁড়ে ফেলত। সে বড় হয়ে স্বেচ্ছায় আমাদের সারা গ্রাম রাতে পাহারা দিত। চোর ডাকাতের উৎপাত ছিল না ভুলুর জন্য। সে অন্যান্য কুকুরের মতো কারণে অকারণে ঘেউ ঘেউ করত না। তবে  সে যখন গম্ভীর আওয়াজ করত, যেন সিংহের গর্জন। যেন বজ্র নির্ঘোষ। যারা সেই আওয়াজ প্রথম শুনবে তাদের পিলে চমকে যাবে। হৃৎস্পন্দন ক্ষণিকের জন্য থমকে যাবে।
     ভুলুর সংগে খেলতে খেলতে আমি বড় হয়েছি। আমি যখন স্কুল যেতাম মাঝেই সে আমার সঙ্গী হতো। কখনো কখনো ক্লাসে ঢুকে পায়ের কাছে চুপ করে শুয়ে থাকত। এমনি তে খুব ভদ্র। কাউকে বিরক্ত করত না। আগেই বলেছি কারণে অকারণে সে টুঁ শব্দ করত না। কেউ খাবার দিলেও খেত না। সে নিজের বাড়িতে, নিজের পাত্রে, নির্দিষ্ট সময়েই  খাবার খেত। মায়ের দেওয়া খাবারই খেত, তবে আমি কিছু খেলে আমার কাছে খুনসুট্টি করে খাবারের ভাগ চাইত।

বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে কাঁপতে কাঁপতে, ঘনান্ধকারে, ভয়ার্ত আমি, অর্ধচেতন অবস্থায়, নিরুপায় হয়ে ভুলুকেই চিৎকার করে ডেকেছিলাম।
    "ভুলু ভুলু রে.. ভাই আমার.. যেখানেই থাকিস আমাকে নিয়ে যা রে.. ভুলু.. ভুলু..রে! "
    কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভুলু কোথা থেকে দৌড়ে দৌড়ে এল.. একবার আওয়াজ করল। যেন বলল, আমি এসে গেছি তোমার আর ভয় নেই..। তারপর সে একটু করে সামনে দৌড়ে যায়, রাস্তায় সাপ খোপ্ আছে কিনা দেখে আসে, তারপর ফিরে  এসে আমাকে নিয়ে এগোয়..।
    মধ্যরাত্রি পার করে বাড়ি পৌঁছে, ভিজে জামা কাপড় বদলে, আগুনের তাপে পা-হাত সেঁকে শরীর গরম করে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়েছিলাম মরার মতো। পরদিন দুপুরে, লাঞ্চের সময় মা ডেকে হেঁকে আমাকে তুলল। 
   ঘুম থেকে উঠে আমি মাকে বললাম, ভুলু কোথা.. ! তাকে দেখছি না..কেন? সেই তো কাল রাতে আমাকে বাড়ি আনল, না হলে হয়ত রাস্তায় মরে পড়ে থাকতাম। কাকপক্ষীও টের পেত না।

  মা বিস্মিত হয়ে বলল, তোকে কাল রাতে ভুলু এনেছে!
    আমি বললাম, "হ্যাঁ মা.. জমাট অন্ধকার ,রাস্তায় গাছ শুয়ে আছে, বৃষ্টি পড়ছে, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আমি ভিজে একশা হয়ে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছিলুম। খুব ভয় লাগছিল, তাই ভুলুকে ডাকলুম। ওই তো আমার ডাক শুনে সে এক ছুটে গিয়ে আমাকে রাস্তা দেখিয়ে আনল।
    মা চোখ বড় বড় করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর  বলল,  "কী বলছিস তুই! ভুলু তো তিনদিন আগে মরে গেছে। গ্রামের সবাই মিলে তাকে গোর দিয়ে এলো। ভুলুর শ্রাদ্ধ শান্তির অনুষ্ঠান হবে, পাড়ার সবাই ঠিক করেছে!"
   শুনে তো আমি হতবাক। 'তা কী করে হয়! ভুলু যে কাল রাতে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এল, প্রথমে আমার গা শুঁকল, তারপর ভোক্ করে দু বার আওয়াজ করল। আমাকে পথ দেখিয়ে আনল?"

খবরটা মুহূর্তের মধ্যে প্রথমে আমাদের পাড়া, তারপর আমাদের গ্রাম ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামেও ছড়িয়ে পড়লো। এই রকম ভুলু মতো একটি মহান আত্মার অনেক ধুমধাম করে শ্রাদ্ধ শান্তি হলো। সবাই ভুলু'র স্মৃতিচারণ করলো।
 'আমি তো লক্ষ্মণের মতো ভাইকে হারিয়েছি! যে ভাই বিপদে- আপদে  আমাকে আগলে রেখেছিল। মৃত্যুর পরও তার আত্মা আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে।
   আমি একজন বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ। ভূত প্রেত মানি না। না, আজো মানি না। তবু সেদিন ভুলু-ই তো আমাকে ঘোর বিপদে উদ্ধার করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল, এই সত্য আমি অস্বীকার করি কেমন করে!
 (সমাপ্ত)
🍂
রথযাত্রা 

রাজর্ষি মন্ডল


আজ বসেছে রথের মেলা দারুণ হৈ চৈ 
মায়ের সাথে ঘুরব মেলায় খাব চিড়া দই।

সন্দেশ আর জিভেগজা কিনব অনেক করে
রিনি ঝিনি ছোট্ট চিনি খাবে পেটটি ভরে।

নাগরদোলা চড়ব মেলায় বেলুন নিয়ে হাতে
ভয় পাব না এবারে আর মা যে আছে সাথে।

চকলেট নয় কুলের আচার ভা'য়ের জন্য কিনে
আনলে আবার আনন্দে সে নাচবে তা-ধীন ধীনে। 

আলুর চপ আর পাঁপড় ভাজা ছোট্ট বনুর প্রিয়
সাজাবো রথ ফুল মালিকায় ভরবে মোদের গৃহ।

জিলাপি আর মিহিদানা কী যে ভাল লাগে 
রথে আছে জগন্নাথ দেব মনের মাঝে জাগে।

রথের রশি টানবো যখন ভাই বোনেরা মিলে
পড়শীরা সব দেখতে এলে বলব কোথায় ছিলে।

শাঁখ ঘণ্টা কাঁসর তথন আনবে ছেলের দল
মা যে তাদের বলবে ওরে রথযাত্রায় চল।

মনের পাঠশালা ২

দিপালী সাহু 
M.A Psychology (clinical)
MSW. Working as a counsellor at a govt. hospital. Midnapur.যোগাযোগ: 7001695687


নিজের ভেতরে এক জাদুর দুনিয়া: মন কী আর সে কোথায় থাকে?
ছোট বন্ধুরা, তোমরা কি জানো, আমাদের সবার ভেতরে একটা দারুণ জাদুর দুনিয়া আছে? যেখানে কোনো টিকিট ছাড়াই মেঘের পিঠে চড়ে ঘুরে আসা যায়, আবার ইচ্ছে করলেই চকোলেটের নদীতে নৌকা চালানো যায়! এই জাদুর দুনিয়াটার নামই হলো আমাদের 'মন'।যাকে কখনো হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় না , চোখে দেখা যায় না , তবু সে সারাক্ষন আমাদের সাথে থাকে ।
কিন্তু এই মন জিনিসটা আসলে কী? আর সে লুকিয়েই বা থাকে কোথায়? চলো, আজকে এই মজার রহস্যটা জানা যাক!
মন আসলে কী?
মন কিন্তু চকোলেট বা খেলনার মতো হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় না, আবার চোখেও দেখা যায় না। মন হলো তোমার ভেতরের একটা অদৃশ্য বন্ধু।
তুমি যখন চোখ বন্ধ করে ভাবো যে তুমি সুপারম্যানের মতো আকাশে উড়ছ—সেটা হলো তোমার মন।পরীক্ষা শেষ হলে বা ছুটির ঘণ্টা বাজলে তোমার ভেতরে যে লাফালাফি শুরু হয়—সেটা হলো তোমার মন।
আর মায়ের ওপর ছোট্ট অভিমান হলে যে মুখটা হাঁড়ির মতো গোল হয়ে যায়—সেটাও কিন্তু তোমার মনেরই কাণ্ড!
সহজ কথায়, যা তোমাকে হাসায়, কাঁদায়, গল্প বানাতে শেখায় আর মিষ্টি মিষ্টি স্বপ্ন দেখায়—তা-ই হলো তোমার মন।
আমি যখন তোমাদের মতো ছোট ছেলে মেয়েদের জিগ্যেস করি মন কাকে বলে , কোথায় থাকে ? জানো সবাই অবাক হয় কিভাবে বলবে । যেন বুঝতে পারছি কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারছি না এইরকম ভাব । তাই না ? তবে কোথায় থাকে তার উত্তরে অনেকেই বুকের বামদিক দেখায় ।গান ,কবিতা ,সাহিত্যে মন বলতে হৃদয়কে বোঝানো হয় ,আর হৃদয় মানে হৃদপিন্ড । তাই তো আমরা বলি হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি , হৃদয় ভেঙেছে। রবিঠাকুরের কত গান কবিতা আছে হৃদয় নিয়ে । যেমন - হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে ( আনন্দ ), আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি( ভালোবাসা )  ইত্যাদি । তাহলে মন খারাপ হলে কেন মনে হয় যে বুকটা বুঝি ভারী হয়ে আছে ?আবার খুব ভালোবাসার কাউকে দেখলে বুকটা যেন আনন্দে লাফাতে থাকে ?বিজ্ঞান বলে, যখন আমাদের ব্রেনে কোনো তীব্র আবেগ (যেমন খুব ভয় বা খুব আনন্দ) তৈরি হয়, তখন ব্রেন আমাদের হার্ট বা হৃদপিণ্ডকে জোরে জোরে পাম্প করার সিগন্যাল পাঠায়। বুক তখন 'ঢিপঢিপ' করে। তাই আমাদের মনে হয় মনটা বুঝি বুকেই আছে! কিন্তু আসলে সব নির্দেশ আসে ওই মাথার ভেতরের বুদ্ধির বাক্স থেকেই।।শুধু ছোটরা নয়, বড়োদের ও অনেকের মন নিয়ে স্পষ্ট ও বিজ্ঞান ভিত্তিক ধারণা নেই । অথচ দেখো আমরা সারাদিন কত বার মন নিয়ে কথা বলি । আসলে মন কোনো দৃশ্যমান অঙ্গ নয় (যেমন হার্ট বা লিভার), যার নির্দিষ্ট একটা ঠিকানা আছে। সহজ কথায় বলতে গেলে: "মস্তিষ্ক বা ব্রেন যদি হয় একটা পিয়ানো তাহলে মন হলো তার সুর বা ব্রেন একটি কম্পিউটার এর হার্ডওয়্যার, তবে মন হলো তার সফটওয়্যার।"
এই নিয়ে  নিউরোসায়েন্স (স্নায়ুবিজ্ঞান) কীভাবে ব্যাখ্যা করে—তা একটু বলি 
বিজ্ঞান বলে আমাদের মন থাকে মূলত মস্তিষ্কে । তোমরা অনেকেই জানো নিউরন এর কথা ।আমাদের মাথার ভেতরে যে অসংখ্য নিউরোন থাকে,  যেগুলো সারাক্ষণ একে অপরের সাথে কথা বলে আর ছোট্ট ছোট্ট বৈদ্যুতিক সিগন্যাল বা কারেন্ট পাঠায়। তুমি যখন কোনো নতুন চকোলেট খাও, কোনো মজার কৌতুক শুনে হাসো, কিংবা অঙ্কের সমাধান করো—তখন মাথার ভেতরের এই নিউরনগুলো একসাথে আলো জ্বালিয়ে ওঠে (যেমনটা টুনি লাইট জ্বলে)। এই কোটি কোটি নিউরনের একসাথে কাজ করাটাকেই বিজ্ঞান বলে 'মন'। জানো তো মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ মনের , শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করে , অর্থাৎ মাথা হলো ইঞ্জিন বা রাজা। 
মস্তিষ্কের কিছু অংশ যেমন....
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex): কপালে ঠিক পেছনের এই অংশটি যুক্তি দিয়ে চিন্তা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সমস্যা সমাধান এইসব কাজ করে ।
অ্যামিগডালা ( Amygdala) : এটি মস্তিষ্কের গভীরে থাকা একটি ছোট অংশ, যা আমাদের  ভয়, রাগ ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে।
হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus): এটি আনন্দ বা দুঃখ সব স্মৃতি বা মেমোরি ধরে রাখে।
এর সাথে কিছু হরমোন বা নিউরোট্রান্সমিটার মনের বিভিন্ন আবেগ বা অনুভূতি তৈরিতে কাজ করে।

আবার psychology বা মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মন হলো দৈনন্দিন জীবনের ভাবনা চিন্তার ,ইচ্ছা অনুভূতির, উপলব্ধির সমষ্টি।  এটি কোনো বস্তু নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া।
মনোবিজ্ঞান অনুসারে মন মূলত তিনটি প্রধান কাজ করে:
ভাবনা (Thinking): আমরা  কী চিন্তা করছি বা কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। 
অনুভূতি (Feeling): সেই চিন্তা বা সিদ্ধান্ত এর ফলে পাওয়া আনন্দ, দুঃখ, রাগ, বা ভালোবাসা।
ইচ্ছা ও আচরণ (Willing & Acting): কোনো কিছু করার ইচ্ছা এবং সেই অনুযায়ী কিছু করা।
মন ও মস্তিস্ক খুব সুক্ষ ও জটিল । তোমরা বড়ো হলে বিস্তারিত পড়বে । এখানে খুব সহজ ভাবে বললাম। 
তোমরা দেখলে তো মন ও শরীর একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত এবং একে অপরের পরিপূরক ।
তাই যখন আমাদের রাগ হয় তখন হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যায় , শ্বাস- প্রশ্বাস দ্রুত হয়, চোয়াল শক্ত হয় চোখ মুখ লাল হয়ে যায় ।ভয় হলেও তেমন হয় । তোমাদের অনেকের নিশ্চয়ই পরীক্ষার আগে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। ধরো ভয়ের ভাবনা এলো মনে কিন্তু প্রকাশ পেলো শরীরে ।রাগ জন্মালো মনে , আর তার আওয়াজ পুরো শরীরে শোনা গেলো। 
আবার শরীর খারাপ থাকলে মন ভালো লাগে না ।রাত এ ঘুম ভালো না হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় ।বুঝতে পারলে তো এটা একটা চক্রের মতো । একটা আর একটাকে প্রভাবিত করে ।তাই শরীর ও মন দুটোকেই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে,  যত্ন করতে হবে । শরীরের যত্ন কেমন করে করি ? বিভিন্ন ধরণের পুষ্টি দেয় এমন বিভিন্ন ধরণের খাবার খাই , পর্যাপ্ত জল খাই , প্রতিদিন নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখি , সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় দিয়ে সুগন্ধি দিয়ে সাজিয়ে রাখি।  তাই তো? 
তোমরা কি জানো, মনের ও পুষ্টিকর খাবার হয় ?, মন পরিষ্কার করার সাবান আছে ?  মনকে সুন্দর করে তৈরী করা যায় ?মনের কাটা ছেঁড়ার জন্য ও ফার্স্ট এইড বক্স হয়?  
জানো না ? 
বেশ পরবর্তী সংখ্যায় আমরা এগুলো জানবো । তোমরা অবশ্যই পড়ো কিন্তু।

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ : ২৮

রতনতনু ঘাটী

আজ সকাল-সকাল গগনজ্যোতি স্কুলের খেলার মাঠে ইট-বালি-স্টোনচিপস ভরতি ট্রাক যাওয়া-আসা শুরু করে দিয়েছে। দেবোপমস্যার সকাল থেকেই তদারক করতে চলে এসেছেন স্কুলে। হেডস্যার বলে দিয়েছেন, ‘দেবোপম, এখন থেকে আমাদের স্কুলের ক্রিকেট কোচিংয়ের জায়গা কমে গেল। এর মধ্যেই এদিক-ওদিক করে ছোট জায়গার মধ্যে কোচিংটা চালিয়ে যাও। আমি স্কুলের কমিটির মিটিং ডেকে স্থির করে ফেলি কবে আমাদের স্কুলের ক্রিকেটের ফাইনাল ম্যাচ হবে?’

   অনীক দত্তদের বাড়ির পাশে একটা ছোট উঠোন আছে। ধানের ফলনের সময় ওখানে ধানের মরাই বসে। না হলে ফাঁকাই পড়ে থাকে সারা বছর। একদিন স্কুলে আসছিলেন দেবোপমস্যার। স্কুলের মাঠে এখন চলছে সে এক মহা দক্ষযজ্ঞ। তিনি ভাবলেন অনীকবাবুদের বাড়ি গিয়ে একবার বলে দেখতে কেমন হয়? গিয়ে বলি না কেনষ ‘অনীকদাদু, এখন তো বেশ ক’মাস আপনাদের উঠোনটা খালি পড়ে আছে? আমরা গগনজ্যোতি স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিকেলবেলা যদি স্কুল ক্রিকেটের কোচিংয়ের প্র্যাকটিস করাতে আসি, আপনার আপত্তি হবে না তো? সপ্তাহে দু’ দিন হবে আমাদের প্র্যাকটিস? ঘণ্টাদুয়েক সময় আমরা আপনার বাড়ির এই উঠোনে যদি ক্রিকেট প্র্যাকটিস করাই?’

   অনীকবাবু সকালবেলা খবরের কাগজ পড়ছিলেন ইজিচেয়ারে বসে। মুখ তুলে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাকে চিনতে পারলাম না তো? আপনি কি গগনজ্যোতি স্কুলের টিচার? কই, আগে কখনও দেখিনি তো? হেডস্যার নবনীতবাবু কি বলে পাঠিয়েছেন আপনাকে?’

   ‘আমি গগনজ্যোতি স্কুলের অঙ্কের টিচার অনীকদাদু। সেই সঙ্গে স্পোর্টসেরও দেখাশোনা করি। আমাদের স্কুলে আলাদা করে স্পোর্টসের কোনও টিচার নেই। আমি স্কুলে ফিরে গিয়ে হেডস্যারের পারমিশান নিয়ে আসব। আগে আপনার অনুমতি তো চাই?’

   ‘কী নাম আপনার?’

   ‘আমার নাম দেবোপম দত্ত।’

   অনীকবাবুর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল, ‘ঠিক আছে স্যার। ক্রিকেট কোচিং শুরু করে দিন না! আমার উঠোনটা এখন তো খালিই পড়ে আছে। হেডস্যার নবনীতবাবুকে বলে শুরু করে দিন কবে থেকে কোচিং করবেন। ভালই তো লাগবে। ছেলেমেয়েদের কলকাকলিতে ভরে উঠবে আমার বাড়ির উঠোন।’

   দেবোপমস্যার তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লেন। নমস্কার করে বলে এলেন, ‘অনীকদাদু, আমি এখন স্কুলে যাচ্ছি। হেডস্যারকে বলে তেমন হলে কাল থেকেই শুরু করে দেব আমাদের স্কুলের ক্রিকেট কোচিং! আসছি দাদু?’

   মনের আনন্দে টগবগ করে ফুটতে-ফুটতে দেবোপমস্যার গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠে হাজির হয়ে গেলেন। মাঠের মাথায় শেড তৈরির তদারক করতে-করতে স্কুলের শুরুর ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন ঘণ্টাদাদু। দেবোপমস্যার প্রেয়ারে গিয়ে যোগ দিলেন। সেখানেই হেডস্যারের সঙ্গে দেখা হল। দেবোপমস্যার প্রেয়ারের পর হেডস্যারকে বললেন, ‘স্যার, আপনার রুমে চলুন। আপনার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে।’

   ছেলেমেয়েরা যে-যার ক্লাসে চলে গেল। নবনীতস্যার তাঁর রুমে ঢুকে চেয়ারে বসলেন। তারপর দেবোপমস্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলো তো দেবোপম, কী যেন বলতে চাইছিলে?’

   দেবোপমস্যরের মুখে কুণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ল। বললেন, ‘স্যার, আমাদের মাঠে আজ থেকে কনস্ট্রাকশানের জিনিসপত্র পড়তে শুরু করে দিয়েছে। ক্রিকেট কোচিংয়ের একটু তো সমস্যা হবেই। তাই আমি আপনাকে না জিজ্ঞেস করেই চলে গিয়েছিলাম অনীক দত্তের বাড়ি। আমি দেখছিলাম, অনীকবাবুদের উঠোনটা তো বেশ বড়। ধানের সময় ওখানে ধানের মরাই বসানো হয়। এখন তো ফাঁকা। ওঁর উঠোনটা পেলে আমাদের স্কুলের ক্রিকেট কোচিংটা কোনও ভাবে চালিয়ে যেতে পারব।’

   ‘অনীকবাবু কী বললেন তোমাকে?’

   ‘আমি আমাদের প্রবলেমের কথা খুলে বললাম। শুনে উনি খুবই খুশি হলেন। বললেন, এখনই ক্রিকেট কোচিং শুরু করে দিতে।’ বলে নিশ্চিন্ত মুখ করে তাকালেন হেডস্যারের দিকে।

   হেডস্যার বললেন, ‘বাঃ! তুমি বুদ্ধি করে একটা বড় কাজ সেরে এসেছ। উনি যখন রাজি হয়েছেন, তখন সামনের শনিবার থেকে ওখানেই ক্রিকেট কোচিংটা শুরু করে দাও। এদিকে আমি স্কুল কমিটির মিটিং ডেকেছি পরশু দিন। আমাদের ক্রিকেট ম্যাচের দিনটা ফিক্সড করে ফেলতে চাই? তুমি ভেবে বলো তো, কবে ফাইনাল ম্যাচ করা যায়? এক শনিবার স্কুলের সব ক্লাস বন্ধ করে দুটো ম্যাচ হবে। প্রথম ম্যাচ হবে ক্লাস এইট এ-সেকশানের সঙ্গে এইট বি-সেকশানের। দ্বিতীয় ম্যাচ হবে সি-সেকশানের সঙ্গে ডি-সেকশানের। এই দুটো ম্যাচে যে দুটো টিম জয়ী হবে, পরের দিন মানে রোববার সেই দুটো টিমের মধ্যে হবে ফাইনাল ম্যাচ। কী, তুমি বলো আমার প্ল্যান ঠিক আছে তো?’

   দেবোপমস্যার কথা শুরুর সময়ই এসে ঢুকলেন মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। এসেই হাসতে হাসতে বললেন, ‘নবনীতস্যার, আমি সমবায় ব্যাঙ্ক ওপেন হতেই মন্দাকিনীর অ্যাকাউন্ট থেকে দু’ লক্ষ টাকা ট্রান্সফার করে দিয়ে এলাম।’

   ‘আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব মুকুলবাবু? অনেক ঋণ জমা হয়ে থাকল আপনার কাছে।’

   হেডস্যারের কথায় হাঁ-হাঁ করে উঠলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু, ‘না না, এটা ঋণ হিসেবে দিচ্ছি না তো! এটা গগনজ্যোতি স্কুলকে আমার এবং আমার স্ত্রী মন্দাকিনীর দান। এটা অ-ফেরত যোগ্য!’

   ‘দেখলে দেবোপম, এমন মানুষ পেয়েছি বলে আমরা আজ এত বড় উদ্যোগ নিতে এগিয়ে যেতে পারছি।’ তারপর দেবোপমকে দেখিয়ে হেডস্যার বললেন, ‘এদিকে দেবোপম আর একটা মারাকল ঘটিয়ে এসেছে।’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু কোতূহলী গলায় জানতে চাইলেন, ‘কী, বলুন!’

   ‘আমাদের স্কুলের মাঠে আজ সকাল থেকে কনস্ট্রাকশানের জিনিসপত্র পড়তে শুরু হয়ে গিয়েছে। ক্রিকেটের কোচিং তা হলে সামনের শনিবার কোথায় হবে? সে কথা ভেবে দেবোপম একটা বুদ্ধির কাজ করে এসেছে। ও আজ সকালে চলে গিয়েছিল অনীক দত্তের বাড়ি। গিয়ে বলেছে, আমাদের স্কুলের মাঠের মাথায় শেড তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে। তাই আমাদের যদি আপনার উঠোনে সপ্তাহে দু’ দিন দু’ ঘণ্টা করে ক্রিকেট কোচিং করাতে দেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে, তা হলে খুব ভাল হবে।’

   মুকুলবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী বললেন অনীকবাবু?’

   ‘উনি আনন্দিত মনে আমাদের দেবোপমকে সম্মতি দিয়েছেন। আমরা কয়েকদিন ওখানেই আমাদের ক্রিকেট কোচিং করব। এর মধ্যে আমি স্কুলকমিটির মিটিং ডেকেছি বুধবার দিন। আমাদের স্কুলের এই ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনালের দিন ঠিক করার জন্যে। কারণ, এর পরেই তো স্কুলের অ্যানুয়াল পরীক্ষা এসে  যাবে। ছেলেমেয়েরা পাড়শুনো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে? তার আগে ক্রিকেট-হুল্লোড়ের ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে পারলে ভাল হয়।’

   ‘আমি কী বলব স্যার! সব সময়ই আপনার কাজ গুছনো, পরিপাটি। তা না হলে এত বড় একটা স্কুল এমন সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারেন? তার মধ্যে শুরু করে দিয়েছেন স্কুলের মাঠের মাথার উপর শেড তৈরির মহাযজ্ঞ। ওদিকে ডি এম সাহেবের স্কুলক্রিকেট টুর্নামেন্টের জমজমাট কাণ্ড শুরু হতে আর বেশিদিন বাকি নেই। আমি ভাবতেই পারছি না!’

   নবনীতস্যার হেসে বললেন, ‘ভাবতে পারছি না বললে শুনছে কে বলুন? না আমি শুনব, না কর্ণার্জুন সাহেব শুনবেন! আপনিই তো আমাদের নির্ভরের জায়গা!’

   মুকুলকৃষ্ণস্যার বললেন, ‘আপনার স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচের দিনক্ষণ ফিক্সড হয়ে গেলে, ফাইনালের দিন বিখ্যাত কোনও ক্রিকেটারকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আনতে হবে তো?’

   ‘ওসব প্ল্যান আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি। যা ভাল হবে, সুন্দর হবে, আমাদের স্কুলের ক্ষেত্রে সুনামের হবে, সব আপনাকে করে দিতে গবে। গগনজ্যোতি স্কুল তো এক অর্থে আপনারও স্কুল!’

   এতক্ষণ দেবোপমস্যার সব শুনছিলেন। ইতস্ততঃ করে বললেন হেডস্যারকে, ‘স্যার, আপনি আর মুকুলবাবু কথা বলুন। আমি এখন ক্লাসে যাচ্ছি। ক্লাস থেকে ফিরে কবে আমরা অনীকবাবুর উঠোনে কোচিং শুরু করব, ঠিক করে নেব।’ বলে তাড়াতাড়ি দেবোপমস্যার ছুটলেন ক্লাস নিতে।

   হেডস্যার বললেন, ‘জানেন তো মুকুলকৃষ্ণবাবু, আপনাকে যেমন আমাদের সঙ্গে পেয়েছি—এ যেমন গড গিফটেড ব্যাপার, তেমনি দেবোপমকে পাওয়া আমাদের স্কুলের পক্ষে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ারই মতো! তার আগে আপনাকে বলে রাখি, আমাদের স্কুলের মাঠের মাথায় শেড তৈরির কাজ যত তানাতানি সম্ভব সেষ করে ফেলতে হবে। তাই আপনার সময় মতো আপনাকেও আমাদের এই কাজ তদারক করতে হবে। কেমন?’ 

   ততক্ষণে শেড তৈরির করবেন যিনি, তিনি এসে হেডস্যারের ঘরে ঢুকলেন, ‘মে আই কামিং স্যার?’ বলে। হেডস্যার মুকুলকৃষ্ণবাবুকে ইঙ্গিত করলেন, একটু বসে যেতে।

   মুকুলকৃষ্ণবাবু গলা তুলে ঘন্টিদাদুকে ডাকলেন, ‘ঘন্টিদাদু, কনট্রাকটরসাহেব এসেছেন। চা খাওয়ান!’ 

   গোটা কাজটার প্ল্যান নিজে হাতে নিয়ে বুঝে নিলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। কনট্রাক্টর মনোজ চাকলাদারকে এও বলে দিলেন, ‘আপনার সব লোকবল লাগিয়ে আমাদের স্কুলের এই শেড তৈরির কাজটা এক মাসের মধ্যে তুলে দিতে হবে। ওই শেডের নীচে ক্রিকেট পিচ তৈরি হবে, তারপর আমাদের স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনাল হবে। একজন বিখ্যাত ক্রিকেটারকে ন ইয়ে আসা হে সেই ফাইনাল ম্যাচের দিন। বুঝতেই তো পারছেন, খুব জমজমাট ব্যাপার হতে চলেছে!’

   বসে-বসে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছিলেন মনোজবাবু। মুকুলবাবুর কথা শেষ হতেই বললেন, ‘দেখুন, আপনাদের এই কাজটা তেমন বন কাজ নয়। আমি কথামতো কাজটা কমপ্লিট করে দেব। তার আগে আমাকে কথা দিন, আপনারা দরকার মতো আমার কাজের টাকা দিয়ে দেবেন তো? তা হলে দেখবেন টগবগিয়ে কাজ এগিয়ে চলবে!’

   মুকুলবাবু বললেন, ‘ও নিয়ে ভাবতে হবে না। নবান্ন থেকে আমাদের ফান্ড হতে এসে গেছে। এ ছাড়া প্রাইভেটলি যতখানি অনুদান আসার কথা, তাও হাতে আসার মুখে।’

   ততক্ষণে ঘন্টিদাদু চা দিয়ে গেলেন নবনীতস্যার বললেন, ‘নিন মনোজবাবু, চা খান!’

   তারপর নবনীতস্যার মুকুলবাবুকে দেখিয়ে বললেন, ‘ইনি আমাদের অয়েলউইশার। এই পুরো কাজটার সিংহভাগ টাকা ওঁর স্ত্রী এবং উনি আজই এইমাত্র আমাদের স্কুলের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়েছেন। অতএব মনোজবাবু, আপনার কাজ যেমন যেমন ভাবে এগোবে, অমন ভাবে পেমেন্ট আমরা কবে দেব।’ 

   ক্লাস সেরে ফিরে এলেন দেবোপমস্যার। হেডস্যার হা-হা করে হেসে বললেন, ‘দেবোপম, মনোজবাবু আমাদের স্বপ্নের কারিগর! উনিই স্কুলের মাঠের মাথায় রাজছত্র রচনা করে দেবেন তাড়াতাড়ি, কথা দিলেন!’

   দেবোপমস্যারের দিকে তাকিয়ে মনোজ চাকলাদার বললেন, ‘আর আমাকে হেডস্যারও প্রতিশ্রুতি দিলেন, আমার কাজ যত তাড়াতাড়ি আমি কমপ্লিট করতে পারব, উনি তত তাড়াতাড়ি আমার পেমেন্টও ক্লিয়ার করে দেবেন!’

   বলে সকলে হা-হা করে হাসতে লাগলেন। 

   এমন সময় রোরো মজুমদার এসে হেডস্যারের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘মে আই কামিং স্যার?’

   হেডস্যার মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘ইয়েস কামিং!’

   রোরো ঢুকেই দেবোপমস্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, আমাদের মাঠের অবস্থা তো লন্ডভন্ড! ফাইনালের আগে আর কি আমাদের কোচিং হবে না?’

   হেডস্যার হাসতে হাসতে বললেন, ‘হবে, হবে! চিন্তা কোরো না! দেবোপমস্যার আছেন যখন তোমাদের কিচ্ছু ভাবতে হবে না।’

   মনোজ চাকলাদার বললেন নবনীতস্যারের দিকে তাকিয়ে, ‘স্যার, আপনাদের ক্রিকেট ম্যাটের ফাইনালের দিন কোনও একজন বিখ্যাত ক্রিকেটারকে আনবেন? বৈভব সূর্যবংশীকে নিয়ে আসুন না! বাচ্চা ছেলে! যা খেলছে! স্কুলের ছেলেমেয়েরা খুব খুশি হবে!’

   রোরো মজুমদার হেডস্যারের রুম থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে বৈভবের নাম শুনে সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাঁ হাত তুলে থামস-আপ দেখিয়ে দৌড়ল ক্লাস রুমের দিকে!

(এর পর ২৯ পর্ব)                                                       


ডাক্তার বাবুর কলমে - ৬

ডঃ এ সামন্ত 
এম ডি হোমিওপ্যাথি, কুইকোটা, মেদিনীপুর। যোগাযোগ - 8768529098

১৯৭১ সাল চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বছর,  কারণ এক বাঙালি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিজ্ঞানী ডাক্তার দিলীপ মহালানোবিশ  ঐ বছর  ডায়রিয়া রোধে,  ওরাল ডিহাইড্রেশন সল্টের বা ও আর এস এর  সঠিক অনুপাত আবিষ্কার করে বৃহৎ পরিসরে ও আর এস এর জীবনরক্ষাকারী ক্ষমতা প্রমাণ করেন । আসলে ক্ষুদ্রান্তের কোষে সোডিয়াম পটাশিয়াম প্রভৃতি আয়নের ট্রান্সপোর্টেশন এর জন্য কি অনুপাতে গ্লুকোজের প্রয়োজন সেই যুগান্ত কারী আবিষ্কার করে দেখান। ফলশ্রুতি হিসাবে আক্রান্ত মানুষদের মধ্যে মৃত্যুর হার প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে নেমে আসে। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর মতে ও ও আর এস এর ২১ গ্রাম প্যাকেটের মধ্যে সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকে ২.৬ গ্রাম, পটাশিয়াম ক্লোরাইড থাকে ১.৫ গ্রাম, ট্রাই সোডিয়াম সাইট্রেট থাকে 2.9 গ্রাম, আর গ্লুকোজ থাকে ১৩.৫ গ্রাম। বাজারে সাধারণত দুই ধরনের ও আর এস পাওয়া যায়। একটা পাউডার ফর্মে অন্য টা লিকুইড ফর্মে। তোমরা পাউডার ও আর এস বা লিকুইড ও আর এস এর যে কোন একটা ব্যবহার করতে পারো। তবে অবশ্যই ব্যবহার করার আগে WHO - ORS  লেখা আছে কিনা দেখে নিও।  পাউডার ও আর এস আবার ২ রকমের  প্যাকেটে পাওয়া যায় । একটা 21 গ্রামের বড় প্যাকেট যা এক লিটার বিশুদ্ধ পানীয় জলের সঙ্গে মেশাতে হবে আর একটা ৪.২ গ্রাম এর ছোট প্যাকেট যা ২০০  এমএল বিশুদ্ধ পানীয় জলের সঙ্গে মেশাতে হবে।  একটা কথা মনে রেখো,  এই মিশ্রণ অবশ্যই ২৪ ঘন্টার মধ্যে পান করে নিতে হবে। ও আর এস কখনোই পাতলা বা গাঢ়  করে খাবে না । দুই ক্ষেত্রেই কিন্তু ক্ষতি হতে পারে। হাতের কাছে যদি তোমাদের ও আর এস এর প্যাকেট না থাকে তাহলে ২ গ্রাম লবণ (আধ চা চামচ ) ও দুই টেবিল চামচ গুঁড়ো চিনি ১ লিটার বিশুদ্ধ পানীয় জলের সঙ্গে মিশিয়ে ৬ থেকে ৮ ঘন্টার মধ্যে ব্যবহার করে নিও । যতক্ষণ না ও আর এস জোগাড় করছো।  কলেরা, আন্ত্রিক , ডায়রিয়া ছাড়াও যে সব ক্ষেত্রে জল শূন্যতা হতে পারে সেই সব ক্ষেত্রে যেমন ধুম জ্বর , প্রচন্ড গরমে যখন ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে জল বেরিয়ে যায় তখনও তোমরা ও আর এস ব্যবহার কোরো।  যদি দেখতে পাও 24 ঘন্টার মধ্যে ৬ বারের কম প্রস্রাব হচ্ছে, প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে গেছে,  শিশু কাঁদলেও চোখ থেকে জল বেরোচ্ছে না,  জিভ শুকিয়ে যাচ্ছে,  শরীর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে বা চামড়ার স্থিতিস্থাপকতা কমে গেছে তাহলে বুঝবে শরীরে জল শূন্যতা শুরু হয়ে গেছে আর সাথে সাথেই ও আর এস থেরাপি শুরু করে দিও ।
এবারে আসি  ও আর এস এর প্রয়োজন কতটা সেটা বলব। শিশু যতবার পাতলা পটি করছে ততবার 5 ml / kg  হিসেবে ও আর এস দিতে হবে মানে কারো ওজন যদি পনেরো কেজি হয় তবে প্রতিবার পাতলা পটির পরে 15 ইনটু ৫ সমান ৭৫ এম এল ওআরএস দিও।  যখন রোগীর ওজন জানা থাকে না তখন দেখবে শিশুর বয়স ২ বছরের কম হলে ৫০ থেকে ১০০ এমএল ও আর এস প্রতিবার তরল পটির পরের দিতে হবে।  আর বয়স ২ বছরের বেশি হলে প্রতিবার পাতলা পটি র পরে ১০০ থেকে ২০০ এম এল ও আর এস দিতে হবে।  যদি দেখা যায় ও আর এস খাইয়ে ও ডিহাইড্রেশন কমছে না,  ৮-৯ ঘন্টা প্রস্বাব হচ্ছে না,  ক্রমাগত বমি হচ্ছে তখন পেরেন্টারাল আইডি ফ্লুইড দেবার জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিও।  তবে একথা মনে রেখো কারো সুগার বা প্রেসারের সমস্যা থাকলে তারাও  অনায়াসে ও আর এস খেতে পারেন।  ও আর এস এর সামান্য সোডিয়াম বা গ্লুকোজ তাদের ওই শারীরিক অবস্থার কোনো ক্ষতি করে না । 
এই বর্ষায় তোমরা সকলে সুস্থ থেকো, সাবধানে থেকো, ভালো থেকো।

ক্যুইজ: ১২ 

১. পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় জেলা কোনটি? 
2. পশ্চিমবঙ্গের কোথায়  চা এর জন্য বিখ্যাত? 
৩. কোন শহরকে "সিটি অফ জয়"? 
৪. হাওড়া ব্রিজের নাম কি? 
৫. ভারতের কোথায় প্রথম মেট্রোরেল চালু হয়েছিল? 

গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর: 

১. ছাতিম
২. দার্জিলিং 
 ৩.বঙ্গোপসাগর
 ৪.হিমালয় 
 ৫.প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ

Post a Comment

0 Comments