স্বাতী ভৌমিক
"স্বপ্ন" কথাটি অনেকটা বিলাসিতাব্যঞ্জক কার্যপ্রণালীর অন্তর্গত বলে মনে হলেও, স্বপ্ন কিন্তু শুধুমাত্র দুটি যুক্তবর্ণের সম্মিলিত রূপমাত্র নয়। স্বপ্ন কি?-এই প্রশ্নের উত্তরের সাথে সবাই সহমত হতে পারেননি। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্ন হলো- সংকেতজ্ঞাপক। স্বপ্ন হলো মানব মনের অবচেতন স্তরের দ্বারা সংঘটিত চিন্তন প্রক্রিয়ার একপ্রকার ফলিত প্রকাশ। বাস্তব রূপ না থাকলেও আপাত অনুভূত স্বপ্নকে তৎকালীন সময়ে বাস্তব থেকে আলাদা করা খুব একটা সহজবোধ্য হয় না। ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব অনুযায়ী স্বপ্ন হলো, মনের অবচেতন স্তরের অনুভূতি- ইচ্ছের ছদ্মবেশে ইচ্ছেপূরণ।
এ তো গেল তত্ত্বকথা।এবার আসি স্বপ্ন নিয়ে আমার কথায়। স্বপ্ন তো কম বেশি সবাই দেখে। তবে স্বপ্নের ধরন ও জাগরুকতা সবার সমান নয়। কিছু স্বপ্ন হয় ঘুমহরণকারী, আবার কিছু স্বপ্ন হয় নিছকই নিদ্রাচারী।
"স্বপ্ন" শব্দটি যখন ব্যক্তির জীবনের লক্ষ্যের সাথে সম্পৃক্ত হয় তখন তা হয় কর্মউদ্দীপনা জাগরণকারী একপ্রকার মানসিক শক্তিবিশেষ। তখন তা ব্যক্তিকে নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য কর্মে প্রবৃত্ত করায়।
আবার ব্যক্তি কখনো কখনো এমন সব স্বপ্ন দেখে যা হয়তো ব্যক্তি বাস্তবে আশা করেছিল, কিন্তু পূরণের পথ পায়নি। মন কিন্তু নিজে সেই ইচ্ছেকে ছদ্মরূপ ধরে ঠিক পূরণের পথ বেছে নেয়। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, কেউ হয়তো ঘুমের মধ্যে দেখল একটি সুন্দর জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘুম ভাঙার পর বেশ কিছু সময় পর সে ভেবে দেখল ঐরকম কোন জায়গাতেই তার কোন একসময় খুব যাবার ইচ্ছে হয়েছিল-যা সে স্বপ্নের মধ্যে দেখেছে। এক্ষেত্রে ব্যক্তির মন বাস্তবে স্বপ্নপূরণের কোনো উপায় না পেয়ে স্বপ্নের মধ্যেই তার ইচ্ছেপূরণের পথ তৈরি করে নিয়েছে।
মানুষ নানাভাবে স্বপ্নের ছোঁয়ায় আসে। স্বপ্ন জীবনের বিশাল এক বাঁচার অবলম্বন। স্বপ্ন পূরণের আশাতেই তো মানুষ নানা কর্মে প্রবৃত্ত হয়। স্বপ্ন না থাকলে মানুষের জীবনে চলার তাগিদ অনেকটাই কমে যেত।
এবার আসি আমার স্বপ্ন দেখার কথায়। আমিও স্বপ্ন দেখি- জেগেও দেখি আবার ঘুমিয়েও দেখি। ঘুমিয়ে যে স্বপ্ন দেখি তা তো অবচেতন মনের সক্রিয়তার পরিচায়ক। আগে ঘুমের মাঝে অনেক রকমের স্বপ্ন দেখতাম। অপরিণত মনে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দৃশ্যমান- ঘটমান অনুভবগুলো বিভিন্ন রূপ নিয়ে স্বপ্নের মধ্যে প্রকট হত। ভয়ের অনুভব গুলো ভয়ের স্বপ্নে আবার অধরা ইচ্ছেরা কাল্পনিক ছদ্মরূপে তাৎক্ষণিক ইচ্ছে পূরণের স্বপ্ন হয়ে ঘুমের মধ্যে আসতো। এখনো স্বপ্ন দেখি-তবে তেমন না। এর আধ্যাত্মিক ও মানসিক কারণ আমি কিছুটা অনুভব করেছি।
কিছুদিন আগে শুনেছিলাম যে- দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ কমাতে হলে বা জীবনের কোন কিছু পরিবর্তন করতে হলে দৈনন্দিন কার্যপ্রণালী সাথে সাথে মানসিক স্তরের তথা অবচেতন স্তরের অনুভূতিগুলোরও পর্যবেক্ষণ ও পরিবর্তন করার প্রয়োজন রয়েছে। অবচেতন মনের পরিধি সবচেয়ে বিস্তৃত। চেতন স্তরের ভাবনাগুলো আসা-যাওয়া করে। কিন্তু অবচেতন মনে যে ভাবনাগুলো থাকে, সেগুলো অনেকটাই স্থির ও দৈনন্দিন কার্যকলাপে প্রভাব বিস্তারকারী মানসিক পরিমণ্ডল রচনা করে।
অবচেতনে যেসব অমূলক উৎকণ্ঠা- সংশয় ঠাঁই নেয়,সেগুলোর অযৌক্তিকতা এবং অসরতা মনকে বুঝিয়ে দিলে সেই ভার কিন্তু অনেকটাই মুক্ত হওয়া যায় এবং দৈনন্দিন পথ চলা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
এখনো স্বপ্নে চাকরিস্থলে যাবার জন্য বাস ধরতে দেরি হয়ে যাচ্ছে, তার জন্য তড়িঘড়ি করা- বাস চলে যাচ্ছে অথচ আমি বাসটা ধরতে পারছি না, বা পরীক্ষায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র ঠিকঠাক শেষ করতে না পারা-সময়ে পরীক্ষার কেন্দ্রে উপস্থিত হতে না পারা-এসবের জন্য প্রচণ্ড টেনশন করা ইত্যাদি স্বপ্নগুলো আজও মাঝে মধ্যে দেখি।পরে আবার হাসি পায় এই ভেবে যে, মনের কোথাও এই দুশ্চিন্তাগুলোগুলোর ছাপ আজও থেকে গেছে।
জেগে স্বপ্ন দেখার প্রসঙ্গে এবার কিছু কথা বলা যাক্। অধুনা Manifestation বা এই জাতীয় ব্যপারগুলোর নিয়ম অনুযায়ী সচেতন বা নিজের চাওয়ার বিষয়কে পূরণ হওয়ার আগেই চিন্তায় তার পরিপূর্ণ রূপ দেখে- তার অনুভূতিতে সেই সফলতাপূর্ণ আবেগের সাথে জীবনের পথে অগ্রসর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই তথ্য জানার আগে "দিবাস্বপ্ন" বলে একটা ব্যাপার জেনেছিলাম। কিন্তু সেক্ষেত্রে বলা হত, দিবাস্বপ্ন বা জেগে থেকে স্বপ্ন দেখা ঠিক না। তবে এটা বলা যায়,মনের ঘরে যেসব ইচ্ছেরা আসা-যাওয়া করে, তার পূরণের জন্য সময়ের অপেক্ষায় অধীরভাবে আগ্রহান্বিত মন অনেকসময় জাগ্রতস্বপ্নের মাঝে তার পূর্ণতার শান্তিকে উপলব্ধি করে-যা পরবর্তী কর্মক্ষেত্রে বা কর্মের ক্ষেত্রে উৎসাহ ও নতুন উদ্যম সঞ্চার করে।
তবে স্বপ্ন যেন শুধুমাত্র কল্পনা বিলাসিতার নামান্তর না হয়ে যায়- তা অবশ্যই লক্ষ্য রাখা উচিত। কারণ তাহলে তা অন্য মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করে। বাস্তবের মাটিতে বাস্তবায়নের স্বপ্নকে কর্মের দ্বারা যাতে সমৃদ্ধ ও প্রকট করে তোলা যায় সেদিকে যত্নশীল ও সচেতন হওয়া উচিত। তাহলেই সেই স্বপ্ন জীবনপথে উন্নয়নশীল এক যাত্রাপথ রচনা করতে সাহায্য করবে।।
0 Comments