গৌতম বাড়ই
উত্তম কুমারের মহাপ্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই। কলকাতার আকাশ যেন সেদিন একটু নিচু হয়ে এসেছিল। রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছিল লাখো মানুষের কান্না। বাঙালি শুধু একজন অভিনেতাকে হারায়নি, হারিয়েছিল নিজের ঘরের মানুষকে। মনে হয়েছিল, শহরের প্রতিটি জানালায় যেন শোকের কালো পতাকা উড়ছে। মহানায়ক উত্তম কুমার পাড়ি দিয়েছেন মহাসিন্ধুর ওপারে।
অকাল প্রয়াণ বড় নিষ্ঠুর। মৃত্যুর কোনও সঠিক সময় হয় না। অথচ তিনি যেন জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়েই মৃত্যুকে নীরবে আলিঙ্গন করেছিলেন। তখন আমাদের বয়স তেরো-চৌদ্দ। স্কুলে গিয়ে দেখেছিলাম, অনেক শিক্ষকই যেন নিজের আপনজনকে হারিয়েছেন। অথচ সেই সময় সিনেমা ছিল এক অদ্ভুত দ্বিধার জগৎ—সব ছবি দেখা চলবে না, পরিবার বেছে দিত কোন ছবি দেখা যাবে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও উত্তম কুমার ছিলেন এক অদৃশ্য উপস্থিতি। তিনি পর্দার মানুষ নন, তিনি ছিলেন বাঙালির প্রতিদিনের ভাষা, হাসি, প্রেম, অভিমান।
বাংলা চলচ্চিত্রের তখন এক স্বর্ণযুগ। একদিকে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন; অন্যদিকে সুচিত্রা-উত্তমের জাদু। আর সেই জাদুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এক মানুষ—উত্তম কুমার। টালিগঞ্জের গণ্ডি ছাড়িয়ে তাঁর পরিচিতি পৌঁছে গিয়েছিল বলিউডেও। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে "দেশপ্রেমী" ছবিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল সেই বিস্তারেরই প্রমাণ।
তারপর এল সেই দিন। "ওগো বধূ সুন্দরী"-র শুটিং চলাকালীন আচমকা হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন তিনি। নার্সিংহোমে লড়াই চলল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবন থেমে গেল। আর কলকাতা? কলকাতা যেন সেদিন রাস্তায় নেমে এসেছিল। কেওড়াতলার পথে মানুষের যে স্রোত নেমেছিল, অনেকেই তাকে রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। ইতিহাস হয়তো তুলনা করে না, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা কখনও কখনও ইতিহাসেরও সীমা অতিক্রম করে যায়।
অদ্ভুত নিয়তি—যে ছবির শুটিং করতে গিয়ে তিনি অসুস্থ হলেন, সেই "ওগো বধূ সুন্দরী" মুক্তি পাওয়ার পর হয়ে উঠল সুপারহিট। আজও কানে ভেসে আসে সেই গান—
"শুধু তুমি নও অবলাকান্ত..."
গানটি শুনলেই মনে হয়, কোথাও না কোথাও এখনও তিনি আছেন। তাঁর ঠোঁটের নিখুঁত লিপ, চোখের ভাষা, সংলাপের স্বাভাবিকতা—সব মিলিয়ে অভিনয় যেন অভিনয় নয়, জীবনেরই আরেক রূপ। এত সহজ, এত স্বতঃস্ফূর্ত, এত বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় আজও বিরল।
আজ যে ছবিটির কথা মনে পড়ে সবচেয়ে বেশি, তা সত্যজিৎ রায়ের "নায়ক"। এই ছবির স্থিরচিত্রে দেখা যায়—একটি সিগারেট, আর ধোঁয়ার পর ধোঁয়া দিয়ে তৈরি গোল রিঙ। সেই ধোঁয়ার বৃত্ত যেন কেবল ধোঁয়া নয়; একজন শিল্পীর অন্তর্লোক, খ্যাতির নিঃসঙ্গতা, সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রশ্ন, সংশয়, আত্মসমীক্ষার প্রতীক। ক্যামেরার সামনে তিনি নায়ক, কিন্তু সেই ধোঁয়ার রিঙের ভেতরে তিনি কেবল একজন মানুষ।
উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা সংখ্যায় মাপা যায় না। তিনি বক্স অফিসের হিসেব নন, তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, তারকার সংজ্ঞা বদলেছে। কিন্তু যে উচ্চতায় তিনি পৌঁছেছিলেন, সেখানে পৌঁছানো আজও প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। জনপ্রিয়তা আর কিংবদন্তি এক জিনিস নয়—উত্তম কুমার সেই বিরল মানুষ, যিনি দুটোকেই একাকার করেছিলেন।
আজ "মহানায়ক" শব্দটি অনেক সময় খুব সহজেই ব্যবহার করা হয়। শব্দেরও মর্যাদা থাকে। কিছু অভিধা একটিমাত্র নামের সঙ্গেই মানায়। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে "মহানায়ক" বললে আজও প্রথম, শেষ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল নামটি একটাই—উত্তম কুমার।
সময় তাঁকে নিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর চলে যাওয়া কোনও সমাপ্তি নয়। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন প্রেমের গল্প লেখা হবে, যতদিন সিনেমার পর্দায় একজন অভিনেতা চোখের ভাষায় সংলাপ বলার চেষ্টা করবেন, ততদিন কোথাও না কোথাও তুলনা উঠে আসবে—"উত্তম কুমারের মতো..."
ধোঁয়ার সেই রিঙ অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে আকাশে। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানুষটি আজও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন।
মহানায়ককে প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা।
"নায়করা জন্মান না প্রতিদিন। কিছু মানুষ সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাস হয়ে ওঠেন। উত্তম কুমার সেই ইতিহাসেরই আরেক নাম।"
0 Comments