জ্বলদর্চি

আফসোস/কমলিকা ভট্টাচার্য


আফসোস
কমলিকা ভট্টাচার্য 

আজ নাকি আন্তর্জাতিক স্ব-যত্ন দিবস।
জ্বলদর্চিতে আমার বন্ধু দোলনচাঁপার লেখা পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে পড়ল, আজ থেকে কয়েক বছর আগে এক বৃদ্ধার কথা। পঞ্চাশ বছর সংসার করার পর একদিন তিনি আমাকে তাঁর অভিমান, তাঁর আফসোসের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, “তুমি তো লেখালিখি করো, কোনোদিন আমাকে নিয়ে লিখো।”
তাঁর জন্য একটা কবিতা লিখেছিলাম হিন্দিতে।
আজ তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। তবু আজ কেন জানি, সেই কবিতাটার কথা আবার মনে পড়ল।
মনে পড়ল আমাদের ভারতীয় নারীদের কথা—যারা নিজেদের আগে সংসারকে রেখেছেন, নিজের স্বপ্নের আগে পরিবারের স্বপ্নকে জায়গা দিয়েছেন; নিজের ক্লান্তি, অভিমান, ইচ্ছা, এমনকি কখনও কখনও নিজের অস্তিত্বটুকুও নীরবে বিসর্জন দিয়েছেন।
কবে শিখব আমরা—নিজেদের যত্ন নিতে?
কবে বুঝব, আত্মত্যাগ ভালোবাসার একমাত্র ভাষা নয়?
কবে মনে হবে, নিজের জন্য একটু সময় চাওয়া, নিজের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দেওয়া, নিজের শরীর-মনকে ভালোবাসা—স্বার্থপরতা নয়?
আজ সেই কবিতাটাই বাংলায়, একটু অন্যভাবে লিখলাম।
আসল হিন্দি কবিতাটি ছবিতে দিলাম।
আফসোস 

পারফেক্ট হতে হতে
কখন যে নিজের অসম্পূর্ণতাটুকুও
হারিয়ে ফেলেছি—
মনে নেই।
পঞ্চাশ বছর তোমার পাশে হাঁটতে হাঁটতে
একদিন দেখি—
তোমার ছায়াটা আমার চেয়ে অনেক বড়।
আমি দাঁড়িয়ে আছি তার ভেতরে।
আমার নিজস্ব রোদটুকু
কোথায় যেন পড়ে আছে পেছনে।
তোমার অভিজ্ঞতার কাছে
আমার অভিজ্ঞতাগুলো
একদিন একদিন করে চুপ হয়ে গেল।
তোমার কথারা ঘর পেল আমার ভেতরে,
আমার কথারা জানালার ধারে বসে
সন্ধে নামতে দেখল।
তোমার মতামত ধীরে ধীরে
আমার বিশ্বাস হয়ে উঠল।
আর আমার বিশ্বাসগুলো
কোনো এক অন্ধকার রাতে
নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে গেল।
তোমার সম্মানের জন্য
কত অপমান নিঃশব্দে পান করেছি—
কেউ জানল না।
এমনকি আমিও না।
তোমার প্রতিভার গায়ে আলো মাখাতে মাখাতে
নিজের আঙুলে কখন যে অন্ধকার লেগে গেল,
টের পাইনি।
তোমাকে সামনে এগিয়ে দিতে দিতে
আমি পিছিয়ে গেলাম।
এতটাই পিছিয়ে—
যে একদিন ফিরে তাকিয়ে দেখি,
আমার জন্য কোনো পথই আর অবশিষ্ট নেই।
তোমার ক্লান্তি আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে,
তোমার জ্বর আমার শরীর কাঁপিয়েছে।
তোমার জন্য ভগবানের দরজায়
দু-হাত পেতে দাঁড়িয়েছি।
শুধু নিজের জন্য কখনও হাত জোড়া হয়নি।
হয়তো নিজেকে চাওয়া
আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।
তোমাকে বুঝতে বুঝতে
জীবন পার হয়ে গেল।
তোমার নীরবতার ভাঁজ খুলেছি,
তোমার দীর্ঘশ্বাসের অক্ষর পড়েছি,
তোমার না-বলা কথারও অনুবাদ করেছি।
শুধু—
আমার নীরবতার ভাষা
তুমি কখনও শেখোনি।
তাই আজও আমার চোখের জল
তোমার কাছে বৃষ্টির মতোই—
নামহীন, অকারণ।
এটাই বোধহয়
সবচেয়ে বড় আফসোস।
তোমার চোখে পারফেক্ট হতে হতে
কখন যে নিজের সমস্ত অসম্পূর্ণতাকে
এক এক করে সমাধিস্থ করেছি—
মনে নেই।
এখনও তোমার চোখে
আমি সেই একই মানুষ—
যে বোঝে,
যে মানিয়ে নেয়,
যে ক্ষমা করে,
যে থেকে যায়।
শুধু কোনোদিন তুমি ফিরে তাকিয়ে দেখোনি—
যে নদীটি সারাজীবন তোমার পাশে বয়ে গেল,
তারও তো কখনও কখনও
নিজের সমুদ্রের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।
তুমি জানোনি—
যে প্রদীপটি সারারাত তোমার ঘর আলোকিত করেছে,
তারও একদিন নিজের জন্য
একটুখানি আলো চেয়েছিল।
আর আজ, পঞ্চাশ বছর পরে,
তোমার পাশে দাঁড়িয়ে
হঠাৎ মনে হয়—
আমি কি সত্যিই তোমার পাশে ছিলাম?
নাকি তোমার দীর্ঘ জীবনের
একটি দীর্ঘ ছায়া হয়ে
নিজেকেই ধীরে ধীরে
মুছে দিয়েছি?
এইটুকুই আফসোস—
তোমার চোখে সম্পূর্ণ হতে হতে
আমি নিজের ভাঙাচোরা
অপূর্ণতাটুকুও
বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম না।
আর আজ,
যখন নিজের কাছে ফিরে আসতে চাই,
দেখি—
যে মানুষটির কাছে ফিরে যাব,
সে-ই তো আর কোথাও নেই।

🍂

Post a Comment

3 Comments

  1. AnonymousJuly 24, 2026

    কবিতাটি ভালো লাগলো,তাই বার দুই পড়ে ফেললাম। সংসারের জাঁতাকলে পড়ে নিজেকে নিয়ে ভাবনার অবসর মেলেনা। অথচ একজন সম্পূর্ণা হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনাই রয়েছে তাঁর মধ্যে। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে নয়, ছোট্ট একটা ছায়া হয়ে অনেক বড়ো এক ছায়ার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া। সত্যিই আফসোস জাগায়। নিজের যত্ন আর নেওয়া হয়না,এমন একটা বিশেষ দিনেও।
    ভালো থাকবেন।

    ReplyDelete
  2. AnonymousJuly 24, 2026

    শুধু শ্রদ্ধা। এই কবিতার জন‍্য।

    ReplyDelete
  3. AnonymousJuly 24, 2026

    চোখের জল শব্দ হলে এই কবিতা হয়।
    প্রণাম জানাই কবিকে।🙏

    ReplyDelete