নবম পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
এই পর্বের আলোচ্য বিষয় হলো -আবেগ। আবেগ ছাড়া জীবন যান্ত্রিক হয়ে যায়। আবেগ-ই জীবনকে জীবনের মর্যাদা দেয়। কিন্তু কথায় বলে, কোনোকিছুর অতিরিক্তটাও ভালো নয়।সবকিছুই একটা সীমা পর্যন্ত তার সৌকার্য্যতা রক্ষা করে চলে। আবেগ বলতে বিভিন্নপ্রকার মানসিক প্রক্ষোভগুলোকে বোঝানো হয়ে থাকে। বাতাসের চেয়েও দ্রুতগামী মন। এই মনকে সীমানায় বেঁধে রাখা কিন্তু সহজকথা নয়। অনুভূত একটা অস্তিত্ব অথচ কতখানি অপরিহার্য -কতখানি প্রভাবশালী এই মন!অদৃশ্য নির্দেশনায় দৃশ্যমান কার্যের কান্ডারি এই মন।আর তার বাহন হলো আবেগ। এই আবেগ কখনো রাগ, কখনো অভিমান, কখনো ভাবগম্ভীর স্থিরতা, কখনো বা অন্যকোনো কাহিনীর বা কার্যের উদ্গাতা এই আবেগ।
কিন্তু সমস্যা হয় তখনই,যখন এই আবেগের কারণেই জীবনে কোন খারাপ কিছু সংঘটিত হয়। তখনি আমাদের মনে হয়-না, এতটা আবেগ এ ব্যাপারে তো ঠিক না। কিন্তু দূর্ভাগ্যের ব্যাপার হল -ঘটনার অপকর্ষতা দৃশ্যমান না হওয়া পর্যন্ত এর এই সীমাটি সাধারণ বিচারে সঠিকভাবে ধরাই দেয় না।
🍂
এই সেদিন একটি ছাত্রী আমাকে বলছিল-"ম্যাডাম, আমার খুব রাগ।রাগ হলে অনেকসময় জিনিসপত্র ভাঙাভাঙিও করে ফেলি। "আমি জিজ্ঞেস করলাম-"তুমি যে রাগ করো, তাতে তোমার কষ্ট হয়না?"উত্তরে ছাত্রীটি বললো,"হয় তো, কিন্তু রাগটা কিছুতেই control করতে পারিনা। আপনি কিছু একটা উপায় বলে দিন।"আমি আমার অবগতির মধ্যে যতটুকু রয়েছে, সেটুকু উপায় তাকে বলে, তারপর বললাম, 'তুমি আমাকে এইভাবে কিছুদিন চলার পর তোমার রাগের সময়কালীন তোমার আচরণ আমাকে জানিও।"এর সাথে তাকে আরো কিছু কথা বললাম। এটা শুধু ছাত্রীটির নয়, অনেকের সমস্যা। আবেগের সীমানা চটকরে টানাটা সব বুঝলেও সবসময় ব্যক্তির আয়ত্তে থাকে না-আর তখন-ই পরবর্তীকালে অনুতাপের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
শুধু ক্রোধ বা রাগ নয়-এরকম আরো অনেক আবেগর অতিশয্যে ব্যক্তি এমন আচরণ করে ফেলে- যা পারবর্তীকালে তারই দুঃখের বা অনুশোচনার কারণ হয়ে যায়।
বিভিন্ন মননিয়ন্ত্রণকারী পদ্ধতিগুলির মধ্যে পরামর্শস্বরূপ বলা যায় যে, যেকোনো প্রক্ষোভজনিত কাজ বাস্তবে প্রকাশিত করার আগে কিছুটা সময় অপেক্ষা করে যাওয়া উচিত। বারকয়েক একটু গভীর শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করা উচিত। এই সৃষ্ট আবেগ ও তার প্রতিক্রিয়ার মাঝের এই স্বল্প বিরতি অনেকক্ষেত্রেই ব্যক্তিকে বিচারের সুফলপ্রদানে সহায়তা করে।
আবেগ যখন নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন তা বন্ধুর মতো জীবনের পথকে সুগম বানায়-যান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত করে প্রাণবন্ত ও সুষ্ঠু যাত্রাপথ রচনা করতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন ওই আবেগ বিবেক তথা ব্যক্তির বিচারশীলতার আওতায় থাকে না,আবেগের আধিক্য ব্যক্তির কর্মকে চালনা করতে শুরু করে -তখনই সমস্যার সৃষ্টি হয়।
এর মধ্যে ব্যক্তির প্রভূত ক্ষতি করে যে ধরণের আবেগ, তা হলো কাম এবং ক্রোধ। এরফলে হিতাহিত জ্ঞান পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে ব্যক্তি। আর কৃতকর্ম হলো জ্যামুক্ত তীরের মতো-তা কিছু না কিছু ফল তো উৎপন্ন করবেই। ভালোকর্ম যেমন ভালো ফল আনে, তেমন-ই বিচারমুক্ত অন্যায্যকর্ম অনুতাপের -মনস্তাপের কারণ হয়। ক্রোধের ফলে ব্যক্তি এমন অনেক কথা বলে ফেলে বা কর্ম করে, যা ক্রোধ প্রশমিত হবার পর তীব্র মনস্তাপের সৃষ্টি করে। তাই আবেগের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যেন ব্যক্তির আয়ত্তে থাকে-তার গুরুত্ব অনুধাবন করা ও প্রয়োজনে উপযুক্ত মন নিয়ন্ত্রণের পন্থা অনুসরণ ও অভ্যাস করা খুব প্রয়োজন।।
0 Comments