স্বপ্ন : এক অধরা মাধুরী
আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী
"The biggest adventure you can take is to live the life of your dreams."
— Oprah Winfrey
সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকে মানুষের প্রাণ কল্পনাপ্রবণ। সভ্যতার গতিপথে সে যতই এগিয়েছে,জীবন তার লাভ-ক্ষতি,ভালো-মন্দ, চাওয়া-পাওয়ার দৃশ্যমান বাস্তবতায় যতই আকৃষ্ট হয়েছে,স্বপ্ন তার যাপিত ইপ্সার ভ্রাম্যমাণ কল্পনা বিলাসে তাকে ততই ঋদ্ধ করেছে। শিশুকাল থেকেই সৃষ্টিমুখী মানুষ তাই তার স্বপ্নকে লালন করেছে পরম যত্নে,সকরুণ মমতায়।
কোন সেই মায়াময় জন্মলগ্ন-সময়কালীন স্নিগ্ধ মাতৃক্রোড়ে “মা ষষ্ঠীর দেয়ালা”-সুখে যার আরম্ভ, শৈশবের আধোবুলিতে যার প্রকাশ, কৈশোর-যৌবনের তন্দ্রাহারা কঠোর কৃচ্ছে যার সাধন,আত্মার একাঙ্গী সেই সত্ত্বাকেই হয়তো জীবনভ’র আমরা স্বপ্ন নামে ডাকি,যা ছাড়া জীবনাচারণ আমাদের সম্ভবপ’র হয়না। কারণ, সমান্তরাল দুটি জীবন সন্ধান — একপারে কঠোর বাস্তবতার একটি দৃশ্যমান যাপন এবং অন্যপারে অদৃশ্য অন্তর্জগৎ নিয়ে মনন-যাপন চলে একটি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি। দিনের আলোয় সে তার পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার মধ্যে বাঁচলেও রাত্রির বিশ্রামের অবসরে তার মনোগহনে খেলা করে ইপ্সিত অলৌকিক বিষয়াবলী,যা সে আত্তীকরণ করতে চায় কিন্তু পারে না,কবির ভাষা ধার করে যার নিরুপন,
"স্বপ্ন সেও চলে আপন মতে,
আমি চলি আমার শূন্য পথে…"
আসলে,মানুষের জীবনের গভীরতম রহস্যময়,গহনতম কামনাময় নবনীকোমল ইচ্ছেগুলির প্রকাশ হয় তার স্বপ্নে। স্বপ্নকে স্পর্শ করা যায় না, মুঠোয় ধরা যায় না, তবু তার প্রভাব এবং প্রেরণা মানুষের হৃদয় ও মনকে ভীষনভাবে দ্রব করে রাখে।কুয়াশার মতো অস্পষ্ট, আবার নদীর জলের মতোই স্বচ্ছতোয়া বহমানতায় তার অদম্য প্রকাশ। প্রতিদিনের দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষময়
মরবাস্তব ভূমিতে যা যা আমরা পাইনা, কিন্তু ভীষণ ভাবে পেতে চাই, পৃথিবীর যাবতীয় কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেলে, অন্ধকার রাতের আকাশে নক্ষত্রেরা যখন তাদের মিটমিটে আলোয় নিঃশব্দ প্রহরীর মতো জেগে থাকে,ক্লান্ত মানুষের দেহ জাগতিক বিশ্রামে গেলেও তার অবচেতনে খুলে যায় অচেনা জগতের দুয়ার। সেখানে সময়ের নিষেধাজ্ঞা নেই, যুক্তির বাধ্যবাধকতা নেই। যেখানে মৃত প্রিয়জনেরা জীবিত হয়ে ফিরে আসে, অসম্ভব ঘটনাও সম্ভবপর হয়ে ওঠে, হারিয়ে যাওয়া,ফুরিয়ে যাওয়া প্রিয়বৎসা দিনগুলি আবার ফিরে আসে স্মৃতির রঙিন পালকে ভর করে। স্বপ্নের এই জগৎ যেন এক অনন্ত নাট্যমঞ্চ, যেখানে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আকাঙ্ক্ষা,কামনা, প্রেম, ভয় ও প্রত্যাশা দক্ষ কুশীলবদের ভূমিকায় অভিনয় করে চলে।একে বিজ্ঞান হয়তো মনোবিকলন বলতে পারে, কিন্তু সাহিত্যপ্রেমী মননমাত্রেই জানে, স্বপ্ন মানুষের বাঁচার রসদ,তার প্রেরণা সঞ্চয়।
🍂
এবং তা দুর্জ্ঞেয় বলেই হয়তো তার স্বরূপ বোঝা সহজ নয়। কখনও স্মৃতির পুনর্জন্মে, কখনও আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনিতে, কখনও বা ভবিষ্যতের পাথেয় সংগ্রহে সে আমাদের দিশা দেখায়। মানুষের চেতনা যখন জাগ্রত থাকে, বাস্তবতার কাঠিন্য তাকে নাগপাশে বিদ্ধস্ত করে রাখে প্রতিনিয়ত। কিন্তু ঘুমের অতল আশ্রয়ে তার সমস্ত অপারগতার দুঃখভার থেকে সে মুক্তি পায়,ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েও রাজছত্রের স্বপ্ন দেখে।চেতনের অসংখ্য অসহায়তারও উত্তরণে ভেসে ওঠে অদ্ভুত মায়াময় এক আলোকছটা, ফিনিক্স পাখির মতো চিতাভস্ম থেকে জেগে ওঠে অজরা প্রাণ। স্বপ্ন যেন সেই হৃদয়মন্হনে জেগে ওঠা অমৃতকলস,যার অন্তর্লীন আনন্দপ্রবাহে, সীমাবদ্ধতার গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি শিল্পীমন নিঃশব্দে তার অতৃপ্ত জীবনটাতে তৃপ্তির বাসনা-রঙ মাখিয়ে দেয়।
তাই হয়তো প্রাচীন ঋষিরা স্বপ্নকে কেবল শ্রান্তির মায়া বলে মনে করেননি। তাঁদের কাছে স্বপ্ন ছিল আত্মার এক বিশেষ উন্মোচন। উপনিষদের ভাষায়, মানুষের চেতনা জাগরণ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি—এই তিনটি সোপান অতিক্রম করে,তবেই প্রার্থিত সত্যের সন্ধানী হয়। এবং স্বপ্ন সেই ধ্রুবক মধ্যভূমি, যেখানে বাহ্যজগতের বন্ধন শিথিল হয়ে অন্তর্জগতের আগল উন্মুক্ত হয়ে যায়। তাই স্বপ্নে মানুষ কখনও এমন সত্যের আভাস পায়, যা জাগ্রত অবস্থায় তার দৃষ্টির অন্তরালে থেকে যায়।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা যদিও বলেন,স্বপ্ন হলো অবচেতন মনের প্রকাশব্যকুল ভাষা। দিনের বেলায় যে কথা আমরা উচ্চারণ করতে বিব্রত হই, যে বেদনা আমরা সামাজিকতার আড়ালে সসঙ্কোচে চাপা দিয়ে রাখি, যে ইচ্ছাকে আমরা সম্মানহানির ভয়ে অস্বীকার করি, তারাই রাতের অন্ধকারে স্বপ্নের রূপ ধরে ফিরে আসে। স্বপ্ন তখন হয়ে ওঠে মনের নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি। মানুষের অন্তর যেন নিজের সঙ্গেই কথোপকথনে মেতে ওঠে। বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার শেক্সপিয়ারের অনেক নাটকে, রোমান্টিক যুগের কবিদের কবিতায় বারংবার এর পরিচয় পাই।
তবে স্বপ্নের স্বরূপ বিশ্লেষণে এই সব বিলাসিতা ছাড়াও আরও একটি বাঙ্ময়তার আলোচনা জরুরী এবং এক্ষেত্রে মনে করি শ্রদ্ধেয় আবদুল কালাম আজাদের কথা: “Dream is not that which you see while sleeping; it is something that does not let you sleep.”(স্বপ্ন তা নয় যা তুমি ঘুমিয়ে দেখো; স্বপ্ন হলো তা-ই, যা তোমাকে ঘুমোতে দেয় না।)
অর্থাৎ নিদ্রার সীমা ছাড়িয়ে জীবনের বিস্তৃত প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়া সাধনার নামও স্বপ্ন। মানুষ কেবল রাতে স্বপ্ন দেখে না; কোন কোন সময় সে দিনের আলোতেও স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের, অসম্ভবকে সম্ভব করার, অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার। একজন কৃষক বীজ বোনেন স্বপ্ন দেখে; একজন কবি কবিতা লেখেন স্বপ্ন দেখে; একজন বিজ্ঞানী গবেষণাগারে রাত জাগেন স্বপ্ন দেখে। মানুষের সমস্ত সৃষ্টি, সমস্ত অগ্রগতি, সমস্ত মহত্ত্বের শিকড়ে লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো স্বপ্নের বীজ।
এবং স্বপ্নহীন মানুষ তাই কখনও কোন সৃষ্টির সুখভোগ করতে পারে না। একটি ডানাহীন পাখির মত তার চলার পথ আছে,উড়ার আকাশ নেই।
একইভাবে যে জাতি স্বপ্ন দেখতে জানে না, তাদের উন্নতির ইতিহাসে নতুন ভোরের সূচনাও হয় না। পৃথিবীর ইতিহাসের চোখ রাখলে দেখি,সমস্ত মহৎ অর্জনই প্রাথমিক ভাবে একটি স্বপ্নসম্ভব কল্পনা থেকেই শুরু হয়েছিল.…
স্বাধীনতার স্বপ্ন, ন্যায়ের স্বপ্ন, মানবমুক্তির স্বপ্ন—এইসব স্বপ্নই যুগে যুগে মানুষকে জাগৃতির এবং সংগ্রামের শক্তি দিয়েছে। এবং এই স্বপ্নের শক্তিতেই মানুষ বারবার ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়িয়েছে।
তবু স্বপ্ন সব সময় সুখের বার্তা নিয়ে আসে না। অনেক স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়, অনেক আকাঙ্ক্ষা মরুভূমির মরীচিকার মতো মিলিয়ে যায়। তবে সেই সব অপূর্ণতার মধ্যেও স্বপ্নের সৌকর্য রয়ে যায়। কারণ স্বপ্নের মূল্য শুধুমাত্র তার লক্ষ্য পূরণে সীমাবদ্ধ থাকে না, তার উত্তরাধিকারেও প্রবাহিত হয়। কারণ,স্বপ্ন মানুষকে এগোতে শেখায়, অপেক্ষা করতে শেখায়, আশাবাদী হতে শেখায় এবং সর্বোপরি বাঁচতে শেখায়। সে মানুষের হৃদয়ে এমন একখানি আশাদীপ জ্বালিয়ে রাখে, যা অযুত প্রতিকূলতার আঘাতেও জীবনভর নির্বাপিত হয় না।
পরিশেষে,স্বপ্ন মানুষের অন্তরাত্মার সহোদর,তার সারা জীবনের বিশ্বস্ত দোসর। কখনও সুদামাপ্রিয় বাঁশির সুরের দ্যোতনায়,কখনও শ্রীরাধিকার অনাকাঙ্ক্ষিত মাথুর সম্ভোগে, কখনও বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার বিষণ্নতায়, কখনও পূর্বরাগ কুসুমের বসন্ত-উদ্ভাসে সে আমাদের মাটির জীবনটিতে পারিজাত রেণু মাখিয়ে রাখে। তার প্রাত্যহিক অস্তিত্বকে স্নিগ্ধ করে ,তাকে গভীরতা দান করে। বাস্তবের কঠোরতার মধ্যেও স্বপ্ন তাই কোনো ক্ষণস্থায়ী বিভ্রম নয়; বরং প্রিয় সঙ্গী। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্তই মানুষ স্বপ্নে নিজেকে খোঁজে। কখনও পায়, কখনও হারায়, আবার কখনও নতুন করে ফিরে আসে নিজের কাছে। তাই স্বপ্ন ঘুমের ভেতর দেখা কিছু অস্পষ্ট দৃশ্যায়ন নয়; স্বপ্ন জীবনের অনন্ত আহ্বান, আশার আলোকবর্তিকা;অধরা মাধুরী।
0 Comments