বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৩৪
কালমেঘ
ভাস্করব্রত পতি
'কালো মেঘ আকাশের তারাদের ঢেকে
মনে ভাবে, জিত হল তার।
মেঘ কোথা মিলে যায় চিহ্ন নাহি রেখে,
তারাগুলি রহে নির্বিকার।'
-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছোটদের কাছে কালমেঘ মোটেই প্রিয় গাছ নয়। অথচ তাঁদের প্রায় জোর করেই খাওয়ানো হয়। অসম্ভব উপকারী গাছটিকে তাই বেশিমাত্রায় মান্যতা দেয় বাড়ির বড়রা। কালমেঘের পাতার রস বা শুকনো কালমেঘ ভিজিয়ে সেই তেতো রস সকালে খালি পেটে খাওয়ানোর চল এবং কারণ সকলেই জানেন এবং করে।
গ্রামেগঞ্জে যত্রতত্র জন্মায় কালমেঘ। কোনও যত্নআত্তির ধার ধারেনা। রাস্তার ধারে, বেড়ার ধারে, পোড়ো বা পতিত জমিতে অন্যান্য গাছের সাথেই বেড়ে ওঠে সাবলীলভাবে। এই বর্ষাকালে এদের বেশিমাত্রায় দেখা পাওয়া যায়। তখন বর্ষার জল পড়ে চকচক করে কালমেঘের পাতা। এরপর ফুল ফোটে। শরতকাল পর্যন্ত দেখা যায়। আর তখন ক্রমশ শক্ত হয় এর কাণ্ডগুলো। বনের মধ্যে কালমেঘ গাছ
কালমেঘকে সংস্কৃতে যবতিক্তা, কিরাত, মহাতিক্ত, হিন্দিতে কিরয়াত, ইংরেজিতে Green Chiretta, Creat, King of Bitter, ওড়িয়াতে ভূঁইনিম্ব বলে। এর লোকায়তিক নাম কল্পনাথ। Acanthaceae পরিবারের কালমেঘের বিজ্ঞানসম্মত নাম Andrographis paniculata, Justicia paniculata, Justicia latebrosa এবং Justicia stricta।
কিন্তু 'কালমেঘ' নামকরণের পেছনে কি কারণ থাকতে পারে? সাধারণত এই গাছের পাতার রঙ বিশেষ ধরনের সবুজ। যা দেখতে অনেকটা বর্ষার আকাশে ঘনিয়ে থাকা কালো রঙের মেঘের মতো। 'লগান' সিনেমার সেই বিখ্যাত গানটি স্মরণ করায় কালো মেঘকে -- 'কালে মেঘা কালে মেঘা, পানি তো বরষাও'! এছাড়াও এর নির্যাস কালো মেঘের রঙের মতোই সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই হয়তো এহেন নামকরণ।
বর্ষার জলে স্নাত কালমেঘ
তবে মহাভারতের আদি কাণ্ড (১৯৩। ১৩ শ্লোক) তে পাই --
"ন বৈশ্য শুদ্রৌপয়িকীঃ কথাস্তা।
ন চ দ্বিজানাং কথয়ন্তি বীরাঃ।।
তেনর্দমানা ইব কালমেঘাঃ।
কথাবিচিত্রাঃ কথয়াম্বভূবুঃ।।"
আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য এই শ্লোকটির বঙ্গানুবাদ করে একটি কাহিনি উল্লেখ করে লিখেছেন, "দ্রুপদ রাজার আহ্বানে পাণ্ডবগণ ছদ্মবেশে উপস্থিত হ'য়ে অসাধ্য সাধন কাজটি সেরে দ্রৌপদীকে লাভ ক'রলেন। কেউ চিনতে পারেননি কে এরা? তবে কৃষ্ণ বলরাম চিনতে পেরেও তাঁদের কাছে আত্মপরিচয় দেননি। তাই যেখানে পাণ্ডবগণ ফিরে এলেন, সেটা ভার্গবের কর্মশালা, সেই পথ ধ'রে কৃষ্ণ বলরামও অনুসরণ ক'রলেন। প্রয়োজন শুধু পরস্পরের পরিচয়। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে এলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। আর তাঁর কয়েকজন ছদ্মবেশী সহচর। পিতা দ্রুপদই তাঁদেরকে পাঠিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, আমার একমাত্র কন্যা দ্রৌপদীকে যাঁরা নিয়ে গেলেন, তাঁদের প্রকৃত পরিচয় কি? ধৃষ্টদ্যুম্ন যথাসময়ে উপস্থিত হয়েই ভার্গবের কর্মশালার আশেপাশে লুকিয়ে থেকে সন্ধ্যার পর সেই গুপ্তগৃহের দেওয়াল ঘে'ষে লুকিয়েই শুনতে লাগলেন, পাণ্ডববৃন্দ তাঁদের মা কুন্তীদেবী এবং দৌপদীর প্রতি তাঁদের আলাপ ও ব্যবহারের কথাবার্তা। সব শুনে গিয়ে ভোরের আগেই সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন। বাড়িতে পৌঁছে পিতা দ্রুপদকে গিয়ে বললেন, বাবা, আমাদের জীবন সার্থক হ'য়েছে। দৌপদীকে নিয়ে গিয়েছেন পাণ্ডবগণ। সেই ভার্গবের কর্মশালায় শুয়ে ওঁদের যেসব কথা শুনলাম তা ব্রাহ্মণের কথা নয়। বৈশ্যেরও নয়, আর শূদ্রেরও নয়। সেসব ক্ষত্রিয়ের আলাপ। এঁরা যে পারিবারিক সমস্যার প্রবল তাড়নায় পলায়ন ক'রে গুপ্তস্থানে ছদ্মবেশে আছেন এবং ভিক্ষা দ্বারা জীবন কাটিয়েও ভবিষ্যতে যে একটা প্রচন্ড সংগ্রাম ক'রে অতীত বেদনাকে মুছে ফেলবেন, তার জন্য কেবল সংগ্রাম আর ভীষণ ভীষণ অস্ত্রের কথাই আলোচনা ক'রছেন। ওঁদের কথালাপে বুঝলাম, ও'রা দেখতে পাচ্ছেন সামনে গাঢ় 'কালমেঘ', তারপর শুরু হবে প্রচণ্ড তার প্রতিক্রিয়া।"
কালমেঘের ফুল ও ফল
এটি একটি বীরুৎ জাতীয় সোজা উদ্ভিদ। এক থেকে দেড় ফুট লম্বা হয়। ঘন সবুজ পাতাগুলি মাছের আকারের বা বল্লমের আকারের। রোমহীন। পাতার প্রান্তভাগ অখণ্ডিত। এর শাখাগুলি চতুষ্কোণ ধরনের। ১ সেমি আকারের ফুলের রঙ সাদা, গোলাপি। ক্ষুদ্রাকার। গুচ্ছাকারে ফোটে। আর চিড়ের মতো চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা দেড় থেকে ২ সেমি লম্বা ফল দেখা যায়। এই ফলগুলি দেখতে যবের মত অথচ তেতো। তাই এর অন্য নাম যবতিক্তা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু বীজ থাকে। ফল পেকে গেলে এই বীজ জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। আর নতুন নতুন চারাগাছ জন্মায়।
কালমেঘের তিক্ততা সর্বজনবিদিত। এর মধ্যে প্রচুর উপকারী গুণাগুণ বর্তমান। কালমেঘের পাতা ও ডালের মধ্যে থাকে Andrographolide, Neoandrographolide, Paniculide-A, Paniculide-B, Paniculide-C, 14 Deoxy 11dehydroandrographolide, 14 Deoxy 11oxoandrographolide এবং 5 Hydroxy 7,8,2',3' Tetramethoxyflavone। মূলের মধ্যে পাওয়া যায় Andrographine এবং Panicoline। এছাড়াও এর টিস্যুতে থাকে 5 Hydroxy 7,8,2' Trimethoxyflavone। গ্রামের লোকেরা এই কাঁচা কালমেঘ গাছ উপড়ে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষিত করে রাখে। পরে এর শুকনো ডাল, পাতা সারা রাত গরম জলে ভিজিয়ে রেখে সকালে ঘুম থেকে উঠে ঐ তেতো জল খায় নানা রোগের হাত থেকে রেহাই পেতে।
বেড়ার ধারে কালমেঘ
কালমেঘের উপকারিতা সীমাহীন। যেকোন রকমেরই পচা ঘায়ে কালমেঘের পাতা সিদ্ধ ক'রে সেই জল দিয়ে ঘায়ের দগদগে অংশ নিয়মিত ধোওয়ালে সেই বিষাক্ত ঘা'ও ঘায়েল হতে বেশি সময় নেয়না। ক্রিমিনাশক হিসেবে এটি একমেবাদ্বিতীয়ম। অম্বলের অসুখ তথা অম্ল ও অজীর্ণ রোগ, রক্ত আমাশার ক্ষেত্রেও কার্যকরী। অগ্নিমান্দ্য রোগের ক্ষেত্রেও উপশমকারী দারুণ। লিভারের জন্য এটি মহৌষধ বলা চলে। যেকোনো ধরনের জ্বরের থেকে নিষ্কৃতি পেতে কালমেঘের ব্যবহার গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়।
0 Comments