জ্বলদর্চি

ভোরের স্বপ্ন/কমলিকা ভট্টাচার্য


ভোরের স্বপ্ন

কমলিকা ভট্টাচার্য


স্বপ্নের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অদ্ভুত।
যে স্বপ্নগুলো ঘুমের মধ্যে আসে, সেগুলো আমাকে অস্থির করে তোলে। আর যে স্বপ্নগুলো জেগে দেখি, সেগুলো আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।
পরীক্ষার আগের রাতগুলোতে একটি স্বপ্ন বারবার ফিরে আসত। দেখি, খাতার ওপর কালি পড়ে গেছে। বাধ্য হয়ে নতুন খাতা নিয়েছি, কিন্তু কিছুতেই পেন দিয়ে লেখা বেরোচ্ছে না। মরিয়া হয়ে বাড়ি ছুটেছি অন্য কলম আনতে। আবার ফিরে এসেছি। ততক্ষণে পরীক্ষার সময় শেষ। প্রশ্নের উত্তরগুলো মাথার ভেতর ঝড় তুলছে, অথচ সাদা পাতাগুলো যেন বাতাসে উড়ে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আমি প্রাণপণে সেগুলো জড়ো করছি, কিন্তু একটি পাতাও আর নিজের জায়গায় ফিরছে না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘুম ভেঙে যায়।
চোখ খুলে দেখি, আমি কোনো পরীক্ষার হলে নই; নিজের বিছানায় শুয়ে আছি। সেই স্বস্তির স্বাদ আজও ভুলতে পারিনি।
পরীক্ষা শেষ হয়েছে, কিন্তু স্বপ্ন বদলায়নি। এখন দেখি কোথাও যাওয়ার কথা, অথচ কিছুতেই ব্যাগ গোছানো শেষ হচ্ছে না। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর আমি অসহায়ের মতো জিনিসপত্র খুঁজে বেড়াচ্ছি। ঘুম ভাঙার পরও বুকের ভেতর সেই অকারণ অস্থিরতা অনেকক্ষণ রয়ে যায়।
মানুষ বলে, স্বপ্ন নাকি অবচেতন মনের ভাষা। তাই মাঝেমধ্যে গুগলবাবুর শরণাপন্ন হই। দেখি, আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা তিনি কী দেন! কখনও বলেন শুভ, কখনও অশুভ, আবার কখনও এমন সব প্রতিকারের ফর্দ ধরিয়ে দেন যে, সেগুলোর মানে বুঝতেই আরেকবার গুগলের শরণাপন্ন হতে হয়। শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের রহস্য ভাঙুক না ভাঙুক, মাথাটা ঠিকই গোল হয়ে যায়।
তবে আমার জীবনে আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা বারবার ঘটে। কোনো কোনো মানুষ, কোনো ঘটনা কিংবা কোনো স্থান হঠাৎই অকারণে মনে পড়ে। এমন নয় যে সেদিন সেই বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে, কিংবা কোথাও কিছু শুনেছি। কোনো দৃশ্য, কোনো শব্দ, কোনো কারণ—কিছুই থাকে না। তবু সেই মানুষ, সেই ঘটনা বা সেই জায়গাটা হঠাৎ করেই মনের মধ্যে এসে বসে।
বেশিরভাগ সময়ই নিজেকে বুঝিয়ে বলি, এ তো নিছক কাকতালীয়। মানুষের মন তো কত কিছুই ভাবে! কিন্তু তারপর এমন কিছু ঘটে যায়, যা সেই কাকতালীয়কে আর সহজে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দিতে পারি না।
এই তো মাত্র কয়েক দিন আগের কথা।
আমাদের এক পরিচিত মানুষ—একজন সার্ভিস প্রোভাইডার। প্রায় বছর খানেক আগে একবার দেখা হয়েছিল। তখন আমার ছেলের বিদেশ থেকে আনা কিছু চকলেট তাঁকে দিয়েছিলাম। জানতাম, তাঁরও আমার ছেলেদের মতোই সন্তান আছে। ব্যস, ওই পর্যন্তই। তারপর আর কোনো যোগাযোগও হয়নি, দেখাও হয়নি।
হঠাৎ গত সপ্তাহে একদিন সকাল থেকে অকারণেই মানুষটার কথা বারবার মনে হতে লাগল। এমনভাবে, যেন কেউ বারবার মনের দরজায় কড়া নাড়ছে। নিজেকেই প্রশ্ন করছিলাম, কেন? কোনো উত্তর পাইনি।
সারাটা দিন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে কেটে গেল।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে হঠাৎ আমাদের হাউজিংয়ের WhatsApp গ্রুপে চোখ পড়ল। সেখানে লেখা—
"দয়া করে কয়েক দিন কেউ ওঁকে ফোন করবেন না। ওঁদের বাড়িতে ভয়ংকর একটা বিপদ হয়েছে।"
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সেই রাতটা আর ঠিকমতো ঘুমোতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, সকালটা যেন তাড়াতাড়ি হয়।
ভোরে যে খবরটা পেলাম, সেটা বিশ্বাস করার শক্তি আমার ছিল না।
একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর ছেলেকে হারিয়েছেন।
খবরটা পড়ে অনেকক্ষণ নিঃশব্দে বসে ছিলাম। বুকের ভেতর শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরছিল—কেন? কেন আগের দিন থেকেই মানুষটার কথা আমার এত মনে হচ্ছিল?
আমি জানি না এর কোনো ব্যাখ্যা আছে কি না। হয়তো আছে, হয়তো নেই। হয়তো এ নিছকই কাকতালীয়, আর আমার মনই পরে গিয়ে ঘটনাগুলোকে জুড়ে দেয়। কিন্তু যখনই এমন হয়, নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত অসহায়তা অনুভব করি। মনে হয়, যদি সত্যিই কোনো অশুভ ছায়া আগে থেকে অনুভব করা যায়, তবে তাকে ঠেকিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কেন আমাদের নেই?
তাই কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখলে, কিংবা কোনো অকারণ অশুভ আশঙ্কা মনে এলে, আমি গাছের কাছে কিংবা জলের কাছে মনের কথাটা বলে দিই। লোকবিশ্বাস আছে, গাছ আর জল নাকি অমঙ্গলকে নিজের ভেতর টেনে নেয়।
এই বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি না, জানি না। তবু সব বিশ্বাসই তো শেষ পর্যন্ত যুক্তির কাছে মাথা নোয়ায় না।
জীবনের পথে অনেক মানুষের কাছ থেকেই ছোট ছোট কিছু বাক্য উপহার হিসেবে পেয়েছি। তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান একটি পেয়েছিলাম বিয়ের পর প্রথম দিন। শাশুড়িমা খুব সহজ করে আমাকে বলেছিলেন—
"Live Simple, Dream Big."
সেদিন হয়তো কথাটার গভীরতা পুরো বুঝিনি। কিন্তু যত জীবনকে দেখেছি, তত উপলব্ধি করেছি—এই একটি বাক্যই যেন আমার জীবনদর্শন হয়ে উঠেছে।
আমি সহজভাবে বাঁচার চেষ্টা করি, কিন্তু স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে কখনও কার্পণ্য করি না।
কারণ, ঘুমের স্বপ্ন মানুষকে বিস্মিত করে, কিন্তু জেগে দেখা স্বপ্ন মানুষকে বদলে দেয়। ঘুমের স্বপ্ন ভোরের আলোয় ভেঙে যায়, আর জেগে দেখা স্বপ্নই মানুষকে সেই ভোর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। পৃথিবীর প্রতিটি বড় সৃষ্টি, প্রতিটি অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প, একদিন কারও খোলা চোখে দেখা একটুকরো স্বপ্ন হিসেবেই শুরু হয়েছিল। তাই আজও আমি বিশ্বাস করি, চোখ বন্ধ করে নয়—চোখ খুলেই সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলো দেখতে হয়।
তবু...
একটি স্বপ্ন আছে, যার কথা আজও কাউকে বলিনি। আজ জানি না কেন, মনে হলো সেটাও বলে ফেলি।
ভোরের ঠিক আগের সময়। রাত আর সকালের মাঝখানে যে ক্ষণিকের নীল অন্ধকার থাকে, ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল।
দরজা খুলতেই দেখলাম, একজন দাঁড়িয়ে।
মুখটা যেন স্পষ্টও, আবার অস্পষ্টও। এমন এক মুখ, যাকে চিনে ফেলার কথা, অথচ কোনো নাম মনে পড়ে না।
সে কিছু বলল না।
শুধু হাত বাড়িয়ে দিল।
আমিও অবলীলায় তার হাত ধরলাম। যেন বহু জন্মের পরিচিত কেউ ফিরে এসেছে।
তারপর তাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে আমার পুরো বাড়িটা দেখাতে লাগলাম।
— এই আমার বইয়ের আলমারি।
— এই জানালার ধারে বসে আমি লিখি।
— এই গাছটা নিজের হাতে লাগিয়েছি।
— এই কাপটা আমার সবচেয়ে প্রিয়।
— এই শাড়িটা মা দিয়েছিলেন।
আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো একে একে তাকে দেখিয়ে চলেছি। সে কিছু বলছে না। শুধু দেখছে। তার সেই নীরব দৃষ্টিতে এমন এক মমতা ছিল, যা ভাষাকেও অপ্রয়োজনীয় করে দেয়।
হঠাৎ এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া এলো।
আমার হাতের মুঠো আলগা হয়ে গেল।
চমকে তাকালাম।
কেউ নেই।
ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে গেল।
অনেক চেষ্টা করেছি, আজও তার মুখটা মনে করতে পারি না।
শুধু মনে আছে, সে ছিল খুব আপন।
লোকমুখে শোনা যায়, ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়।
জানি না, সত্যিই হয় কি না।
তবু আজও আমার মনে হয়, পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ আছেন—যাকে হয়তো আমি এখনও চিনিনি, অথবা চিনেও চিনতে পারিনি। অথচ আমার অবচেতন মন তাকে অনেক আগেই আমার মনবাড়ির প্রতিটি ঘর, প্রতিটি প্রিয় জিনিস আর আমার সমস্ত স্বপ্নের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
হয়তো কোনো একদিন সত্যিই কলিংবেল বেজে উঠবে।
আমি দরজা খুলব।
আর মনে হবে—
এ মানুষটিকে আমি আজ প্রথম দেখছি না।
আমার স্বপ্ন তো তাকে অনেক আগেই চিনে ফেলেছিল।
আমি যেন অনেকদিন ধরেই তাঁর অপেক্ষায় আছি। শুধু তিনি এখনও দরজায় কড়া নাড়েননি।

🍂

Post a Comment

3 Comments

  1. AnonymousJuly 26, 2026

    ভোরের প্রথম কমেন্টটিও যদি তার হত? 😊 বেশ লেখাটি।

    ReplyDelete
  2. AnonymousJuly 26, 2026

    সত্যি হোক আপনার স্বপ্ন।

    আমি তো বুড়ো বয়সেও পরীক্ষার স্বপ্ন দেখি !

    ReplyDelete
  3. AnonymousJuly 26, 2026

    ভরসা থাকুক। সব স্বপ্ন সত্যি না হলেও কিছু কিছু হয় বৈকি।

    ReplyDelete