করমের ব্রতকথা : করমু ও ধরমুর গল্প /সূর্যকান্ত মাহাতো

জঙ্গলমহলের জীবন ও প্রকৃতি

পর্ব - ৩৪

করমের ব্রতকথা : করমু ও ধরমুর গল্প

সূর্যকান্ত মাহাতো


বর্ষায় চারা রোপণের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। এবার সেগুলোকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কোনও অপদেবতার কু - দৃষ্টি কিংবা কোনও অশুভ শক্তির ছায়া যেন ফসলের উপর না পড়ে। সে কারণেই অশুভ শক্তির হাত থেকে ফসলকে সুরক্ষিত রাখতে জঙ্গলমহলের কুড়মি, মাহাতো, খেড়িয়া, ভুমিজ, সহ একাধিক সম্প্রদায়ের মানুষ বেশ মহা সমারোহে "করম" ঠাকুরের পূজা করে। ব্রত রেখে একাদশী পালন করে। আর অদ্ভুত ব্যাপার হল এই ব্রত রাখে একেবারেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। দিনভর তারা নানান  উপচার ও অনুষ্ঠানের পালন করে থাকে। দিন শেষে সন্ধ্যা নামলেই সকলে ফুল, পাতা, প্রদীপ সহ পুজোর নৈবেদ্য নিয়ে "করম থানে" উপস্থিত হয়। পুজো হয়। পূজা শেষে ব্রতচারীদের "করম" দেবতার মাহাত্ম্য কথা শোনানো হয়। একেবারে গল্পের আকারে। বক্তার গল্পের প্রতিটি বাক্যের শেষে ব্রতচারীরা 'হুঁ' দেয়। গল্প শুরুর পর, মধ্যিখানে এবং গল্পের শেষে দেবতার উদ্দেশ্যে ফুল ছোঁড়া হয়।

গল্পে ব্রত পালনে নিয়মভঙ্গের কী করুণ পরিণতি হতে পারে, এবং দানের মাহাত্ম্য কথাই ব্যক্ত হয়েছে। এই গল্পের মধ্য দিয়ে শিশুদের শিষ্টাচার ও দানের মতো মহৎ গুণের বিকাশ ঘটানোই অন্যতম উদ্দেশ্য বলে আমার মনে হয়েছে। 

আর বেশি কিছু না বলে বরং গল্পটা শোনা(পড়া) যাক।


সে অনেক অনেক বছর আগের কথা। সে সময় করমু আর ধরমু নামে দুই ভাই ছিল। চাষ বাস করে তারা বেশ সুখে শান্তিতেই বসবাস করছিল। প্রতি বছর নিয়ম করে করম ঠাকুরের পূজার্চনা করত। ঠাকুরের আশীর্বাদে তাদের কোনও অভাব বা দুঃখ কষ্ট ছিল না। এভাবেই বেশ দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু এক বছর তার ব্যতিক্রম ঘটে গেল। এক ভাই করমু 'করম' ব্রতের নিয়ম লঙ্ঘন করে ফেলেছিল। নিয়ম আছে করমের পূজা অর্চনার পরদিন বা করম একাদশীর পর দিন বাসি ভাত আর বাসি তরকারির পান্না খেয়ে ব্রত ভাঙতে হয়। কিন্তু করমু সে বছর ভুল করে গরম ভাত আর গরম তরকারির পান্না খেয়ে ব্রত ভঙ্গ করেছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হল। করম ঠাকুর ভক্তের এমন অনাচারে খুবই রুষ্ট হয়ে পড়লেন। করমুর উপর করম ঠাকুর বাম হয়ে পড়লেন। তার রোষানলে পড়ে করমুর জীবনে নেমে এসেছিল চরম দুঃখ আর কষ্ট।

দেবতার অভিশাপে করমুর সমস্ত শস্য ও ফসল নষ্ট হয়ে গেল। ঘরে দেখা দিল প্রচন্ড অভাব আর অনটন। খাবার তো চায়, না হলে প্রাণে বাঁচবে না। তাই অন্যের বাড়িতে কাজ করতে গিয়েও ফিরে এল। কেউ তাকে কাজে নিচ্ছিল না। এদিকে অনাহারে আর ক্ষুধা ও কষ্টে তার প্রাণ যায় যায়। ভাই ধরমুর বাড়িতে তাই অসহায় ভাবে তাকে একদিন কাজে যোগ দিতে হল। কাজের শেষে খাবারের সময় খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে দেখা গেল, করমুর সামনে আসার প্রাক মুহূর্তেই হাঁড়ির সব ভাত শেষ হয়ে গেল। করমু ভাবল, ফিরে গিয়ে হয়তো তার জন্য আবার ভাত নিয়ে আসবে। করমু অপেক্ষা করতে লাগল। দীর্ঘক্ষন বসে থেকে অপেক্ষা করার পরও যখন তাকে খাবার দেওয়া হল না, তখন করমু রাগে ক্ষোভে ভাই ধরমুর সব শস্য নষ্ট করতে মাঠের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। তারপর যেই ফসল নষ্ট করতে উদ্যত হল অমনি কোথা থেকে যেন আকাশ বাণী হল,---
"খবরদার এমন কাজ একদম করবে না। না হলে শেষ হয়ে যাবে। তুমি গরম ভাতে পান্না করেছ বলেই আজ তোমার এই দুর্দশা। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে থাকেন দেবতা করম ঠাকুর। তুমি তার কাছে যাও। তোমার দুঃখ কষ্টের কথা বল। তিনিই তোমার সকল সমস্যার সমাধান করে দিতে পারবেন।"


করমু আর কোনও উপায় না দেখে সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে যাওয়ায় স্থির করলেন। সেখানে করম ঠাকুর কে সন্তুষ্ট করতে সে সেই রাত্রিতেই বেরিয়ে পড়ল। তারপর দিনরাত্রি কেবল হেঁটেই চলেছে। একটা সময় আর পারছিল না। বেশ কয়েকদিন তার পেটে খাবারের একটি দানাও পড়েনি। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় সে অবসন্ন হয়ে পড়ছে। পা দুটো যেন আর কোনমতেই চলছে না। ক্ষুধা নিবারণ যদিও বা সহ্য করা যাচ্ছে, কিন্তু তৃষ্নাই গলা একেবারে শুকিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় সামনে একটা পুকুর দেখতে পেল। করমু ভাবল, যাক একটু জল খেয়ে তেষ্টা মেটানো যাবে। তারপর পুকুরে নেমে হাতের আঁজলা ভরে জল খাবে বলে যেই মুখের সামনে তুলে ধরল অমনি দেখল জলের ভিতর অজস্র পোকা কিলবিল করছে। তার আর জল খাওয়া হল না। ব্যর্থ মনোরথে যেই ফিরে আসছে, অমনি পুকুর তাকে জিজ্ঞেস করল, সে কোথায় চলেছে? করমু পুকুরকে তার সব কথা খুলে বলল। করম ঠাকুর তার উপর বাম হয়েছেন। তাই সে করম দেবতার কাছে যাচ্ছে প্রতিকারের আশায়। পুকুর তখন করমুকে অনুরোধ করল, "যাচ্ছোই যখন করম দেবতার কাছে জেনে আসবে আমার জলে এত পোকা কেন?" করমু "ঠিক আছে" বলে ফের পথ চলা শুরু করল।

ফের হাঁটা শুরু করলেও সেভাবে আর পারছিল না। খিদার জ্বালা ক্রমশই যেন বাড়ছে। তবুও কোনও রকমে কষ্টে শিষ্টে কিছুদূর এগোতেই দেখতে পেল সামনে একটা ডুমুর গাছ। করমুর মনটা আনন্দে ভরে গেল। ভাবল, যাক এই ডুমুর ফলগুলো খেলে কিছুটা ক্ষুধা নিবারণ করা যাবে। তারপর যেই ডুমুরের ফলে কামড় দিতে যাবে অমনি দেখল, ফলের মধ্যেও অজস্র পোকা। তার আর ডুমুর ফল খাওয়া হল না। মনের কষ্টে যখন ফিরে আসছে ডুমুর গাছটি জানতে চাইল, সে কোথায় যাচ্ছে। সব শুনে ডুমুর গাছটি করমুকে অনুরোধ করল, তার ফলে পোকা কেন এবং কীভাবে মুক্তি পাবে, সে কথা যেন ঠাকুরের কাছে জেনে আসে।


"আচ্ছা" বলে করমুর পথ চলা আবার শুরু হল। পথের যেন শেষ নেই। হাঁটা হাঁটা আর হাঁটা। হেঁটেই চলেছে সে। এদিকে খিদা ও তেষ্টাই কষ্ট যেন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কিছুদূর এভাবে হাঁটতেই অদূরেই একটা কুঁড়েঘর দেখতে পেল। করমু ভাবল যাক এই বাড়িতে কিছু জলখাবার যদি বা নাও পাওয়া যায়, তামাক খাওয়ার আগুন টুকু অন্তত পাওয়া যাবে। করমু কুঁড়ে ঘরের সামনে এসে হাঁক পাড়ল, "বাড়িতে কেউ আছো?"
 ভিতর থেকে এক বুড়ির কণ্ঠস্বর ভেসে এল। "কে বাবা তুমি। ভিতরে এসো। আমার যাওয়ার উপায় নেই।"
 করমু ভিতর ঢুকেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। একটা উনুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। উনুনের মুখে বসে আছে এক বুড়ি। পা দুটো তার উনুনের ভেতর। কাঠের পরিবর্তে বুড়ির পা দুটো আগুনে জ্বলছে। তবুও পা দুটো পুড়ে শেষ হচ্ছে না। এদিকে বুড়ি বসে বসে দুই হাতে একটা কুলার মধ্যে থাকা অজস্র চিংড়ি মাছ বেছেই চলেছে। যেন শেষই হচ্ছে না। বুড়ির অসহায়তা দেখে করমু যখন ফিরে আসছে, বুড়ি বলল, "বাবা কোথায় যাচ্ছো?" করমু তাকে সব কথা সবিস্তারে বলল। বুড়ি সব শুনে বলল, "তুমি যখন করম ঠাকুরের কাছে যাচ্ছ, তখন জেনে আসবে আমার পা আগুনে কেন পুড়ছে না! আর চিংড়ি মাছ বাছাই বা শেষ হচ্ছে না কেন!"


"ঠিক আছে" বলে বুড়ির কাছ থেকে ফিরে করমু ফের পথ চলতে শুরু করল। যেতে যেতে, যেতে যেতে এবার একটা বড় মাঠে এসে পড়েছে। দেখল, কতকগুলো গাভী এদিক-ওদিক চরে বেড়াচ্ছে। তাদের কোনও বাগাল নেই। করমু ভাবল, যাক এদের একটু দুধ খেতে পারলে তেষ্টা অনেকটাই মেটানো যাবে। খিদাও অনেকটা কমবে। তারপর যেই একটা গাভীর দিকে গেল, অমনি গাভীটি শিং উঁচিয়ে তাকে তাড়া করল। তবে পালানোর আগে গাভী তাকে জিজ্ঞেস করল, "ভাই কোথায় যাচ্ছ?" করমু সব কথা গাভীকে খুলে বলল। গাভী সব শুনে বলল, "তাহলে তোমার করম ঠাকুরের কাছে জেনে আসবে আমাদের কেন বাগাল নেই!"


গাভীকে "ঠিক আছে" বলে, করমু আবার হাঁটতে শুরু করেছে। বেশ ক্লান্ত সে। যেতে যেতে এবার কিছুটা দূরেই দেখতে পেল কতকগুলো ঘোড়া চরে বেড়াচ্ছে। করমু ভাবল যাক এবার ঘোড়ায় চড়ে সে বাকি পথটুকু যেতে পারবে। এই ভেবে যেই সে একটা ঘোড়ার পিঠে চাপতে গেছে অমনি তাকে লাথি মেরে ঘোড়াটি পালিয়ে গেল। করমু অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল। ঘোড়াটি তখন করমুকে বলল, "ভাই কোথায় যাচ্ছ?" করমু বলল, "করম ঠাকুরের কাছে।" তারপর সব ঘটনা তাকে খুলে বলল। ঘোড়াটি সব শুনে বলল, "তাহলে তোমার করম ঠাকুরের কাছে জেনে আসবে তো কেন আমাদের কোন মালিক নেই। কেন আমরা পিঠে সওয়ার নিতে পারি না।"


করমু "আচ্ছা বলে" ফের হাঁটা শুরু করেছে। এবার আর কোথাও থামেনি। একটানা হেঁটে চলেছে। দীর্ঘ পথ ঘাট পিছনে ফেলে কেবল হেঁটেই চলেছে অবিরাম। এক সময় একটা জায়গায় পৌঁছানোর পর দেখল, সমস্ত রাস্তা শেষ। সামনে শুধু জল আর জল। যেদিকে চোখ যায় কেবল বিস্তৃত জলরাশি শুধু। করমু ভাবল, এবার কি হবে! এই বিস্তৃত জলরাশি সে কীভাবেই বা পার হবে। এদিকে আবার করম ঠাকুরের সঙ্গে দেখা তাকে করতেই হবে। উনি তো আবার থাকেন জলের ওপারে। তার কাছে পৌঁছোতে না পারলে তার দুঃখ কষ্টের মুক্তিও ঘটবে না। এই দুঃখ কষ্ট নিয়ে সে বেঁচে থাকতেও পারবে না। তখন কোনও উপায় না খুঁজে পেয়ে সে জলে ঝাঁপ দিয়ে পেরানোর কথায় চিন্তাভাবনা করল। তাতে যদি ডুবে মরতেও হয় তাও বরং ভালো। এ কথা ভেবে সে যেই জলে ঝাঁপ দিতে দৌড়ালো, অমনি দেখল দূর থেকে একটা কুমির ভেসে আসছে। কুমিরকে দেখে তো সে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। তারপর ভাবল, জলে নামলেই তো কুমির তাকে খেয়ে ফেলবে। আসন্ন মৃত্যুর আশঙ্কায় বউয়ের মুখটা তখন খুব বেশি বেশি মনে পড়তে লাগল। সে কী করছে, কী খাচ্ছে এসব কিছু ভাবতে ভাবতেই তার কান্না পেয়ে গেল। সে মনের দুঃখে বেশি করে কাঁদতে লাগল। কারণ একটু পরেই তো সে কুমিরের পেটে চলে যাবে। কুমির তার কান্না শুনে বলল, "তুমি কাঁদছ কেন ভাই?" করমু তাকে তার সমস্ত দুঃখের কথা জানাল। সব শুনে কুমিরটি বলল, "ঠিক আছে। কাঁদতে হবে না। আমি তোমাকে ওপারে নিয়ে যেতে পারি। তবে তোমার করম ঠাকুরকে আমার কথা অবশ্যই বলবে, আমি কেন আজ পর্যন্ত ডুবতে পারি না।"

করমু "ঠিক আছে" বলতেই কুমিরটি তাকে পিঠে চড়িয়ে সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে নিয়ে গেল। আর বলল, "আমি এখানে অপেক্ষা করছি।"


করমু সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে পৌঁছে দেখল সামনেই একটা ঝর্ণা। তার স্রোত বয়ে চলেছে সমুদ্রমুখে। সেই ঝর্ণায় এক সুদর্শন ও সু-পুরুষ ব্যক্তি ডুবছে আর উঠছে। তার শরীর থেকে নির্গত হচ্ছে অদ্ভুত এক জ্যোতির্বলয়। উজ্জ্বল সেই জ্যোতি রশ্মি কেবলই চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। করমু ভাবল, ইনিই সেই করম ঠাকুর হবেন। তাই আর দেরি না করে সে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল করম ঠাকুরের পায়ে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ঠাকুর আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমার অপরাধ হয়েছে।"

করম ঠাকুর অন্তর্যামী। তিনি সব জেনেও বললেন, "কে তুই, আমার পা ধরলি কেন?"

করমু কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আমি করমু। আমি ভুল করে গরম ভাতে পান্না করে ফেলেছিলাম। তাই আপনার কোপ দৃষ্টিতে পড়ে আমি সর্বশ্রান্ত হয়েছি। আপনি ক্ষমা করে না দিলে আমি এই পা কখনো ছাড়ব না।"

করম ঠাকুর করমুর উপর প্রসন্ন হলেন। তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সেই সঙ্গে নির্দেশ দিলেন প্রতিবছর যেন ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশীতে করম ডাল গেড়ে তার পূজা করা হয়। আর উপবাসের পর বাসি ভাত ও বাসি তরকারিতে পান্না করা হয়। তাহলেই করমুর দুঃখ ঘুচবে।

করম ঠাকুরের কৃপায় সন্তুষ্ট হয়ে করমু এবার রাস্তার সমস্ত ঘটনা দেবতাকে সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। পুকুর, ডুমুর গাছ, বুড়ি, গাভী, ঘোড়া ও কুমিরের দুঃখের কথা শোনালেন। তাদের মুক্তির উপায় ঠাকুরের কাছে জানতে চাইলেন। করম ঠাকুর সব শুনে তাদের মুক্তির উপায়ও বলে দিলেন করমুকে।

করমু প্রসন্ন মনে বাড়ি ফেরার জন্য পা বাড়াল। নদীর ঘাটে এসে দেখে কুমির তখনও তার জন্য অপেক্ষা করছে। কুমির তাকে দেখতে পেয়ে বলল, "ভাই আমার কথাটা তোমার ঠাকুর কে বলেছিলে?"

করমু বলল, "আগে আমাকে পার করে দাও তারপর বলব।" কুমির তখন পিঠে চড়িয়ে করমুকে নদীর এপারে এনে দিল। এপারে পৌঁছে করমু কুমিরকে বলল, "তুমি অনেক মানুষ খেয়েছ। তার মধ্যে অনেক মহিলাও ছিল। তাদের সব গয়নাগাটি তোমার পেটে। তাই তুমি যদি সেই সব উগরে কোন গরীব দুঃখীকে দান কর, তাহলেই তোমার মুক্তি ঘটবে। এবং তুমি ডুবতে পারবে।"

কুমির একটু ভেবে বলল, "গরিব দুঃখী আমি কোথায় পাবো? এই আমি উগরে দিলাম। তুমিই বরং নিয়ে যাও।"

কুমির তখন জলে ডুবতে পারল। করমু সমস্ত গয়নাগাটি নিয়ে হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল ঘোড়ার দলের কাছে। দলের প্রধান ঘোড়াটা জিজ্ঞাসা করল ভাই আমাদের কথাটা তোমার ঠাকুর কে বলেছিলে? করমু বলল, "বলেছি। এবং মুক্তির উপায়ও বলেছেন। তোমাদের দলের একটি ঘোড়া যদি কাউকে দান করতে পারো, তাহলে তোমাদের মালিক জুটবে এবং সওয়ারও চাপাতে পারবে।"

প্রধান ঘোড়াটি বলল, "এখন কোথায় তেমন লোক পাব! তাই তোমাকেই একটি ঘোড়া দান করলাম।"

করমু সেই ঘোড়ায় চড়ে এবার ফিরতে লাগল। ফিরতে ফিরতে পৌঁছে গেল সেই মাঠে, যেখানে গাভী চড়ে বেড়াচ্ছে। গাভীদের বলল, তারা যদি কাউকে তাদের দুধ দান করতে পারে তাহলে তাদের বাগাল জুটবে। কোথায় আর গরিব দুঃখী পাবে! তাই করমুকেই একটি গাভী দুধ দান করল। সেই দুধ খেয়ে করমু সমস্ত গাভীর মালিক হয়ে ঘোড়ায় চড়তে চড়তে পৌঁছে গেল বুড়ির কাছে।

বুড়িকে বলল, জ্বলন্ত উনুনের কাঠে সে কোন একদিন লাথি মেরেছিল। তাই আজ তার এই দশা। এছাড়াও উনুনের নিচেই পোঁতা আছে পূর্বপুরুষের ধন-সম্পদ। বুড়ি যদি সেগুলো কোন গরীব দুঃখীকে দান করে, তবেই তার মুক্তি ঘটবে। বুড়ি কোথাও কাউকে না পেয়ে করমুকেই সে ধন-সম্পদ দান করল। এবং উনুনের কাঠকে প্রণাম করে বুড়ির মুক্তি লাভ ঘটল।

 প্রচুর ধন সম্পদ ঘোড়াই চাপিয়ে করমু এবার ডুমুর গাছের সামনে এল। ডুমুর গাছের নিচেও অনেক সোনা দানা ছিল। ডুমুর গাছকেও একইরকম ভাবে বলল, "সে যদি ওই সোনাদানা গরিব দুঃখীকে দান করে তবেই তার ফল পোকামুক্ত হবে।" ডুমুর গাছও কাউকে না পেয়ে করমুকেই সেই সব দান করল। 

করমু এবার সমস্ত সোনাদানা নিয়ে পুকুর পাড়ে এসে পৌঁছাল। পুকুরের জলেও অনেক সোনা ডানা ডুবে ছিল। পুকুরকেও সেই সোনা দানা দান করতে হবে। তবেই তার জল পোকা মুক্ত হবে। পুকুরও গরিব দুঃখী কোথায় পাবে! তাই করমুকেই সে সোনা দানা দান করল। তারপর মুক্তি লাভ করল সমস্ত পোকা মাকড়ের হাত থেকে। করমু তখন নিজেও পুকুরের জল খেয়ে ঘোড়া ও গাভীগুলোকেউ জল খাইয়ে মনের আনন্দে বাড়ি ফিরল।

ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশীর দিন মহা ধুমধাম করে করম ডাল গেড়ে করমু 'করম' ঠাকুরের পূজা করল। আর গরিব-দুঃখীদেরও প্রচুর ধন-সম্পদ ও অর্থ দান করল। এভাবেই এই দানের মধ্য দিয়ে সে সমস্ত দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তি লাভ করল।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. খুব ভালো লাগল। ঘোড়ায় চেপে হয়ে গিয়েছে "ঘোড়াই" চেপে। দয়া করে খেয়াল করুন।

    ReplyDelete
  2. Darun laglo lekhta pore ...valo hoye6e.

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন