(দ্বিতীয় পর্ব )
সৌমেন রায়
চিত্র – কল্লোল মজুমদার
( প্রথম পর্বের শেষ অংশ -ঘোতন পাখির দিকে চোখ রেখে ছুটছে। শুনতে পেল কিনা কে জানে! পাখি এই গাছ থেকে ওই গাছে উড়ে যায়। অর্ক দৌড়ায় তার পিছু পিছু। পাখিটার যখন আর চিহ্ন পাওয়া গেল না তখন উপর থেকে চোখ নামিয়ে অর্ক দেখল এখানের জঙ্গলটা এক্কেবারে অচেনা। গাছগুলো বড় বড়, ঘন লতাপাতা জড়িয়ে আছে। বেশ ঠান্ডা ভাব। নিচটা স্যাতস্যাতে। গা ছমছম করে উঠল। বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। কোনদিক থেকে এসেছিল সেটা কিছুতেই ঠিক করতে পারল না। সবদিক একই রকম লাগছে। কি করে বাড়ি ফিরবে এখন? কেন যে পাখিটার পিছনে ছুটল ! চোখে জল এসে গেল অর্কের।)
তখন বেলা থাকলেও জায়গাটা অন্ধকার অন্ধকার। পাশের প্রকাণ্ড গাছটার উপর থেকে হঠাৎ তীক্ষ্ণ স্বরে কেউ বলে উঠল, ‘তুই কে?’ আশপাশ থেকে অনেকে একসঙ্গে যেন বলে উঠল কেরে, কেরে, কেরে কেরে’!শব্দটা ছড়িয়ে পড়ছে গোটা জঙ্গল জুড়ে।
ঝাঁকড়া গাছটার গুড়িটা বেশ মোটা। যেখান থেকে বড় বড় ডালগুলো বেরিয়েছে সেখানে একটা মস্ত ফোকর। মনে হলো ওর মধ্যে কেউ নড়াচড়া করছে যেন । কিছুক্ষণ চারিদিক নিস্তব্ধ। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কি করবে ভাবছে অর্ক। এমন সময় শুরু হলো একটা সর -সর , খস – খস ,গজ- গজ মৃদু আওয়াজ। ক্রমশ বাড়তে লাগলো আওয়াজটা। ভয়ে এদিক ওদিক তাকাল অর্ক। যেদিকে ঘোরে মনে হয় তার পিছন থেকে যেন শব্দটা আসছে।ভয়ে দিশেহারা হয়ে গেল সে। এমন সময় আবার সেই ডাক।
‘তুই কে! কেরে, কেরে, কেরে, কেরে’!
মনে হল কারা যেন তাকে ধরতে আসছে।
এবার যেদিকে চোখ যায় ছুটতে লাগল অর্ক। ডাকটা যেন পিছু পিছু আসছে। ছুটতে ছুটতে গাছে ধাক্কা খাচ্ছে। পা ছড়ে যাচ্ছে। কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ নাই তার। হঠাৎ গাছের ডালে থাকা একটা মাটির দলায় ধাক্কা খেল। আসলে সেটা ছিল ভিমরুলের বাসা। তিন চারটা ভিমরুল অর্ক ‘র মুখে আর ঘাড়ে হুল ফোটাতে শুরু করেছে। এই সময় ছুটে পালাতে গেলে ঝাঁকে ঝাঁকে ভিমরুল তাড়া করে বলে সে শুনেছিল। বুদ্ধি করে বসে পড়ল। বসে বসেই পিছিয়ে গেল একটু । কিন্তু বড় বিপদ থেকে বাঁচলেও আগের কামড়েই মুখটা একদম ফুলে উঠল। গা ঝিমঝিম করতে লাগল। বোধহয় আর কোনদিন বাড়ি ফিরতে পারবে না। কি হবে তাহলে? শেয়ালে খাবে না ভূতে ধরবে? আর ভাবতে পারছেনা সে।
এদিকে অর্ক ফিরছে না দেখে ভৈরব চারিদিকে খুঁজতে লাগলো, ‘অর্ক কোথায়, অর্ক কোথায়’?
জঙ্গলের মধ্যে হাহাকারের মতো আওয়াজ উঠল, ‘অর্ক কোথায়, অর্ক কোথায়’?
তখন সন্ধ্যা হব হব। খুঁজতে খুঁজতে যখন ভৈরবও হাল ছেড়ে দেবার উপক্রম তখনই ভাগ্যক্রমে দেখতে পেল অর্ককে। একটা বিরাট ভীমরুল চাকের হাত দশেক দূরে পড়ে আছে। মুখে বিড় বিড় করছে কিছু একটা ।
‘কি বলছ দাদাবাবু? কি হল গো তোমার! হায় হায় কি হলো’ ? ভৈরব ভয় পেয়ে গেছে।
অর্ক অস্ফুটে বলে,’তুই কে? কেরে, কেরে, কেরে, কেরে’।
ঠিক সেই সময় ভয়ঙ্কর ডাকটা আবার শোনা গেল। ভয়ে কাঁপতে লাগল অর্ক।
‘ওটা তো কুটুরে পেঁচার ডাক। ভয়ের কি আছে! চল বাড়ি চল’।
ভালুকের মতো ফোলা মুখ নিয়ে, ভৈরবের কাঁধে ভর দিয়ে অর্ক যখন বাড়ি ফিরল সবাই তার আশা ছেড়ে দিয়ে কাঁদতে বসেছে।
‘দাদাবাবু আজ আমার আঁতে পাক ফেলে দিয়েছে’ , অর্ককে পৌঁছে দিয়ে হাঁফ ছাড়ে ভৈরব।
লাঠি হাতে ছুটে আসে পিসি। হাতে লাঠি থাকলে কি হবে পিসির চোখে জল। অর্ক আশ্রয় পায় দিদিমার আঁচলে। দিদিমা পেঁয়াজ বেটে ক্ষতগুলিতে লাগিয়ে দেয়। হোমিওপ্যাথি ওষুধ নিয়ে আসে বড় মামা। পাশে বসে মিষ্টি হাওয়া করে দেয়।ব্যথা একটু কমলেও রাতে প্রবল জ্বর এলো অর্কের। পিসি সারারাত বসে জল পটি দিল।আর তার ভাগ্যটাই যে খারাপ সেই কথা বলল অন্তত বার কুড়ি । ভোরের দিকে জ্বর কমতে তবে পিসি ঘুমালো একটু।
সকাল হতে দরজার কাছে আবার আওয়াজ উঠল, ‘অর্ক কোথায়, অর্ক কোথায়?’
পাড়ার মামিমারা সব অর্কের জন্য এটা ওটা খাবার বানিয়ে নিয়ে এসেছে। আজ তার খাতির আরও একটু বেশি। পিসি অর্ককে ঘুম থেকে তুলে, মুখ ধুইয়ে, খাবার খাইয়ে গেল স্নান করতে। ফিরে এসে দেখে অর্ক বিছানায় নেই। আবার কোথায় গেলো? হায় হায় করে ডুকরে কেঁদে উঠে পিসি।আর সহ্য করতে পারছেনা সে।
আবার চারিদিকে আওয়াজ উঠল, ‘অর্ক কোথায়? অর্ক কোথায়’?
জ্বর গায়ে তো আর জঙ্গল যেতে পারবে না। তাহলে গেল কোথায়? চারিদিকে খুঁজেও যখন পাওয়া গেল না তখন মামিমা ভয়ে ভয়ে বলল, ‘ জ্বর গায়ে পুকুরের জলে পড়ে যায়নি তো’?
ছোট মামা জাল নিয়ে সারা পুকুর টেনে দেখল। কটা গেড়ি - গুগলি ছাড়া কিছু উঠল না। পিসি অকারনে দিদিমাকে দোষ দিতে লাগল।
‘কি কুক্ষণেই না বাপের বাড়ি এলাম । আর কোনদিন যদি আসি! ’
এমন সময় ছোট্ট মিষ্টি এসে বলল, ‘পিসিমনি, দাদা তো ওই ঘরে’।
সবাই এক দৌড়ে ঘরে গেল। কিন্তু বিছানা তো ফাঁকা! ছোট্ট মিষ্টি কোমর ঝুঁকিয়ে দেখালো খাটের নিচে। সবাই একসঙ্গে মেঝেতে বসে তাকালো খাটের তলায়। দেখার পর সবাই উঠে দাড়িয়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। খাটের নিচে কালকে কাটা আধপাকা কলার কাঁদিটাকে পাশবালিশ করে ঘুমাচ্ছে অর্ক।
0 Comments