দশম পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
এই পৃথিবীতে আমার মনে হয়, অসুখী-এর অনুভূতির ক্ষমতায় মানুষই সর্ব্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। দুঃখ-যন্ত্রনা- এসব তো সব প্রাণী তথা যাদের প্রাণ আছে, তাদের সবারই আছে।কিন্তু তা বলে নিজেকে অন্যের তুলনায় অসুখী মনে করে দুঃখের ভার আরো বাড়িয়ে দেবার ক্ষমতা মানুষেরই আছে।এরকারণ হল-মানুষের বিচারক্ষমতা-চিন্তাক্ষমতা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল-এই প্রদত্ত বা অর্জিত বিচারক্ষমতার উদ্দেশ্য কী এটা যে -নিজের অনুভূতিকে অনুভব করে তাতে ডুবে থাকা-বিশেষ করে দুঃখের ক্ষেত্রে!
এই বিশেষ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি তো সকল অবস্থার অতীত যে আনন্দময় সত্তা, তাকে উপলব্ধি করতে পারে -আর জাগতিক ক্ষুদ্র, তুচ্ছ স্বার্থপ্রনোদিত সুখ-দুঃখের অনুভূতিতে ভেসে না গিয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় থেকে জগতের উদ্দেশ্যে মঙ্গলকার্য -বৃহৎ আমি বা প্রকৃত আমির উদ্দেশ্যে মঙ্গলকার্য করতে পারে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব যদি সুখ-দুঃখের স্রোতে ভেসে গিয়ে নিজের আত্মপরিচয় বিস্তৃত হয়ে ওই সুখ-দুঃখকেই নিজের অস্তিত্বের ধারক-বাহক মনে করে নেয়-তাহলে তা কী শোভা পায়!
🍂
আত্মস্বরূপ অনুসন্ধান বা উপলব্ধির ক্ষমতা মনুষ্যেতর প্রাণীদের থাকে না-কিন্তু মানুষের আছে। মানুষ কী নিজে নিজের স্রষ্টা!নিজের ইচ্ছেমতো সে নিজের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে পারে!যদি তা না হয়, তাহলে নিজের বলতে আছেটা কী!যদি কিছুই না থাকে, তাহলে তো কোনো সমস্যাই থাকার কথা নয় -কারণ জীবন,যা আপাত ব্যক্তি নিজের বলে মনে করে, তা-ই যখন নিজের নয়, তাহলে জড়বিষয়সংস্পর্শে প্রাপ্ত সুখ-দুঃখ কী করে আপন হয়!আর যদি আধ্যাত্মিকতত্ত্ব অনুযায়ী উত্তর হয় -"আত্মা আছে ", তাহলেও তো দুঃখের কিছু নেই। কারণ আত্মা তো জড়জাগতিক ব্যাপার নয় -তা তো আনন্দময়-অজড়-অমর সত্তা। তাহলে দুঃখ কিসের!
এইজন্যই যোগে বলা হয়- নিজের জীবনের প্রতিটি ঘটনা, অনুভূতিকে দ্রষ্টারূপে দেখতে। এর অন্তর্নিহিত ভাবার্থ অনেক। এর জীবনের প্রতি প্রভাবও অত্যন্ত ইতিবাচক।
অনেকক্ষেত্রে ব্যক্তির মধ্যে আর এক প্রকার প্রবণতা দেখা যায়। তা হল-নিজের দোষ ঢাকতে অপরের প্রতি দোষারোপ করা। এক্ষেত্রে অন্যের প্রতি দোষারোপ একপ্রকার মনগত আত্মপক্ষরক্ষামূলক মানসিক কৌশল। কিন্তু এর নঞর্থক দিক হল-এর ফলে ব্যক্তির দৃঢ় মানসিকতা ক্ষুন্ন হয়। ভুল তো মানুষমাত্রেই হয়। ভুল হলে সেই ভুল স্বীকার করা কখনোই ক্ষুদ্র মানসিকতার পরিচায়ক নয়। ভুল স্বীকার করে নিলে অনেকটাই হাল্কা হওয়া যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা হল-ভুল স্বীকার দৃঢ় মানসিকতার পরিচায়ক। কারণ ভুলকে ঠিক বলে চালিয়ে জেতার থেকে ভুল বুঝে নিয়ে সঠিক পথ নির্বাচন করা শ্রেয়।
দ্রষ্টার ভূমিকায় থেকে আত্মপর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণ করলে ব্যক্তির জীবন বা মন খুব বিস্ময়ের উদ্রেক করে। এতো বৈচিত্র্যময় ও বিস্ময়কর পরিবর্তনশীলতা বা প্রবহমানতার অন্তর্নিহিত অর্থ বা ভাব ব্যক্তি যদি অনুধাবন করতে পারে, তাহলে জীবন ব্যক্তির কাছে আর সমস্যাবহুল বলে মনে হবে না-জীবনটা ঠিক প্রবহমান নদীধারাসম মনে হবে।।
0 Comments