একত্রিশ পর্ব
রতনতনু ঘাটী
ক্রিকেটের গল্পে আজ এখন সকলের মন টইটই। রোরো মজুমদার লোকনের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘জানিস তো, আমাদের যদি ক্রিকেট খেলতেই হয়, তবে মুকুলস্যারের এই গল্পগুলো জীবন দিয়ে মনে রাখতে হবে। সত্যিই যেন এক অন্য রূপকথার গল্প শুনলাম। আমরা যেমন সেই কোন ছোটবেলায় ব্যঙ্গমা-বেঙ্গমীর গল্পগুলো শুনেছিলাম, আজও ভুলিনি। এ গল্পগুলোও অমনি, চিরদিন মনে গাঁথা হয়ে থেকে যাবে।’
লোকন বলল, ‘আজ তো বিকেল হয়ে গেল। আর একদিন হেডস্যারকে বলে, মুকুলস্যরের ক্রিকেটের গল্পের আসর করতে বলব, কী বল রোরো? অনেকটা সময় ধরে উনি আমাদের এরকম নানা গল্প শোনাবেন!’
দূর থেকে দেবোপমস্যার ওদের কথাগুলো শুনছিলেন। বললেন, ‘জানো তো, মুকুলকৃষ্ণস্যার ক্রিকেটের যত গল্প নিজের চোখে দেখেছেন, অমন কত-কত গল্প যে বই পড়ে মনে রেখেছেন, তার শেষ নেই! এককম ক্রিকেটপ্রাণ মানুষ আমি জীবনে দেখিনি!’
ওঁদের কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন ইংরেজির লতিকাম্যাম। তিনিও বললেন, ‘দেবোপমস্যার, আজ ওইটুকু খানিক গল্পে যেন মন ভরল না। আর একদিন শুনতে চাই।’
ততক্ষণে হেডস্যার এবং মুকুলকৃষ্ণস্যার এসে দাঁড়ালেন। ঘন্টিদাদুকে হেডস্যার বললেন, ‘তুমি সব দিক গোছগাছ করে বাড়ি চলে যেও!’
তারপর মুকুলকৃষ্ণবাবুকে বললেন, ‘আমাদের ক্রিকেটের গল্প শোনানোর হাত থেকে আপনার রেহাই নেই, বুঝতেই তো পারছেন! দেখি আমাদের ফাইনাল ম্যাচের আগে আর-একদিন এরকম একটা ক্রিকেটের গল্পের আসর করা যায় কিনা।’ দেবোপমস্যারের দিকে তাকিয়ে হেডস্যার বললেন, ‘দেবোপম, তুমিও অবকাশ খুঁজে একটা দিন দেখে আমাকে জানিও! আমি সেই দিনটা দেখে নোটিস দিয়ে দেব!’
মুকুলকৃষ্ণস্যার বললেন, ‘আমি যদি এরকম করে ক্রিকেট নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারি, তবে দেখতে হয় না! আমি সব সময় রাজি!’
সিন্ধুজা মাইতি মুকুলকৃষ্ণস্যারের কথার পিঠে বলল, ‘আজ কত না-জানা কথা শুনে যে জীবনটা ধন্য হয়ে উঠল, সারা জীবন যদি ক্রিকেট নিয়ে না-ও থাকতে পারি, বড় হয়ে ছোটদের কাছে এই সব পৌঁছে দিতে পারব, যাতে তারা মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠে!’
তিথিবকুল গ্রামের অমূল্য ধর বললেন, ‘মুকুলবাবু, আপনি ক্রিকেটকে সমাদরের আসনে বলিয়ে দিলেন আমার মনে! এনিতেই সব খেলার চেয়ে ক্রিকেট প্রিয়তম খেলা আমার’
লোকন আর অপেক্ষা করতে পারল না। দিদি পারুলমণি একটু দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিল সকলের কথা। বলল, ‘ভাই চল রে, বাড়ি ফিরতে হবে তো! এক্ষুনি অন্ধকার নেমে পড়ল বলে!’
পারুলমণি চোখে দেখতে পায় না বটে, মনের চোখ দিয়ে সবকিছুই দেখতে পায়। যারা চোখে দেখতে পায় না, দিনের সূর্যের আলো আর রাতের অন্ধকার এবং জ্যোৎস্না তাদের অনের কথাই না চাইতে জানিয়ে দেয়! লোকন বলল, ‘চল রে দিদি!’
ওরা আবছা অন্ধকারে বাড়ির পথ ধরল। দিদির হাত ধরেছে লোকন। অমন সময় মুকুলকৃষ্ণবাবু হেডস্যারকে বললেন, ‘এই পারুলমণি, কেমন আশ্চর্য মেয়ে দেখুন তো! সারাক্ষণ বসে-বসে আমার ক্রিকেটের গল্প শুনল। ভগবান কেন যে ওর দু’চোখে আলো দিতে ভুলে গেলেন!’
হেডস্যার বললেন, ‘আমাদের মাঠের শেড তৈরির জন্যে পারুলমণিও অনুদান দিতে চেয়েছে। আমি তো ওর সম্মতির কথা শুনে সেদিন অবাক হয়ে গেছি।’
একধারে চুপটি করে দাঁড়িয়ে ছিল ক্লাস ফাইভের সাতনরী গায়েন। হেডস্যার ওকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এখনও দাঁড়িয়ে আছ যে বড়? কার সঙ্গে বাড়ি ফিরবে?’
সাতনরী গলায় আকুতি ফুটিয়ে বলল, ‘আমি আর একটু বড় হয়ে নিই। আমাকে তখন আমাদের স্কুল ক্রিকেট টিমে নেবেন তো স্যার? আমি ক্রিকেটার হতে চাই!’
হেডস্যার গলা তুলে হা-হা করে হেসে বললেন, ‘চটপট ক্লাস এইটে উঠে পড়ো। তোমার জন্যে একটা জায়গা খালি থাকবে!’
কথাটা শুনে মন ভরিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল সাতনরী! মুকুলস্যার বললেন, ‘দেখেছেন নবনীতস্যার, এসব মেয়েই একদিন আমাদের ভারতের ক্রিকেট টিমে উঠে আসবে। এরা এক-একজন স্মৃতি মান্থানা, শেফালি বর্মা, শিখা পান্ডে নয়তো চম্বলের মেয়ে বৈষ্ণবী শর্মা হয়ে ক্রিকেট মাঠ দাপিয়ে বেড়াবে। শুধু দরকার আপনার মতো মানুষকে।’
লোকন আর পারুলমণির বাড়ি ফিরছিল। হরিমোহন দাদুদের পুকুর পাড়ে জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটে লম্বা তালগাছ। তাদের মাথায় হুড়মুড় করে অন্ধকার নেমে পড়ল হুট করে। পারুলমণি বলল, ‘তুই দাঁড়া ভাই। আমি দরজার চাবিটা খুলি। এদিকে বড্ড অন্ধকার!’
‘আমিও তো খুলতে পারি দিদি? অন্কারে তুই চাবিটা খুলতে পারবি, আমি পারব না? এই তোর সবকিছুতে আগ বাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া, এটা এবার বন্ধ কর তো দিদি! তোর জেনে রাখা দরকার, লোকন দাস এখন বড় হয়ে গেছে!’
ভাইয়ের মাথায় একটা আদরমাখা আলতো চাঁটি মেরে পারুলমণি বলল, ‘দাঁড়া দিকিনি চুপটি করে! অত বড় হয়ে কাজ নেই!’
ঝনাত করে দরজা থেকে তালা খোলার শব্দ হল। পাল্লা খুলে হাতড়ে সুইচ বোর্ডের কাছে এগিয়ে গিয়ে পারুলমণি ঘরের আলো জ্বলাল। প্রথমে মাছের জারের মুখটায় উঁকি দিয়ে মুখ নিচু করে দেখল। হঠাৎই হাউহাউ করে কেঁদে উঠল পারুল, ‘লোকন, সে আর নেই!’
‘কী হয়েছে রে দিদি? তুই কাঁদছিস কেন? বল না!’
‘আমার নয়নী নেই রে। জারের ভিতর উলটে স্থির হয়ে জলের উপর ভেসে আছে নয়নী। তুই এসে দেখে যা!’
হুড়মুড় করে লোকন উঁকি দিয়ে দেখে দিদিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল, ‘দিদি, ওকে নিয়ে এসেছিলি অমিতাভ সেনজেঠুদের অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে। এতদিন বাঁচিয়েও রাখলি! কেন এনেছিলি বল তো? অমন দৃষ্টিহীন মাছ! চোখে দেখতে পেত না তো! পরে তুই সেনজেঠুদের কাছ থেকে তার জন্যে আবার একটা বন্ধু-মাছকেও এনে রাখলি। এবার ওর বন্ধুটার কী হবে? নয়নীকে কিন্তু রাখা তো গেল না। পৃথিবীটা ওকে চাইল না রে দিদি!’
‘পৃথিবীটা এরকমই রে! যে থাকতে চায় তাকে রাখে না। যাকে থাকতে দেয় না তার জন্যে চুপিচুপি আসন গুটিয়ে নেয়। একদিন আমার জন্যেও দেখিস, ও এমন করে আসন গুটিয়ে নেবে!’
‘কে?’
পারুলমণি করুণ ঠোঁটটা তিরতির করে কেঁপে উঠল। মুখটা উপরে তুলে গলা নামিয়ে বলল, ‘ভগবান!’
লোকন মুখে রাজ্যের রাগ ফুটিয়ে বলল, ‘দিদি, তুই অমন কথা বলিস না তো! আমার শুনতে ভাল লাগে না। আমরা কেউই অনন্তকাল পৃথিবীতে থাকতে আসিনি। তুই, আমি, দেবোপমস্যার, রোরো... কেউ না। আমাদের প্রত্যেকের জন্যে সময় ঠিক করা আছে। সময় হলে শিউলি ফুলের মতো বোঁটার বাঁধন ছিন্ন করে টুক করে মাটির মায়ায় খসে পড়ব!’
‘ভাই, তুই কি আজকাল কবিতা-টবিতা লিখছিস নাকি রে? এই যে বললি, এ তো পুরোটা কবিতাই! চল, রাধামাসি রান্না করে রেখে গেছে। খেয়ে নিই। বড্ড খিদেও পেয়েছে ভাই। তোর ক্রিকেট নিয়ে কিছু থাকলে আমি লক্ষ করে দেখেছি, তোর খিদে-তেষ্টাও পায় না! তোর মুখটা খিদেয় কতটুকুন হয়ে গেছে রে। একবার আয়নায় গিয়ে দেখে আয়।’ বলে লোকনকে আদর করে দিল পারুলমণি।
দিদি আর ভাই মেঝেতে আসনপিঁড়ি হয়ে খেতে বসল। খেতে-খেতে লোকন দিদির মুখের দিকে একবার তাকাল। দেখল, দিদির চোখের কোল বেয়ে বৃষ্টির মতো টপটপ করে জলের ধারা ঝরে পড়ছে। লোকন বলে উঠল, ‘দিদি, তুই তো তখন থেকে নয়নীর জন্যে কেঁদেই যাচ্ছিস? আর কাঁদিস না দিদি! নয়নীর চলে যাওয়ার পর ওর বন্ধুটা বড় একা হয়ে যাবে রে! তুই ওকে অমিতাভ সেনজেঠুদের অ্যাকোয়ারিয়ামে ফেরত দিয়ে আয়। ও ভাল থাকবে!’
‘ভাই, তুই ভারী হিংসুটে হয়ে উঠছিস তো দিনদিন? নয়নীর বন্ধু-মাছটাকে ক’দিন একা-একা কাঁদতে দে! নয়নীর জন্যে কষ্ট পেতে দে, নয়নীর দুঃখ ভুলতে দে! তবেই না বন্ধু! একটু সামলে নিক। তখন ও সেনজেঠুদের অ্যাকোয়ারিয়ামে অন্য মাছেদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে।’
‘খুব হয়েছে দিদি! এবার দু’ মুঠো ভাত মুখে তোল।’
পারুলমণি বা হাতের চেটোয় চোখের জল মুছে বলল, ‘আমার গলা দিয়ে ভাত নামছে না রে! শুধু মনে হচ্ছে, সেনজেঠু ওকে ফেলে দিতেই চেয়েছিলেন। কেন যে চেয়ে আনলাম। অন্ধ প্রাণীকে আশ্রয় দেওয়া মহান কাজ, ওকথা ভেবে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সেই বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত তোর মনে আছে--অন্ধজনে দেহ আলো মৃতজনে দেহ প্রাণ!’ আমি আগে সাধন পণ্ডিতমশাইয়ের বাড়ি যেতাম সন্ধেবেলা বাবার হাত ধরে। উনি বিবেকানন্দের কথা শোনাতেন। বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘যে চোখে দেখতে পায় না, সে তো অন্ধই। কিন্তু অন্ধত্বের চেয়েও বড় অন্ধত্ব হল সত্য ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে না পারা।’
লোকন মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল, ‘কী কঠিন
কথা রে দিদি!’
একটু পরে চিন্তিত মুখে লোকন বলল, ‘কবে যে আমাদের মাঠের মাথার উপর শেডের কাজ শেষ হবে কে জানে! ততদিন ক্রিকেট প্র্যাকটিস হবে না রে দিদি।’
‘কেন? দেবোপমস্যার তো একটা কিছু ব্যবস্থা করেছেন শুনলাম। অনীক দত্তদের বাড়ির পাশে একটা ছোট উঠোন পড়ে আছে। ধানের ফলনের সময় ওখানে ধানের মরাই বসে। না হলে ফাঁকাই তো পড়ে থাকে সারা বছর। দেবোপমস্যার অনীকদাদুর কাছ থেকে পারমিশান নিয়ে নিয়েছেন। যতদিন তোদে মাঠের মাথার শেড না হবে, ততদিন গগনজ্যোতি স্কুলের ছেলেমেয়েরা অনীক দাদুদের ওই উঠোনেই ক্রিকেট প্র্যাকটিস করবে। চিন্তা কী?’
‘তা হলে আজ দেবোপমস্যারের কাছ থেকে জেনে নেব, কবে থেকে ওখানে আমাদের ক্রিকেট কোচিং শুরু হবে?’
পারুলমণি বলল, ‘চল, এবার শুয়ে পড়বি চল! কাল আবার সকালে বিজনডিহি ক্রিকেট মাঠের প্র্যাকটিসটা মিস করিস না যেন! বিল্টু কামিলা কাল সকাল থেকেই বলে রেখেছে, ‘পারুলদি, কাল সকালে কিন্তু লোকনকে বিজনডিহির মাঠে পাঠিও, কতদিন আমাদের খেলা হয়নি!’ তুই সকালে তাড়াতাড়ি উঠে মাঠে চলে যাস কিন্তু!’
সকলে বিজনডিহির মাঠ থেকে ফিরে লোকন ছুটল স্কুলে। গিয়ে দেবোপমস্যারের মুখ থেকে শুনল, আজ থেকেই বিকেলে অনীকদাদুদের উঠোনে ক্রিকেট প্র্যকটিস হবে। মনের আনন্দে লোকন ক্লাস এইটের সক্কলকে ছুটে-ছুটে ঘোষণা করতে লাগল এই খবরটা।
হেডস্যার শুনলেন কথাটা। যখন ক্রিকেট টিম নিয়ে দেবোপমস্যার বেরিয়ে পড়েছেন ব্যাট-হল নিয়ে, তখন হেডস্যার বলে দিলেন, ‘দেবোপম, অনীকবাবুদের উঠোনে ক্রিকেট প্র্যাকটিস করাতে যাচ্ছ যাএ। মানা করব না। কিন্তু বলটা বারেবারে অনীকবাবুদের পাশের পুকুরে গিয়ে পড়বে। একটা জাল লাগানো আঁকশি তৈরি করে নিওযে কাল থেকে।’
প্রথম দিনটা কোনও রকমে প্র্যাকটিস হল। হেডস্যারের মুখের কথা মতো বলটা উনিশবার গিয়ে পড়ল অনীকদাদুদের পুকুরে। ক্লাস এইটের সি-সেকশানের ইমন সামন্ত রোববার করে সাঁতার শিখতে যায় শাঁখাপোতা গ্রামের পাশের কুসুম নদীতে। দেবোপমস্যার তাকেই প্রথম দিনের বল তুলে আনার গুরু দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
ব্যাট-বল আর উইকেট নিয়ে দেবোপমস্যারের ক্রিকেট টিম ফিরে এল গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রীড়াকৌমুদী রুমের সামনে। ব্যাট-বল গুছিয়ে রাখছিলেন স্যার। হেডস্যারকে দেখে বললেন, ‘স্যার, আজ আমাদের বল উনিশবার পুকুরে পড়েছে। ওখানে মনে হয় ক্রিকেট কোয়িং করা যাবে না।’
হেডস্যার মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘দেখছি কী করা যায়। দেখি, মুকুন্দ শাসমলদের পুরনো মাছ ধরার জাল জোগাড় করা যায় কিনা। তা হলে তো ভালই হবে। পুকুরের পাড়ের দিকটা জাল দিয়ে ঘিরে দেব।’
পাশেই লোকন দাঁড়িয়েছিল। বলল, ‘হেডস্যার, তাতে কি আর চার আর ছয় আটকানো যাবে? পুকুরে গিয়ে পড়বেই।’
‘ফের একদিন হোক তো কোচিংটা। দেখাই যাক না কী হয়? তুমি কতগুলো চৌকা আর ছক্কা মারতে পার দেখব!’
সকলে হো-হো করে হেয়ে উঠল। স্কুল মাঠের ওদিকটায় পুরো দমে মাঠের উপরের শেড তৈরির কাজ চলছে। তক্ষুনি মস্ত বড় একটা হোর্ডিং এসে নামল মাটের একধারে। দেবোপমস্যার ছুটলেন সেদিকে। ছেলেমেয়েরাও ছুটল। হেডস্যারও হনহন করে সেখানে পৌঁছে গেলেন। সকলে চোখ বড়-বড় করে দেখল, গগনজ্যোতি স্কুলের স্টেডিয়ামের নামের হোর্ডিং তৈরি হয়ে চলে এসেছে। স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে ‘নিখিলমনোহর স্টেডিয়াম’। কী সুন্দর হয়েছে দেখতে হোর্ডিংটা!
হেডস্যার বললেন, ‘জানো দেবোপম, মুকুলকৃষ্ণবাবুর বাবার নামেই স্টেডিয়ামটার নাম রাখলাম। ওঁরই পৈতৃক ভিটে বিক্রির টাকায় তো তৈরি হল।’ একটু থেমে মুচকি হেসে হেডস্যার বললেন, ‘আমি এখনও মুকুলবাবুকে কথাটা জানাইনি!’
দেবোপমস্যার এবং সব ছেলেমেয়ে একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘মুকুলকৃষ্ণস্যার, হিপ-হিপ-হুররে!’
(এর পর ৩২ পর্ব)
বাইশে শ্রাবণ
অমিত কুমার রায়
বাইশে শ্রাবণ রয়েছি এখন
তোমার বেদীর পাশে,
ভাগীরথি ওই কুলুকুলু বয়ে
চরণ ধোয়াতে আসে।
তোমার বুকে মাথা রাখে
রজনীগন্ধা যুঁই,
গোলাপ গাঁদা অশ্রু আঁখি
যেন ওরা বোন দুই!
বাইশে শ্রাবণে আছো বিশ্রামে
চির নিদ্রায় কবি,
আমরা কেমন এই প্রজন্ম
দেখো অদৃশ্যে সবি।
আবেগের বশে বলে যাই কেঁদে
হে বাইশে শ্রাবণ কোন সে ক্ষণে
গঙ্গার কূলে বহে গেল
অশ্রুর প্লাবন
উত্তর দাও বাইশে শ্রাবণ!!
বই রয়েছে কত তোমার
হাজার হাজার চরণ
নিত্যদিনই পড়ে থাকি বই
করি বন্ধু বরণ।
বাইশে শ্রাবণ তোমার কাছে
আসি যে কবি রবি,
হাজার হাজার মানুষের ঢল
নিমতলার চির ছবি।
প্রদীপ তোমার সদাই জ্বলে
দীপশিখা অনির্বাণ,
ফুলের মালা ধূপের ধোঁয়া
তোমার লেখা গান।
তোমার বেদির চরণ তলে
করি প্রণাম শত,
মানুষ আমায় গড়ে তোল
মান হুঁশ হবার মত।
গঙ্গা কূলে নিরব কবি
বলছ যেন আর
"সম্মুখে শান্তির পারাপার
ভাসাও তরণী
এবার কর্ণধার "।
আকাশ আজকে মেঘে মোড়া
ঝিরি ঝিরি ঝরে,
বিশ্বকবি চেতন রবি
থাকো হৃদয়- ঘরে।
বন্ধুত্ব
আলোকরেখা চক্রবর্তী
কবির কথায় এই পৃথিবীতে সবচেয়ে দামী সম্পর্ক হলো 'বন্ধুত্ব' যা নাকি বিকোয় না। তাই তো আমি সবসময় আমার বন্ধুদের আগলে রাখি, ভালো রাখার চেষ্টা করি, তাইতো আজ
এষাকে ওইভাবে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে দেখে সব কাজ ফেলে আমি ও ওদের পিছু নিলাম। তোমরা ভাবতে পারো হয় তো বা বলতেই পারো, এ আবার এমন কি ঘটনা যে এত উতলা হতে হবে। তোমরা বুঝতে পারছ না এই দৃশ্য আমার চোখে শুধু অচেনা নয় ব্যতিক্রমী। স্বাভাবিক যেটা, তা হলো প্রতিদিন সে তার মায়ের হাত ধরে পায়রার মতো বক্ বকম্ করতে করতে বাড়ির পথে এগিয়ে যায়। তাহলে বলো প্রথমবার অন্যরকম কিছু দেখলে আশ্চর্য হব না? তাছাড়া এষা আমার ভালো বন্ধু। তাই বন্ধুর মনখারাপ! মানে আমার ও মনখারাপ। যতক্ষণ না ওদের মুখে হাসি দেখছি ততক্ষন বাপু আমার কাজে মন বসবে না। এই দেখো, মনেহয় কথা বলতে বলতে ওদের বাড়ি চলে এলাম। ওহ! এত তাড়াহুড়ো, ঝড়ের বেগে ঘরের ভেতর ঢুকে গেলো। না বাপু আমার আবার ঝড় হওয়া চলবে না। তবে আর বিপদের শেষ থাকবে না। এমনিতেই আমি ভিজে ভারী হয়ে গেছি।তাই গজগমনে প্রবেশ করলাম। আমি তো এই প্রথমবার এখানে এলাম তাই ভাবছিলাম এষা কে খুঁজে পেতে অসুবিধে হবে। কিন্তু একটা বন্ধ দরজার বাইরে এষার মায়ের গলা শুনে বুঝলাম ওরা এই রুমে আছে। ভেতরে যে এষা বকা খাচ্ছে এটাও বেশ বোঝা যাচ্ছে, সাথে হয়তো ভিজে পোশাকটাও বদলে দিচ্ছেন। তাই আমার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা ঠিক মনে হলো। মিনিট খানেক পরেই এষার মা বাইরে বেরিয়ে হনহন করে চলে গেলেন। কিন্তু এটা কি হলো! মা বেরোনোর সাথে সাথেই এষা দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল। যদিও তারজন্য আমার যাওয়া আটকে থাকে না। ভেতরে গিয়ে দেখি অভিমানের কালো মেঘে ঢেকে পালঙ্কের উপর চুপটি করে বসে আছে আমার মিষ্টি বন্ধু। ভারী কষ্ট পেলাম, নাহ ওর মন ভালো করতেই হবে। কি করা যায় ভাবছি। মনে পড়লো আসার সময় সাথে করে কিছুটা জুঁই ফুলের সুবাস নিয়ে এসেছি। আমি জানি এই সুবাসে ওর মন ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু ফল তো হলো উল্টো। যেই আমি ওকে ছুঁয়ে দিলাম অমনি ওর নরম দুটো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। এবার কি করি, নরম গলায় বললাম,
আহা, কেঁদোনা, কেঁদোনা, কি হয়েছে তোমার, আমাকে বলবেনা? আমি না তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি আজকাল এত বেশি ইংরেজি শব্দ ভেসে আসে যে আমি ও বাংলা বলতে বলতে ইংরেজি শব্দ বলে ফেলি। সে যাইহোক এখন যেটা ইম্পরট্যান্ট তাহলো কিছু একটা করে ওদের সবার মন ভালো করে দেওয়া।আমি জানি তোমার সবাই ছড়া শুনতে ভালোবাসো তাই ভাবলাম ছড়া বলে যদি ওর মন ভালো করা যায়। আমি আবার একটু আধটু ছড়া বানাতে পারি কিনা। সুর কেটে বলা শুরু করলাম,
বন্ধু আমার বলো তো এবার,
কমাও দেখি মনের ভার।
কেঁদে কেঁদে চোখ হলো লাল,
দেখতে ভালো লাগে না আমার।
হুমম ছড়াটি মন দিয়ে শুনল বটে কিন্তু সেভাবে রেসপন্স করল না। হাল ছাড়লে হবেনা বন্ধু। তাই আবার শুরু করলাম,
খুশির আলো ঝিলিক মেরে
দুচোখ দিয়ে পড়ুক ঝরে,
এমন করে বললে ছড়া-
যায় না থাকা চুপটি করে।
চুপের কি অর্থ উদ্ধার হল জানিনা ছড়া বলা শেষ হতেই এষা তড়াক লাফে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। বুঝলাম এই ঘরে ওর আরও এক বন্ধু আছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তাকেই বলতে লাগল, জানো তো আমি কোন দোষ করিনি তবুও মামমাম বললো সব দোষ আমার। আমাকেই সবার সামনে বকলো।
যাক মুখ খুলেছে, তাই ওর কাছে গিয়ে বললাম, ওহ কি হয়েছিল বলবে আমায়।মামমাম হয়তো ভুল করে ফেলেছে মামমামের ও তো ভুল হতে পারে বলো। এবার বলো তো তুমি এমন কি করেছিলে যে মামমাম এত্ত রেগে গেল। তুমি কি করেছিলে?
টিফিনের সময় তো বৃষ্টি পড়ছিল তাই বাইরে না বেরিয়ে জানালার কাছে বসেছিলাম, তখন ওই ছানা পাখি দুটো বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে উড়ছিল। একবার আমার কাছে একবার গাছে। শুধু বলছে,
বন্ধু যদি হও
মজা করে যাও।
ডানা ঝাপটে, ঘাড় ঘুরিয়ে কতবার ডাকল। তবু যাইনি। তবু মামমাম আমাকে বকল আ্যঁ--আ্যঁ-।
আরে কেঁদোনা এষা। এবার বলো তুমি ভিজে গেলে কিভাবে।
সে আবার আয়নার সামনে দৌড়ে গেল।
আরে মা পাখি ও যে ডাকতে এল। মামমাম তো বলে বড়দের কথা শুনতে হয়।
তবু ম্যাম বকল, মামমাম বকল।
আমি আজ কিচ্ছু খাবো না ঠাম্মি, দরজাও খুলবো না কিন্তু। মামমাম কে বলে দিও। ঠাম্মি বোধহয় এতক্ষন কিছুই বুঝতে পারেন নি। এবার বুঝি বুঝলেন এবং সাথে সাথেই চিৎকার জুড়ে দিলেন, বৌমা ও বৌমা, মনার কি হয়েছে, কি সব বলছে শোনো। তুমি বকাবকি করেছো বুঝি? ঠাম্মির কথায় প্রমাদ গণলাম। এইরে মামমামকে রাগিয়ে দিচ্ছেন কেন তাহলে যে এষা আরও বকা খাবে। হলও তাই, তিনি বেশ রেগে বললেন, আপনার মনা খুব দুষ্ট হয়েছে, দোষ করে কেমন বড়দের মতো কথা বলছে। ওকে একেবারে আশকারা দেবেন না মা। ভাবলাম এই বুঝি ঝগড়া লাগবে কিন্তু আমাকে ভুল প্রমান করে ঠাম্মি কি বললেন জানো? আমি তো শুনে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম। জানলে তোমরাও অবাক হবে। হয়তো বা কখনো তোমাদের কাজেও লাগতে পারে। তিনি বললেন, শোনো বৌমা, আমার নাতনি কি করেছে জানিনা তবে সে কোনো অপরাধ বা দোষ করেনি এ বিশ্বাস আমার আছে। হয় তো সে কিছু ভুল করেছে। তবে সেটা যে ভুল তাও জোর দিয়ে বলা যায় না। কারণ তোমার ভুল টা তার কাছে আবার দারুন ভাবে ঠিক। তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে তুমি তারকাছে বিষম ভুল। তার ভুল ঠিক করার জন্য তুমি তোমার মতো করে বকাঝকা ইত্যাদি করেছো। একইভাবে মনাও এসব করে বোঝাতে চাইছে যে তুমি ভুল।এখন অঙ্কুরেই যদি এই ভুল বোঝাবুঝির বিনাশ না ঘটে তারফল কি হবে জানো বৌমা তুমি আর কখনোই পুরোটা ঠিক হয়ে ওর ভাবনায় থাকবে না এবং এটাও শিখবে বড় হলেই যা খুশি আচরণ করা যায়। আর রইলো বাকি বড়দের মতো কথা-, ও বিষয়ে আমার থেকে তোমরা আরও ভালো জানো। একটা শিশু জন্ম ইস্তক কতটা অনুভূতি প্রবণ। ক্ষেত্র বিশেষে তা পাল্টায় এই আর কি। এখন যাও তো দেখি গরম লুচি ভেজে নিয়ে এসো, আমি ময়দা মেখে রেখেছি আর হালুয়া বানিয়ে রেখেছি। আমি যাই মনা কে ঘর থেকে বের করি।
এইবার কিন্তু আমি ঠাম্মি কে ভরসা করতে পারলাম না কারণ তিনি তো এষার রাগ দেখেন নি। কিন্তু তিনি এসব কি বলছেন, ও মনা, মনারে তোর মা কেমন কান্নাকাটি করছে দেখে যা আমি ভোলাতে পারছি না। কোথাও কি ব্যাথা পেয়েছে?
আমি মনে মনে বলে উঠলাম,
মনা এখন দারুন রেগে,
ডাকে কি আর সাড়া দেবে।
ভাগ্যিস এগুলো মনে মনে বলেছিলাম, মনা যে এমন করবে আমি ভাবিনি। দরজা খুলে তীরবেগে মায়ের কাছে ছুটে গেলো। আমি অবশ্য এতে একটুও দুঃখ পাইনি বরং খুব খুব খুশি হয়েছি। কাল থেকে আবার ওরা হেসে হেসে বাড়ি ফিরবে। আহা কি আনন্দ।
তাই তো মনের আনন্দে আমার প্রিয় গানখানি ধরলাম-
হারে রে রে রে রে
আমায় ছেড়ে দেরে দেরে
যেমন ছাড়া বনের পাখি •••
মনের পাঠশালা 5
দীপালি সাহু
M.A Psychology ( clinical), MSW
আগের সংখ্যায় আমি তোমাদের বলেছিলাম যে , এবারের সংখ্যায় আমি মনের কাটা ছেঁড়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসা কিভাবে করবো ,সেটা জানাবো । শরীরের জন্য যেমন ফার্স্ট-এইড বক্স থাকে, তেমন মনের জন্য ও আমরা একটা ফার্স্ট -এইড বক্স জোগাড় করে রাখবো । সেটা নিয়ে আলোচনা করার আগে মনের কাটা ছেঁড়া কোন কোন পরিস্থিতিতে হতে পারে সেটা জানবো। তবে আজকের সংখ্যাটা যারা একটু বড়ো তাদের জন্য।
তোমাদের পরীক্ষার আগে যখন কারুর তীব্র ভয় করে , ভালো ফল না করলে সবাই বকবে , কেউ ভালো বাসবে না , লোকে খারাপ বলবে , এইরকম ভাবনা আসে । যখন সত্যি সত্যি তোমাদের খারাপ পরীক্ষা হয় বা খারাপ রেজাল্ট হয় , তখন অনেক সময় বুক ধড়পড় করা, শ্বাসকষ্ট, হাত পা কাঁপা , ভীষণ ভাবে ঘেমে যাওয়া , মাথা ঘোরা বা তীব্র পেটে ব্যথার মতো শারীরিক লক্ষণ দেখা দেয়। অনেক সময় রেজাল্ট খারাপ হলে চরম ভুল সিদ্ধান্ত যেমন বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া বা মরে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতাও তৈরি হয়।
কখনো স্কুলে বা বন্ধুদের মধ্যে শারীরিক/মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হওয়া, অপমানিত হওয়া বা বন্ধুদের দল থেকে বাদ পড়া , প্রিয় বন্ধু হটাৎ করে কথা বলা বন্ধ করার ফলে প্রচন্ড রাগ হওয়া , নিজেকে ছোট মনে করা, স্কুলে যেতে ভয় পাওয়া, তীব্র মন খারাপ বা প্রতিশোধের ইচ্ছে হয় ।
আবার কখনো সোশ্যাল মিডিয়া বা অনলাইন গেমসে ট্রোল হওয়া, কারোর কাছে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হওয়া বা গেমসের আসক্তি থেকে বের হতে না পারার মতো ঘটনা ঘটে , তখন অপরাধবোধ, গোপন আতঙ্ক এবং নিজের ভেতর গুটিয়ে যাওয়া,বড়দের কাছে প্রকাশ করতে না পেরে ভেতরে ভেতরে দমবন্ধ লাগার মতো অনুভূতি আসে ।
অথবা বাবা-মায়ের মধ্যে অনবরত ঝগড়া, ডিভোর্স বা বিচ্ছেদ, পরিবারের কারও মৃত্যু কিংবা পরিবারে শারীরিক/যৌন নির্যাতনের শিকার হলে অসহায় লাগে , তীব্র আতঙ্ক বোধ হয় । এই রকম কোনো পরিস্থিতি তৈরী হলে মনের ফার্স্ট এইড ব্যবহার করতে হবে ।
যেকোনো ধরণের সমস্যায় বিশ্বস্ত কোনো বড় মানুষ (মা, বাবা, শিক্ষক, দাদা-দিদি বা অভিভাবক)তোমার যাকে খুশি তাকে জানাতে হবে ।বললে সবাই বকবে এমন ভেবে চুপ করে থেকো না ।জানো তো তাতে সমস্যা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ।
হটাৎ করে রাগ , আতঙ্ক ,উদ্বেগ লাগলে ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নাও ও ছাড়ো ,যাতে মন কিছুটা শান্ত হয়। কিছু সময় শান্ত কোনো জায়গায় বসো ।চোখে মুখে জল দেওয়া বা বন্ধুর সাথে কথা বললে আবেগ শান্ত হয় ।মন শান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয় কিন্তু ।
প্রিয় বন্ধু বা পরিবারের পছন্দের মানুষ বা পোষ্যর সাথে সময় কাটালে মনের মধ্যে নিরাপত্তার বোধ আসে । নিয়মিত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং খেলাধুলার অভ্যাস শরীরের সাথে মনের স্বাস্থ্য ভালো রাখবে । মনে রেখো যে সব অনুভূতিই স্বাভাবিক—কান্না পেলে কাঁদা মানে দুর্বল হওয়া নয় । যে ধরণের ভাবনা আসুক না কেন নিজেকে খারাপ বা দোষারোপ না করা ।সেই অনুভূতিকে না লুকিয়ে ভরসা যোগ্য কারুর কাছে শেয়ার করা। যদি তেমন কেউ না থাকে তাহলে ডায়েরি লেখা ( ওই যে আগের সংখ্যায় বলেছিলাম )।
এতক্ষন যা বললাম তার সাথে জরুরি অবস্থার জন্য ভারত সরকারের দুটো হেল্প লাইন এর কথা জানিয়ে রাখি ।
মানসিক স্বাস্থ্যের জরুরি সহায়তার জন্য ভারত সরকার পরিচালিত “টেলি মানস ” নামে সহায়তা পরিষেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, নির্ভরযোগ্য এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য সরকারি উদ্যোগ . যোগাযোগের নম্বর 14416 অথবা 1800-891-4416।২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের ৭ দিনই বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি সহ ভারতের ২০টিরও বেশি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা যায় । ফোন করলে শুরুতেই অভিজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী বা কাউন্সেলর তোমাদের কথা শুনবেন এবং প্রাথমিক মানসিক সমর্থন দেবেন। যদি সমস্যাটি গভীর বা জটিল হয় বা ইমার্জেন্সি থাকে ,তবে তারা সরাসরি কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট (Psychiatrist) বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের কাছে কল ট্রান্সফার করেন । তিনি তোমাদের কি করণীয় সব কিছু বলে দেবেন ।এখানে বড়ো ছোট যেকোনো মানুষ সাহায্য নিতে পারেন।
এছাড়া শুধু ছোটদের যেকোনো ধরণের নির্যাতন , নিরাপত্তা , বিপদে সাহায্যের জন্য চালু আছে child heplline নম্বর 1098।
দুটো ক্ষেত্রেই কল করার সময় নিজের আসল পরিচয় বা নাম না বললেও চলে। তোমাদের মনের কথা শতভাগ গোপন রাখা হয়।সার্ভিসটি সম্পূর্ণ ফ্রি, তাই অর্থনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে যে কেউ কল করতে পারে।তোমরা নিজের বা তোমাদের বন্ধুদের জন্য ও কথা বলতে পারো।
ডাক্তার বাবুর কলমে ৭
ডাঃ এ সামন্ত
MD Homeopathy
তিন্নি তার মাকে প্রতিদিন রাত্রে বলে মাগো আমার পায়ে খুবই ব্যথা করছে পা দুটো একটু টিপে দাওনা প্লিজ, তিন্নির মা কথাটা তার বাবাকে বললে তিনি সেদিন সন্ধেতে ডাক্তারবাবুর কাছে নিয়ে গেলে তিনি অনেকগুলি পরীক্ষা করতে বলেন। পরদিন রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট পেলে দেখা যায় রক্তের ভিটামিন ডি এর মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় বেশিরভাগ লোকের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি এর অভাব লক্ষ্য করা যায়। আমরা সাধারণত ভাবি ভিটামিন ডি কেবল হাড়ের বৃদ্ধি এবং হাড়ের শক্তির জন্য দায়ী। আসলে কিন্তু তা নয় আমাদের সামগ্রিক সুস্বাস্থ্যে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই ভিটামিনের। ভিটামিন ডি যতটা না ভিটামিন তার থেকে বেশি যেন একটি হরমোন, যা আমরা নিজেদেরকে যখন সূর্যালোকে উন্মুক্ত করছি তখন সেটি আমাদের ত্বকের নিচে তৈরি হয়। আমাদের খাদ্যেও কিছু পরিমাণ ভিটামিন ডি থাকে। বিশেষত আমিষ জাতীয় খাদ্যে। যেমন ডিমের কুসুম, সামুদ্রিক মাছ বা মাশরুম ইত্যাদিতে। তবে তা থাকে খুব নগণ্য মাত্রায়। হাড়ের স্বাস্থ্য ছাড়াও পেশির স্বাস্থ্য, মস্তিষ্ক বা মানসিক স্বাস্থ্য , রক্ত চাপ, হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য , রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণে, ইমিউনিটি তে, ক্যান্সার প্রতিরোধে, এই ভিটামিনের খুব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। ভিটামিন ডি দুই ধরনের। Vit- D2 এবং Vit- D3, ভিটামিন ডি বলতে আমরা সাধারণত ভিটামিন ডি ৩ কে ই বুঝি। রক্তে ভিটামিন ডি কম থাকলে - পিসিতে টান, কোমরে ব্যথা, হাড়ে হাড়ে ব্যথা, চলাফেরা করতে গেলে পায়ে ব্যথা, রাত্রে ঘুমানোর সময় পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে । ছোটদের ক্ষেত্রে রিকেট আর বড়দের ক্ষেত্রে অস্ট্রিওম্যালিসিয়া হতে পারে। যেখানে হার নরম হয়ে যায়। ভিটামিন ডি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করায় ঝিনঝিনানি , অবসতা, পায়ে জোর থাকেনা অথবা মুড সুইং, ডিপ্রেশন বা অবসাদের কারণ হতে পারে । ভিটামিন ডি এমন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন যা গ্রহণে আমাদের অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস শোষণে সহায়তা করে । যার অভাবে অস্ট্রিও পোরোসিস ঘটায়। ফলে হাড় সহজে ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ায় প্যাথলজিক্যাল ফ্র্যাকচার দেখা যায়। কিছু কিছু মেডিকেল কন্ডিশনে এই ভিটামিনের অভাব দেখা যায় , যেমন ক্রোনস ডিজিজ, সিস্টিক ফ্রাইবোসিস , ফিলিয়াক ডিজিজ, স্থূলতা (যেখানে ভিটামিন ডি চর্বি কোষের মধ্যে শোষিত হয়ে যাওয়ায় রক্তে ভিটামিন ডি এর অভাব দেখা যায়) । লিভার এবং কিডনির সমস্যায় ভিটামিন ডি এর অভাব দেখা যায় কারণ লিভারের অসুবিধায় 25 হাইড্রক্সিলেজ নামক একটি উৎসেচকের অভাবে ভিটামিন ডি শোষিত হতে পারেনা আর কিডনির অসুবিধায় 1 আলফা হাইড্রোক্সিলেজ নামক একটি উৎসেচকের অভাবে ভিটামিন ডি রক্তে কম আসে। আবার কিছু কিছু ঔষধ দীর্ঘদিন ধরে খেলে রক্তে ভিটামিন ডি এর অভাব দেখা দেয় যেমন ল্যাগজেটিভ , ওজন কমানোর ওষুধ, স্টেরয়েড ইত্যাদি। রক্তে ভিটামিন ডি এর পরিমাপ জানতে হলে রক্তে টুয়েন্টি ফাইভ হাইড্রক্সি কোলে ক্যালসিফেরল এর মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। রক্তে Vit - D3 এর মাত্রা ২০ এর কম হলে তাকে ভিটামিন ডি এর স্বল্পতা ধরা হয় এবং তখন হাড় সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। Vit - D3 , ৩০ থেকে ১০০ এর মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। আর এই মাত্রা ১০০ এর বেশী হলে টক্সিসিটি হতে পারে। ছোট বাচ্চা যাদের বয়স এক বছরের কম এবং বয়স্ক যাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি তাদের ভিটামিন ডি এর অভাব বেশি দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দৈনিক চাহিদা 400 IU, বয়স্ক, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের ক্ষেত্রে 600 IU , আর যাদের বয়স ৭০ বছরের বেশি তাদের ক্ষেত্রে দৈনিক চাহিদা 800 IU ।
আজ এই পর্যন্তই থাক, বাকি আলোচনা আবার পরের সপ্তাহে হবে । ভালো থাকো সবাই।
ক্যুইজ- ১৫
১. বাউল গানের জন্য বিখ্যাত কোন জেলাটি ?
2. পশ্চিমবঙ্গের কোন শহর সিল্কের জন্য বিখ্যাত?
৩. হাজার দুয়ারী প্রাসাদের কতগুলো দরজা আছে?
৪. পলাশীর যুদ্ধ কবে হয়েছিল?
৫. পশ্চিমবঙ্গের কোন শহর আমের জন্য বিখ্যাত?
গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর:
১. রাজা রামমোহন রায়
2. হুগলী
৩. কুচবিহার
৪. রাণী গঞ্জ
৫. তিস্তা প্রকল্প
0 Comments