দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ১৬ই আগস্ট, কেরলে পালিত হয় ওনাম উৎসব। আসুন এই সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
কেরলের মাটি ও মানুষের উৎসব ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মানচিত্রে কেরল এক অনন্য ভূখণ্ড। সবুজে ঘেরা এই রাজ্যের জীবনযাত্রা, লোকসংস্কৃতি ও উৎসবের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশগুলির একটি হলো, ওনাম। সাধারণত আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে মালয়ালম ক্যালেন্ডারের চিঙ্গম মাসে এই উৎসব পালিত হয়। ২০২৬ সালে ১৬ই আগস্ট পালিত হবে থিরুওনম ওনাম উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন।
ওনামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহাবলী বা মাভেলি রাজার এক জনপ্রিয় কিংবদন্তি। কথিত আছে, মহাবলীর রাজত্বে কেরল ছিল সুখ, সমৃদ্ধি ও সাম্যের এক আদর্শ ভূমি। প্রজাদের মধ্যে ছিল না বড়-ছোটের ভেদাভেদ, ছিল না অভাবের দীর্ঘশ্বাস। মানুষের মুখে ছিল হাসি, ঘরে ছিল সমৃদ্ধি এবং সমাজে ছিল পারস্পরিক ভালোবাসা। কিন্তু মহাবলীর জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেবতারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তখন বিষ্ণু বামন অবতারে তাঁর কাছে এসে তিন পা জমি চান। বামন রূপী বিষ্ণু তাঁর দুই পায়ে পৃথিবী ও আকাশ পরিমাপ করার পর তৃতীয় পা রাখার জন্য মহাবলী নিজের মাথা এগিয়ে দেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ ও প্রজাদের প্রতি ভালোবাসার স্মৃতিই পরবর্তীকালে ওনামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়। লোকবিশ্বাস অনুসারে, বছরের এই বিশেষ সময়ে মহাবলী তাঁর প্রিয় প্রজাদের দেখতে কেরলে ফিরে আসেন। তাই ওনাম কেবল আনন্দের উৎসব নয়, এটি যেন প্রিয় এক রাজার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার বার্ষিক প্রকাশ।
ওনামের সৌন্দর্য শুধু পুরাণের কাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়। এই উৎসব কেরলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতিকে এক অপূর্ব রঙে রাঙিয়ে তোলে। বাড়ির উঠোনে তৈরি হয় পুক্কালম বিভিন্ন রঙের ফুল দিয়ে সাজানো নকশা। প্রতিদিন নতুন ফুল যোগ করে এই ফুলের আলপনা আরও সুন্দর করে তোলা হয়। পুক্কালম যেন প্রকৃতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা এবং সৌন্দর্যবোধের এক সহজ অথচ গভীর প্রকাশ।
🍂
ওনামের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো,ওনাম সদ্যা। কলাপাতায় পরিবেশিত এই ঐতিহ্যবাহী ভোজে থাকে নানা ধরনের নিরামিষ পদ, ভাত, ডাল, তরকারি, আচার, পায়েসসহ বহু রকমের খাবার। একই পাতায় নানা স্বাদের খাবারের এই সমাবেশ যেন উৎসবের একটি বড় দর্শনও বহন করে,বৈচিত্র্যের মধ্যেই মিলন। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা একসঙ্গে বসে খাবার ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আনন্দকে আরও পূর্ণ করে তোলেন।
ওনামের সঙ্গে কেরলের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘ সর্পিল নৌকা বা ভল্লমে বহু মানুষ একসঙ্গে দাঁড় বেয়ে এগিয়ে চলেন। একসঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে দাঁড় টানার দৃশ্য শুধু প্রতিযোগিতার উত্তেজনা সৃষ্টি করে না, বরং দলগত ঐক্য ও সহযোগিতার শক্তির কথাও মনে করিয়ে দেয়।
উৎসবের দিনগুলিতে কেরলের নানা প্রান্তে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মানুষ নতুন পোশাক পরে, বাড়িঘর পরিষ্কার করে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করে এবং আনন্দ ভাগ করে নেয়। শহর থেকে গ্রাম সব জায়গাতেই উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে।
তবে ওনামের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত তার সামাজিক দর্শনে। মহাবলীর কাহিনিতে যে সমতা, ন্যায়, ভালোবাসা ও মানুষের কল্যাণের কথা উঠে আসে, তা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধুনিক সমাজে যখন নানা কারণে মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি হয়, তখন ওনাম মনে করিয়ে দেয়, একটি সুন্দর সমাজ কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গড়ে ওঠে না, তার ভিত্তি হতে হয় সহমর্মিতা, পারস্পরিক সম্মান ও ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতার ওপর।
ওনাম তাই শুধু কেরলের উৎসব নয়, ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিরও এক সুন্দর প্রতিচ্ছবি। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এর মধ্যে রয়েছে লোকঐতিহ্য, প্রকৃতিপ্রেম, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার চেতনা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে বসবাসকারী মালয়ালি মানুষও এই উৎসবের মাধ্যমে তাঁদের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হন।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে উৎসবের অর্থও বদলাচ্ছে। কিন্তু ওনামের মূল সুর এখনও অটুট ঘরে ফিরুক আনন্দ, মানুষের মধ্যে ফিরুক ভালোবাসা, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক সমতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর হোক।
১৬ই আগস্টের থিরুওনম তাই শুধু একটি উৎসবের দিন নয়। এটি স্মরণ করার দিন এক আদর্শ রাজ্যের কল্পনা, এক কিংবদন্তি রাজার প্রতি মানুষের ভালোবাসা এবং এমন একটি সমাজের স্বপ্ন, যেখানে সুখ ও সমৃদ্ধি কেবল কয়েকজনের জন্য নয়, সবার জন্য। ফুলের পুক্কালম, কলাপাতার সদ্যা, নৌকার ছন্দ আর মানুষের হাসির মধ্য দিয়ে প্রতি বছর ওনাম সেই স্বপ্নকেই নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
0 Comments