দূর দেশের লোকগল্প—২৯৯
খরগোশের হুঁশিয়ারি
নেপাল (এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
এক বনে একটি খরগোশ থাকত। একদিন একটা গাছের নিচে বসে আছে। দেখতে সাধারণ খরগোশের মতোই। তবে কি না, আকারে বেশ কিছুটা বড়। কান দুটোও ছিল অনেক লম্বা। পাগুলোও ছিল বেশ শক্তিশালী। ফলে, ভীষণ দ্রুত দৌড়াতে পারত সে।
খরগোশটা তার লম্বা কান দুটো খাড়া করে স্থির ও সতর্ক হয়ে বসে ছিল। বনের সবরকম শব্দ শোনার চেষ্টা করছিল সে। ঠিক তখনই তার মাথায় একটি চিন্তা খেলে গেল। মনে মনে ভাবল, যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়, তবে আমার কী হবে?
ঠিক সেই মুহূর্তে, তার ঠিক পেছনের একটি গাছ থেকে একটি ফল মাটিতে টুপ করে খসে পড়ল। খরগোশটি সেই পতনের শব্দ শুনল এবং মাটির কেঁপে ওঠাটাও অনুভব করল। আচমকা ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠল। তারপর যা হয়। শক্তিশালী পা জোড়া দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব দৌড়াতে শুরু করল। কারণ? তার মন বলল--পৃথিবী ভেঙে যাচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সব কিছু!
খরগোশ এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে সে তার জীবনের সবচেয়ে দ্রুত গতিতে দৌড়াচ্ছিল। যাওয়ার পথে যখনই অন্য কোনও খরগোশ চোখে পড়ছে, চিৎকার করে বলছিল-- পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে !
আর, সে কথা যে শুনছে, সেই খরগোশটিও ভয় পেয়ে তার সাথে দৌড়াতে শুরু করছিল। দেখতে দেখতে সারা বন জুড়ে একশোটা খরগোশ তাদের সবটুকু শক্তি দিয়ে দৌড়াতে লাগল—যা সত্যিই ভীষণ দ্রুত গতি।
একশোটা খরগোশের এই দৌড়াদৌড়ি এবং শোরগোল বনের অন্যান্য সকলের চোখে পড়ছে। তাতে বনের সমস্ত পশুপাখি চমকে উঠল। আর যখন তারা শুনতে পেল—পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তারাও সেই দৌড়ে যোগ দিল।
খুব তাড়াতাড়িই দেখা গেল, খরগোশদের সাথে হরিণ, বুনো শুয়োর, কৃষ্ণসার হরিণ, জলহস্তী, গণ্ডার, হাতি এবং এমনকি চিতাবাঘ এবং বাঘেরাও ছুটতে শুরু করেছে। মাথার ওপর দিয়ে পাখিরা উড়ে চলল। সাপ এবং কুমিরেরাও যে যার মতো করে তাদের পিছু নিল।
জঙ্গলের ভিতর ছিল একটা উঁচু পাহাড়। তার চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল সিংহ। সে এই বনের রাজা। পশুপাখিদের এই হুড়োহুড়ি দেখতে পেল সিংহ। তার মনে হোল, পশুপাখিরা যেভাবে জঙ্গল থেকে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে, সোজা সমুদ্রে গিয়ে পড়বে। আর নির্ঘাৎ সেখানে তারা ডুবে মরবে।
সিংহ জানে, সে হোল বনের রাজা। তার দায়িত্ব হোল—সবাইকে রক্ষা করা। এখন এই মূহুর্তে তার কাজ় হোল, এদের থামাতে হবে। সিংহ প্রথমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটি গভীর শ্বাস নিল লম্বা করে। তার পর? তারপর এক বিশাল গর্জন। একবার নয়। পরপর তিনবার গর্জন করল পশুরাজ।
সে গর্জনে বন-জঙ্গল, আকাশ-বাতাস সব কেঁপে উঠল থরথর করে। পাহাড়ের তলার দিক দিয়ে ছুটে যাওয়া পশুরা মুখ তুলে, পাহাড়ের চূড়ায় সিংহকে দেখতে পেয়ে গেল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সবাই।
সিংহ লাফিয়ে নীচে নেমে, পশুদের দলের সামনে এসে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল-- তোমরা এভাবে আতঙ্কে দৌড়াচ্ছ কেন?
তারা সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে বলতে লাগল-- পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে । চুরমার হয়ে যাবে সবকিছু।
সিংহটি তাদের শান্ত করবার জন্য আবার একবার গর্জন করল। তাতে চুপ করে গেল সবাই। তখন জিজ্ঞেস করল--পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে, কে দেখেছে?
পশুরা চিৎকার করে বলল-- চিতাবাঘ আর বাঘেরা দেখেছে!
সিংহ তখন বাঘেদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল-- তোমরা পৃথিবীকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছ?
তারা উত্তর দিল—না। হাতি আর গণ্ডাররা দেখেছে!
সিংহ হাতি ও গণ্ডারদের দিকে ফিরে, জিজ্ঞেস করল-- তোমরা কি পৃথিবীকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছ?
তারা উত্তর দিল—না, হুজুর। কুমির আর জলহস্তীরা দেখেছে!
সিংহ তখন কুমির ও জলহস্তীদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল-- তোমরা কি পৃথিবীকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছ?
তারা উত্তর দিল, না। ওই হরিণগুলো আর খরগোশেরা দেখেছে!
সিংহ তখন হরিণ এবং একশোটি খরগোশের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল--তোমরা কি পৃথিবীকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছ?
তারা তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। তাড়াতাড়ি সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল—আমরা না, হুজুর। এই বড় খরগোশটাই প্রথম পৃথিবীকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছে! ও-ই তো প্রথম দৌড় লাগিয়েছিল। ও-ই তো আমাদের চেঁচিয়ে বলেছিল-- পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে সব কিছু।
সবার চোখ তখন গিয়ে পড়ল সেই প্রথম খরগোশটির ওপর। সে-ই এই সবকিছুর সূত্রপাত করেছিল। সিংহ বলল—বনের আর কেউ দেখল না! এই পুঁচকেটা দেখতে পেল? সিংহ খরগোশকে জিজ্ঞেস করল--তুমি কি পৃথিবীকে ভেঙে যেতে দেখেছ?
খরগোশটার তখন একেবারে ধুকপুক অবস্থা। ভীষণ ভড়কে গিয়েছে সে। কোনও রকমে তোতলাতে লাগল—আজ্ঞে, হয়েছে কী, আমি একটি ফলের গাছের নিচে বসেছিলাম। হঠাৎই একটা বিকট শব্দ শুনলাম। নিজের শরীর দিয়ে মাটি কেঁপে উঠতে দেখলাম। আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে পৃথিবী ভেঙে যাচ্ছে। এবং গোটা দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়াতে শুরু করি
সিংহ গম্ভীর গলায় বলল—তোমার মনে হয়েছিল, ঠিক আছে। তুমি আর সবাইকে ভয় দেখাতে গেলে কেন?
খরগোশ একটু সাহস দেখিয়ে বলল—বিপদের সময়। কেবল নিজে বাঁচলেই হবে? আশপাশে পাড়াপড়শিরাই তো থাকে। সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া উচিৎ মনে হয়েছিল আমার।
সিংহ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। হো-হো করে হেসে উঠল। অন্য সব পশুরাও তখন চারপাশে তাকিয়ে দেখল। পৃথিবী একেবারেই শান্ত। যেমনটি থাকার তেমনটাই রয়েছে। শূন্য জঙ্গলটি শান্তভাবে বিরাজ করছে। অনেক নিচে সমুদ্রের ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে আগের মতোই। আর, মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছে ওপরের উঁচু পাহাড়টার মাথার ওপর দিয়ে।
সবাই আমার সাথে এসো—বলে, সিংহ সবাইকে নিয়ে, বনের সেই ফলের গাছটির কাছে গিয়ে হাজির হল। খরগোশ যেখানে বসে ছিল, ঠিক তার পেছনেই একটি ফল পড়ে থাকতে দেখা গেল। এটাই শব্দ করে মাটিতে পড়েছিল।
এবার সিংহ সহ সকলেই হাসতে শুরু করল। এমনকি সেই বড় চেহারার খরগোশটিও।
0 Comments