ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি
পর্ব ২৬
প্রীতম সেনগুপ্ত
নিত্যানিত্য বিচারের মাধ্যমে কীভাবে সত্যের অভিমুখে পৌঁছানো যায় সেই বিষয়ে স্বামী বিবেকানন্দ জানাচ্ছেন ---“জীবনে আমরা যাহাই করিতে যাই তাহার সঙ্গে নিজেদের এক করিয়া ফেলি। এই লোকটি কটু কথা বলিল, আমার মনে ক্রোধের সঞ্চার হইল। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ক্রোধের সঙ্গে আমি এক হইয়া গেলাম --- তারপরই আসে দুঃখ। নিজেকে ভগবানের সঙ্গে যুক্ত কর, আর কিছুর সঙ্গে নয়; কারণ আর সবকিছুই অসত্য। অনিত্য অসত্যের প্রতি আসক্তিই দুঃখ আনে। একমাত্র সৎস্বরূপই সত্য; তিনিই একমাত্র জীবন, তাঁহাতে বিষয়-বিষয়ী ( object and subject ) বোধ নাই।
কিন্তু নিষ্কাম ভালবাসায় তোমাকে আঘাত পাইতে হইবে না। যাহা কিছু কর, ক্ষতি নাই। বিবাহ করিতে পার, সন্তানের জনক হইতে পার ... তোমার যাহা খুশি তা করিতে পার --- কিছুই তোমাকে দুঃখ দিবে না; ‘অহং’- বুদ্ধিতে কিছু করিও না। কর্তব্যের জন্যই কর্তব্য কর; কর্মের জন্যই কর্ম কর। তাহাতে তোমার কি? তুমি নির্লিপ্তভাবে পাশে দাঁড়াইয়া থাক।
🍂
যখন আমরা ওই রূপ অনাসক্তি লাভ করি, তখনই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অদ্ভুত রহস্য আমাদের হৃদয়ঙ্গম হয়। তখনই বুঝিতে পারি -- একই সঙ্গে কি তীব্র কর্মচাঞ্চল্য ও চরম শান্তি! প্রতিক্ষণে কি কর্ম আবার কি বিশ্রাম! ইহাই সংসারের রহস্য -- একই সত্তায় অকর্তৃত্ব ও কর্তৃত্ব, একই আধারে অনন্ত এবং সান্ত। তখনই আমরা রহস্যটি আবিষ্কার করিব। ‘ যিনি তীব্র কর্মব্যস্ততার মধ্যে অপার শান্তি এবং অসীম শান্তির মধ্যে চরম কর্মচাঞ্চল্য লাভ করেন, তিনি যোগী হইয়াছেন।’ ( গীতা, ৪/১৮ ) কেবল তিনিই প্রকৃত কর্মী আর কেহই নন। আমরা একটু কাজ করিয়াই ভাঙিয়া পড়ি। ইহার কারণ কি? যেহেতু আমরা কাজের সঙ্গে নিজেদের জড়াইয়া ফেলি। যদি আমরা আসক্ত না হই, তাহা হইলে কাজের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পূর্ণ বিশ্রাম লাভ করিতে পারি...।
এইরূপ অনাসক্তিতে পৌঁছান কত কঠিন! সেইজন্য কৃষ্ণ আমাদিগকে অপেক্ষাকৃত সহজ পথ ও উপায়গুলির নির্দেশ দিতেছেন। ( পুরুষ বা নারী ) প্রত্যেকের পক্ষে সহজতম রাস্তা হইতেছে ফলের আকাঙ্ক্ষায় উদ্বিগ্ন না হইয়া কর্ম করা। বাসনাই বন্ধন সৃষ্টি করে। আমরা যদি কর্মের ফল চাই, তবে শুভই হউক আর অশুভই হউক, উহার ফল ভোগ করিতে হইবেই। কিন্তু যদি আমরা আমাদের নিজেদের জন্য কর্ম না করিয়া ঈশ্বরের মহিমার জন্যই করি, তাহা হইলে ফল নিজের ভাবনা নিজেই ভাবিবে। ‘কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নহে।’ ( গীতা, ২/৪৭ ) সৈনিক ফলের আশা না করিয়া যুদ্ধ করে। সে তাহার কর্তব্য সম্পাদন করিয়া যায়। যদি পরাজয় হয় ---তাহা সেনাপতির, সৈনিকের নয়। প্রীতির জন্যই আমরা কর্তব্য করিব -- সেনাপতির প্রীতির জন্য, ঈশ্বরের প্রীতির জন্য।
যদি শক্তি থাকে, বেদান্ত দর্শনের ভাব গ্রহণ কর এবং স্বাধীন হও। যদি তাহা না পার তো ঈশ্বরের ভজনা কর। তাহাও যদি না পার, কোন প্রতীকের উপাসনায় ব্রতী হও। ইহাও যদি না পার ফলের আকাঙ্ক্ষা না করিয়া সৎ কাজ কর। তোমার যাহা কিছু আছে, ভগবানের সেবায় উৎসর্গ কর। যুদ্ধ করিতে থাক। ‘যে-কেহ ভক্তিভরে আমার উদ্দেশ্যে পত্র পুষ্প ফল ও জল অর্পণ করে, আমি তাহা প্রীতির সহিত গ্রহণ করি।’ ( গীতা, ৯/২৬ ) যদি তুমি কিছুই করিতে না পার, একটি সৎ কাজও যদি তোমার দ্বারা অনুষ্ঠিত না হয়, তবে প্রভুর শরণ লও। ‘ঈশ্বর সর্বভূতের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত থাকিয়া তাহাদিগকে যন্ত্রারূঢ়ের মতো চালাইতেছেন। তুমি সর্বান্তঃকরণে তাঁহারই শরণাগত হও...।’ ( গীতা, ১৮/৬১ )” ( গীতা-প্রসঙ্গ, স্বামী বিবেকানন্দ)
বস্তুতপক্ষে নিত্যানিত্য বস্তু বিচারের ক্ষেত্রে, যে সমস্ত সূক্ষ্ম বিচার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সত্যদ্রষ্টা ঋষি করে গিয়েছেন, সেগুলি মুমুক্ষু জীবের পাথেয়।
0 Comments