জ্বলদর্চি

চিন দেশের গল্প: ১০(সিস্টার লেস)/বাংলা ভাষান্তর : নিখিলেশ ঘোষ

চিন দেশের গল্প: ১০( সিস্টার লেস )                                             
/বাংলা ভাষান্তর :  নিখিলেশ ঘোষ
(একটি মিয়াও  লোককথা। মূল চিনা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন : 
জন মিনফোর্ড)


অনেক বছর আগে, এক মেঘ-ঘেরা পাহাড়ি গ্রামে এক রূপবতী মেয়ে বাস করত।  যেমনি তার রূপের ছটা তেমনি সবুজ পাহাড় আর রূপোলি ঝরনার মতোই সরল ও সুন্দর ছিল তার মন। তবে তার রূপের চেয়েও বেশি খ্যাতি ছিল তার হাতের জাদুতে। মেয়েটি সুতোর বুননে অসাধারণ সব লেস বা ঝালর তৈরি করতে পারত। সে যখন সুতো আর কাঁটা নিয়ে বসত, তখন মনে হতো তার আঙুলের ডগায় কোনো জাদু লুকিয়ে আছে। তাই তার তৈরি করা কাপড়ের ওপর গাছপালা, পাখি এবং পশুপাখির নকশাগুলো চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আর জীবন্ত হতো।  গ্রামের মানুষ আদর করে তাকে ডাকত "সিস্টার লেস" বা "লেস বোন"।  উৎসবের দিনে বা আনন্দের ক্ষণে যখনই কেউ তার কাছ থেকে একটুখানি লেস উপহার বা বিনিময় হিসেবে পেত, তাদের খুশির আর সীমা থাকত না। মানুষ তৎক্ষণাৎ তা দিয়ে নিজেদের সাধারণ টিউনিক বা শার্টের হাতা সাজিয়ে নিত। সেই সামান্য পোশাকটিই তখন রাজকীয় পোশাকের মতো ঝলমল করে উঠত।

তারা পরম গর্বে আর আনন্দে পাড়া-পড়শিকে ডেকে ঘোষণা করত: "দেখো, দেখো! আমি সিস্টার লেসের নিজের হাতের তৈরি একটি বিনুনি পেয়েছি!" আর এভাবেই সেই পাহাড়ি গ্রামে সিস্টার লেসের হাতের বুনা সুতোর টান মানুষের পোশাকে আর মনে আনন্দের রঙ ছড়িয়ে যেত।
🍂
 প্রতিটি গ্রামের মেয়েরা তার কাছ থেকে লেস তৈরি শিখতে আসে। সে তাদের শেখানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা যতই চেষ্টা করুক না কেন, তারা কখনই তার মতো সুন্দর লেস তৈরি করতে পারত না। সে তাদের বলত, "ধৈর্য ধরো, আমি যতক্ষণ না আমার দক্ষতা তোমাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি, ততক্ষণ আমি থামব না।"

সিস্টার লেসের খ্যাতি এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে স্বয়ং সম্রাটও তার কথা শুনেছিলেন। তিনি তাঁর দরবারীদের ডেকে পাঠালেন এবং তাদের তীব্র তিরস্কার করে বললেন: "আমি কখনই জানতাম না যে আমার রাজ্যে এমন রূপে  গুণে অতুলনীয়াএকটি মেয়ে আছে। তোমরা আমাকে আগে কেন বলোনি?" রাজার ভয়ে দরবারী মাথা হেঁট  করে রইলেন। রাজা তৎক্ষণাৎ আদেশ করলেন এখুনি মেয়েটিকে আমার সামনে ধরে নিয়ে এস।" তখন একজন দরবারী একদল সৈন্য নিয়ে সিস্টার লেসকে বন্দি করার জন্য পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা পেরিয়ে ছুটে চলল। কিন্তু সিস্টার লেস তার সাথে যেতে অস্বীকার করল। সে বলল, "আমাকে মেয়েদের লেস তৈরি শেখাতে হবে।" দরবারী হুমকি দিয়ে বলল, "সম্রাট তোমাকে চান, তোমার এত বড় সাহস যে তুমি অবাধ্য হচ্ছো!"

মেয়েরা সিস্টার লেসকে এই হিংস্র নেকড়েদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তাকে চারপাশে শক্ত করে ঘিরে ধরল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। দরবারী চিৎকার করে আদেশ দিল এবং তার সৈন্যরা তাকে জোর করে একটি ছোট পালকিতে ঢুকিয়ে দিল। পালকির ভেতরে পাখীর মতো ছটফট করতে করতে সিস্টার লেস কাঁদতে কাঁদতে মেয়েদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল: "আমি যেভাবে হোক তোমাদের লেস তৈরি শেখাবই, এমনকি এর জন্য যদি আমার মৃত্যুও হয় তো হোক!" সৈন্যদের চিৎকার আর ঘোড়ার চিঁহিঁহিঁ ডাকের এক বিশৃঙ্খল হট্টগোলের মধ্যে তারা পালকিটি নিয়ে চলে গেল।

যখন তারা রাজপ্রাসাদে পৌঁছাল, সিস্টার লেস পালকি থেকে বের হতে পরিষ্কার অস্বীকার করল। তাই সম্রাট দাসীদের আদেশ দিতে বাধ্য হলেন তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করার জন্য। তিনি তাকে বললেন, "তুমি এখন এখানে! আর তুমি কখনোই ফিরে যেতে পারবে না।" তার সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম এবং বাড়িতে থাকা সমস্ত মেয়েদের কথা ভেবে সিস্টার লেস সম্রাটকে তার হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত ঘৃণা করতে লাগল। 

যখন সম্রাট তাকে নিজের কাছে টেনে নিতে এলেন, সে সুযোগ বুঝে তাঁর আঙুলে এক জোরে কামড় বসিয়ে দিল।সম্রাট এতে ভীষণ অপ্রস্তুত ও লজ্জিত বোধ করলেন। তিনি প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তাকে কারাগারে ছুঁড়ে ফেলার আদেশ দিলেন।

পরের দিন, সম্রাট কারাগারে গিয়ে দরজায় দাঁড়ালেন। তিনি সিস্টার লেসকে বললেন, "তুমি যদি আমাকে বিয়ে করো, তবে তোমার জীবনে সুখ-আহ্লাদের কোনো কমতি থাকবে না। তোমাকে শুধু খাওয়ার জন্য মুখ খুলতে হবে আর জামাকাপড় পরার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। ভেবে দেখো আর বোকামি কোরো না!"সিস্টার লেস কেঁদে উঠে বলল, "আমার গ্রাম ছাড়া আমি কোনো জায়গাকে ভালোবাসি না! আমার গ্রামের মেয়েগুলো ছাড়া আমি কাউকে ভালোবাসি না! এখানে থাকার চেয়ে আমি মরে যাওয়াও ভালো মনে করি!"

যখন একজন দরবারী এই কথাগুলো শুনল, সে সম্রাটকে বলল, "মহারাজ! ওকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক!"এই পরামর্শ শুনে সম্রাটের মুখের ভাব হঠাৎ বদলে গেল এবং তিনি সেই দরবারীকে তিরস্কার করে বললেন, "তাকে এখানে নিয়ে আসতে আমার এত ধকল পোহাতে হয়েছে, আর তুমি আমাকে কোনো ভালো বুদ্ধি দেওয়ার বদলে তাকে মেরে ফেলতে বলছো! তুমি আমার কোনো কাজেরই নও! রক্ষী, ওর মাথা কেটে ফেলো!"রক্ষীরা সম্মতিসূচক চিৎকার করে দরবারীকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে নিয়ে গেল এবং তার শিরশ্ছেদ করল।

এই দৃশ্য দেখে অন্য সব দরবারীদের মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল এবং তারা ভয়ে কাঁপতে লাগল। তখন অন্য একজন দরবারী সম্রাটের কাছে এগিয়ে গেল এবং তাঁর কানে কানে কিছু একটা ফিসফিস করে বলল। সম্রাট অনুমোদনের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। আবার সিস্টার লেসের দিকে ফিরে তিনি দাঁত বের করে এক চিলতে হেসে বললেন, "লোকে বলে তুমি নাকি খুব সুন্দর লেস তৈরি করতে পারো। এটা কি সত্যি? এখন, তুমি যদি সাত দিনের মধ্যে এক টুকরো কাপড়ের ওপর একটি জ্যান্ত মোরগ বুনে দিতে পারো, তবে আমি তোমাকে বাড়ি ফিরে যেতে দেব; অন্যথায়, তোমাকে চিরকাল আমার সাথেই থাকতে হবে।"

চোখে জল নিয়ে, সিস্টার লেস মোরগটি তৈরি করার জন্য তার অন্ধকার কারাগারের কুঠুরিতে দিন-রাত কাজ করতে লাগল। সপ্তম দিনে কাজটি শেষ হলো। সে নিজের আঙুল কামড়ে এক ফোঁটা রক্ত তার ঝুঁটির ওপর পড়তে দিল। তারপর সে চোখ পিটপিট করল এবং তার চোখ থেকে একটি মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে মোরগের মুখে পড়ল। ডানার এক ঝাপটায় মোরগটি জ্যান্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।

যখন সম্রাট তাকে দেখতে এলেন, তিনি তার কারাগারের কুঠুরিতে একটি জ্যান্ত মোরগকে দম্ভভরে হেঁটে বেড়াতে দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। সম্রাট বললেন, "তুমি এই মোরগটি তৈরি করোনি। এটি আমার প্রাসাদের পাখিগুলোর মধ্যে একটি। আমি তোমাকে আজ থেকে আরও সাত দিন সময় দিচ্ছি। এবার তোমাকে অবশ্যই আমার জন্য একটি বুনো তিতির পাখি  তৈরি করতে হবে। তুমি যদি সফল হও, তবে আমি তোমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেব!"

হঠাৎ, মোরগটি লাফিয়ে উঠে সম্রাটের মাথার ওপর উড়ে গিয়ে বসল। ঘাড়ের পালকগুলো খাড়া করে এটি চিৎকার করে উঠল: "আমি সিস্টার লেসকে কত করুণা করি! আমি সম্রাটকে কত ঘৃণা করি!" দরবারীরা যখন মোরগটিকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ছুটে এলো, এটি তার নখ দিয়ে সম্রাটের কপালে বেশ কয়েকবার আঁচড় কেটে দিল, তারপর উড়ে বাগানে চলে গেল এবং অদৃশ্য হয়ে গেল।

সম্রাটের কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি রাগ আর লজ্জায় সেখান থেকে চলে গেলেন। চোখে জল নিয়ে, সিস্টার লেস সেই বুনো তিতির পাখিটি তৈরি করার জন্য তার কারাগারের কুঠুরিতে দিন-রাত কাজ করতে লাগল। সাত দিন কেটে গেল এবং কাজটি শেষ হলো। সে নিজের আঙুল কামড়ে তিতির পাখির পালকের ওপর রক্ত মাখিয়ে দিল, যা লাল দাগে সেগুলোকে চিতাবাঘের মতো চিত্রবিচিত্র করে তুলল।
তারপর সে চোখ পিটপিট করল এবং তার চোখ থেকে একটি মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে বুনো তিতির পাখির মুখে পড়ল। ডানার এক ঝাপটায় তিতির পাখিটি জ্যান্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।সম্রাট তাকে আবার দেখতে এলেন এবং তার কারাগারের কুঠুরিতে একটি জ্যান্ত তিতির পাখিকে দেখে হতবাক হয়ে গেলেন।

 তিনি বললেন, "তুমি আমাকে ভুল বুঝেছো। আমি তোমাকে একটি স্বর্গীয় ড্রাগন তৈরি করতে বলেছিলাম। তোমাকে এমন জিনিস তৈরি করতে কে বলেছে? আমি তোমাকে একটি ড্রাগন তৈরি করার জন্য আরও সাত দিন সময় দিচ্ছি। তুমি যদি এটি সঠিকভাবে করতে না পারো, তবে তোমাকে চিরকাল আমার সাথেই থাকতে হবে!"হঠাৎ, তিতির পাখিটি লাফিয়ে উঠে সম্রাটের কাঁধের ওপর উড়ে গিয়ে বসল। এটি মুখ খুলে চিৎকার করে উঠল: "সিস্টার লেস কত না কষ্ট পাচ্ছে! আমি সম্রাটকে কত ঘৃণা করি!"

 দরবারীরা যখন পাখিটিকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ছুটে এলো, এটি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে সম্রাটের ঘাড়ে বেশ কয়েকবার আঁচড় কেটে দিল, তারপর রাজপ্রাসাদের দেয়াল পেরিয়ে উড়ে চলে গেল এবং অদৃশ্য হয়ে গেল।সম্রাটের ঘাড় বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি রাগ আর লজ্জায় সেখান থেকে চলে গেলেন। চোখে জল নিয়ে, সিস্টার লেস সেই ড্রাগনটি তৈরি করার জন্য তার কারাগারের কুঠুরিতে দিন-রাত কাজ করতে লাগল। 

সাত দিন পর, সে ড্রাগনটি তৈরি করা শেষ করল। ছোট ড্রাগনটিকে লাল রঙে রাঙিয়ে তুলতে সে নিজের আঙুল কামড়াল। তারপর সে চোখ পিটপিট করল এবং তার চোখ থেকে একটি মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে ছোট ড্রাগনটির মুখে পড়ল। শরীরের এক মোচড়ে ছোট ড্রাগনটি জ্যান্ত হয়ে উঠল। সিস্টার লেস আলতো করে ছোট ড্রাগনটিকে আদর করল এবং তাকে বলল: "আমার ছোট লাল ড্রাগন, যদিও তুমি জ্যান্ত হয়ে উঠেছো, তাও আমার ভয় হচ্ছে সম্রাট হয়তো আবারও তাঁর দেওয়া কথা থেকে পিছিয়ে যাবেন এবং তাঁর দেওয়া কথা থেকে পিছিয়ে যাবেন এবং বলবেন যে তিনি ড্রাগন নয়, বরং একটি মাছ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। মনে হচ্ছে আমি আর কখনোই আমার গ্রামে ফিরে যেতে পারব না।"
সম্রাট যখনই তার কারাগারের কুঠুরিতে পা রাখলেন ছোট ড্রাগনটিকে দেখে তিনি ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। তিনি ভয়ে চিৎকার করে বললেন, "এটি কোনো ড্রাগন নয়, এটি একটি সাপ!" ছোট লাল ড্রাগনটি প্রচণ্ড রেগে গেল। সে তার মাথা উঁচু করল, মুখ খুলল এবং একটি জ্বলন্ত আগুনের গোলা উগরে দিল। সেই আগুনের গোলা সম্রাট এবং তাঁর দরবারীদের পুড়িয়ে মারল। তারপর আগুনের গোলাটি কারাগার থেকে গড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল এবং পুরো রাজপ্রাসাদটিকে পুড়িয়ে ছাই করে দিল।

সেই লাল ড্রাগনের পিঠে চড়ে, সিস্টার লেস আকাশে উড়ে গেল। বলা হয়, সে আজও সেই মেঘের রাজ্যে বসে পরম যতন আর মনোযোগ দিয়ে তার কাপড়ে নকশা তোলার কাজ করে চলেছে। আকাশে যখনই মেঘ জমে, সে তার জাদুকরী সুতো দিয়ে আকাশ জুড়ে এক অদ্ভুত রঙের জাল বোনে। আর তাই, ঝড়-বৃষ্টির শেষে যখনই আকাশের বুকে সেই সাতরঙা রামধনু নকশা দেখা যায়, গাঁয়ের প্রবীণ মানুষেরা শিশুদের ডেকে বলে, "দেখ্ দেখ্, এটি সিস্টার লেসের হাতেরই কাজ।"

Post a Comment

0 Comments