জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি /পর্ব ২৩/প্রীতম সেনগুপ্ত

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি 

পর্ব ২৩

প্রীতম সেনগুপ্ত 


নিত্যানিত্য বস্তুবিচার ও শ্রীরামকৃষ্ণ 

শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন ---‘ধ্যান করবে মনে, কোণে ও বনে। আর সর্বদা সদসৎ বিচার করবে। ঈশ্বরই সৎ --- কিনা নিত্য বস্তু, আর সব অসৎ --- কিনা অনিত্য। এই বিচার করতে করতে অনিত্য বস্তু মন থেকে ত্যাগ করবে। ’

কথামৃত রচয়িতা শ্রীম অর্থাৎ মাস্টারমশাই প্রশ্ন করছেন --- সংসারে কিরকম করে থাকতে হবে? 

শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন --- সব কাজ করবে কিন্তু মন ঈশ্বরেতে রাখবে। স্ত্রী, পুত্র, বাপ, মা --- সকলকে নিয়ে থাকবে ও সেবা করবে। যেন কত আপনার লোক। কিন্তু মনে জানবে যে, তারা তোমার কেউ নয়। 

           “ বড় মানুষের বাড়ির দাসী সব কাজ করছে, কিন্তু দেশে নিজের বাড়ির দিকে মন পড়ে আছে। আবার সে মনিবের ছেলেদের আপনার ছেলের মতো মানুষ করে। বলে ‘আমার রাম’, ‘আমার হরি’ কিন্তু মনে বেশ জানে ---- এরা আমার কেউ নয়।

🍂

      “কচ্ছপ জলে চলে বেড়ায়, কিন্তু তার মন কোথায় পড়ে আছে জানো? --- আড়ায় পড়ে আছে । যেখানে তার ডিমগুলি আছে। সংসারের সব কর্ম করবে, কিন্তু ঈশ্বরে মন ফেলে রাখবে। 

     “ ঈশ্বরে ভক্তিলাভ না করে যদি সংসার করতে যাও তাহলে আরও জড়িয়ে পড়বে। বিপদ, শোক, তাপ --- এসবে অধৈর্য হয়ে যাবে। আর যত বিষয় - চিন্তা করবে ততই আসক্তি বাড়বে। 

“ তেল হাতে মেখে কাঁঠাল ভাঙতে হয়। তা না হলে হাতে আঠা জড়িয়ে যায়। ঈশ্বরে ভক্তিরূপ তেল লাভ করে তবে সংসারের কাজে হাত দিতে হয়।

...“সঙ্গে বিচার করা খুব দরকার। কামিনী-কাঞ্চন অনিত্য। ঈশ্বরই একমাত্র বস্তু। টাকায় কি হয়? ভাত হয়, ডাল হয়, থাকবার জায়গা হয় --- এই পর্যন্ত। ভগবানলাভ হয় না। তাই টাকা জীবনের উদ্দেশ্য হতে পারে না --- এর নাম বিচার বুঝেছ? 

মাস্টার --- আজ্ঞে হাঁ, প্রবোধচন্দ্রোদয় নাটক আমি সম্প্রতি পড়েছি, তাতে আছে ‘বস্তুবিচার’।

শ্রীরামকৃষ্ণ --- হ্যাঁ, বস্তুবিচার! এই দেখ, টাকাতেই বা কি আছে! বিচার কর, সুন্দরীর দেহেতেও কেবল হাড়, মাংস, চর্বি, মল, মূত্র --- এইসব আছে। এইসব বস্তুতে মানুষ ঈশ্বরকে ছেড়ে কেন মন দেয়? কেন ঈশ্বরকে ভুলে যায়? 

( ঈশ্বর দর্শনের উপায় )

মাস্টার --- ঈশ্বরকে কি দর্শন করা যায়?

শ্রীরামকৃষ্ণ --- হ্যাঁ, অবশ্য করা যায়। মাঝে মাঝে নির্জনে বাস; তাঁর নামগুণগান, বস্তুবিচার --- এইসব উপায় অবলম্বন করতে হয়।

মাস্টার --- কী অবস্থাতে তাঁকে দর্শন হয়?

শ্রীরামকৃষ্ণ --- খুব ব্যাকুল হয়ে কাঁদলে তাঁকে দেখা যায়। মাগছেলের জন্য লোকে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়, কিন্তু ঈশ্বরের জন্য কে কাঁদছে? ডাকার মতো ডাকতে হয়।

আরেকটি জায়গায় নিত্যানিত্য বস্তুবিচার বিষয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন -- ‘আমি রাজসিক ভাবের আরোপ করতাম --- ত্যাগ করবার জন্য। সাধ হয়েছিল সাচ্চা জরির পোশাক পরব, আঙটি আঙুলে দেব, নল দিয়ে গুড়গুড়িতে তামাক খাব। সাচ্চা জরির পোশাক পরলাম --- এরা ( মথুরবাবু ) আনিয়ে দিলে। খানিকক্ষণ পরে মনকে বললাম, মন এর নাম সাচ্চা জরির পোশাক। তখন সেগুলোকে খুলে ফেলে দিলাম। আর ভাল লাগল না। বললাম, মন, এরই নাম শাল --- এরই নাম আঙটি। এরই নাম নল দিয়ে গুড়গুড়িতে তামাক খাওয়া! সেই যে সব ফেলে দিলাম আর মন উঠে নাই।”

( সূত্র: শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত, অখণ্ড সংস্করণ )

এই জগত, জীবনকে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসায় নিরীক্ষণ করেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। নিরীক্ষা অন্তে ভেসেছেন ব্রহ্মানন্দ সাগরে।

Post a Comment

0 Comments