(প্রথম পর্ব)
সৌমেন রায়
চিত্র – কল্লোল মজুমদার
(এই গল্পটির প্রথমের সামান্য একটু অংশ জ্বলদর্চির ছেলেবেলা বিভাগে প্রকাশিত হয়েছিল)
সকাল থেকে একটা পাখি ‘চুইট – চুইট , চুইট – চুইট’ করে চারিদিক মাতিয়ে রেখেছে। একবার এপাশ থেকে শব্দ আসে তো একবার ওপাশ থেকে। তিতলি ভাবছিল এত জোরে ডাকছে যখন নিশ্চয় বেশ বড় পাখি হবে। এদিক ওদিক খুঁজে দেখা পেল অবশেষে।
ও মা! এতো রাজামশাইকে নাজেহাল করা টুনটুনি!
একটা ছোট্ট পাখি। পিঠের দিকটা একটু জলপাই রঙের।
তিতলি ডাকল, ‘এই শোন এদিকে।‘
অবাক কান্ড! ডাকতেই পাখিটা এসে বসল জানালায়।
তিতলি জিজ্ঞেস করল, ‘এই তোমার কি পড়াশোনা নেই? সারাদিন ঘুরে বেড়াও যে বড়।‘
‘তোমাদের মত সারাদিন বইতে মুখ গুঁজে শিখতে হয় না আমাদের। আমরা এমনি এমনি শিখি।‘
‘ও মা ! তাই নাকি ?’
‘এই দেখো না গত বছর তোমাদের রবীন্দ্রজয়ন্তীর পরে আমার জন্ম। এখনই আমি পোকা ধরে খেতে পারি। এই বছরই আমি আমার নিজের বাসা বানাবো বড় বড় পাতাগুলোকে ঠোঁট দিয়ে সেলাই করে।‘
‘তোমার মা তোমাকে বকে না’ ?
‘ মা? মা কোথায় থাকে তো জানিনা। সেই ছোটবেলায় তাকে দেখেছিলাম। এখন প্রকৃতিই আমার মা। আচ্ছা তোমরা ঝড় বৃষ্টি হবে কিনা কি করে জানতে পারো’?
‘ কি করে আবার ,আবহাওয়ার খবর শুনে।‘
‘এই দেখো কান্ড! আমরা তো এমনি এমনিই বুঝতে পারি। কোন দিন ঝড় – বৃষ্টি হবে, কোন দিন রোদ হবে, কখন কোথায় পোকা পাওয়া যাবে - সব আমরা জেনে যাই বই না পড়েই।‘
‘কি করে বোঝো তোমরা? শিখে নিলে কি আমিও বুঝতে পারব?’
‘ না ভাই, তোমরা পারবে না। পারবে কি করে, তোমরা তো প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছ। বন্ধু হলে তবে না মন বুঝতে পারবে।‘
তিতলি অবাক হয়ে দেখে টুনটুনিকে।
টুনটুনি বলে, ‘ চলিগো বন্ধু। আমার এখন অনেক কাজ। সঙ্গী খুঁজতে হবে, বাসা বানাতে হবে। টা – টা’।
তারপর থেকে টুনটুনিটা রোজ সকালে এসে বসে জানালার পাশে কাড়িয়া পাতা গাছটায়। তিতলির সঙ্গে খানিকটা বকবক করে আবার উড়ে যায়। তিতলি কথায় কথায় বুঝে নিতে চায় কি করে জানা যায় প্রকৃতির মনের কথা।
‘ঘরে বসে কি আর প্রকৃতির মন বোঝা যায় বন্ধু, বাইরে যেতে হয়। চোখ মেলে দেখো আকাশে কেমন মেঘ ভাসছে’,একদিন বলল টুনটুনি।
তিতলি তাকিয়ে দেখে নীল আকাশটা মেঘে মেঘে সেজে উঠেছে। তুলোর পাহাড়গুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। আরো উপরে পাতলা মেঘের পানসিগুলো ভাসতে ভাসতে যেন চলে যাচ্ছে কোন দূর দেশে।ভারি সুন্দর লাগছে।
‘ আজ একটা রোদ ঝলমলে দিন। চলো তোমাদের বাগানটা ঘুরে আসি। নিজেদের বাগানটাই তো দেখনি ভালো করে’।
তিতলিরা শহরের একটু বাইরের দিকে থাকে। তার বাড়ির সঙ্গে একফালি বাগানও আছে। মাকে বলে তিতলি নেমে এল বাগানে। জানলা থেকে সে দেখে বাগানটা। কিন্তু সামনে থেকে তার রূপ যেন একদম আলাদা। কত রকমের ঘাস। ছোট ছোট শামুক ঘাসের নিচে ঝুলছে। একটা শুকনো গাছে ব্যাঙের ছাতা বেরিয়েছে। পিঁপড়ে ঘুরছে তার গায়ে। দুটো প্রজাপতি পরস্পরের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে উড়ে গেল দূরে।
টুনটুনি তার বাসাটা তিতলিকে দেখাল দূর থেকে, ‘ ওই দেখো আমার বাসা। পাতাগুলো সেলাই করে বানানো’।
তিতলি সেদিকে এগিয়ে যেতেই আঁতকে উঠল টুনটুনি, ‘কাছে যেও না বন্ধু। হুলোটা দেখতে পেলে সর্বনাশ। বড্ড দুষ্ট, ডিমগুলো খেয়ে নেবে’।
‘ তুমি আরেকটু উঁচুতে বাসা করো না কেন’?
‘ভয় করে যে, যদি উঁচু থেকে ছানাগুলো পড়ে যায়’,টুনটুনি উত্তর দেয়।
একদিন টুনটুনি একটা পোকা মুখে করে এনে বসলো ওদের বক্স জানালাতে। পোকাটা জানালার উপর রেখে বলল,
‘এই দেখো আমার প্রাতরাশ’। পোকাটা তখনও নড়ছিল। কিন্তু পালানোর ক্ষমতা ছিল না।
তিতলির বুক দুঃখে ভরে উঠল ‘ ইস তুমি পোকাটাকে মেরে দিলে? ওর মা তো কাঁদবে’।
টুনটুনি অবাক হয়ে গেল, ‘ এটা তো আমার খাবার। আমাদের ডিম, ছানাও তো দাঁড়াশ সাপগুলো মাঝে মাঝে খেয়ে নেয়। এসব প্রকৃতির নিয়ম। তুমিও তো রোজ মাছ খাও, তার বেলা ?’
আস্তে আস্তে তিতলি প্রকৃতির ভাষা খানিকটা পড়তে শিখে গেল। এখন অ্যাকুরিয়ামের মাছগুলো ওকে ফিসফিস করে বলে,
‘ বড্ড গরম লাগছে গো। তোমাদের কংক্রিটের ঘরে আমাদের জল গরম হয়ে গেছে। একটু যে ঘাস পাতার আড়ালে লুকোবে তার উপায় কি রেখেছ!’
তিতলি আর কি করবে? ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল এনে মিশিয়ে দেয়।
শুকনো হয়ে যাওয়া নাগচম্পার গাছটা ওকে চুপি চুপি বলে,’আমি বেঁচে আছি খুকি। সামনের বসন্তে আমার আবার কচি পাতা বেরোবে’। অবাক হয়ে যায় তিতলি।
ডিম পেড়েছে বলে টুনটুনিটা এখন আর বেশি দূরে যায় না। সারাক্ষণই তিতলির সঙ্গে ওর দেখা হয়। ক্রমে ক্রমে টুনটুনির সঙ্গে তার এত ভাব হয়ে গেল যে মনে মনে ভাবতে শুরু করল সে যদি টুনটুনির মত হয়ে যায় তাহলে বেশ হয়। চারিদিকে উড়ে বেড়াবে, যেখানে খুশি সেখানে যাবে। ভারী মজা হবে। উড়বে আর উড়বে।
একদিন ভোরবেলা স্বপ্ন দেখল পাখি হয়ে সে উড়ে বেড়াচ্ছে চারিদিকে। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়? ঘুম ভেঙে যেতেই তিতলির মনে হলো তার হাত দুটো কেমন যেন সুড়সুড় করছে। এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখে দুটো হাতেই রোমগুলো জড়িয়ে গেছে ।দেখতে অনেকটা ছোট ছোট পালকের মত লাগছে ।
(পরের অংশ পরের পর্বে)
🍂
8 Comments
হ্যাঁ এটা খুবই সত্য যে,
ReplyDeleteআমরাই প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি।
পরের পর্বে দেখা যাক তিতলি প্রকৃতির বন্ধু হয়ে যেতে পারে কিনা ?
🙏🙏🙏🙏🙏🙏
🙏🙏💐💐
Deleteমিষ্টি গল্প। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়।
ReplyDeleteধন্যবাদ 🙏
Deleteশেষ টা যে অবাক করে দিলো!এরপর আবার কী হবে?!
ReplyDeleteতিতলি কি পাখি হয়ে যাবে ? দেখা যাক ।💐
Deleteতিতলি তো মনপাখি হয়েই আছে।
ReplyDeleteসেটা ঠিক।কিন্তু ফ্যান্টাসি কি থাকবে শেষ পর্যন্ত? সেটাই প্রশ্ন।
Delete