পর্ব ৮ : উত্তরাধিকার
কমলিকা ভট্টাচার্য
গাড়িটা দ্রুত এগিয়ে চলেছে দক্ষিণ লন্ডনের রাস্তায়।
সামনের সিটে প্রফেসর হ্যারিসন।
পাশে দর্শন।
জানলার বাইরে একের পর এক আলো পিছিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দুপাশে শরতের হলুদ পাতা বাতাসে উড়ছে। আকাশে মেঘ জমেছে। দূরে কোথাও হালকা বৃষ্টি নামছে।
গাড়ির ভিতরে অদ্ভুত নীরবতা।
হ্যারিসন কয়েকবার দর্শনের দিকে তাকালেন।
আজ তাকে অন্যরকম লাগছে।
যেন কয়েক মাসে নয়, কয়েক বছরে বুড়িয়ে গেছে।
হঠাৎ তিনি বললেন,
— "তুমি আমাকে সত্যিটা বলবে?"
দর্শন জানলার বাইরে তাকিয়েই রইল।
— "কোন সত্যি?"
— "হারগ্রিভের কী হয়েছে?"
দর্শন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— "সে আর কাউকে আঘাত করতে পারবে না।"
— "কীভাবে?"
দর্শন উত্তর দিল না।
হ্যারিসন এবার ধীরে বললেন,
— "তুমি কি নিজের কিছু হারিয়েছ?"
প্রথমবার দর্শন তার দিকে তাকাল।
মুখে ক্ষীণ হাসি।
— "সবকিছুর একটা মূল্য থাকে, প্রফেসর।"
— "আর তুমি সেই মূল্য দিয়েছ?"
দর্শন আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার নীরবতাই উত্তর হয়ে রইল।
সুসানের বাড়ির সামনে পৌঁছতেই তারা দেখল সবাই জেগে আছে।
দৃষ্টি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে।
সুসান, রবার্ট উদ্বিগ্ন মুখে এদিক-ওদিক হাঁটছেন।
গাড়ি থামতেই দৃষ্টি বলল,
— "দর্শন কোথায় ছিলে তুমি?"
তার গলায় রাগ।
অভিমান।
আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা অবিশ্বাস।
দর্শন শুধু বলল,
— "আদর কেমন আছে?"
— "তোমার সেটা নিয়ে এখনও চিন্তা হয়?"
কথাটা ছুরির মতো বিঁধল।
কিন্তু দর্শনের মুখে কোনো পরিবর্তন এল না।
সে ধীরে ভিতরে ঢুকে গেল।
দৃষ্টি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কেন জানি আজ তার নিজেরই কথাগুলো নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে।
উপরে ঘরে আদর বসে ছিল।
দর্শন ঢুকতেই সে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড।
তারপর হঠাৎ কপালে হাত দিল।
চোখের সামনে যেন একের পর এক ছবি জ্বলে উঠছে।
একটি ল্যাবরেটরি।
রোবোটিক আর্ম।
অনির্বাণ।
ঋদ্ধিমান।
দৃষ্টি।
আর...
দর্শন।
আদর ফিসফিস করে বলল,
— "আমি তোমাকে চিনি..."
দৃষ্টির বুক ধক করে উঠল।
দর্শন স্থির।
আদর আবার বলল,
— "তুমি..."
তার কণ্ঠ কেঁপে গেল।
— "তুমি আমাকে বাঁচিয়েছিলে..."
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
দৃষ্টি অবাক।
🍂
হ্যারিসনও।
দর্শনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য আলো জ্বলে উঠল।
কিন্তু সে কিছু বলল না।
শুধু বলল,
— "সব মনে করার চেষ্টা কোরো না। ধীরে ধীরে আসবে।"
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
হ্যারিসন ফোনটা তুললেন।
ওপাশে অনির্বাণ।
"আমরা লন্ডনে নেমে গেছি।"
ঘরের সবাই চমকে উঠল।
দৃষ্টি বিস্ময়ে বলল,
— "তোমরা এসেছ?"
ঋদ্ধিমানের কণ্ঠ ভেসে এল,
— "এবার অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমরা আর অপেক্ষা করতে পারিনি।"
দর্শন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
কোনো বিস্ময় নেই।
যেন সে আগেই জানত।
পরদিন সকাল।
হিথরো বিমানবন্দর।
অনির্বাণ, ঋদ্ধিমান, ইরা এবং নাতাশা বেরিয়ে এলেন।
গাড়িতে ওঠার পর কেউ বিশেষ কথা বলল না।
শুধু ঋদ্ধিমান বারবার জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
তার মনে হচ্ছিল—
কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
খুব বড় কিছু।
সুসানের বাড়িতে পৌঁছানোর মুহূর্তটা যেন সময় থামিয়ে দিল।
আদর সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল।
অনির্বাণ তাকে দেখলেন।
তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
বহু সময়ের জমে থাকা কান্না ভেঙে পড়ল।
ইরা কাঁদছেন।
নাতাশার চোখ ভিজে গেছে।
সুসান মুখ ফিরিয়ে নিলেন,তার চোখেও জল।
আর ঋদ্ধিমান?
তিনি শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন।
তার চোখ দুটো দর্শনকে খুঁজছে।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল সে।
নীরব।
অদ্ভুত ক্লান্ত।
ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।
অনেকক্ষণ কোনো কথা বললেন না।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
— "কেমন আছো?"
দর্শনের ঠোঁটে হাসি ফুটল।
— "ভালো।"
ঋদ্ধিমান মাথা নাড়লেন।
— "মিথ্যে কথা।"
দর্শন চুপ।
ঋদ্ধিমান আরও কাছে এলেন।
— "তুমি কী করেছ?"
— "কিছু না।"
— "আমাকে বলবে না?"
— "এখন না।"
দুজনেই চুপ করে রইলেন।
তারপর ঋদ্ধিমান খুব আস্তে বললেন,
— "সবাই তোমাকে ভুল বুঝছে।"
দর্শন মৃদু হাসল।
— "জানি।"
— "তবু কিছু বলছ না?"
— "সব সত্যি সময়ের আগে জানা ভালো নয়।"
ঋদ্ধিমান তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
হঠাৎ যেন তার বুকের ভিতর কাঁপন উঠল।
কারণ তিনি লক্ষ্য করলেন—
দর্শনের ডান হাতটা সামান্য কাঁপছে।
যেটা কোনোদিন কাঁপত না।
সেদিন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর ঋদ্ধিমান একা নিচে নেমে এলেন।
ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলছে।
দর্শন জানলার পাশে বসে।
বাইরে চাঁদের আলো।
টেমসের দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে।
ঋদ্ধিমান ধীরে বললেন,
— "তুমি কি মরছো, দর্শন?"
প্রশ্নটা বাতাসে ভেসে রইল।
দর্শন প্রথমে উত্তর দিল না।
তারপর অনেকক্ষণ পরে বলল,
— "আমরা মানুষ নই, স্যার।"
— "উত্তরটা এড়িয়ে যেও না।"
দর্শন চোখ নামিয়ে ফেলল।
কয়েক সেকেন্ড পরে খুব আস্তে বলল,
— "সব সিস্টেমের একটা শেষ সময় থাকে।"
ঋদ্ধিমানের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
তিনি আর কিছু বললেন না।
কারণ তিনি বুঝে গেছেন—
যে উত্তরটা তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, সেটাই সত্যি।
আর সেই সত্যের শেষ অধ্যায় এখনও বাকি।
দর্শন জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
দূরে টেমসের জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে।
তার নিজের জীবনটাও কি ঠিক এমনই?
ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে।
কিন্তু সেই ভাঙনের মধ্য দিয়েই হয়তো অন্য কারও ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে।
আর প্রথমবারের মতো, বহু বছরের মধ্যে, তার মনে হলো
হয়তো এটাই বাঁচার উত্তরাধিকার।
পরদিন সকাল।
রাতভর বৃষ্টির পর লন্ডনের আকাশ পরিষ্কার। জানলার কাচে রোদের নরম আলো এসে পড়েছে। বাগানের গোলাপের পাতায় এখনও বৃষ্টির ফোঁটা লেগে আছে।
বাড়িটায় আজ বহুদিন পর যেন একসঙ্গে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সবাই।
অনির্বাণ বারবার আদরের দিকে তাকাচ্ছেন। যেন চোখ ফিরিয়ে নিলেই ছেলেটা আবার হারিয়ে যাবে।
ইরা মিসেস সুসানের সাথে মিলে নিজের হাতে সকালের জলখাবার সাজিয়ে দিচ্ছেন।
নাতাশা চুপচাপ বসে আদরের মুখ দেখছেন।
আর ঋদ্ধিমান...
তিনি শুধু দর্শনকে লক্ষ্য করছেন।
গত রাতের কথোপকথনের পর থেকে তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—
দর্শন ঠিক কী লুকিয়ে রেখেছে?
আদর আজ অনেকটাই স্বাভাবিক।
হঠাৎ সে অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে বলল,
"বাবা..."
শব্দটা শুনে অনির্বাণ যেন জমে গেলেন।
চোখ ভিজে উঠল।
তিনি এগিয়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
"আর একবার বল..."
আদর মৃদু হেসে বলল,
"বাবা..."
ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকের চোখে জল।
দৃষ্টি নীরবে দাঁড়িয়ে শুনছে।
সে দেখতে পায় না, তবু সে বুঝতে পারছে—এই ঘরে আজ আলো নেমে এসেছে।
কিন্তু সেই আলোর মধ্যে একমাত্র ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে দর্শন।
দুপুরে প্রফেসর হ্যারিসন দর্শনকে আলাদা করে ডাকলেন।
সুসানের বাড়ির পেছনে ছোট্ট বাগান।
হালকা বাতাসে শুকনো পাতা উড়ছে।
হ্যারিসন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
"হারগ্রিভকে সরকারি সুরক্ষায় রাখা হয়েছে।"
দর্শন মাথা নাড়ল।
"আমি জানি।"
"ডাক্তাররা বলছেন, তার স্মৃতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা আর কোনোদিন ফিরবে না।"
দর্শনের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
হ্যারিসন ধীরে ধীরে বললেন,
"আমি একটা প্রশ্ন করব।"
"করুন।"
"তুমি কি ইচ্ছে করেই এটা করেছ?"
অনেকক্ষণ নীরবতা।
তারপর দর্শন বলল,
"কখনও কখনও একজন মানুষকে থামানোর একমাত্র উপায় হলো তার অন্ধকারটাকে কেড়ে নেওয়া।"
"আর তার জন্য তোমাকে কী দিতে হয়েছে?"
দর্শন উত্তর দিল না।
হ্যারিসন এবার তার ডান হাতটা ধরে ফেললেন।
হাতটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
কাঁপছে।
"দর্শন..."
"স্যার..."
"আমাকে আর মিথ্যে বলো না।"
দর্শন আস্তে করে হাত সরিয়ে নিল।
"আপনি সত্যিটা জানেন। শুধু পুরোটা জানেন না।"
ঠিক সেই সময় বাড়ির ভেতর থেকে একটা চিৎকার ভেসে এল।
"দর্শন!"
সবাই দৌড়ে ভিতরে ঢুকল।
আদর মেঝেতে বসে।
দুই হাতে মাথা চেপে ধরেছে।
সে হাঁপাচ্ছে।
"সব মনে পড়ছে..."
একটা...
দুটো...
তারপর যেন বাঁধ ভেঙে গেল।
"ডিআরআইএসএইচটিআই প্রজেক্ট..."
"লিয়াম..."
"দৃষ্টি..."
"হারগ্রিভ..."
"বিস্ফোরণ..."
"আমি..."
হঠাৎ সে দর্শনের দিকে তাকাল।
চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
"তুমি..."
দর্শন স্থির দাঁড়িয়ে।
আদর ধীরে ধীরে উঠে এল তার সামনে।
"তুমিই আমাকে বাঁচিয়েছ..."
ঘর নিস্তব্ধ।
অনির্বাণ, ঋদ্ধিমান, ইরা—কেউ নড়তে পারছেন না।
আদরের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
"তুমি নিজের শরীরের অর্ধেক শক্তি আমাকে দিয়েছিলে..."
"আমি... আমি সব মনে করতে পারছি..."
দর্শন শুধু মৃদু হেসে বলল,
"ভালো।"
শুধু এই একটি শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দের ভিতরে যেন বছরের পর বছর জমে থাকা অপেক্ষা।
দৃষ্টি কাঁপা গলায় বলল,
"তাহলে..."
"আমি এতদিন..."
সে আর কথা শেষ করতে পারল না।
তার মুখ ফ্যাকাশে।
দর্শনের দিকে এক পা এগিয়ে এসে বলল,
"আমি তোমাকে..."
"ক্ষমা চাইবে না।"
দর্শন শান্ত গলায় বলল।
"তোমার যা জানা ছিল, তাই বিশ্বাস করেছ।"
দৃষ্টির চোখে জল নেমে এল।
"তবু..."
দর্শন মাথা নাড়ল।
"এখনও সব জানো না।"
ঋদ্ধিমান হঠাৎ বলে উঠলেন,
"মানে?"
দর্শন তাঁর দিকে তাকাল।
"আরও একটা কাজ বাকি আছে।"
ঠিক তখনই প্রফেসর হ্যারিসনের ফোন বেজে উঠল।
সরকারি গবেষণা কেন্দ্র থেকে খবর এসেছে।
হারগ্রিভ অস্বাভাবিক আচরণ করছে।
সে বারবার শুধু একটি নাম উচ্চারণ করছে—
"দর্শন..."
"দর্শন কোথায়?"
হ্যারিসন ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
দর্শন ধীরে বলল,
"আমাকে যেতে হবে।"
আদর অবাক হয়ে বলল,
"এখন?"
"হ্যাঁ।"
"আমি তোমার সঙ্গে যাব।"
দর্শন মাথা নাড়ল।
"না।"
"কেন?"
প্রথমবার দর্শন সরাসরি আদরের চোখে তাকাল।
"কারণ এবার আমার পথটা আমাকে একাই হাঁটতে হবে।"
কথাটা শুনে ঋদ্ধিমানের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
তিনি এগিয়ে এসে দর্শনের কাঁধে হাত রাখলেন।
"আমি যাব তোমার সঙ্গে।"
দর্শন মৃদু হেসে বলল,
"আপনি তো সবসময়ই আমার সঙ্গে ছিলেন, স্যার।"
এই প্রথম দর্শন তাকে আবার "স্যার" বলে ডাকল।
ঋদ্ধিমানের চোখ ভিজে উঠল।
তিনি বুঝলেন—
বিদায়ের ভাষা সবসময় "বিদায়" শব্দে লেখা হয় না।
দর্শন দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
বাইরে শরতের বাতাস।
হলুদ পাতাগুলো ঘুরে ঘুরে তার পায়ের কাছে এসে পড়ছে।
সে একবার পিছন ফিরে তাকাল।
অনির্বাণ।
ইরা।
নাতাশা।
ঋদ্ধিমান।
আদর।
দৃষ্টি।
সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে।
এমন দৃশ্য সে বহুদিন ধরে দেখতে চেয়েছিল।
আজ দেখল।
তারপর খুব আস্তে নিজের মনেই বলল—
"এবার আমার কাজ শেষ হওয়ার সময় এসেছে..."
সে দরজা পেরিয়ে বাইরে চলে গেল।
কেউ জানল না—
এই বাড়ি থেকে এটাই ছিল দর্শনের শেষ প্রস্থান।
সরকারি গবেষণা কেন্দ্রের সেই সাদা ঘর।
জানলার বাইরে শরতের বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় মিলিয়ে যাচ্ছে।
ঘরের মাঝখানে বসে আছে হারগ্রিভ।
তার চোখে আর সেই নির্মম দৃষ্টি নেই।
সে যেন একটি হারিয়ে যাওয়া শিশু।
দর্শন ঘরে ঢুকতেই হারগ্রিভ মুখ তুলে তাকাল।
কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
"তুমি... কে?"
দর্শন মৃদু হেসে বলল,
"একটা অসমাপ্ত ভুলের শেষ উত্তর।"
হারগ্রিভ কিছুই বুঝল না।
হঠাৎ সে বলল,
"আমি কি খুব খারাপ মানুষ ছিলাম?"
দর্শন দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে উত্তর দিল,
"আপনি মানুষ হতে ভুলে গিয়েছিলেন।"
হারগ্রিভ শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করল।
"আমার কিছুই মনে নেই..."
দর্শন এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল।
"সব ভুলে যাওয়াই হয়তো আপনার সবচেয়ে বড় শাস্তি।"
সে আর একবারও পিছন ফিরে তাকাল না।
ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রফেসর হ্যারিসন।
তিনি দর্শনের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝলেন—
সময় শেষ হয়ে এসেছে।
"আর কতক্ষণ?"
দর্শন হাসল।
"সময় কখনও আমাদের হাতে ছিল না, স্যার।"
"আমি ওদের ডেকে আনছি।"
"হ্যাঁ... এবার সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।"
এক ঘণ্টার মধ্যে সবাই এসে পৌঁছাল।
অনির্বাণ।
ঋদ্ধিমান।
ইরা।
নাতাশা।
আদর।
দৃষ্টি।
দর্শন তখন একটি চেয়ারে বসে।
তার চোখের নীল আলো বারবার নিভে যাচ্ছে, আবার জ্বলছে।
হঠাৎ তার বুকের ভেতর থেকে সতর্ক সংকেত শোনা গেল।
CORE SYSTEM FAILURE.
ঋদ্ধিমান ছুটে গেলেন।
"দর্শন!"
দর্শন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
"স্যার... এবার আর ঠিক করতে পারবেন না।"
ঋদ্ধিমানের হাত কাঁপছে।
তিনি নিজের যন্ত্রপাতি বের করে সিস্টেম স্ক্যান করলেন।
তারপর যেন পৃথিবী থেমে গেল।
তিনি ফিসফিস করে বললেন,
"তুমি... তোমার নিজের কোর ব্যবহার করেছ?"
দর্শন মাথা নাড়ল।
"হারগ্রিভের নিউরাল নেটওয়ার্ক ভাঙতে বাইরের শক্তি যথেষ্ট ছিল না।"
"তাই..."
"আমার নিজের স্মৃতি... আমার নিজের শক্তি... সব ব্যবহার করেছি।"
ঘরে নেমে এল গভীর নীরবতা।
আদর স্তব্ধ।
দৃষ্টি কিছুই বুঝতে পারছে না।
ঋদ্ধিমান চোখের জল আটকাতে পারলেন না।
"তুমি আমাকে একবারও বললে না?"
দর্শন খুব আস্তে বলল,
"বললে... আপনি আমাকে করতে দিতেন না।"
দৃষ্টি কাঁপা গলায় বলল,
"তাহলে এতদিন..."
দর্শন তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল,
"তোমাদের আমাকে ঘৃণা করাটা দরকার ছিল।"
"কেন?"
"হারগ্রিভ বিশ্বাস না করলে সে কখনও আমাকে নিজের ভেতরে ঢুকতে দিত না।"
আদর বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
দর্শন বলতে লাগল,
"প্রতিদিন... একটু একটু করে... আমি ওর স্মৃতি মুছে দিয়েছি।"
"ওর সব গবেষণা... সব পরিকল্পনা... সব অপরাধ..."
"একদিনে নয়..."
"মাসের পর মাস..."
"আর সেই কাজ করতে গিয়েই... আমার কোর ক্ষয়ে গেছে।"
আদর আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে এগিয়ে এসে দর্শনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার কণ্ঠ কান্নায় ভেঙে যাচ্ছিল।
— "সেদিন... তুমিই আমায় বাঁচিয়েছিলে। যখন হারগ্রিভ আমার স্মৃতি কেড়ে নিয়ে সেই ঘরে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, তুমিই আমাকে পালিয়ে যেতে বলেছিলে। কিন্তু আমার আর শক্তি ছিল না... তুমিই তোমার শক্তি আমাকে দিয়েছিলে।"
সে থামল। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
— "তারপর যখন ওরা আমাকে বন্দি করে দিনের পর দিন নির্যাতন করছিল, আমি শুধু মনে মনে তোমাকেই ডাকতাম। সবাই ভেবেছিল আমি একা... কিন্তু তুমি সেই নীরব ডাক শুনেছিলে। তুমিই লন্ডনে ছুটে এসেছিলে। দিনের পর দিন আমাকে খুঁজেছ... ছায়ার মতো আমাকে আগলে রেখেছ... হারগ্রিভের হাত থেকে বারবার আমাকে বাঁচিয়েছ।"
আদর দর্শনের দুই কাঁধ ধরে বলল,
— "আজ বুঝতে পারছি, আমি যতবার নতুন করে বেঁচেছি... প্রতিবারই তোমার জন্য।"
দর্শন শুধু মৃদু হেসে বলল,
— "তোমাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই তো আমার সবচেয়ে বড় কাজ ছিল, আদর।"
দৃষ্টি দু'হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল।
"আমি তোমাকে বিশ্বাস করিনি..."
দর্শন মৃদু হেসে বলল,
"তুমি আদরকে বিশ্বাস করেছিলে। সেটাই যথেষ্ট।"
ঠিক তখনই দর্শনের শরীর একবার প্রবলভাবে কেঁপে উঠল।
তার চোখের আলো আরও ম্লান হয়ে গেল।
ঋদ্ধিমান বুঝলেন—
আর সময় নেই।
দর্শন ধীরে বলল,
— "স্যার... একটা অনুরোধ আছে।"
— "বল।"
— "আমার শরীরের যেসব অঙ্গ এখনও ব্যবহারযোগ্য... সব দান করে দেবেন।"
তারপর সে আদরের দিকে তাকাল।
— "আর আদর... আমি তোমার গবেষণার পথটা কিছুটা এগিয়ে দিয়েছি। কাগজে-কলমে যা ছিল, তার বাস্তব রূপ তোমাকেই দিতে হবে। মানুষের জীবন বাঁচানোর সেই স্বপ্নটাকে থামতে দিও না। আমার যে অঙ্গগুলো ব্যবহারযোগ্য থাকবে, সেগুলো দিয়েই সেই নতুন জীবনের প্রথম সফল অধ্যায় শুরু করো।"
আদরের চোখ আবার ভিজে উঠল।
দর্শন মৃদু হেসে লিয়ামের কথা মনে করল।
— "ওর নতুন পা..."
একটু থেমে আবার বলল,
— "আর নোয়া... আর যাদের প্রয়োজন, তাদের জীবনেও যেন নতুন আলো পৌঁছায়।"
তারপর ধীরে ধীরে সে মুখ ফিরিয়ে দৃষ্টির দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ। যেন এই প্রথম সত্যিই তাকে দেখছে।
— "আমার চোখ দুটো... ওকে দিও।"
দৃষ্টি কেঁপে উঠল।
— "না... আমি চাই না!"
দর্শন শান্ত গলায় বলল,
— "তুমি তো একদিন বলেছিলে... আমাকে কোনোদিন দেখতে পাওনি।"
একটু থেমে সে মৃদু হেসে বলল,
— "এবার... সত্যিই দেখো।"
দৃষ্টির কান্নায় ঘর ভরে গেল।
কয়েকমাস পর দৃষ্টির চোখের
অস্ত্রোপচার সফল হলো।
তারও কয়েক সপ্তাহ পর...
প্রথমবার দৃষ্টির চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হলো।
ঘরে সবাই দাঁড়িয়ে।
অনির্বাণ।
ইরা।
নাতাশা।
ঋদ্ধিমান।
আদর।
ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন,
"চোখ খুলুন।"
দৃষ্টি আস্তে আস্তে চোখ খুলল।
প্রথমে সব ঝাপসা।
তারপর...
আলো।
রং।
মানুষ।
জীবন।
সে প্রথমবার পৃথিবী দেখল।
চোখ ভিজে উঠল।
তার প্রথম প্রশ্ন—
"দর্শন কোথায়?"
ঘরের কেউ উত্তর দিল না।
আদর এগিয়ে এসে তার হাত ধরল।
ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে।সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অডিটোরিয়ামে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।
প্রফেসর হ্যারিসন মঞ্চে উঠে ধীরে ধীরে কালো কাপড়টা সরিয়ে দিলেন।
সামনে ভেসে উঠল নতুন ফলক—
DARSHAN–ADARSH CENTRE FOR HUMAN-CENTRED INTELLIGENCE
নিচে বাংলায় উৎকীর্ণ—
"যেখানে দর্শন আর আদর্শ এক হয়ে যায়, সেখানেই মানুষের জীবনকে দেখার সত্যিকারের দৃষ্টি জন্ম নেয়।"
সারা হলঘর করতালিতে মুখর হয়ে উঠল।
দৃষ্টি ফলকটা ছুঁয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
এই চোখে—
দর্শনের আলো।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরে আদর আর দৃষ্টি হেঁটে হেঁটে টেমসের ধারে এসে বেঞ্চে বসল।
বাতাসে হালকা শীত।
নদীর জল নীরবে বয়ে চলেছে।
অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
হঠাৎ দৃষ্টি তার ভায়োলিনের বাক্সটা খুলল।
সাবধানে ভিতর থেকে সেই পুরোনো স্কেচটা বের করল।
আদর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
এটা সেই ছবিটা—
যেটা সে একদিন দৃষ্টিকে এঁকে দিয়েছিল।
ছবিতে দৃষ্টি ভায়োলিন বাজাচ্ছে।
দৃষ্টি ছবিটার ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল,
— "আমি এতদিন এই ছবিটা দেখতে পাইনি... আজ দেখতে পাচ্ছি... কিন্তু দর্শন নেই।"
আদর ধীরে বলল,
— "কেউ কেউ চলে যায়... শুধু আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য। সে মানুষ ছিল না... তাই হয়তো মানুষ হওয়ার অর্থ আমাদের চেয়েও গভীরভাবে বুঝেছিল।"
সূর্য তখন টেমসের জলে ডুবে যাচ্ছে। হলুদ একটা পাতা স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলেছে।
দৃষ্টি আস্তে জিজ্ঞেস করল,
— "বাঁচার উত্তরাধিকার কী, আদর?"
আদর নদীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— "রক্ত নয়... প্রযুক্তিও নয়... যে নিজের সবটুকু দিয়ে অন্যের ভবিষ্যৎ বাঁচিয়ে যায়— উত্তরাধিকার তারই।"
আদর দৃষ্টির হাত ধরল। দুজনেই আকাশের দিকে তাকাল। অস্তগামী সূর্য যেন নীরবে বলে গেল—
দর্শন কখনও শেষ হয় না।
দর্শনই একদিন আদর্শ হয়ে ওঠে।
আর সেই আদর্শই হয়ে থাকে—বাঁচার উত্তরাধিকার।
দৃষ্টি অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভায়োলিনটা তুলে নিল। ধীরে ধীরে সেই পুরোনো সুর ভেসে উঠল— যে সুর একদিন দুটি ভিন্ন অস্তিত্বকে এক জীবনের বন্ধনে বেঁধেছিল।
টেমসের জল সেই সুর বয়ে নিয়ে চলল... আরও দূরে...
মনে হলো— শরতের বাতাসে কেউ যেন মৃদু হেসে বলছে—
"মিশন সম্পূর্ণ।"
আকাশের শেষ আলোটুকু ধীরে ধীরে সন্ধ্যার মধ্যে মিলিয়ে গেল। কিন্তু কিছু আলো কখনও নিভে যায় না। তারা মানুষের চোখে নয়— মানুষের হৃদয়ে, মানুষের কর্মে, মানুষের উত্তরাধিকারে বেঁচে থাকে।
সমাপ্ত।
"কিছু উত্তরাধিকার রক্তে আসে না—
4 Comments
দারুন ! দারুন ! কল্পবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান,এথিক্স ,প্রকৃতির রূপ সব মিলে জমজমাট। এটি বই আকারে প্রকাশ পাবে এই প্রত্যাশা রইল। সেই সঙ্গে ধারাটি বজায় রাখার অনুরোধ রইল।
ReplyDeleteবইয়ের পাতায় হয়তো কোনোদিন
Deleteএই গল্প পাবে ঘর,
আজকের কল্পনা, কালকের বাস্তব—
বিজ্ঞানের সেই সফর।
ধন্যবাদ নিরন্তর 🙏
একটি মহাকাব্যের সমাপ্তি হলো। মুহ্যমান। আপ্লুত। ভাষাহীন। এত কাব্যমষ ভাষায় সায়েন্স ফিকশন লেখা যায়? মনে হয় এই প্রথম। বাংলায় অবশ্যই। লেখা শেষ হলো। কিন্তু ভালোবাসার কি শেষ হয়? শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে। আবার নিশ্চয়ই লেখকের কলমে ভালোবাসা আব্দার জানাবে। রচিত হবে আর এক কাব্য। অপেক্ষায় থাকবো। অভিনন্দন কাহিনীর এমন সুন্দর emotionally explosive conclusion সৃষ্টির জন্য। 🙏🙏🙏🙏🙏🌠🌠🌠🌠🌠
ReplyDeleteশেষেরও পরে
ReplyDeleteশেষ বলেই কি সত্যিই
শেষ হয়ে যায় গল্প?
শব্দ থামে, কলম থামে,
থামে না মনের অর্ঘ্য।
একটি কাহিনি নিভে গেলে
রয়ে যায় তার আলো,
চোখের জলে, স্মৃতির ভাঁজে
ভালোবাসা জ্বালো।
আপনার এই ভালোবাসা
রইল হৃদয়জুড়ে—
শেষের পরে নতুন কোনো
কাব্য আসুক ঘুরে।
শেষ নাহি—শুধু একদিন
বদলে যায় তার ভাষা,
কলম আবার ডাকবে যখন,
ফিরে আসবে ভালোবাসা।
অনেক ধন্যবাদ।প্রণাম নেবেন।🙏