জ্বলদর্চি

দক্ষিণ আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ/মলয় সরকার


 দক্ষিণ আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ

মলয় সরকার

আমরা যারা আজ দু চারটি দেশ ভ্রমণে গিয়েই ভাবছি বিশ্বকে অনেক দেখেছি বা জেনেছি, তাদের অনেকেরই হয়ত’ জানা নেই, আজ থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আজকের প্রযুক্তির নানা সুবিধার তুলনায় সেই কালের নানা ধরণের অসুবিধার বাধা অতিক্রম করে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য মিলিয়ে প্রায় ত্রিশোর্ধ দেশে ভ্রমণ করেছিলেন, এবং তার অনেকগুলিই সরকারী কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায়। তা ছাড়া, এটা তো বুঝতেই হবে, কবিগুরুর ভ্রমণ আর যে কোন আনন্দলোভীর ভ্রমণ তো আর এক নয়। তাঁঁর ভ্রমণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে হয়েছিল নানা সাহিত্য সাংস্কৃতিক বিষয়ের আদান প্রদান, রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রীতিবন্ধনের ও পরিচিতির গণ্ডীর প্রসার।
আজ সারা পৃথিবীর, যে সমস্ত দেশে তিনি গিয়েছেন, সে সব দেশে তো বটেই, যে সমস্ত দেশে যান নি, সেখানেও তাঁর জন্য পাতা হয়েছে এক বিশিষ্ট সম্মানের আসন। সেই সঙ্গে আমাদের দেশ, ভারতও পেয়েছে সম্মানের ও শ্রদ্ধার জায়গা।

এই প্রসঙ্গে আজ আমরা আলোচনা করি, দক্ষিণ আমেরিকার সাথে তাঁর সম্পর্কের ব্যাপারে। 
🍂
একটা আশ্চর্যের কথা , তিনি সারা দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে একমাত্র, পৃথিবীর শেষপ্রান্তে আর্জেন্টিনা ছাড়া আর কোন দেশেই যেতে পারেন নি। তাও তাঁকে নিয়ে সারা লাতিন আমেরিকার কৌতুহলের অন্ত নেই। ১৯২৪ সালে পেরু সরকারের আয়াকুচো যুদ্ধের এবং স্বাধীনতার শতবার্ষিকী পালনের উৎসবে আমন্ত্রণে যাত্রা শুরু করে অসুস্থতার কারণে শেষ পর্যন্ত পেরু গিয়ে পৌঁছাতে পারেন নি।তিনি যাত্রা স্থগিত করে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এয়ারস এ আতিথ্য গ্রহণ করেন চৌঁত্রিশ বর্ষীয়া কবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কাছে। আর এই ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো তেষট্টি বছরের অসুস্থ কবিকে প্রায় দু’মাস (৫৮ দিন) নিজের কাছে স্যান ইসিদ্রো গ্রামে প্লাতা নদীর ধারে রেখে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এই দু’মাস তাঁর আর্জেন্টিনা-বাস তো এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এখানেই তিনি তাঁর পূরবী কাব্যগ্রন্থের ত্রিশটি কবিতা লিখে তাঁর ‘বিজয়া’ ভিক্টোরিয়া কে উৎসর্গ করেন। আর বিজয়া তাঁকে উৎসাহিত করেছিলেন চিত্রশিল্পের ব্যাপারে। এখানের বিস্তারিত বিবরণ, যাঁরা কবি শঙ্খ ঘোষের ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’’ বইটি পড়েছেন, তাঁরা  সমস্তটাই জানেন।
 কাজেই সে ব্যাপারে আলোচনায় যাচ্ছি না। 
ইউরোপীয়ান দেশগুলি বা প্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলির উপর তাঁর প্রভাব বা সেখানে তাঁর স্থান নিয়েও অন্যত্র আলোচনার ইচ্ছা রইল। তবে তাঁর সাহিত্য বা দর্শনের প্রভাবে যে দক্ষিণ আমেরিকার অনেকখানিই প্রভাবিত এটা বললে অত্যুক্তি হয় না। চিলি কিউবা কোস্টারিকা মেক্সিকো ইত্যাদি নানা দেশের সাহিত্যিকরা তাঁদের নিজেদের ও সাহিত্যের উপরে তাঁর প্রভাবকে অস্বীকার করেন না।  
আশ্চর্যের ব্যাপার, ভারত আর দক্ষিণ আমেরিকা দুটি জায়গার ভিতর যথেষ্ট দূরত্ব থাকা সত্বেও মানসিকতার ও দার্শনিক মিল অনেক রয়েছে। এর কারণ হিসাবে অনেকেই নানা কারণ বলেছেন।
অবশ্য রবীন্দ্রনাথ নিজে সশরীরে লাতিন আমেরিকা পৌঁছানোর অনেক আগেই তাঁর পরিচিতি ও সাহিত্য সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল স্পেনের বিখ্যাত কবি Juan Ramo'n Jimenez এর হাত ধরে।১৯১৩ সালে এই হিমেনেজ ও তাঁর ভাবী স্ত্রী জেনোবিয়া কাম্প্রুবি সদ্য নোবেল পাওয়া ‘গীতাঞ্জলি’র অনুবাদ করেন স্প্যানিশ ভাষায়। এটি লাতিন আমেরিকায় কবিগুরুর ব্যাপারে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে।
হিমেনেজের ” Platero and I “ বইটিতে রবীন্দ্রনাথের গীতিময় গদ্যের প্রভাব গভীর। রবীন্দ্রনাথের গদ্য ও নাটক, যেখানে কবিতা ও উপন্যাসের সাথে অপরিসীম ভাবে মিলে মিশে গেছে, সেই ভাবই কিন্তু এই গল্পের প্রধান ভিত্তি।
ওদিকে যে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কাছে কবি গিয়েছিলেন, সেই ওকাম্পোই তো ফরাসী কবি আন্দ্রে জিদের ১৯১৪ সালের গীতাঞ্জলির ফরাসী অনুবাদ থেকে কবির সাথে  সাক্ষাতের অনেক আগেই, কবির ব্যাপারে ভীষণ অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
আজ যদি আমরা দেখতে যাই, কেন এবং কি ভাবে রবীন্দ্রনাথ এখানে আদৃত হলেন, তাহলে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে নানা জনে নানা কথা বলেছেন।
তবে অনেকে মনে করেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ও তার পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার সমস্ত শিক্ষা সংস্কৃতিতে ইউরোপীয় প্রভাব প্রকট হয়ে ওঠে। সমস্ত দেশেই, দেশীয় প্রাচীন সংস্কৃতিকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়ে শিক্ষাদীক্ষা রীতিনীতি চালচলনে ইউরোপীয় ধারার অনুকরণ প্রবৃত্তি প্রবল হয়ে ওঠে।এতে যদিও শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে শান্তি পূর্ণতা লাভ করছিল না, তবু তাঁরা এখান থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। যদিও ১৮২৫ সালের কাছাকাছি, লাতিন আমেরিকার প্রায় সমস্ত দেশই স্বাধীনতার আলোর মুখ দেখেছিল, তবুও এক দৃঢ় ইউরোপীয়ান সংস্কৃতির প্রভাবের  ও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক মডেলের চাপে লাতিন আমেরিকা বিপর্যস্ত হয়েছিল, সেই সময়েই রবীন্দ্রনাথের শিল্প সাহিত্য ও দর্শনের ভাবধারা তাঁদের নতুন রাস্তার সন্ধান দেখায়। অনেক বড় দার্শনিকও,  যেমন আর্জেন্টিনার Domingo Sarmiento ইত্যাদিরা স্বদেশের চেয়েও বিশুদ্ধ ইউরোপীয়  সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা চাইছিলেন।মেক্সিকোর অনেকেই ইউরোপীয় মডেল ও তৃতীয় নেপোলিয়নের ফ্রান্সের অনুকরণ করে এখানে এক ক্যাথলিক রাজত্ব গড়ে তুলতে চাইছিলেন। তার ফলেই এখানে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ Maximilian of Hasburg  মেক্সিকোর সম্রাট হিসাবে বৃত হন।এর ফলে অনেকেই ইউরোপীয় সাহিত্য সংস্কৃতির অনুরক্ত হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে তাঁরা ক্রমশঃ বুঝতে পারেন, নিজের দেশের ভিতরেই  রয়েছে শিল্পের ও সংস্কৃতির মণিকোঠা এবং তার অনুশীলনেই যে তাঁদের মুক্তি এটি তাঁরা রবীন্দ্রদর্শন থেকে বুঝতে পারেন। এর ফলে তাঁরা নিজস্ব সৃষ্টির রাস্তা খুঁজে পান। তাই তাঁরা রবীন্দ্রদর্শনকে এত বেশি আশ্রয়যোগ্য বলে মনে করেন।
এমন কি, যে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বিখ্যাত আজ, তাঁর রচনার যাদু বাস্তবতার জন্য, সেই যাদুবাস্তবতার পরিচয় রবীন্দ্র সাহিত্যে অনেক আগেই তিনি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।

তরুণ সাহিত্যিকদের জন্য রবীন্দ্রপ্রতিভার অবদান খুবই বেশি।নতুন সাহিত্যিকদের কাছে রবীন্দ্র- রচনাশৈলী এক নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে। ফলে কোস্টারিকা, মেক্সিকো ইত্যাদি নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর লেখা পাঠ্য।  এছাড়া তাঁর যে শিক্ষাদান পদ্ধতি তা, সে সব দেশে যথেষ্ট গ্রাহ্য বলে বিবেচিত হয়েছে।কোস্টারিকার দার্শনিক ও চিন্তাবিদ এমা গামবোয়া ও রোবের্টো ব্রেনেস সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় রবীন্দ্রনাথের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।
চিলির পাবলো নেরুদাও খুব অল্প বয়স থেকেই রবীন্দ্রসাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। তাঁর নিজের রচনাতেও রবীন্দ্রকবিতার প্রভাব আছে। এই কথা অক্টাভিও পাজের মত সমালোচকও গভীরভাবে মনে করেন।এমনকি নেরুদার প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ রচনা ‘টোয়েন্টি লাভ পোয়েমস এণ্ড এ ডেস্পারেট সং’ এর ১৬ নম্বর কবিতা, গীতাঞ্জলীর অনুবাদ, দ্য গার্ডেনারের ৩০ নম্বর কবিতার দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত।চিলির আর এক বিখ্যাত নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল রবীন্দ্রনাথের বাছাই কবিতা সংকলন প্রকাশ করেন।শুধু তাই নয়, তিনি কবির দর্শন ও ভাবধারায় ভীষণ রকম প্রভাবিত ছিলেন।
আজ পর্যন্ত মেক্সিকো চিলি কোস্টারিকা, ব্রাজিল আর্জেন্টিনার বেশ কিছু সাহিত্যপ্রেমী মানুষের মনে রবীন্দ্রপ্রভাব বিশাল ছায়া বিস্তার করে রয়েছে তার কারণ নিশ্চয়ই আছে।শিক্ষাদান বা তাঁর দর্শন হিসাবে ভারত সম্বন্ধে এই সমস্ত দেশের কৌতুহল অবশ্যস্বীকৃত।
যদিও আজকের তরুণ প্রজন্মের কিছু সাহিত্যিকের কাছে নতুন সাহিত্যধারার প্রভাবে রবীন্দ্রদর্শনের ছায়া কিছুটা কমতির দিকে, তবুও যাঁরা গভীর ভাবে সাহিত্য ও দর্শন কিংবা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের কথা চিন্তা করেন, তাঁরা রবীন্দ্রপ্রভাবকে অস্বীকার করতে পারেন না।
আজ লাতিন আমেরিকার বহু দেশেই কবিগুরুর নামে, হয় কোন রাস্তা মূর্তি বা লাইব্রেরী, কিংবা বিশেষ ভবন ইত্যাদি স্থাপন করে কবিকএ সম্মান দেখানো হয়েছে কিংবা হয়। অনেকে তাঁর নামে ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছেন।
ভারতের একজন কবিকে সারা পৃথিবী যে সম্মানে ভূষিত করেছে, ভারত নিশ্চয়ই তার জন্য গর্বিত।

তথ্যঋণ-
১)Rabindranath Tagore and the Latin Connection - Roshmi Sinha
২) The forgotten stone: On Rabindranath Tagore and Latin America - Alfonso Chacon

Post a Comment

0 Comments