ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সুরের মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন, তা আজ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের যুগে এসে এক নতুন মাত্রায় উপনীত হয়েছে। বিশ্বায়ন মূলত একটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া হলেও এর সাংস্কৃতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং বহুমুখী। সংস্কৃতির এই আদান-প্রদানের জোয়ারে যেকোনো আঞ্চলিক সৃষ্টিই আজ বিশ্বমঞ্চে অবলীলায় পা রাখছে এবং ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সর্বজনীন হয়ে উঠছে। বাঙালির আবেগ, মনন, আধ্যাত্মিকতা ও জীবনদর্শনের শ্রেষ্ঠ নির্যাস হলো রবীন্দ্রসংগীত। বিশ্বায়নের ফলে একদিকে যেমন এই সংগীতের আন্তর্জাতিক প্রচার ও প্রসারের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, অন্যদিকে এর ভেতরের রূপকাঠামো, বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ এবং সামগ্রিক পরিবেশন শৈলীতে এসেছে ব্যাপক রূপান্তর। এই রূপান্তর ও আধুনিকীকরণ যেমন ইতিবাচক সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে, তেমনই তৈরি করেছে কিছু মৌলিক সংকট, মূল সুরের বিকৃতি এবং নান্দনিক বিতর্ক।
বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো ভৌগোলিক সীমানার সম্পূর্ণ বিলোপ সাধন। একসময় রবীন্দ্রসংগীত মূলত শান্তিনিকেতন, কলকাতা এবং সামগ্রিকভাবে দুই বাংলার বাঙালি শ্রোতাদের অন্তরের উপাসনা ও সংস্কৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি এবং ইন্টারনেটের কল্যাণে আজ রবীন্দ্রসংগীত বিশ্বজনীন রূপ ধারণ করেছে। ইউটিউব, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিক কিংবা অ্যামাজন মিউজিকের মতো বিশ্বমানের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কারণে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষ এখন এক ক্লিকেই রবীন্দ্রসংগীত শুনতে পাচ্ছেন। প্রবাসী বাঙালিরা তো বটেই, এমনকি অনেক অ-বাঙালি এবং বিদেশি শ্রোতাও এই সুরের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পশ্চিমা সংস্কৃতির বহু সংগীতানুরাগী এখন রবীন্দ্রনাথের গানের অন্তর্নিহিত দর্শনকে বোঝার চেষ্টা করছেন। অনেক বিদেশি শিল্পী, যেমন স্কটল্যান্ডের ফ্রান্সেসকা ক্যাসি বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংগীত দল এখন নিখুঁত বাংলা উচ্চারণ শিখে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করছেন। এটি সম্ভব হয়েছে কেবল বিশ্বায়নের ফলে উন্মুক্ত হওয়া তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনের কারণে।বিশ্বায়ন রবীন্দ্রসংগীতের সাঙ্গীতিক আয়োজনে এবং সুরের বিন্যাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। রবীন্দ্রনাথ নিজে কিন্তু রক্ষণশীল ছিলেন না; তিনি পশ্চিমা সংগীতের উপাদান, বিশেষ করে আইরিশ সুর বা স্কটিশ লোকগান দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বেশ কিছু কালজয়ী গান বেঁধেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, স্কটিশ লোকসংগীত ‘অল্ড ল্যাং সাইন’ এর সুরে তিনি রচনা করেছিলেন অমর গান ‘পুরানো সেই দিনের কথা’। আবার আইরিশ মেলোডির ছোঁয়ায় তিনি তৈরি করেছিলেন ‘আহা, আজি এ বসন্তে’ বা ‘যদি জানতেম আমার কিসেরও ব্যথা’র মতো গান। বিশ্বায়নের এই যুগে সেই আদান-প্রদান আরও ব্যাপক এবং গতিশীল হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী হারমোনিয়াম, এসরাজ, বাঁশি, সেতার বা তবলার গণ্ডি পেরিয়ে রবীন্দ্রসংগীতে এখন গ্র্যান্ড পিয়ানো, অ্যাকোস্টিক ও ইলেকট্রিক গিটার, ভায়োলিন, চেলো এবং আধুনিক সিন্থেসাইজারের মতো বৈশ্বিক বাদ্যযন্ত্রের সূক্ষ্ম ও নান্দনিক প্রয়োগ ঘটছে। এই আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের সংগীতায়োজন গানগুলোকে আজকের আধুনিক প্রজন্মের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলছে। বিশ্বমানের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রেকর্ডিং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রবীন্দ্রসংগীতের ধ্বনিগত মাধুর্য এক নতুন উচ্চতা লাভ করেছে, যা আন্তর্জাতিক মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সমকক্ষ হয়ে উঠেছে।
তবে বিশ্বায়নের এই প্রভাবের একটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল ও বিতর্কিত দিক হলো ‘ফিউশন’ বা মিশ্র ধারার সংগীতের ব্যাপক উদ্ভব। বর্তমান যুগের বহু তরুণ সংগীতশিল্পী এবং ব্যান্ড রবীন্দ্রসংগীতের সাথে পাশ্চাত্য পপ, রচনা, জ্যাজ, ব্লুজ কিংবা ইলেকট্রনিক ডান্স মিউজিকের মিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন ধরনের পরীক্ষা-নীতিমালা বা নিরীক্ষা করছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ গানটিকে যখন জ্যাজ বা ব্লুজ ঘরানার গিটার কর্ডের সাথে পরিবেশন করা হয়, কিংবা ‘মায়াবনবিহারিণী হরিণী’ গানটির আধুনিক রিমেক করা হয়, তখন তা তরুণ শ্রোতাদের মধ্যে এবং বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ‘আমার পরাণ যাহা চায়’ গানটির পাশ্চাত্য অর্কেস্ট্রেশন বা অ্যাকোস্টিক গিটার সংস্করণের জনপ্রিয়তাও আকাশচুম্বী। এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা রবীন্দ্রসংগীতকে সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক রাখতে সাহায্য করছে এবং বিশ্বায়িত সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে নতুন প্রজন্মকে এই গানের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।কিন্তু এই অতি-আধুনিকীকরণ এবং অন্ধ অনুকরণের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা রবীন্দ্রসংগীতের বোদ্ধা মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অনেক সময় দেখা যায়, গানের মূল সুর, তাল এবং লয়কে বাণিজ্যিক সাফল্যের খাতিরে এতটাই বদলে ফেলা হয় যে রবীন্দ্রনাথের মূল সৃষ্টিটির আত্মাই হারিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ গানটির মূল ভাব হলো আত্মতন্ময়, একাকী লড়াই এবং গভীর শান্ত সমর্পণ। এই গানটিকে যখন উচ্চ শব্দযুক্ত রক বা মেটাল মিউজিকের ড্রামস ও ইলেকট্রিক গিটারের তীব্র ঝঙ্কারে ফিউশন করা হয়, তখন গানের অন্তিম আবেদন এবং শান্ত সমাহিত ভাবটি পুরোপুরি ক্ষুণ্ন হয়। রবীন্দ্রসংগীতের মূল শক্তি তার শব্দচয়ন, কাব্যের গভীরতা এবং সুরের পরিমিতিবোধের মধ্যে নিহিত। সস্তা বাণিজ্যিক ফিউশনের চাকচিক্যে এবং চটুল রিদমের আড়ালে যখন সেই গানের কাব্যিক ভাব হারিয়ে যায়, তখন তা কেবলই এক যান্ত্রিক কোলাহলে পরিণত হয়।
বাণিজ্যিকীকরণ বিশ্বায়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, যা রবীন্দ্রসংগীতকেও গভীরভাবে গ্রাস করেছে। বর্তমানে রবীন্দ্রসংগীত কেবল আত্মিক শান্তির মাধ্যম বা সাংস্কৃতিক চর্চার অংশ নয়, এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক বিনোদন শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন রিয়েলিটি শো, করপোরেট স্পন্সরড অনুষ্ঠান, বাংলা ও চলচ্চিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এর ফলে শিল্পীদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসছে এবং গানের বৈশ্বিক প্রচার বাড়লেও, রবীন্দ্রসংগীতের যে গভীর আধ্যাত্মিক, পূজা বা প্রেম পর্যায়ের অন্তর্মুখী আবেদন ছিল, তা কিছুটা হলেও খর্ব হচ্ছে। ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’ বা ‘আকাশভরা সূর্য-তারা’র মতো গভীর ব্রহ্মসংগীত বা প্রকৃতির গান যখন চটজলদি সস্তা স্যুভেনির হিসেবে বাজারে বিক্রি হয়, তখন তার নান্দনিক মূল্য সংকটের মুখে পড়ে। সুরের গভীরতার চেয়ে পরিবেশনার বাহ্যিক চাকচিক্য এবং চটজলদি ভিউ বা লাইক পাওয়ার প্রতিযোগিতা আজ অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।বিশ্বায়নের ফলে রবীন্দ্রসংগীতের ঐতিহ্যগত ধারা বা ‘ঘারানা’ রক্ষার ক্ষেত্রেও এক বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশ্বায়িত সংস্কৃতির প্রভাবে আধুনিক শ্রোতা ও শিল্পীদের ধৈর্য ও ধ্রুপদী তাল-লয়ের প্রতি nesting বা নিষ্ঠা কমে আসছে। শান্তিনিকেতনি ধারা বা পঙ্কজ মল্লিক, দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্রদের তৈরি করা যে শুদ্ধ গায়নশৈলী—তা আজ অনেকটাই পরিবর্তনের মুখে। আধুনিক ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের অতি-ব্যবহারে অনেক সময় শিল্পীর স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর ও গায়কী ঢাকা পড়ে যায়। তবে এর উল্টো পিঠে, বিশ্বায়নই আবার এই আদি রেকর্ডগুলোকে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করার সুযোগ করে দিয়েছে, যার ফলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের গবেষক বা শিক্ষার্থী এখন রবীন্দ্রসংগীতের আদি ও অকৃত্রিম রূপটি নিয়ে চর্চা করতে পারছেন।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বায়ন রবীন্দ্রসংগীতের সামনে একটি দ্বিধারী তলোয়ারের মতো উপস্থিত হয়েছে। এটি একদিকে যেমন রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সৃষ্টিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে মর্যাদা দিয়েছে এবং আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধনে একে নতুন এক বৈশ্বিক রূপ দিয়েছে; অন্যদিকে মূল সুরের বিকৃতি, সস্তা জনপ্রিয়তা এবং অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিকীকরণের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজে কখনোই কূপমণ্ডূক বা অনুদার মানসিকতার মানুষ ছিলেন না। তিনি বিশ্বসংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ উপাদানগুলোকে অত্যন্ত সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন এবং নিজের সৃষ্টিতে তার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। তাই বিশ্বায়নের এই যুগে রবীন্দ্রসংগীতকে কোনো বদ্ধ খাঁচায় বন্দি করে রাখার চেষ্টা যেমন অবান্তর ও প্রগতিবিরোধী, তেমনই আধুনিকতার নামে এর মূল সত্ত্বা, ব্যাকরণ ও আত্মাকে ধ্বংস করে দেওয়াও কোনোভাবেই কাম্য নয়। রবীন্দ্রসংগীতের আদি ঐতিহ্য, শুদ্ধ সুর এবং গভীর ভাবধারাকে হৃদয়ে অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রযুক্তি, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের পরিমিত ব্যবহার এবং প্রচারের মাধ্যমগুলোকে বুদ্ধিদীপ্তভাবে ব্যবহার করাই হবে বর্তমান প্রজন্মের প্রকৃত বিচক্ষণতা। তবেই বিশ্বায়নের উত্তাল জোয়ারে ভেসে না গিয়ে রবীন্দ্রসংগীত বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব স্বকীয়তা ও স্বমহিমায় চিরকাল টিকে থাকবে এবং বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করবে।
গ্রন্থ ঋণ :
চক্রবর্তী, সুধীর। বিশ্বপথিক রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর গান। কলকাতা: পুস্তক বিপণি।
সেন, সমীরণ। বিশ্বায়নের আঙিনায় রবীন্দ্রসংগীত। কলকাতা: দে'জ পাবলিশিং।
চৌধুরী, সুপ্রিয়। রবীন্দ্রসংগীত: ঐতিহ্য ও আধুনিকতা। কলকাতা: সিগনেট প্রেস।
বন্দ্যোপাধ্যায়, কনক। রবীন্দ্রসঙ্গীতের নান্দনিক রূপরেখা। কলকাতা: এ মুখার্জি অ্যান্ড কোং।
0 Comments