মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২২৬
গুরুচরণ খাটুয়া (কবি, প্রধান শিক্ষক, হাউর)
ভাস্করব্রত পতি
প্রত্যন্ত এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেঁয়ো শিক্ষক তিনি। 'আসি যাই মাইনে পাই' সুলভ শিক্ষকতা তাঁর সিলেবাসে কস্মিনকালেও ছিল না। শিক্ষকতা তাঁর কাছে নিছক পেশা নয়। একপ্রকার ব্রত। একপ্রকার দায়িত্বপালন। একপ্রকার কর্তব্যবোধের সফল রূপায়ণ। পাঁশকুড়ার শিক্ষক কবি গুরুচরণ খাটুয়া আজ অবসরকালীন জীবনেও সেই আলোকবর্তিকা বহন করে চলেছেন নীরবে।
শিক্ষাস্বার্থে এক হাতে যেমন বেত তুলে নিতে পারতেন, তেমনি অন্য ধরনের সামাজিক শিক্ষার প্রসারে হাতে কলমও তুলে নিতেন নিজের খেয়ালে। সবুজ মাঠ, বাঁশের ঝাড়, তালগাছের সারি, এঁদো পুকুর, লুকোচুরি খেলার জগতে তাঁর যাওয়া আসা। ছোটদের সাথে নিত্যদিনের খুনসুটির আড়ালে নিজের মনটাও ছুটে যেত পাখপাখালির সাথে সখ্যতা বানাতে। মনের গভীরে কল্পনার জগত হয়ে উঠতো উড়নচণ্ডী ভাবুক প্রকৃতির। সেইসব নির্যাস কলমের আঁচড়ে কালো অক্ষরে স্থান পেতো সাদা কাগজের বুকে। লেখালেখিতে ছোটদের উৎসাহিত করতে তাঁর উদ্যোগ অবশেষে পূর্ণতা পেলো লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের মাধ্যমে। আলোর ছটায় আলোকিত করতে সফল হয়েছেন নিজস্ব ভাবনার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
লেখালেখিতে ছোটদের উৎসাহিত করতে প্রকাশ করেছেন লিটল ম্যাগাজিন 'আলোর ছটা'
১৯৫৩ এর ৩ রা মার্চ পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার কালুখাঁড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গুরুচরণ খাটুয়া। বাবা সত্যেশ্বর খাটুয়া এবং মা গঙ্গারাণী খাটুয়ার প্রথম সন্তান। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর জুনিয়র বেসিক ট্রেনিং করেন শিক্ষকতার চাকরির নেশায়। ১৯৭৬ এর ৬ ই ডিসেম্বর প্রথম চাকরিতে যোগদান করেন পিংলার গোপীনাথপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে প্রায় চার বছর চাকরির পর ১৯৮০ এর ৩ রা এপ্রিল কুমরপুর হটেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরূপে যোগদান করেন। তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন অমূল্য চরণ ঘোড়াই। আর ছিলেন পলাশকান্তি বেরা। এই তিনজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের সম্মিলিত সহায়তায় বিদ্যালয়টি উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। এখানেই পরবর্তীতে প্রধানশিক্ষক পদে নিযুক্ত হন। ২০১৩ তে অবসরের সময় পর্যন্ত এখানে তিনি শিক্ষার এক আলাদা পরিবেশ রচনা করেছেন। যা আজও বজায় রয়েছে।
স্কুলে পড়াতে পড়াতে ছোটদের কথা ভেবেই সম্পাদনা করেছেন 'আলোর ছটা' (প্রথম প্রকাশ, অক্টোবর, ২০১১) লিটল ম্যাগাজিনের। বহু ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছে এই ম্যাগাজিনেই। প্রথম সংখ্যা প্রকাশের পর 'আলোর ছটা'র প্রকাশিত হয়েছে দ্বিতীয় সংখ্যা (অক্টোবর, ২০১২), তৃতীয় সংখ্যা (২৫ শে মে, ২০১৩), চতুর্থ সংখ্যা (অক্টোবর, ২০১৩), পঞ্চম সংখ্যা (নভেম্বর, ২০১৪), ষষ্ঠ সংখ্যা (অক্টোবর, ২০১৫), সপ্তম সংখ্যা (অক্টোবর, ২০১৬), অষ্টম সংখ্যা (অক্টোবর, ২০১৭) এবং নবম সংখ্যা (অক্টোবর, ২০১৮) রূপে। প্রতিটি সংখ্যাই ছিল অপরিচিত, অনামা, অখ্যাতদের কাছে সাহিত্যচর্চার অন্যতম সোপানস্বরূপ।
লিটল ম্যাগাজিন ছাড়াও নিজের লেখা কবিতা, ছড়া প্রকাশ করেছেন পুস্তক আকারে। শিশুবান্ধব সেইসব ছড়া হয়ে উঠেছে কচি মুখের বোল। কবি গুরুচরণ খাটুয়া লিখেছেন 'জীবনছন্দে' (দীপাবলি, ১৪১৮), কুরুক্ষেত্র (২ রা জুন, ২০১৯) এবং মামদোবাজি (অক্টোবর, ২০২৬)। তাঁর লেখা মনটা দোলে, ক্ষীরাই নদী, শুভেচ্ছা, হারিয়ে যেতে, বাদল দিনে, দীঘির কথা, ফিঙে, কাকের মেলা, বই, স্বপ্ন, বায়ূদূষন, আজব কাণ্ড, ভাঙাগড়া ছড়াগুলি ছন্দের আলিঙ্গনে সকলকে নিয়ে যায় এক অনাস্বাদিত জগতে। এখানেই তাঁর স্বার্থকতা। নিরলস সাহিত্য কীর্তির জন্য পেয়েছেন ড. সমরেন্দ্রনাথ বর্দ্ধন স্মৃতি সম্মান।
এখন বিশিষ্ট ব্যাকরণবিদ শিক্ষক কালীপদ চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত 'গ্রন্থলোক' পাঠাগারে আয়োজিত দৃশ্য শ্রাব্য মাধ্যমে পঠনপাঠনে নিয়মিত ক্লাস নেন নানা বিষয়ের। সেইসাথে তিনি হাউর সাহিত্য পাঠচক্রের অন্যতম আহ্বায়ক। জেলা এবং জেলার বাইরে থেকে প্রকাশিত বহু লিটল ম্যাগাজিন মরশুমি, জন্মভূমি, পুণ্যিপুকুর, সৌতি, বালিভূমি, পূর্বাচল, সংগ্রামী হাতিয়ার পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। মেদিনীপুরের বুকে এহেন 'মানুষ রতন'টি আজ অবসরগ্রহণের পরেও সমানভাবে জারি রেখেছেন সাহিত্যসেবা। আর কলমের ডোগায় লেখা লিখতে উৎসাহিত করেন অন্যদের।
🍂
0 Comments