জ্বলদর্চি

কেন লিখি/সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ



কেন লিখি

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ


প্রশ্নটার সঙ্গে আপাতদৃষ্টে একটা উত্তর জড়িয়ে আছে 'লেখা-পড়া' এই শব্দবন্ধে। বাংলা বাগধারাতে এই একটা স্বতঃসিদ্ধ উক্তি। লিখতে হলে পড়তে হয়। কিংবা আরও তীক্ষ্ণ  করে বললে মোদ্দা কথাটা দাঁড়ায় লেখা ও পড়া এ দুটোকে পৃথক করাই যায় না। এরা অচ্ছেদ্য। 

এবার আসছি নিজের দিকে। সোজা কথায়: আমি পড়েছিলাম বা অনেক পড়েছি এবং পড়ি বলেই লেখার আখড়ায় আমার বসবাস। এ তো আমার দিক থেকে পড়ারই প্রতিক্রিয়া। হ্যাঁ, যাঁরা লিখেছেন বা লেখেন, তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ারও সাধ। সেই সুদূর অতীতে বাল্যদশায় 'বেড়ালঠাকুরঝি', 'টুনটনি'-র বই এইসব পড়েই না আমার মনে হয়েছিল আমিও এরকম গল্প লিখতে পারি। সেই ইচ্ছে আর সাধ বয়স বাড়তে বাড়তে আমাকে লেখালেখির যুদ্ধে নামিয়েছিল। এই প্রবীণ বয়সেও লড়াইটা থেকে সরে দাঁড়াতে পারছি না। কারণ সরে দাঁড়ালেই লেখক-আমি-র মৃত্যু এবং সেই মৃত্যু আমার কাছে দুঃসহ হবে।

কিন্তু শুধু লিখে গেলেই তো হয় না। আমি যা লিখছি, তা কেউ পড়ছে কি না, সে দিকেও লক্ষ্য রাখতে হয়। এইসব লেখার সঙ্গে অন্যের পড়াও জড়িয়ে আছে। তাই লেখকের পক্ষে এ-ও জানা দরকার, শুধু অন্যের পড়া নয় তারিফও চাই। তারিফ এলে লেখার জোয়ার আসে। খুলে বলতে দ্বিধা নেই। এখন আমার ঘরভরতি হাজার লেখকের হাজার বই এবং তাঁদের মধ্যে আমারও লেখা বই অন্তত শ'তিনেক! সুদূর বাল্যে এটাই হয়তো মনের কোণে ইচ্ছে হয়ে লুকিয়ে ছিল। পরের কথা পরে। এখন তো আছি। মৃত্যুর পর আমি থাকছি না। অতএব তখন আমার এই শ'তিনেক থাকল কি না থাকল, কিছু যায়-আসে না। বাদবাকি হাজার তো থেকেই যাবে।

তো এ সব হ'ল সাদাসিধে হিসেব। উপর-উপর দেখা। আড়ালের দিকে এ বয়সে দৃষ্টিপাত করে চমকে উঠি। আবছায়ার মতো ভেসে আসে টুকরো-টুকরো কী সব কথা! বিস্ময়কর কথার ঝাঁক মাছের ঝাঁকের মতো ভেসে উঠেই তলিয়ে যায়। দিনের পর দিন রাতের পর রাত তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রেখে জানতে পেরেছি, আমার অগোচরে একটা জোরালো আকাঙ্ক্ষা প্ররোচিত করেছিল। যা সব দেখেছি-দেখছি, জেনেছি-জানছি, তাতে বুঝতে পেরেছিলাম, এই সমাজ এই পৃথিবী বড়ো অবাঞ্ছিত। বড়ো কষ্টকর। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির কণ্ঠস্বর শুনেছি। মানুষের জীবনে বৃক্ষের মতো ঊর্ধ্বগামিতা চায় সে। চায় নদীর মতো মানুষও বহতা হোক। বাঁধ বাঁধলেই বিপুল ধারা চারদিকে ছড়িয়ে সর্বনাশী হবে নদী। বৃক্ষের তলায় আরেক বৃক্ষ উঠতে চাইলে তার উত্থান ব্যর্থ হবে। তার মানে, প্রাকৃতিক স্বাধীনতা আমি চিনেছিলাম। সেই স্বাধীনতা মানুষের জীবনে ব্যপ্ত না হলে সব সভ্যতা ব্যর্থ। তাই মানুষের সমাজ বদলানো দরকার। কার্ল মার্ক্সের সেই আর্ষবাক্য মনে বারবার ভেসে এসেছে: 'দার্শনিকরা এ যাবৎকাল পৃথিবীর ব্যাখ্যাই করেছেন। এখন মোদ্দা কথাটা হ'ল, কী করে একে বদলানো যায়।' একজন লেখকও তো প্রকৃত প্রস্তাবে একজন দার্শনিক।

কিন্তু একজন লেখক হয়ে আমি ওই দায়িত্ব কেমন করে পালন করতে পারব? নিজের মনের ভিতরেই উত্তর ভেসে এসেছে। যে দর্জি সৈনিকের জামা সেলাই করছে, এমন কি যে সেই জামার বোতামঘর সেলাই করছে, তারাও পরোক্ষে যুদ্ধের আড়ালে সৈনিকের ভূমিকাও পালন করছে। একজন লেখক অবশ্যই শিল্পের প্রতি গোড়াতেই দায়বদ্ধ। সেই দায় মেনেও তো তিনি সমাজ বদলানোর যুদ্ধের সৈনিক হতে পারেন। শিল্পের দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতাও অচ্ছেদ্য বলে বিশ্বাস করি।

এ যাবৎকাল সব মহৎ লেখক সব শ্রেষ্ঠ লেখক আমার বিচারে নিজের অলক্ষ্যে এই দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকরাও কেউ প্রত্যক্ষ কেউ পরোক্ষে তা-ই করেছেন। একজন লেখক হিসেবে এতদিন পর টের পেয়েছি, আমি কেন লিখি। এই জঘন্য পৃথিবী বদলানোর তীব্র ইচ্ছা আমার অবচেতনায় আলপিনের মতো বিদ্ধ করে বলেই আমি লিখি।

সেপ্টেম্বর ২০১২ 
(কেন লিখি বিশেষ সংখ্যা)
🍂

Post a Comment

0 Comments