জ্বলদর্চি

কেন লিখি /গুরুপদ মুখোপাধ্যায়

কেন লিখি 

গুরুপদ মুখোপাধ্যায় 


কেন লিখি? নিজের তাগিদে না অন্যকিছু। আমি কি লিখি?না লেখা আমাকে লিখে। আমার সুখ -দুঃখ, হাসি-কান্না, জীবন হতাশা, শূন্যতা,জীবনদর্শন, ব্যক্তি আমি সব। এছাড়াও আমার মধ্যে অনেক আমিকে খুঁজে চলে সবসময়। একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে যখন সমাজের অন্যের প্রতি বঞ্চনা, শোষণ, দমন, নিপীড়ন দেখি, তখন  মনে মনে অস্থির হয়ে উঠি।মনের মধ্যে অক্ষরেরা কিলবিল করতে থাকে।আর সেই লেখার অন্তরালে লেখনী তাকে লিখতে থাকে।

অনেকেই লিখছেন। কিন্তু কেন লিখেন! মনের শূন্য স্পেসটাকে ভরাট করার জন্য। হয়তো হ্যাঁ। আবার হয়তো না। সাহিত্য নির্মল আনন্দ দেয়। হয়তো সেই জন্য আমি লিখি। কিন্তু লিখলে কি সমাজে অন্যায় অবিচার বন্ধ হয়। হয়তো না। কিন্তু একটা ঘূর্ণি (হুপোল) ওঠে।এই আলোড়ন কিছুটা হলেও জনমানসে একাত্মতা অনুভব করে। লেখকেরা সেই কাজটা করে থাকেন।

আমি লিখতে বসে কী ভাবি।১-জীবনসত্য,২-শিল্পের সত্য,৩-জীবন দর্শন,৪-সমাজ ও রাজনীতি,৬-অভিমুখ। পন্ডিত মহলে বিতর্ক রয়েছে শিল্প শিল্পের জন্য না শিল্প মানুষের জন্য।এ নিয়ে নানান মুনির নানা মত।
কিন্তু আমার মতে   শিল্প যে জন্যই রচিত হোকনা কেন, তাকে যুগোত্তীর্ণ শিল্প হতে হবে। এছাড়া তাকে অলংকার শাস্ত্রের 'বাক্যং রসাত্মকং বাক্যং'শর্ত রক্ষা করতে হবে।আগে রচনাকে শিল্প হয়ে উঠতে হবে।তারপর শিল্প কার জন্য তা নির্ধারিত হবে। নাজিম হিকমত বলেছেন,'সেই শিল্প সত্যি কারের শিল্প যা জীবন সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা দেয় না'।

আমি প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলার ছেলে।শিলাই-এর পাড়ে বাস।গ্রীষ্মে দেখেছি তার বিধ্বস্ত রূপ, বর্ষায় সে প্রলয়ংকরী, আবার কখনো অভিসারিকা,শরতে উদাসী, উদ্ভিন্ন যৌবনা, হেমন্তে অভিমানীনি বঁধু,বিরহী,শীতে যৌনকাতর, বসন্তে যৌবনের ষোড়শী দয়িতা। আমার গ্রাম আম জাম কাঁঠাল অর্জুন শিমুল,হিজল কুল সেঁকুল আলু ধান তিল সব্জি ঘেরা এক অখ্যাত শান্ত জনপদ।কাদা নেই ।বালি রাস্তায় হাঁটি আজো। গ্রামের নাম দেউলবেড়িয়া। অনেক দেবতার আবাসস্থল ছিল বলে গ্রামের নাম দেউলবেড়িয়া।যা আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত।শিক্ষিত একশো শতাংশ। শিক্ষক অধ্যাপক কেরানী ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার কৃষক ও কবি সব আছে এই গ্রামে। আমি ১৯৭৮ ও ১৯৮৫'র বিধ্বংসী বন্যা দেখেছি।এই ভয়ঙ্কর জীবন সংগ্রাম আমাকে লেখার  রসদ জুগিয়েছে। ছাত্রজীবনে আমার প্রথম লেখা গল্প 'আঠাত্তরের একটি রাত'।১৯৭৮ সালে লেখা।"শ্রী মোহিনী"পত্রিকায় প্রকাশিত।লেখার মাধ্যমে চেয়েছি গ্রাম বাংলার এই অবহেলিত রূপকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জলসাঘরের নকল রূপকথা লেখা মহানগরের রূপকারদের কাছে পৌঁছে দিতে।
🍂
আমি গ্রাম বাংলার প্রান্তিক মানুষের জন্য লিখি।খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের কথা লিখি। মহানগরের বাবুদের কল্পনার নকল কিচিরমিচির নয়। সামনে থেকে দেখা সংগ্রামময় জীবনের কথা বলি।যে কথা প্রতি প্রশ্বাসে নিঃশ্বাসে বলে চলেছেন গ্রাম বাংলা ও মফস্বল শহরের প্রান্তিক কবিরা। আমি প্রান্তিক কবিদের জন্য লিখি। গ্রাম বাংলার  ও প্রান্তিক শহরের অবহেলিত সাহিত্যকে নিয়ে লিখি। আমি তথাকথিত মহানগরের উগ্র পারফিউম মেখে সাহিত্যচর্চা করিনা। আমার রচনায় ঘামের গন্ধ পাবেন। আমি গ্রাম বাংলার কবি সাহিত্যিকদের ঘামের গন্ধে কবিতা লিখি, প্রবন্ধ লিখি, গল্প লিখি। মহানগরের বাবুদের মতো পানা পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে দেখিনা কতটা গভীর।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,"দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া/একটি ধানের শিসের উপরে/একটি শিশিরবিন্দু"।তাই আমার কবি জীবনে অবহেলায় পড়ে থাকা টুকরো টুকরো ছবির মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজি। শুধু রোমান্স নয়, হৃদয়ের গভীরে অশান্ত গলিত লাভার মত সত্যের উন্মোচন হতে থাকে। হাতড়াতে থাকি অপার বিস্ময়।শিল্প ও জীবন সত্যের পালকগুলি খুলে দেখতে থাকি। কবিতা এক অনির্বচনীয় পরশ ও প্রশ্বাস। যেখানে নিঃশ্বাসের প্রহারে কাঁপতে শুরু করে শব্দ ব্রহ্ম।

ইতিহাস পুরাণ মিথ প্রেম,হতাশা প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে আত্ম উন্মোচনের মাধ্যমে আত্মানুসন্ধানের জগতে ঢাকা পর্দাগুলির অবগুণ্ঠন সরে যেতে থাকে। কবিতা সত্যের পূজারী। কবিতা সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য এক অদম্য লড়াই চালাতে থাকে। আমি কবিতায় ছবি আঁকি। ছবির মধ্য দিয়ে সমাজে জারিত লীনজাত উত্তাপের সন্ধান করি। যেখানে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনার পরতে পরতে সমকালের পদধ্বনি ধাবিত হয় চিরকালীন মাধুর্যের দিকে। আমি আগুনে বসে আলো দেখি।এজরা পাউন্ড,ইয়েটস, জীবনানন্দ কবিতায় ছবি আঁকতেন। ছবিতে মুখগুলি হয়ে ওঠে জীবনের প্রতিধ্বনির প্রতিভাস,সুর ও স্বর।

দর্পণে ছায়া পড়ে। কবিতাও সেই মানসলোকে ছায়া বেষ্টিত এক প্রতিফলনের প্রতিবিম্ব রূপ। সেই অধরা সত্যের সন্ধানে আমি পথ হাঁটি। কিন্তু হাজার বছর অতিক্রান্ত হলেও পথ অধরা থেকে যায়। কবি বীজ। কবিতা নতুন কিশলয়।বীজ মাটির গভীরে থেকে কবিতার শিকড় প্রোথিত করে অক্ষরে অক্ষরে।

Post a Comment

0 Comments