পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী
ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যে যখন এক নতুন যুগের সূচনা হচ্ছিল, ঠিক তখনই বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এক নতুন নক্ষত্র হিসেবে উদয় হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় ছোটগল্পের যে আধুনিক রূপ আমরা দেখি, তার অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন মার্কিন লেখক ও কবি এডগার অ্যালেন পো। ১৮৩০ থেকে ১৮৪০-এর দশকে তাঁর হাত ধরেই মূলত আধুনিক ছোটগল্পের কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হয়। এডগার অ্যালেন পো-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি ছোটগল্পের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও ব্যাকরণ তৈরি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একটি আদর্শ ছোটগল্প এমন হওয়া উচিত যা পাঠক এক পাঠে শেষ করতে পারবেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, গল্পের প্রথম বাক্য থেকে শেষ বাক্য পর্যন্ত প্রতিটি শব্দের লক্ষ্য থাকবে পাঠকের মনে একটি নির্দিষ্ট আবেগ বা একক প্রভাব তৈরি করা। বিশ্বসাহিত্যে তাঁর হাত ধরে যখন সার্থক ছোটগল্পের বিকাশ ঘটছে, তখনই সমসাময়িককালে বাংলা সাহিত্যে সেই ধারার সফল সূত্রপাত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর লেখনীর জাদুতে বাংলা ছোটগল্প অবয়ব পেয়েছিল, লাভ করেছিল বিশ্বমানের মর্যাদা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন তাঁর প্রথম গল্প ‘ভিখারিনী’ রচনা করেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ষোলো বছর। ১২৮৪ বঙ্গাব্দের ‘ভারতী’ পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়। কিশোর বয়সের এই সৃজনে কাহিনীর বিস্তার এবং আবেগেরই আধিক্য দেখা গিয়েছিল। ছোটগল্পের যে মূল বৈশিষ্ট্য— আঁটসাঁট বাঁধুনি, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা বা নাটকীয় সমাপ্তি—সেগুলো এই গল্পে পুরোপুরি ছিল না। তাই ‘ভিখারিনী’কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম গল্প বলা হলেও, একে ‘প্রথম সার্থক ছোটগল্প’ বলা যায় না। এটি ছিল বাংলা ছোটগল্পের এক সোনালী অঙ্কুরোদগম।
পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের গল্প রচনার হাত আরও উন্নত হয়। ১২৯৮ বঙ্গাব্দে ‘হিতবাদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর অনন্য সৃষ্টি ‘দেনা-পাওনা’। কাঠামোগত নিপুণতা, সমাজ বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিফলন এবং ছোটগল্পের চিরন্তন বৈশিষ্ট্যের বিচারে এটিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্পের মর্যাদা পেয়েছিল। গল্পের মূল উপজীব্য ছিল তৎকালীন সমাজের এক জ্বলন্ত সমস্যা—যৌতুক প্রথা। ‘নিরুপমা’ নামের এক ভাগ্যহীনা মেয়ের জীবনের করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের নির্মম মানসিকতাকে তুলে ধরেছিলেন। গল্পটির ভাষা ছিল মেদহীন, গতি ছিল সাবলীল এবং এর সমাপ্তি ছিল অত্যন্ত নাটকীয় ও মর্মস্পর্শী।
🍂
রবীন্দ্রনাথের এক অনবদ্য সৃষ্টি তার ‘ছুটি’ গল্পটি। তেরো, চৌদ্দ বছর বয়সে একজন কিশোরের মানসিক টানাপোড়েন এবং তাকে নিয়ে সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গল্পটির মূল উপজীব্য। ফটিক সম্পর্কে লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সংগসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগলভতা।’ কাবুলীওয়ালা’ গল্পে পরিবার-পরিজন থেকে বহুদূরে ব্যবসা করতে এসে এক কাবুলীওয়ালা মমতার বন্ধনে জড়িয়ে যায় তারই কন্যাসম মেয়ে মিনির সঙ্গে। দীর্ঘ কারাবাস থেকে বেরিয়ে সে ছোট্ট মিনিকে দেখতে ছুটে আসে। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে রতন ও পোস্টমাস্টারের মধ্যেও তৈরি হয় এক মায়ার সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ তার সাবলীল রচনা কৌশলে এভাবেই মানুষের মানবিক দিকটি তুলে ধরেছিলেন। একই সাথে নারীর প্রতি সমাজের অবিচার, অন্যায়ের বিরূদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন তার সাহিত্যে। ‘হৈমন্তী’, ‘দেনা পাওনা’ গল্পে উঠে এসেছিল পণপ্রথার ভয়াবহ চিত্র। ‘
তবে, তাঁর ছোটগল্পে শুধু মানুষ বা সমাজের কথাই উঠে আসেনি, বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রথম লেখক যিনি মানুষ ও প্রকৃতির চিরন্তন সম্পর্কটিকেও ছোটগল্পের মূল উপজীব্য করে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা কিছুটা বিকশিত হলেও, ছোটগল্পে মানুষ ও প্রকৃতির এই নিবিড়, আত্মিক এবং মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন একেবারেই অনুপস্থিত ছিল।
তাঁর গল্পে প্রকৃতি কেবল কোনো জড় পটভূমি বা দৃশ্যপট ছিল না , সেটি ছিল এক জীবন্ত চরিত্র, যা মানুষের আনন্দ-বেদনা, আশা- আকাঙ্ক্ষা এবং মনস্তত্ত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে জমিদারির কাজে পদ্মাপাড়ের শিলাইদহ, পতিসর ও সাজাদপুরে থাকার সময় গ্রামীণ বাংলার যে রূপ তিনি দেখেছিলেন, তা-ই তাঁর গল্পগুচ্ছের প্রাণ হয়ে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন জমিদার পরিবারের সন্তান।কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির চার দেওয়ালে এবং শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাথমিক ভাবনার জগৎ গড়ে উঠেছিল প্রধানত কাব্য, মননশীল চিন্তা ও গীতি-
আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। অন্তর্মুখী সেই সৃজনশীলতায় ছিল রোমান্টিকতার প্রাচুর্য।
১৮৮৯ - ৯০ সালের দিকে যখন তাঁর ওপর পৈতৃক জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব অর্পিত হয়, তখন তাঁর জীবন ও সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব বাঁক আসে। জমিদারি পরিচালনার সূত্রে নদীমাতৃক তৎকালীন
পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ও বসবাস শুরু হয়। এই ভ্রমণ ও প্রবাসজীবন কবিকে চেনা নাগরিক বলয় থেকে বের করে সম্পূর্ণ এক নতুন ও অকৃত্রিম জগতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। পদ্মাপাড়ের গ্রামীণ মানুষের সরলতা, দারিদ্র্য, সুখ-দুঃখ এবং গ্রামীণ সমাজের নানা সংস্কার কবিকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ড্রয়িংরুমের কাল্পনিক জগত ছেড়ে তিনি মাটির কাছাকাছি মানুষের বাস্তব জীবনকে উপলব্ধি করেন। শিলাইদহে বোটে বসেই তিনি লিখেছিলেন একের পর এক কালজয়ী ছোটগল্প । 'পোস্টমাস্টার', 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন', 'ছুটি', 'অতিথি' বা 'সুভা'র মতো বিশ্বমানের গল্পগুলোর মূল উপাদান ও চরিত্র তিনি এই গ্রামীণ পরিবেশ থেকেই সংগ্রহ করেছিলেন। নাগরিক জীবনের কৃত্রিমতা পেরিয়ে এখানে এসে তিনি প্রকৃতির এক বিশাল ও জীবন্ত রূপ দেখতে পান। নদী, চরের দিগন্তবিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপ, বর্ষার মেঘ আর শরতের আলো-ছায়া তাঁর গল্প ও কবিতায় মানুষের সুখ-দুঃখের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম, উত্তাল পদ্মার সৌন্দর্য, সুবিশাল আকাশ তার কল্পনাপ্রবণ মনকে আলোড়িত করে। বলা যায়, শিলাইদহ - শাহজাদপুর -পতিসরের এই কালপর্বটিই নাগরিক কবি রবীন্দ্রনাথকে সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনার সাথী এবং বাংলা ছোটগল্পের সার্থক জনক রূপে পুনর্জন্ম দিয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের গল্পে মানুষের ভেতরের অব্যক্ত কথা বা আবেগ প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতি। মানুষের সুখের দিনে প্রকৃতি যেমন আলোয় ঝলমল করে, তেমনি দুঃখের দিনে তা বিষণ্ণতায় ডুবে যায়। তাঁর 'পোস্টমাস্টার ' গল্পে রতন ও পোস্টমাস্টারের বিচ্ছেদের বেদনার সাথে বর্ষার একটি একাত্মতার ছবি দেখা যায়। পোস্টমাস্টার যখন নৌকা করে চলে যাচ্ছেন, তখন বর্ষার স্ফীত নদী যেন রতনের চোখের জলের মতোই এক অবাধ্য কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘... এবং নদীপ্রবাহে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এ তত্ত্বের উদয় হইল, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী। পৃথিবীতে কে কাহার?’
আবার, 'মেঘ ও রৌদ্র' গল্পে মানুষের জীবনের উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখের খেলাকে প্রকৃতির মেঘ আর রোদের লুকোচুরির সাথে তুলনা করেছিলেন তিনি।'মধ্যবর্তিনী’ গল্পের দেখা যায় হরসুন্দরী যখন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে যায়, তখন জানালা দিয়ে নিচের গাছপালা, বাগানের সৌন্দর্য দেখে সে অভীভূত হয়ে ওঠে। প্রাত্যহিক কাজের ব্যস্ততায় যে সৌন্দর্য আগে তার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল, সেই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য তার মনকে সতেজ করে তোলে।
রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের ছোটগল্পগুলো অনেকাংশেই পল্লীজীবনকেন্দ্রিক।
‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প’ গ্রন্থে শ্রী প্রমথনাথ বিশী লিখেছেন, ‘পল্লীবঙ্গই তাঁহার ছোটগল্পের যথার্থ ক্ষেত্র। যে সময় হইতে তিনি নিয়মিত ছোটগল্প লিখিতে আরম্ভ করিলেন,তখন হইতেই পল্লীবঙ্গেরও সহিত তাঁহার স্থায়ী পরিচয়ের সূত্রপাত।’
আমরাও দেখতে পাই, তাঁর বেশ কিছু গল্পের চরিত্রে মানুষের চেয়ে প্রকৃতির প্রভাব ছিল অনেক বেশি স্পষ্ট। শহর বা সমাজ থেকে দূরে থাকা এই চরিত্রগুলো প্রকৃতির বুকেই নিজেদের খুঁজে পেয়েছিল। যেমন 'সুভা' গল্পটি। বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ে সুভার কোনো মানুষের বন্ধু ছিল না, কিন্তু প্রকৃতির সাথে তার ছিল গভীর মিতালী। নদীর কলতান, পাখির ডাক, পাতার মর্মর ধ্বনি যেন সুভার না বলা কথার ভাষা হয়ে উঠেছিল। সমাজ তাকে না বুঝলেও, বিশাল প্রকৃতি তাকে মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছিল। 'অতিথি' গল্পের তারাপদ ছিল এক চির-উদাসীন মুক্ত বিহঙ্গ। প্রকৃতির অমোঘ আকর্ষণ তাকে বারবার ঘরছাড়া করেছে। কোনো মানবিক বন্ধন বা বৈষয়িক সুখ তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি, কারণ সে ছিল প্রকৃতিরই সন্তান।
রবীন্দ্রনাথ কেবল প্রকৃতির শান্ত রূপই আঁকেননি, এর রহস্যময় ও আদিম রূপটিকেও ফুটিয়ে তুলেছেন। 'ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পে আমরা দেখি শুষ্ক নদীখাত, নির্জন প্রাসাদ আর বাতাসের হাহাকার মিলে এক মায়াবী, অতিপ্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যা মানুষের অবদমিত বাসনাকে জাগিয়ে তোলে। আবার, 'সবুজপত্র’ বা ‘গল্পগুচ্ছ’-এর বহু গল্পে পদ্মা নদী এক প্রলয়ঙ্করী অথচ মমতাময়ী রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে, যা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেয়।রবীন্দ্রনাথের গল্পে বারবার গ্রামীণ অকৃত্রিম প্রকৃতির সাথে শহুরে যান্ত্রিক সভ্যতার সংঘাত ফুটে উঠেছে। ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক যখন তার চিলতে-পড়া নদীর ধার, ঘুড়ি ওড়ানো আর মুক্ত আকাশ ছেড়ে কলকাতার চার দেওয়ালে বন্দি হলো, তখন থেকেই তার মৃত্যুর কাউন্টডাউন শুরু হলো। প্রকৃতির কোল থেকে বিচ্যুত হওয়াই ফটিকের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
0 Comments